১৩. সাফল্যের রহস্য

 

বাণিজ্য, সাম্রাজ্য এবং ধর্মের বিস্তার বিভিন্ন মহাদেশের বিচ্ছিন্ন সেপিয়েন্সদেরকে একত্রিত করে একটি একীভূত মানব সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তবে পৃথিবীজুড়ে সেপিয়েন্সের এই ছড়িয়ে পড়া এবং একত্রিত হবার প্রক্রিয়াটা মোটেই সরল ছিল না, আর একেবারে নির্বিঘ্নেও সেটা সম্পন্ন হয়নি। যদিও মোটা দাগে দেখলে মনে হয়, অনেকগুলো ছোট ছোট সংস্কৃতির রূপান্তরিত হয়ে কয়েকটা বড় সংস্কৃতিতে পরিণত হওয়া এবং অবশেষে কয়েকটি প্রধান সংস্কৃতি মিলেমিশে বিশ্বব্যাপী একটি একক মানব সমাজের প্রতিষ্ঠা, এসবই ছিল সেপিয়েন্সের অনিবার্য নিয়তি।

সেপিয়েন্সের জন্য একটি বৈশ্বিক সমাজ গড়ে ওঠাটা অনিবার্য ছিল- এ কথার অর্থ অবশ্য এই নয় যে, আজ আমরা পৃথিবীটাকে যে রূপে দেখছি সেপিয়েন্সের জন্য অনিবার্য বৈশ্বিক সমাজের অবস্থা ঠিক সেরকমটাই হবার কথা ছিল। পৃথিবীর আজকের সমাজব্যবস্থার বিকল্প ব্যবস্থাগুলো কেমন হতে পারত সেটা আমরা চাইলেই কল্পনা করতে পারি। আমাদের প্রশ্ন জাগতেই পারে- দুনিয়াজুড়ে কেন আজ ইংরেজির জয়জয়কার, ডেনিশ ভাষার কেন নয়? কেন আজ পৃথিবীতে দুইশ কোটি খ্রিস্টান আর একশ পঁচিশ কোটি মুসলিম? অথচ জরুথস্ট্রবাদ ও ম্যানিকিয়ান ধর্মের অনুসারী কেন মাত্র দেড় লক্ষ? আমরা যদি দশ হাজার বছর পিছন থেকে আবার শুরু করতে পারতাম, তাহলে আবারও কি দ্বৈতবাদকে পিছনে ফেলে একেশ্বরবাদী ধর্ম পৃথিবীতে রাজত্ব করত?

যেহেতু হাতে-কলমে অতগুলো বছর পিছিয়ে যাবার সুযোগ আর নেই, সে কারণে এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর কী হতো সেটাও নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। কিন্তু ইতিহাসের দুটো গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য খেয়াল করলে এ প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

১। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে

ইতিহাসের পথের প্রতি মোড়ে মোড়ে থাকে অনেকগুলো বাঁক। অতীত থেকে একটি জানা পথে হেঁটে আমরা বর্তমানে পৌঁছাতে পারি। কিন্তু বর্তমান থেকে অগণিত অজানা পথ চলে গেছে ভবিষ্যতের দিকে। । এই অগণিত পথের মাঝে ইতিহাস সবসময় সহজ, মসৃণ, প্রায়-চেনা পথটাই বেছে নেবে, এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময়ই ইতিহাসের দিকপালেরা ইতিহাসকে টেনে নিয়ে যায় অপ্রত্যাশিত, অমসৃণ পথে।

খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকে রোমান সাম্রাজ্যে অনেকগুলো ধর্মের বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হয়। রোমানরা সেসব সম্ভাবনা নাকচ করে তাদের পুরনো, বৈচিত্র্যপূর্ণ বহু-ঈশ্বরবাদী ধর্ম নিয়েও থাকতে পারত। রোমানদের এর আগের শতাব্দীটা কেটেছে তিক্ত গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। রোমান সম্রাট কনস্ট্যানটিন সে কথা মাথায় রেখেই সম্ভবত ভেবেছিলেন, পুরো সাম্রাজ্যের নানা রকম মানুষকে এক কাতারে আনতে হলে প্রয়োজন এমন কোনও ধর্ম, যার নীতিগুলো হবে সুনির্দিষ্ট। বেছে নেওয়ার মতো অনেক ধর্মই তাঁর সামনে ছিল। তিনি বেছে নিতে পারতেন ম্যানিকিয়ানিজম, বেছে নিতে পারতেন পারস্যের দেবতা মিথ্রাস কিংবা সিবিলির দেবী আইসিসকে, অথবা গ্রহণ করতে পারতেন জরুথস্ট্রবাদ বা ইহুদি ধর্ম, এমনকি বৌদ্ধধর্মকেও। এতকিছুর মাঝেও তিনি কেন যিশুখ্রিস্টের পথে হাঁটলেন? খ্রিস্টধর্মে কি এমন কিছু ছিল যার প্রতি সম্রাটের ব্যক্তিগত বিশেষ আগ্রহ ছিল? নাকি খ্রিস্টধর্মের মাধ্যমে তাঁর কোনও উদ্দেশ্য সহজে পূরণ হতো? খ্রিস্টধর্ম বেছে নেওয়ার পিছনে কি তাঁর ধর্মীয় কোনও অভিজ্ঞতার ভূমিকা ছিল? নাকি খ্রিস্টধর্মের প্রসার দেখে তাঁর উপদেষ্টারা তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সেটা গ্রহণ করতে? ইতিহাসবিদরা এমন অনেক রকম ধারণা করতে পারেন, কিন্তু সঠিক কারণটা বের করে আনতে পারেন না। খ্রিস্টধর্ম কীভাবে রোমান সাম্রাজ্য দখল করল তার বিশদ বর্ণনা তাঁরা দিতে পারেন, কিন্তু ঠিক কী কারণে সেটা সম্ভব হল তা বলতে পারেন না।

কোনো কিছু ‘কীভাবে’ হল তার বর্ণনা দেওয়া, আর ‘কেন’ হল তা ব্যাখ্যা করা- এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী? পার্থক্য হল, ‘কীভাবে’র উত্তর দিতে বিভিন্ন সময়ে ঘটা ঘটনাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সাজালেই হয়। আর ‘কেন’র উত্তরে সেই ঘটনাগুলোর মধ্যে কার্য-কারণের সূত্র তৈরি করতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কেউ কেউ খ্রিস্টধর্মের উত্থানের মতো ঘটনাগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেন। তাঁরা মানুষের ইতিহাসকে পরিবেশ, জীববিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের মতে, ভূমধ্যসাগরীয় রোমান অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, বংশগতি ও অর্থনীতিই সেখানে একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রতিষ্ঠা অনিবার্য করে তোলে। তবে বেশিরভাগ ইতিহাসবিদই এ ধরনের তত্ত্বের ব্যাপারে সন্দিহান। ইতিহাসের ব্যাপারটাই এমন- কোনো একটা সময়ের কথা যত বেশি জানা যায়, তার ঘটনাপ্রবাহের ব্যাখ্যা দেওয়া ততটাই কঠিন হয়ে পড়ে। যারা ওই সময়ের ভাসা ভাসা জ্ঞান রাখে, তারা কী ঘটেছে তার উপরে জোর দেয়, পরের ঘটনাগুলো দেখে কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। আর যারা খুব ভালোভাবে জানে, তারা আরও কী কী ঘটতে পারত কিন্তু ঘটেনি, সেগুলোর ব্যাপারেও ভাবে।

সত্যি বলতে কী, যারা সেই সময়ের কথা সবচেয়ে ভালোভাবে জানত, মানে ওই সময়ে যারা বেঁচে ছিল, তারাই ছিল সবচেয়ে অন্ধকারে। সম্রাট কনস্ট্যানটিনের আমলে সাধারণ একজন রোমান নাগরিকের কাছে তাদের সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ ছিল ধোঁয়াশা। ইতিহাসের নিয়মই এই- পিছনে ফেলে আসা ঘটনাকে যতটা অবশ্যম্ভাবী মনে হয়, বর্তমান তার ধারে কাছেও যায় না। এখনকার সময়ের জন্যও কথাটা খাটে। আমরা কি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি? নাকি আরও খারাপ সময় সামনে আসছে? চীন কি সত্যিই একদিন সারা পৃথিবীর উপর ছড়ি ঘোরাবে? আমেরিকার আধিপত্য কি খর্ব হবে কোনোদিন? একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর মৌলবাদী আচরণ কি অচিরেই থামবে, নাকি আরও অনেক দিন পর্যন্ত চলবে? আমাদের সামনে কী আছে- বিরাট কোনো পরিবেশ বিপর্যয় নাকি প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ? আজ এসব প্রশ্নের প্রত্যেকটা উত্তরের পক্ষেই ভালো ভালো যুক্তি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু কী হবে সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারবে না কেউ। অথচ আজ থেকে দশ কি বিশ বছর পরে মানুষ যখন পিছনের কথা ভাববে, তখন তাদের মনে হবে, যা যা ঘটেছে ঠিক সেগুলোই তো হওয়ার কথা!

আবার অনেক সময় যেটা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম সেটাই হয়। ৩০৬ খ্রিস্টাব্দে কনস্ট্যানটিন যখন রাজা হলেন, তখন পৃথিবীতে খ্রিস্টধর্ম পালন করত অল্প কিছু মানুষ। তখন যদি কেউ বলত এই খ্রিস্টধর্মই হতে যাচ্ছে রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম, তাতে মানুষের প্রতিক্রিয়া কী হত জানতে হলে “২০৫০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ধর্ম হবে হিন্দু ধর্ম”- এ কথাটা একটু প্রচার করে দেখতে পারেন। ১৯১৩ এর অক্টোবরে বলশেভিকরা ছিল রাশিয়ার একটা ছোট দল। এই ছোট দলটাই যে চার বছরের মধ্যে পুরো দেশটা দখল করবে- এ কথাটা ছিল অবিশ্বাস্য। ৬০০ খ্রিস্টাব্দের আরবের মরুবাসী মানুষেরা আটলান্টিকের তীর থেকে ভারত পর্যন্ত জিতে নেবে, এ কথা তো আরও অবিশ্বাস্য ছিল। বাইজানটাইন (Byzantine) সেনাবাহিনী যদি আরবদের প্রাথমিক আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে পারত, তাহলে ইসলাম ধর্মও আরবের অল্প কিছু মানুষের ধর্ম হয়েই থাকত। তখন আমাদের ইতিহাসবিদরাও মক্কার একজন মধ্যবয়সী বণিকের উপর অবতীর্ণ ঐশ্বরিক বাণী কেন মানুষের মাঝে বিস্তৃত হতে পারল না- সেটা খুব সহজে ব্যাখ্যা করতেন।

এসবের মানে এই নয় যে, মানুষের সমাজে যে কোন সময় যে কোনও কিছু ঘটা সম্ভব। বিভিন্ন ভৌগোলিক, জীববৈজ্ঞানিক বা অর্থনৈতিক কারণে পরিস্থিতির উপর নানা রকম সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। আবার সেসব সীমাবদ্ধতার ভিতর থেকেই ইতিহাসের এমন সব পথ খুলে যায়, যাকে কোনোভাবেই কোনো নিয়মের মধ্যে ফেলা যায় না।

যারা ইতিহাসের চলার পথকে সুনির্দিষ্ট বা নিয়মতান্ত্রিক ভাবেন এই মন্তব্য তাদেরকে হয়ত কিছুটা হতাশ করবে। ইতিহাসের গতিপথকে নিয়মতান্ত্রিক ভাবার সুবিধা হল, সেক্ষেত্রে পৃথিবীর আজকের অবস্থা ও প্রচলিত বিশ্বাসগুলোকে অতীতের ঘটনাগুলোর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখানো যায়। এই যে আজকে আমরা বিভিন্ন জাতি হয়ে বিভিন্ন দেশে বাস করি, পুঁজিবাদী কাঠামোর উপর নির্ভর করে জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলি, মানবাধিকারের কথা বলি- এ সবকিছুকেই তখন প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত আমাদের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। ইতিহাসকে যদি আমরা নিয়মতান্ত্রিক বলে স্বীকার না করি তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায় এই জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ আর মানবাধিকারে পৃথিবীর এত মানুষের বিশ্বাস স্রেফ কাকতালীয় একটা ব্যাপার।

ইতিহাসকে কখনো নির্দিষ্ট একভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ ইতিহাস কোনও নিয়ম মেনে এগোয় না। এক সাথে এত বেশি ঘটনা ঘটে, আর একটা ঘটনার উপর অন্যান্য ঘটনার প্রভাব এত বেশি যে সব মিলিয়ে পুরো ব্যাপারটা খুব জটিল হয়ে দাঁড়ায়। কোনো একটা ঘটনার একটা ছোট্ট পরিবর্তন হলেই তার ফলাফল একসময় বিরাট হয়ে যায়। শুধু তাই না, ইতিহাস হল একটা দ্বিতীয় মাত্রার বিশৃঙ্খল সিস্টেম (second order chaotic system)। বিশৃঙ্খল সিস্টেম দুরকম হতে পারে। প্রথম মাত্রার বিশৃঙ্খল সিস্টেমের উপর ভবিষ্যদ্বাণীর কোনও প্রভাব নেই। এর একটা উদাহরণ হল আবহাওয়া। আবহাওয়া কেমন হবে সেটা অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। কিন্তু আমরা সেটার কম্পিউটার মডেল দাঁড় করাতে পারি, আর সেই মডেল আবহাওয়া নিয়ন্ত্রক বিষয়গুলো নিয়ে হিসেব করে নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। এই ভবিষ্যদ্বাণী আবহাওয়ার উপর কোন প্রভাব ফেলে না বা আবহাওয়া পাল্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা পালন করে না।

দ্বিতীয় মাত্রার বিশৃঙ্খলার সমস্যা হল, সেটা নিয়ে কোনও ভবিষ্যদ্বাণী করা হলে সেই ভবিষ্যদ্বাণীও পরবর্তী ঘটনার উপর প্রভাব বিস্তার করে। বাজার হল এরকম সিস্টেম। আজ যদি এমন একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম লেখা হয় যেটা শতকরা একশ ভাগ নিশ্চয়তায় আগামীকাল তেলের দাম কত হবে সেটা বলে দেবে, তাহলে কী হবে? ভবিষ্যদ্বাণী হওয়ার সাথে সাথে বাজারে তেলের দাম পালটে যাবে, ফলে ওই ভবিষ্যদ্বাণীও ব্যর্থ হবে। ধরা যাক আজ প্রতি ড্রাম তেলের দাম ৯০ ডলার, আর আমাদের কম্পিউটার প্রোগ্রাম বলল আগামীকাল সেটা ১০০ ডলার হয়ে যাবে। সাথে সাথে তেল ব্যবসায়ীরা তেল কিনতে ছুটবে, কারণ তারা জানে আজ ৯০ ডলারে তেল কিনে কাল ১০০ ডলারে সেটা বেচা যাবে। তাহলে আর আগামীকাল নয়, আজই তেলের দাম ১০০ ডলার হয়ে যাবে। কাল কত হবে? কেউ জানে না সেটা।

রাজনীতিও আরেকটা দ্বিতীয় মাত্রার বিশৃঙ্খল সিস্টেম। অনেকেই ১৯৮৯ সালের সোভিয়েত বিপ্লব কিংবা ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’ বিপ্লব কেন আগে থেকে আঁচ করা গেল না সেজন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দায়ী করেন। কিন্তু সেটা অনুচিত। বিপ্লব তার সংজ্ঞানুযায়ীই অনুমানযোগ্য নয়। আগে থেকে কোন বিপ্লবের অনুমান করা গেলে সে বিপ্লবের সম্ভাবনাই নাকচ হয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হল, কেন আগে থেকে এসব বিপ্লব সম্পর্কে অনুমান করা যায়নি? ধরুন, ২০১০ সালে কয়েকজন রাজনীতি বিশ্লেষক আর তুখোড় কম্পিউটার প্রোগ্রামার মিলে এমন একটা অ্যালগরিদম তৈরি করল যেটা দিয়ে কবে কোথায় বিপ্লব হবে সেটা আগে থেকেই নিখুঁতভাবে জানা যাবে। তারপর তারা তাদের তৈরি প্রোগ্রামটা নিয়ে গেল রাষ্ট্রপতি হোসনি মোবারকের কাছে চড়া দামে বিক্রির আশায়। সেটা কিনে মোবারক যখন দেখবেন ২০১১ সালেই বিপ্লব আসন্ন, তখন কী করবেন তিনি? নিশ্চয়ই নাগরিকদের উপর থেকে করের বোঝা কমিয়ে দেবেন, কোটি কোটি ডলার খরচ করবেন নানাদিকে, সাথে তাঁর গোপন পুলিশ বাহিনীকেও তৈরি থাকতে বলবেন, যদি দরকার হয়। এরপর ২০১১ সাল আসবে, যাবে, কিন্তু বিপ্লব আর হবে না, কারণ বিপ্লব যাতে সংগঠিত না হয় সে ব্যবস্থা তো আগেই করা আছে। এরপর মোবারক সেই রাজনীতি বিশ্লেষক আর প্রোগ্রামারকে ডেকে টাকা ফেরত চাইবেন, কারণ প্রোগ্রামটা কাজ করেনি, তার ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হয়েছে। হয়তো সেই টাকা দিয়ে তিনি নতুন একটা প্রাসাদই বানিয়ে ফেলতে পারতেন। প্রোগ্রামারও যুক্তি দেখাতে পারে, ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক হয়েছে বলেই তো বিপ্লব হয়নি, কিন্তু মোবারক তা মানবেন কেন?

তাহলে ইতিহাস পড়ে কী লাভ? ইতিহাস তো পদার্থবিজ্ঞান কিংবা অর্থনীতি নয় যে সবকিছু একেবারে গাণিতিক সূত্র মেনে চলবে। আসলে ইতিহাস পড়ার উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ জানা নয়, এর উদ্দেশ্য হল আমাদের চিন্তাকে বিস্তৃত করা, এইটুকু বুঝতে পারা যে বর্তমানে যা হচ্ছে তা মোটেই পূর্বনির্ধারিত কিছু নয়। এর উদ্দেশ্য হল এটা জেনে রাখা যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা যা যা ভাবি, সম্ভাব্য ঘটনার বিস্তার তার চেয়েও অনেক বেশি। আমরা যখন ইউরোপীয়দের আফ্রিকা দখল করার কথা পড়ি, সেটা আমাদের জানায় যে এখানে কালো মানুষের উপর সাদা মানুষের ছড়ি ঘোরানোটা কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, সেটা অনেকগুলো সম্ভাব্য ঘটনার মধ্যে একটা মাত্র, এবং ঘটনাটা অন্যরকমও হতে পারত।

২। অন্ধ ঘুণপোকা

ইতিহাস কোন পথ ধরে এগোবে তার ব্যাখ্যা আমরা দিতে পারি না। কিন্তু ইতিহাস প্রসঙ্গে যে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যটা আমরা করতে পারি তা হল ইতিহাসের গতিপথ মানুষের ভালোমন্দের ধার ধারে না। ইতিহাস যে সবসময় মানুষের জন্য সবচেয়ে মঙ্গলজনক পথটাই বেছে নিয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। এমন কোনও প্রমাণ নেই যা দেখে আমরা বলতে পারি মানুষের জন্য কল্যাণকর সংস্কৃতিগুলোই টিকে থাকে আর অন্যগুলো হারিয়ে যায়। খ্রিস্টধর্ম যে ম্যানিকিয়ানিজিমের চেয়ে ভালো- এ কথা জোর দিয়ে বলার মতো কোনো যুক্তি আমাদের হাতে নেই। পারস্যের সাসানিদ সাম্রাজ্যের চেয়ে আরব সাম্রাজ্য যে মানুষের বেশি উপকার করেছে- এ কথাও আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না।

ইতিহাস যে মানুষের জন্য কল্যাণের পথটাই বেছে নেয়- এ কথা আমরা বলতে পারি না, কারণ এই ‘কল্যাণের’ কোনও সর্বজনগ্রাহ্য মাপকাঠি নেই। ‘ভালো’কে এক এক সংস্কৃতিতে এক একভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বিজয়ীরা সবসময় ভাবে তাদের ধারণাটাই ঠিক। কিন্তু আমরা সেটা মেনে নেব কেন? খ্রিস্টানরা মনে করে ম্যানিকিয়ানিজমের উপর খ্রিস্টধর্মের বিজয় মানবজাতির জন্য ভালো। কিন্তু আমরা যদি খ্রিস্টধর্মের অনুসারী না হই, তাহলে এ কথা মেনে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। একইভাবে মুসলমানরা মনে করে যে মুসলিম শাসনের কাছে সাসানিদ সাম্রাজ্যের পতনও মানুষের জন্য কল্যাণকর ঘটনা। কিন্তু যে মুসলিম নয়, তার কাছে এমনটা নাও মনে হতে পারে। খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম, দুটোর কোনোটাই যদি জয়ী না হতো, তাহলে আজ সেটাকেও নিশ্চয়ই মানুষের জন্য ‘ভালো’ হিসেবেই দেখা হতো।

অনেক বিশেষজ্ঞের কাছে সংস্কৃতি জিনিসটা এক ধরনের মানসিক পরজীবী সংক্রমণের মতো একটা ব্যাপার, নিজের অজান্তেই যার বাহক হিসেবে কাজ করে মানুষ নিজে। ভাইরাসের মতো জৈব পরজীবী তাদের বাহকের শরীরের ভিতরে বেঁচে থাকে। এরা এক বাহকের শরীর থেকে অন্য বাহকের শরীরে ছড়ায়, বাহকের শরীর থেকে পুষ্টি আহরণ করে বাহককে দুর্বল করে ফেলে, অনেক ক্ষেত্রে মেরেও ফেলে। ভাইরাসের শুধু নিজের চাহিদা পূরণ করা দরকার, এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়ানো দরকার, বাহক বেঁচে থাকল না মারা গেল সেটা তার দেখার বিষয় নয়। ঠিক একইভাবে সাংস্কৃতিক ধারণাগুলোও টিকে থাকে মানুষের মস্তিষ্কের ভিতর। ভাইরাসের মতো এসব ধারণাও বিকাশ লাভ করে, এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। এগুলোর প্রতি মানুষের এক ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয় এবং অনেক সময় সংস্কৃতির কারণে মানুষ নিজের প্রাণ ত্যাগ করতেও দ্বিধা বোধ করে না। খ্রিস্টানদের স্বর্গ আকাশে, কিংবা কম্যুনিস্টদের স্বর্গ এই পৃথিবীতেই- এইরকম একটা সাংস্কৃতিক ধারণাকে লালন ও প্রচার করতে অনেক মানুষ তাদের সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দেয়, অনেকে মৃত্যুবরণ করতেও পিছপা হয় না। ভাইরাসের মতই মানুষ মরে গেলেও সাংস্কৃতিক ধারণাটা বেঁচে থাকে, আরও মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যায়। মার্ক্সবাদীদের মতে সংস্কৃতি হল অন্য মানুষের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের জন্য কিছু মানুষের ষড়যন্ত্র, কিন্তু মানসিক পরজীবীর ধারণাটা ঠিক সেটা বলে না। এই ধারণা অনুযায়ী, সংস্কৃতি হল ঘটনাচক্রে উদ্ভূত কিছু মানসিক পরজীবী, যারা নিজের টিকে থাকার স্বার্থে আক্রান্ত মানুষকে ব্যবহার করে মাত্র।

এ ধরনের ব্যাখ্যাকে অনেক সময় বলা হয় ‘মিমতত্ত্ব’ (memetics)। জীবের বিবর্তন যেমন হয় ‘জিন’ (gene) এর প্রতিলিপি তৈরির মাধ্যমে, ঠিক তেমনি সংস্কৃতির বিবর্তন হয় ‘মিম’ (meme) এর প্রতিলিপি তৈরির মাধ্যমে। এখানে জিন এবং মিম দুটোই তথ্যের ক্ষুদ্রতম একক, একটা জৈবিক, অন্যটা সাংস্কৃতিক।১ যেসব সংস্কৃতি তাদের মিমগুলোর প্রতিলিপি তৈরি করতে ও ছড়িয়ে দিতে পারে, সেগুলোই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম হয়। কিন্তু এসব মিমের বাহক মানুষগুলোর পরিণতি কী হচ্ছে সেটা এখানে অবান্তর।

অনেক বিশেষজ্ঞই এই মিমতত্ত্বকে গোনায় ধরতে চান না। তাঁদের কাছে এটা হল সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়াগুলোকে জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখার একটা আনাড়ি প্রয়াস মাত্র। কিন্তু এঁদের অনেকেই আবার মিমতত্ত্বেরই এক জ্ঞাতিভাই ‘উত্তরাধুনিকতা’ (postmodernism) তত্ত্বকে মানেন। মিমতত্ত্ব যেখানে মিমকে সংস্কৃতির গাঠনিক উপাদান হিসেবে ধরে নেয়, সেখানে উত্তরাধুনিকতা ডিসকোর্সকে (discourse) সংস্কৃতির গাঠনিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। এই যেমন উত্তরাধুনিক চিন্তাবিদদের মতে জাতীয়তাবাদ হল ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া একটি ‘মহামারী’- যার প্রভাবে এই দুই শতাব্দীতে পৃথিবী দেখেছে এতগুলো যুদ্ধ, অত্যাচার, ঘৃণা আর গণহত্যা। প্রথমে এক দেশের মানুষ এই মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছে, তারপর সেটা ছড়িয়ে গেছে আশপাশের দেশেও। এই ‘ভাইরাস’টা মানুষের জন্য উপকারী হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিল, কিন্তু সেটা নিজের উপকারই করেছে কেবল।

একই রকম যুক্তি সমাজ বিজ্ঞানেও গেম থিওরির(Game Theory) একটা অংশ হিসেবে লক্ষ্য করা যায়। গেম থিওরি পুরো ব্যাপারটাকে অনেকজন খেলোয়াড়ের একটা খেলা হিসেবে দেখে। খেলায় খেলোয়াড়ের কোনো দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ অন্য খেলোয়াড়ের জন্য ক্ষতিকর হলেও সেটাই খেলার নিয়ম হিসেবে থেকে যায় এবং সবাই সে নিয়মটাই অনুসরণ করে খেলায় জিতবার চেষ্টা করে। অস্ত্রের প্রতিযোগিতা এর একটা ভালো উদাহরণ। এই প্রতিযোগিতায় নেমে অনেক প্রতিযোগীই সর্বস্বান্ত হয়ে যায়, কিন্তু শেষমেশ ক্ষমতার লড়াইয়ে এগোতে পারে না কেউই। পাকিস্তান যখন তার বিমান বাহিনীর জন্য নতুন বিমান কেনে, ভারতও হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। আবার ভারত যখন পারমাণবিক বোমা বানায়, পাকিস্তানও সেদিকে এগোয়। পাকিস্তান তার নৌবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি করলে ভারতও তার উচিত জবাব দেয়। এতকিছুর পরেও দেখা যায় ভারত আর পাকিস্তানের সামরিক শক্তির ভারসাম্যটা আগে যেমন ছিল পরেও তেমনই আছে, কিন্তু এর মাঝখান দিয়ে দুই দেশই খরচ করে ফেলেছে কোটি কোটি টাকা। যে টাকা তারা খরচ করতে পারত দেশের মানুষকে উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে, তা খরচ হয়ে গেল অস্ত্র কিনতে। এই অপ্রতিরোধ্য অস্ত্রের প্রতিযোগিতা একটা ছোঁয়াচে রোগের মতোই এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কোনো দেশেরই উপকার হচ্ছে না, কিন্তু প্রতিযোগিতাটা নিজে টিকে থাকছে, আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ব্যাপারটা অনেকটা বিবর্তনের মতোই। একটা জিন নিজে টিকে থাকার জন্য সচেতনভাবে কিছুই করে না, অথচ প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলাফল হিসেবে সেটা টিকে যায়। অস্ত্রের প্রতিযোগিতাও ঠিক তেমন। এর নিজে থেকে টিকে থাকবার কোন ক্ষমতা নেই, কিন্তু ক্ষমতার লড়াইয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাত হিসেবে এই প্রতিযোগিতা সমাজে টিকে থাকে।

গেম থিওরি, উত্তরাধুনিকতা বা মিমতত্ত্ব- যা দিয়েই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, ইতিহাসের উদ্দেশ্য কখনোই মানব কল্যাণ নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে সফল সংস্কৃতিগুলোই যে হোমো সেপিয়েন্সের জন্য সবচেয়ে ভালো- সেটা ভাবার কোনোই কারণ নেই। বিবর্তনের মতো ইতিহাসও একজন ব্যক্তি মানুষের সুখ-সুবিধার কথা ভাবে না। আবার একজন মানুষের সেই পরিমাণ জ্ঞান-বুদ্ধি বা ক্ষমতা থাকে না যা দিয়ে ইতিহাসকে সে নিজের সুবিধা অনুযায়ী চালিত করবে।

এভাবেই ইতিহাস এগিয়ে যায় তার নিজের পথে। কোন রহস্যময় কারণে সে অনেকগুলো পথের মধ্যে একটা ধরে এগোয়, জানা যায় না। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইতিহাস এমন একটা পথ বেছে নিয়েছিল যা পরবর্তীতে শুধু মানুষ নয়, সারা পৃথিবীর ভাগ্য পালটে দেয়। এই ঘটনাকে আমরা বলি বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। এই বিপ্লবের শুরু হয়েছিল বিশাল আফ্রো-এশীয় ভূখণ্ডের পশ্চিম কোণে, ইউরোপে। এর আগ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে ইউরোপের তেমন কোনো ভূমিকাই ছিল না। অথচ সেখান থেকেই কেন বৈজ্ঞানিক বিপ্লব শুরু হল? কেন চীন বা ভারতে সেটা হল না? কেন সেটা খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি থেকে শুরু হল? এর দুশ বছর আগে, বা তিনশ বছর পরে কেন নয়? উত্তর জানা নেই। গবেষকরা এর ডজন ডজন ব্যাখ্যা দিতে পারেন, কিন্তু তার কোনোটাই বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি খাপ খায় না।

ইতিহাসের সামনে অসংখ্য সম্ভাবনা, এর মধ্যে অনেকগুলোকেই আমরা অনেকসময় উপলব্ধিও করতে পারি না। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবকে বাদ দিয়েও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকা মানুষের ইতিহাস কল্পনা করা যেতে পারে। একইভাবে ভাবা যেতে পারে খ্রিস্টধর্ম, রোমান সাম্রাজ্য অথবা স্বর্ণমুদ্রার ব্যবহার ছাড়া মানুষের অন্য কোন সম্ভাব্য ইতিহাস।


1 Susan Blackmore, The Meme Machine (Oxford: Oxford University Press, 1999).

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s