১৭. শিল্পের রথ

 

আধুনিক যুগের অর্থনীতি বিকাশ লাভের পেছনে দুটো উপাদানের অবদান অনস্বীকার্য। একটা হল, ভবিষ্যতের উপর আমাদের অগাধ বিশ্বাস, আর আরেকটা হল পুঁজিপতিদের নতুন নতুন পণ্যের উৎপাদনে ক্রমাগত বিনিয়োগ। কিন্তু অর্থনীতির বিকাশে কেবল এই দুটি উপাদানই যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য আরও প্রয়োজন শক্তির যোগান এবং কাঁচামাল। এসবের পরিমাণ সীমিত। যখন এই দুটো উপাদানের যোগান ফুরিয়ে আসবে, সমস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো তখন মুখ থুবড়ে পড়বে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কাঁচামাল এবং শক্তির এই সীমাবদ্ধতার ব্যাপারটি কাগুজে তত্ত্ব মাত্র। বিগত কয়েক শতকে মানুষের শক্তি এবং কাঁচামালের ব্যবহার আগের তুলনায় বহুগুন বেড়েছে এবং তা সত্ত্বেও বিস্ময়করভাবে মানুষের ব্যবহার উপযোগী শক্তির পরিমাণ কমে যাওয়ার বদলে উল্টো বেড়েছে। যখনই এই দুই উপাদানের যে কোন একটির অভাবে অর্থনৈতিক উন্নতির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে, তখনই বিনিয়োগকারীরা সেই সমস্যা সমাধানের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত গবেষণায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলেছেন। এইসব বিনিয়োগ কেবল কাঁচামাল এবং শক্তিকে সাশ্রয়ী ভাবে ব্যবহারের কৌশলই উদ্ভাবন করেনি, সন্ধান দিয়েছে শক্তি এবং কাঁচামালের সম্পূর্ণ নতুন উৎসের।

পরিবহন শিল্পের কথাই ধরুন। বিগত তিনশ’ বছরে মানুষ পশুবাহিত মাল গাড়ি, এক চাকার ঠেলাগাড়ি থেকে শুরু করে ট্রেন, মোটরগাড়ি, শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির বিমান, মহাকাশযান ইত্যাদি নানা ধরনের কোটি কোটি সংখ্যক যানবাহন তৈরি করেছে। এত বিপুল সংখ্যক যানবাহন তৈরির ফলে পরিবহন শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও কাঁচামালের ঘাটতি তৈরি হওয়ার কথা এবং পরিবহন শিল্পের সাথে জড়িতদের তলানিতে পড়ে থাকা কাঁচামাল নিয়ে কাড়াকাড়ি করার কথা। বাস্তব অবস্থা কিন্তু এর পুরোপুরি বিপরীত। যেখানে ১৭০০ সালে পরিবহন শিল্পকে উৎপাদনের জন্য প্রধানত কাঠ এবং লোহার উপর নির্ভর করতে হত, আজকে তাদের জন্য আছে প্লাস্টিক, রাবার, অ্যালুমিনিয়াম এবং টাইটেনিয়ামের মত নতুন উদ্ভাবিত অনেক কাঁচামালের পর্যাপ্ত যোগান, যেসবের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের পূর্বপুরুষদের কোনও ধারণাই ছিল না। ১৭০০ সালে যেখানে অধিকাংশ গাড়ি তৈরি হত ছুতার আর কামারের পেশীশক্তিকে অবলম্বন করে, সেখানে আজ পেট্রোলিয়াম চালিত ইঞ্জিন আর পারমাণবিক শক্তিতে টয়োটা এবং বোয়িং নামের বড় বড় যানবাহন তৈরির কারখানাগুলো চালিত হচ্ছে। প্রায় একই ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ছোঁয়া আমরা আজকাল শিল্পের অন্যান্য খাতেও দেখতে পাই। এই বিপ্লবের নাম শিল্প বিপ্লব।

শিল্প বিপ্লবের হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ জানত কীভাবে বিভিন্ন ধরনের শক্তির উৎসকে ব্যবহার করতে হয়। তারা কাঠ পুড়িয়ে উৎপন্ন তাপে লোহা গলাত, বাড়িঘর গরম রাখত আর পিঠা তৈরি করত। পালতোলা জাহাজ বাতাসের শক্তি ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াত আর পানিচালিত কলে নদীর স্রোতকে কাজে লাগিয়ে মাড়াই করা হত ধান। তা সত্ত্বেও এই প্রত্যেক উৎসের ব্যবহারের কিছু সীমাবদ্ধতা এবং সমস্যা ছিল। গাছের যোগান সব জায়গায় পাওয়া যেত না, দরকার পড়লেই বায়ুকল চালানোর জন্য বাতাস বইতো না এবং কেবলমাত্র নদীর কাছাকাছি বসবাস করলেই নদীর স্রোতকে কাজে লাগানো সম্ভব হতো।

তার চেয়েও বড় সমস্যা যেটা ছিল তা হল, মানুষ এক ধরনের শক্তিকে অন্য ধরনের শক্তিতে রূপান্তর করতে পারত না। তারা বাতাস এবং স্রোতের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পালতোলা জাহাজ চালাতে বা কলে মাড়াই করতে পারত, কিন্তু তারা এসব দিয়ে পানি গরম করতে কিংবা লোহা গলাতে পারত না। একইভাবে, তারা কাঠ পুড়িয়ে উৎপন্ন তাপ ব্যবহার করে মাড়াইকলের চাকা ঘুরাতে পারত না। সেকালে, শক্তির রূপান্তর করতে পারে এমন একটি যন্ত্রের কথাই কেবল মানুষ জানত, তা হলো শরীর। পরিপাক নামক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী খাদ্য নামক জৈব জ্বালানি গ্রহণ করত এবং পেশী নড়াচড়ার মাধ্যমে নতুন উপায়ে সে শক্তি ব্যবহার করত। নর, নারী এবং অন্যান্য প্রাণী নানা ধরনের শস্য এবং মাংস খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত, সেসব থেকে পাওয়া শর্করা এবং চর্বি পুড়িয়ে তারা রিকশা চালাত বা লাঙ্গল ঠেলত।

যেহেতু মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর শরীরই ছিল শক্তি রূপান্তরের একমাত্র অবলম্বন, সে কারণে পেশীশক্তিই ছিল মানুষের সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। মানুষের পেশী ঠেলাগাড়ি আর বাড়ি বানাত, গরুর পেশী মাঠে চালাত লাঙ্গল আর ঘোড়ার পেশী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হত। জৈবিক পেশীশক্তি চালিত এসব যন্ত্রের একটিই শক্তি আহরণের উৎস ছিল- সেটি হল গাছপালা। গাছপালা আবার শক্তির জন্য নির্ভরশীল ছিল সূর্যের উপর। সালোকসংশ্লেষণ নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা সূর্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করত এবং তাকে রূপান্তরিত করত ফল, মূল, বীজ ইত্যাদি নানা জৈব উপাদানে। সুতরাং, এ পর্যন্ত মানুষ যা কিছু করেছে তার পেছনের শক্তির মূল যোগানদাতা ছিল সূর্য, গাছ যার আলো গ্রহণ করেছে এবং গাছ থেকে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী তা গ্রহণ করে তাকে পেশীশক্তিতে পরিণত করেছে।

সুতরাং, এতদিন মানুষের ইতিহাস নির্ভরশীল ছিল দু’টো প্রধান চক্রের উপর- গাছপালার বেড়ে ওঠার চক্র আর সূর্যের আলোর চক্র (দিন বা রাত, গ্রীষ্ম কিংবা শীত)। কোন অঞ্চলে যখন সূর্যের আলো কম, ক্ষেতে শস্য এখনও পেকে ওঠে নি, সেখানে তখন মানুষের শক্তি থাকত কম। ফাঁকা থাকত গোলা, কর সংগ্রহকারী পাইক পেয়াদারও করার কিছু থাকত না, সৈন্যদের পক্ষে যুদ্ধ জয় করতে যাওয়া সম্ভব হত না আর রাজারাও তখন তাঁবু টানিয়ে শান্তিতে ঝিমোতেন। আবার সূর্য যখন পূর্ণ তেজে জ্বলে উঠত, ফসলের ক্ষেত ভরে উঠত পাকা ফসলে, কৃষকেরা তখন ফসল কাটতে আর গোলায় ফসল জমানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তো। কর সংগ্রহকারী পাইক-পেয়াদারা কর সংগ্রহে হন্যে হয়ে উঠতো। সৈন্যদের পেশীর জোর আর তলোয়ারের ধার যেত বেড়ে। রাজামশাই আয়োজন করতেন বড় বড় সভার এবং সিদ্ধান্ত নিতেন রাজ্যের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে। সকলেরই চালিকা শক্তি ছিল ভুট্টা, ধান এবং আলুর মাঝে জমে থাকা সৌর শক্তি।

হেঁশেলে লুকিয়ে থাকা মানিক

হাজার হাজার বছর ধরে শক্তি উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি দিনরাত মানুষের হাতের কাছেই ঘুরঘুর করেছে। কিন্তু, আশ্চর্যজনকভাবে, কেউ সেটা খেয়াল করে দেখেনি। একজন গৃহিণী বা চাকর যতবার চায়ের জন্য কেটলিতে পানি ফুটিয়েছে বা আলু সিদ্ধ করার জন্য হাঁড়িতে পানি চড়িয়ে উনুনে রেখেছে, ততবার এই আবিষ্কার মানুষের চোখে চোখ রেখে মুখ টিপে হেসেছে। পানি যখনই ফুটতে শুরু করেছে, কেটলি বা হাঁড়ির ঢাকনা ঠিক একটু পরেই লাফিয়ে উঠেছে। তাপ রূপান্তরিত হয়েছে বস্তুকে নাড়িয়ে দেয়ার শক্তিতে। কিন্তু, পানি ফোটার পর সময়মত কেটলি বা হাঁড়ির ঢাকনা না সরানো হলে বারবার ঢাকনার লাফিয়ে ওঠা একটা বিরক্তিকর ব্যাপার। তাই, কেউ এই বিষয়টাকে আগ্রহের সাথে লক্ষ্য করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি।

উনবিংশ শতকে বারুদ আবিষ্কারের পরপরই তাপকে বস্তুর নড়াচড়া বা সরণে রূপান্তর করার একটি প্রক্রিয়ার আংশিক উদ্ভাবন হয়। প্রথম প্রথম কামানের গোলায় বারুদ ব্যবহারের চিন্তাটাই এত আজগুবি ছিল যে মানুষ শত শত বছর ধরে কেবলমাত্র আতশবাজি তৈরির কাজেই বারুদ ব্যবহার করে এসেছে। পরবর্তীতে, সম্ভবত যেদিন বারুদ গুঁড়ো করতে গিয়ে হামানদিস্তা থেকে পেষণীটা ছুটে বেরিয়ে গেল, সেদিনই তৈরি হলো প্রথম বন্দুক।- আর সেদিন থেকেই জন্ম হল বন্দুকের। বারুদের আবিষ্কার এবং সত্যিকারের যুদ্ধাস্ত্রে তার ব্যবহার হতে প্রায় ছয়শ বছর লেগে গেল।

এতকিছুর পরেও, সে সময় তাপকে সরণে পরিণত করার ধারণাটি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে, তাপ ব্যবহার করে বস্তু সরানোর প্রথম যন্ত্রটি তৈরি করতে মানুষের আরও তিনশ বছর লেগে গেছে। প্রায় তিনশ বছর পর এই নতুন প্রযুক্তি জন্ম নিল ব্রিটেনের কয়লা খনিতে। সে সময়, জনসংখ্যা বাড়ার দরুন বর্ধিত জনগণের আবাস আর চাষের জমির জন্য ব্রিটেনের বনভূমি উজাড় হতে শুরু করেছে। ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে জ্বালানি কাঠের যোগান। মানুষ কাঠের বদলে খনিজ কয়লাকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। তখনকার ব্রিটেনে অনেক কয়লাখনিই ছিল জলমগ্ন এলাকায়। বন্যার কারণে এসব কয়লাখনির নিচের স্তরগুলো থেকে কয়লা উত্তোলন করা একরকম অসম্ভব হয়ে পড়ল। সবার কাছেই তাই এ সমস্যার আশু সমাধান জরুরি হয়ে পড়ল। অবশেষে, আনুমানিক ১৭০০ সালের দিকে এক নতুন, অচেনা শব্দের গুঞ্জনে ব্রিটেনের কয়লাখনিগুলো সচকিত হয়ে উঠল। সেই গুঞ্জন- একসময় হয়ে উঠল শিল্প বিপ্লবের অগ্রদূত। প্রথমে মৃদু, তারপর কয়েক দশকে ক্রমশই উচ্চগ্রামে উঠতে লাগল সেই শব্দ, ছড়িয়ে পড়ল এবং শেষ পর্যন্ত সমস্ত পৃথিবীকে সে তার বিপুল শব্দের চিৎকারে ভরিয়ে তুলল। এই শব্দ ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিনের।

বাষ্পীয় ইঞ্জিনের অনেক রকমফের থাকলেও তাদের সবারই মূলনীতি এক। আপনি কয়লা বা কাঠের মত কোন একটি জ্বালানী পোড়াবেন, তা দিয়ে পানি ফুটানো হবে আর তার ফলে তৈরি হবে বাষ্প। বাষ্প যখন গরম হয়ে প্রসারিত হবে তখন এটি পিস্টনকে ঠেলে দেবে। পিস্টনের নড়াচড়ার ফলে এর সাথে সংযুক্ত কোন জিনিসও নড়াচড়া করতে শুরু করবে। ব্যাস, তাপশক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল! অষ্টাদশ শতকে ব্রিটেনের কয়লাখনিতে পিস্টনগুলো একটি পানি সেচ করার পাম্পের সাথে যুক্ত থাকত যেগুলো খনির তলদেশ থেকে পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহৃত হতো। প্রথম দিককার ইঞ্জিনগুলোতে অনেক বেশি জ্বালানির অপচয় হতো। একগাদা কয়লা পুড়িয়ে নামমাত্র পানি নিষ্কাশন করা যেত। কিন্তু, এর ফলেই কয়লাখনির কয়লা উত্তোলন হয়ে যেত অনেক সহজ আর পোড়ানোর জন্য কয়লারও অভাব থাকত না। সুতরাং, সেসব অপচয় নিয়ে কেউ মাথাও ঘামাতো না।

পরবর্তী দশকগুলোতে ব্রিটিশ উদ্যোক্তাগণ বাষ্পীয় ইঞ্জিনের দক্ষতা অনেকখানি বাড়িয়ে তুললেন এবং কয়লাখনির গণ্ডি থেকে তুলে এনে তা দিয়ে শুরু করলেন সুতা তৈরি আর কাপড় বোনার কাজ। আর এর ফলে আমূল পাল্টে গেল বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন পদ্ধতি এবং আগের যে কোন সময়ের চেয়ে কম খরচে এবং বেশি পরিমাণ বস্ত্র উৎপাদন সম্ভবপর হলো। চোখের নিমিষে তাবৎ পৃথিবীর উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠল ব্রিটেন। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, কয়লাখনি পেরিয়ে বস্ত্রশিল্পে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ব্যবহার মানুষের একটি বিশাল মানসিক সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙে দিল। যদি কয়লা পুড়িয়ে তাঁত কারখানার চাকা সচল রাখা যায়, তবে তা দিয়ে গাড়ির চাকাও তো ঘোরানো যেতে পারে!

১৮২৫ সালে খনির কয়লাভর্তি বগিওয়ালা একটি ট্রেনের সাথে একজন ব্রিটিশ প্রকৌশলী একটি বাষ্পীয় ইঞ্জিন জুড়ে দিলেন। এই ইঞ্জিন লোহার তৈরি একটি রেললাইনের উপর দিয়ে বগিগুলোকে কয়লাখনি থেকে বিশ কিলোমিটার দূরের এক বন্দরে পৌছে দিল। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম বাষ্পচালিত যান। এরপরের হিসেব আরও সহজ, বাষ্পচালিত ইঞ্জিন যদি কয়লাভর্তি বগি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, তবে অন্যান্য জিনিস কেন নয়? আর তাতে মানুষই বা চড়তে পারবে না কেন? ১৮৩০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মানুষ বহন করার জন্য লিভারপুল থেকে ম্যানচেস্টার পর্যন্ত প্রথম বাণিজ্যিক রেললাইন চালু হল। যে বাষ্পের শক্তি কয়লা খনির পানি নিষ্কাশন আর তাঁতকল চালাতে ব্যবহৃত হতো, সেই একই শক্তি ব্যবহার করেই চলতে শুরু করল এই ট্রেন। পরবর্তী বিশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ব্রিটেনে দশ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্যের রেললাইন জুড়ে রেলগাড়ি চলতে শুরু করল।

এইসব ঘটনা থেকে মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মাল যে, যন্ত্র ব্যবহার করে একরকম শক্তিকে অন্য শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। উপযুক্ত যন্ত্র থাকলে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে, যে কোন ধরনের শক্তিকে আমরা অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, মানুষ যখন জানলো যে, পরমাণুর মধ্যে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত থাকে, তৎক্ষণাৎ তার মনে চিন্তা জন্মাল, কীভাবে পরমাণুর এই শক্তিকে অবমুক্ত করা যায় এবং তা দিয়ে বিদ্যুৎ, যুদ্ধের সাবমেরিন বা নগর ধ্বংসকারী পারমাণবিক বোমা বানানো যায়। চীনাদের বারুদ আবিষ্কার এবং তা ব্যবহার করে বানানো কামান দিয়ে তুর্কিদের কনস্টানটিনোপলের দেয়াল ধ্বংস করার মধ্যবর্তী সময় ছিল ছয়শ’ বছর। অথচ আইনস্টাইনের ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করার গাণিতিক সূত্র E=mc2 আবিষ্কার আর পারমাণবিক বোমা দিয়ে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরকে ধুলিসাৎ করে দেওয়া বা বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র গজিয়ে ওঠার মধ্যবর্তী সময় ছিল মাত্র চল্লিশ বছর!

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল অন্তর্দহ (internal combustion) ইঞ্জিনের আবিষ্কার, যেটি এক প্রজন্মের কিছুটা বেশি সময়ের মধ্যেই পরিবহন ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে এবং পেট্রোলিয়াম পরিণত হয় তরল রাজনৈতিক শক্তিতে। এর হাজার বছর আগে থেকেই পানিরোধী ঘরের ছাদ তৈরিতে বা গাড়ির চাকার পিচ্ছিলকারক পদার্থ হিসেবে পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। কিন্তু, গত একশ বছরের আগে পেট্রোলিয়ামের অন্য কোন সম্ভাবনার কথা কারও মাথায়ই আসেনি। সে সময় তেলের মালিকানা লাভের জন্য যুদ্ধ ও রক্তস্রোত বইয়ে দেবার মত ধারণাই ছিল হাস্যকর। হ্যাঁ, রাজ্য, সোনাদানা, মরিচ কিংবা দাস অধিকার করার জন্য যুদ্ধ হতেই পারে, কিন্তু তেলের জন্য যুদ্ধ, অসম্ভব!

বিদ্যুতের গল্প আরও বেশি রোমাঞ্চকর। দুইশ বছর আগেও অর্থনীতিতে বিদ্যুতের কোন অবদানই ছিল না। কিছু গোপন বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর সস্তা জাদুর খেলা দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এর ব্যবহার। কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন বিদ্যুৎকে পরিণত করলো জাদুর প্রদীপের দৈত্যে। আজকে আমাদের এক তুড়িতে বিদ্যুৎ ছাপিয়ে ফেলে বই, সেলাই করে কাপড়, তরতাজা রাখে শাকসবজি, জমিয়ে তোলে আইসক্রিম, রান্না করে খাবার আর মৃত্যুদণ্ড দেয় অপরাধীদের, লিপিবদ্ধ করে আমাদের ভাবনা-চিন্তা আর ফ্রেমে বন্দী করে আমাদের হাসি-কান্না, রাতকে জাগিয়ে তোলে দিনের আলোয় আর টিভির অগণিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের দেয় বিনোদনের খোরাক। বিদ্যুৎ কীভাবে এগুলো করে সেটা খুব কম লোকই জানে, অথচ বিদ্যুৎ ছাড়া জীবনের কথা কেউ আজ কল্পনাও করতে পারে না।

শক্তির সাগর

একবারে শিকড় থেকে চিন্তা করলে, শিল্প বিপ্লব আসলে শক্তির রূপান্তরের বিপ্লব। এটা বারবার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে, মানুষের ব্যবহারযোগ্য শক্তির যোগান সীমাহীন। আরও সঠিক ভাবে বললে, শক্তির পরিমাণকে একমাত্র সীমাবদ্ধ করে তুলতে পারে মানুষের অজ্ঞতা। কয়েক দশক পর পরই আমরা শক্তির নতুন একটি উৎসের সন্ধান পাই এবং মানুষের ব্যবহারযোগ্য শক্তির পরিমাণ বাড়তে থাকে।

তাহলে, দুনিয়াজুড়ে এত মানুষ শক্তির ফুরিয়ে যাবার আশঙ্কায় ভীত কেন? কেন তারা জীবাশ্ম জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে দুনিয়াজুড়ে আসন্ন মহাবিপর্যয় সম্পর্কে বারবার আমাদের সতর্ক করেন? এটা তো নিশ্চিত পৃথিবীতে শক্তির কোন অভাব নেই। আমাদের প্রধান সমস্যা হলো সে শক্তিকে আহরণ করা এবং আমাদের প্রয়োজন অনুসারে রূপান্তরিত করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব। গোটা দুনিয়ায় যে পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানির যোগান আছে, সূর্য একদিনে বিনামূল্যে তার বহুগুণ শক্তি আমাদের দিয়ে থাকে। সূর্যের মোট শক্তির মাত্র সামান্য একটা অংশ পৃথিবীতে আসে। এই সামান্য অংশটুকুরই বাৎসরিক পরিমাণ ৩,৭৬৬,৮০০ এক্সাজুল (১ এক্সাজুল = ১০১৮ জুল, জুল হলো মেট্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী শক্তি পরিমাপের একক, মোটামুটিভাবে এক জুল হলো একটি আপেলকে মাটি থেকে এক গজ উপরে তুলতে প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণ। এক্সাজুল মানে এক কোটি কোটি জুল। অর্থাৎ, এক এক্সাজুল শক্তি দিয়ে এক কোটি কোটি আপেলকে মাটি থেকে উপরে তোলা যাবে)।২ পৃথিবীর সকল গাছপালা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য উৎপাদনের জন্য এর মধ্যে মাত্র ৩,০০০ এক্সাজুল শক্তি ব্যবহার করে।৩ মানুষ এক বছরে সকল কর্মকাণ্ড এবং শিল্প কারখানায় মোট খরচ করে ৫০০ এক্সাজুল, যা নব্বই মিনিটে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসা সৌরশক্তির সমান।৪ এসব তো গেল কেবল সৌরশক্তির কথা। সূর্য ছাড়াও পারমাণবিক শক্তি এবং অভিকর্ষের মত শক্তিগুলো আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। এর মাঝে চাঁদের পৃথিবীর প্রতি আকর্ষণের কারণে সাগরে সৃষ্ট জোয়ার থেকে অভিকর্ষ শক্তির ধারণা সহজেই বোঝা যায়।

শিল্প বিপ্লবের আগে মানুষের শক্তির বাজার পুরোপুরি গাছপালার উপরেই নির্ভরশীল ছিল। সুতরাং, মানুষকে দুনিয়াব্যাপী ৩,০০০ এক্সাজুল শক্তি গ্রহণকারী উৎস গাছপালার কাছাকাছি বসবাস করতে হত, গাছপালা তার গ্রহণকৃত শক্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ মানুষের গ্রহণোপযোগী খাদ্যে রূপান্তর করে ফেরত দিত। গাছের এই রূপান্তর করে দেয়া শক্তির পরিমাণ ছিল সীমিত। শিল্প বিপ্লবের সময় আমরা বুঝতে পারলাম, আমরা আসলে অনেকগুলো শক্তির সাগরের উপর বসবাস করছি যাদের প্রতিটি উৎসের কোটি কোটি এক্সাজুল শক্তি দেয়ার সক্ষমতা আছে। আমাদের কেবল সেসব শক্তি উত্তোলন বা সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে।

যথাযথ উপায়ে শক্তি সংগ্রহ ও রূপান্তর সম্পর্কে জানার চেষ্টা অর্থনীতিকে শ্লথ করে দেয়া আরেকটি সমস্যা সমাধান করতে মানুষকে সাহায্য করল। সেটি হলো- কাঁচামালের দুষ্পাপ্র্যতা। মানুষ যত কম খরচে বেশি পরিমাণ শক্তি আহরণ করা শিখতে লাগল, ততই মানুষের নতুন নতুন কাঁচামাল সংগ্রহ (উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সাইবেরিয়ার পতিত জমি থেকে লোহা উত্তোলনের কথা) এবং দূর-দূরান্ত থেকে কাঁচামাল পরিবহনের (যেমন একটি ব্রিটিশ পোশাক কারখানায় অস্ট্রেলীয় উলের সরবরাহ) সক্ষমতা বাড়তে লাগল। একই সাথে, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি মানুষকে প্লাস্টিকের মত সম্পূর্ণ নতুন কাঁচামাল উদ্ভাবন এবং সিলিকন, অ্যালুমিনিয়ামের মত অচেনা কাঁচামাল আবিষ্কার করতে সহায়তা করল।

বিজ্ঞানীরা ১৮২০ সালের দিকে এসে অ্যালুমিনিয়ামের সন্ধান পান। কিন্তু, আকরিক থেকে অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশন ছিল কষ্টসাধ্য এবং প্রচুর ব্যয়সাপেক্ষ। কয়েক দশক যাবৎ অ্যালুমিনিয়াম ছিল সোনার চেয়ে দামী ধাতু। ১৮৬০ সালের দিকে ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ান, তার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত অতিথিদেরকে অ্যালুমিনিয়ামের থালাবাসনে অাপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন। এর থেকে অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদার অতিথিরা পেতেন সোনার ছুরি এবং কাঁটাচামচ দিয়ে ভোজনের সুযোগ।৫ ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে এসে কিছু রসায়নবিদ অনেক কম খরচে বিপুল পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশনের উপায় বের করেন এবং বর্তমান বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি টন অ্যালুমিনিয়াম উৎপন্ন হয়। তৃতীয় নেপোলিয়ান যদি জানতেন তার উত্তরসূরীরা আজ অ্যালুমিনিয়ামে বানানো মোড়ক দিয়ে স্যান্ডউইচ মুড়ে রাখে এবং খাওয়া শেষে অ্যালুমিনিয়ামের মোড়কটিকে আবর্জনার বাক্সে ফেলে দেয়, নিশ্চয়ই বিস্ময়ে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যেত।

দুই হাজার বছর আগে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের অধিবাসীরা ত্বকের শুষ্কতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হাতে শুধু জলপাইয়ের তেল মালিশ করতেন। আজ, তারা শুষ্কতা প্রতিরোধের জন্য হ্যান্ডক্রিমের টিউবের ঢাকনা খোলেন। আমি স্থানীয় একটি দোকান থেকে যে সাধারণ হ্যান্ডক্রিমটি কিনেছি, তার উপাদানগুলো নিম্নরূপ-

পরিশ্রুত পানি, স্টিয়ারিক এসিড, গ্লিসারিন, ক্যাপ্রিলিক/ক্যাপ্রিকটিগ্লাইসেরাইড, প্রোপাইলিন গ্লাইকল, আইসোপ্রোপাইল মাইরিস্টেট, পানাক্স জিনসেং শেকড়ের নির্যাস, সুগন্ধী, সিটাইল অ্যালকোহল, ট্রাইথানোলামাইন, ডাইমেটিকোন, বিয়ারবেরী পাতার নির্যাস, ম্যাগনেসিয়াম অ্যাসকোবাইল ফসফেট, ইমিডাজলিডিনল ইউরিয়া, মিথাইল প্যারাবেন, ক্যামফর, প্রোপাইল প্যারাবেন, হাউড্রক্সিআইসোহেক্সাইল ৩-সাইক্লোহেক্সেন কার্বোক্সাল্ডিহাইড, হাইড্রোক্সাইল-সাইট্রোনেলাল, লিনালুল, বিউটাইল ফেনাইল মিথাইল প্রোপলোনাল, সাইট্রোনেলোল, লিমোনিন, জেরানিয়ল।

এর বেশিরভাগই উপাদানই উদ্ভাবিত অথবা আবিষ্কৃত হয়েছে গত দুই শতকের মাঝে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি অবরোধের শিকার হয় এবং তাদের কাঁচামাল শূন্যতা দেখা দেয়। বিশেষ করে সংকট তৈরি হয় বারুদ এবং অন্যান্য বিস্ফোরক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সল্টপিটারের (saltpetre)। সল্টপিটার প্রধান যোগান ছিল চিলি আর ভারতে, জার্মানীর নাগালের বাইরে। সল্টপিটার বিকল্প রাসায়নিক ছিল অ্যামোনিয়া, কিন্তু তখন অ্যামোনিয়ার উৎপাদন ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। জার্মানদের জন্য সুখের খবর এই যে, ১৯০৮ সালে ফ্রিটজ হ্যাবার নামের একজন ইহুদি জার্মান আক্ষরিক অর্থেই বাতাস থেকে অ্যামোনিয়া তৈরির একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যখন যুদ্ধ শুরু হলো, তখন জার্মানরা হ্যাবারের আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে বাতাসকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে যুদ্ধাস্ত্রের উৎপাদন শুরু করল। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, হ্যাবারের আবিষ্কার না থাকলে জার্মানি ১৯১৮ সালের অনেক আগেই আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হত। হ্যাবারের এই আবিষ্কার (যুদ্ধের সময় বিষাক্ত গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রেও যিনি ছিলেন পুরোধা ব্যক্তিত্ব) তাকে এনে দেয় নোবেল পুরস্কার। অবশ্য তাকে শান্তিতে নোবেল দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছে রসায়নে।

খাঁচায় বন্দী জীবন

শিল্প বিপ্লব এনে দিয়েছে ব্যয়সাশ্রয়ী শক্তি ও কাঁচামালের প্রাচুর্য। ফলশ্রুতিতে অস্বাভাবিক গতিতে বেড়েছে উৎপাদন। উৎপাদনের এই বিস্ফোরক গতির পরিচয় প্রথম পাওয়া যায় কৃষিক্ষেত্রে। এমনিতে শিল্প বিপ্লবের কথা চিন্তা করলেই আমাদের চোখে ভাসে কালো ধোঁয়া উঠা চিমনি সমতে একটি শহরের ছবি বা মাটির তলদেশের কয়লাখনিতে খননকাজে লিপ্ত ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত শ্রমিকদের ছবি। কিন্তু, এ সবকিছুর পরেও শিল্প বিপ্লব প্রধানত দ্বিতীয় কৃষি বিপ্লব।

গত দুইশ বছরে শিল্পজাত উপকরণ কৃষিকাজের প্রধান অবলম্বনে পরিণত হয়েছে। ট্রাক্টরের মত যন্ত্রগুলো এককালের অসম্ভব অথবা পেশীশক্তির উপরে একান্ত নির্ভরশীল কাজগুলো সহজে করতে সহায়তা করছে। কৃত্রিম সার, কীটনাশক, নতুন নতুন হরমোন আর ওষুধের গুণে মাঠের ফসল আর গবাদি পশুর উৎপাদন দুটোই বেড়ে গেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, জাহাজ আর বিমান উৎপাদিত পণ্য মাসের পর মাস সংরক্ষণ করতে, সুলভে এবং দ্রুত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিবহন করতে সাহায্য করছে। ফলশ্রুতিতে, একজন ইউরোপিয়ানের রাতের খাবারের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে আর্জেন্টিনার তাজা গোমাংস কিংবা জাপানে তৈরি সুশি।

উদ্ভিদ এবং প্রাণীরাও এই যান্ত্রিক বিপ্লবের শিকারে পরিণত হয়েছে। মানবতাবাদী ধর্মগুলো যখন তাদের চর্চিত মূল্যবোধ দ্বারা মানুষের জীবনকে স্বর্গীয় সুষমায় বিভূষিত করছে, সেই একই সময়ে খামারে পালিত গবাদিপশুগুলোকে দেখা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক অনুভূতিহীন উৎপাদন যন্ত্র হিসেবে। আজকের দিনে এই গবাদিপশুগুলোকে শিল্পকারখানায় উৎপাদিত অন্যান্য পণ্যের মতই বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করা হয়, ব্যবসায়িক চাহিদার কথা চিন্তা করেই গড়ে তোলা হয় তাদের শারীরিক গড়ন। তাদের পুরো জীবনটা যেন একটি বিশাল শিল্পোৎপাদন পদ্ধতির নিছক একটা উপকরণ মাত্র। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভ-ক্ষতিই নির্ধারণ করে দেয় তাদের জীবনকাল এবং প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ যত্ন নেয় এবং পর্যাপ্ত দানাপানির যোগান দেয়, তখনও তারা প্রাণীগুলোর সামাজিক ও মানসিক চাহিদার কথা ভাবে না (যদি না এসব চাহিদা উৎপাদনের পরিমাণের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত না হয়), ব্যবসায়িক লাভের কথা চিন্তা করেই তারা এমনটা করে।

ডিম পাড়া মুরগির কথাই ধরা যাক, এদেরও আচরণ ও উদ্দীপনাগত চাহিদার একটি জটিল, সূক্ষ্ম জগত আছে। নিজস্ব পরিবেশে বেড়ে ওঠা, ঘুরে ঘুরে ঠুকরে খাবার সংগ্রহ করা, সামাজিক স্তরবিন্যাস তৈরি করা, বাসা তৈরি এবং নিজেদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলার ব্যাপারে এদেরও আছে তীব্র আকর্ষণ। কিন্তু ডিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত একটা ছোট খাঁচার মধ্যে মুরগিগুলোকে বন্দী করে রাখে এবং প্রায়ই দেখা যায় একটি ছোট খাঁচায় গাদাগাদি করে চারটি মুরগি রাখা, প্রতিটা মুরগির জন্য বরাদ্দ জায়গা যেখানে মাত্র দৈর্ঘ্যে পঁচিশ ও প্রস্থে বাইশ সেন্টিমিটার। মুরগিগুলোকে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার দেয়া হয় কিন্তু নিজের বাড়ি বানানো, সামাজিক ও প্রাকৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন এবং নিজের আবাস বলে ভাবার মতো কোন জায়গা তার জন্য বরাদ্দ থাকে না। এমনকি খাঁচাগুলো অনেকসময় এতটাই ছোট হয় যে মুরগিগুলো ঠিকমত সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা ডানা ঝাপটাতে পর্যন্ত পারে না।

বুদ্ধিমত্তা ও কৌতূহলের বিচারে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম হল শুকর, সম্ভবত নরবানরদের পরেই এদের স্থান। তা সত্ত্বেও খামারগুলোতে পূর্ণবয়স্ক শুকরীদের প্রায়ই এত ছোট একটি কাঠের খাঁচার মাঝে রাখা হয় যেখানে তারা হাঁটা বা চরে বেড়ানো তো দূরের কথা, ঘুরে বসতে পর্যন্ত পারে না। বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর চার সপ্তাহ সমস্ত দিন-রাত বাচ্চাগুলোকে মা শুকরীর সাথে এই আবদ্ধ খাঁচায় রাখা হয়। এরপর বাচ্চাগুলোকে মোটাতাজা করার জন্য মায়ের থেকে আলাদা করা হয় এবং মা শুকরীকে আবার গর্ভধারণ করতে বাধ্য করা হয়।

অনেক গরুর খামারেই গরুগুলোকে তাদের জীবনের পুরোটাই কাটাতে হয় একটি ছোট্ট আবদ্ধ পরিবেশে। নিজেদের মল-মূত্রের উপরই শোয়া, বসা আর ঘুমানোই হয়ে ওঠে তাদের নিয়তি। কতকগুলো যন্ত্র তাদের নিয়মিত খাবার, হরমোন আর ওষুধপত্র সরবরাহ করে। আর কতকগুলো যন্ত্র নিয়মিত এসে দুইয়ে নিয়ে যায় দুধ। গাভীগুলোকে যেন একটি যন্ত্রবিশেষ, যে মুখ দিয়ে কাঁচামাল গ্রহণ করে আর ওলান দিয়ে উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করে। জটিল অনুভূতির জগত সম্পন্ন এসব প্রাণীদেরকে যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করার ফলে তাদেরকে যে কেবল শারীরিক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাই নয়, তাদের সামাজিক এবং মানসিক জীবনেও মানুষের এসব আচরণ তৈরি করছে অসহনীয় চাপ।৭

image062.jpg

৪০। একটি বাণিজ্যিক মুরগি খামারে কনভেয়র বেল্টের উপর বসানো মুরগির বাচ্চা। মোরগ এবং ত্রুটিযুক্ত মেয়ে মুরগিগুলোকে এখান থেকে আলাদা করা হয়। এরপর গ্যাস চেম্বারে তাদের শ্বাসরূদ্ধ করে মারা হয় এবং স্বয়ংক্রিয় মেশিনে কেটে ফেলা হয় বা কখনও তাদেরকে স্রেফ আবর্জনায় ছুড়ে ফেলা হয় এবং পিষে মারা হয়। এ ধরনের বড় মুরগি খামারে এভাবে প্রতিবছর কোটি কোটি মুরগি মারা যায়।

আফ্রিকানদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব থেকে যেমন আটলান্টিক অঞ্চলে দাস ব্যবসার জন্ম হয়নি, ঠিক একইভাবে প্রাণীদের প্রতি কোনও বিদ্বেষ থেকেও বড় আকারের গবাদি পশু শিল্প গড়ে ওঠেনি। কিন্তু, অস্বীকার করার উপায় নেই, আফ্রিকান এবং প্রাণীদের প্রতি উদাসীন মনোভাবই এসব ব্যবসার গতিশীল হবার মূল কারণ। যারা ডিম, দুধ বা মাংসের ভোক্তা তাদের মাঝে খুব কম সংখ্যক মানুষই এসবের সাথে জড়িত মুরগি, গরু বা শুকরের জীবনের পরিণতি নিয়ে ভাবেন। যে অল্প কজন ভাবেন, তাদেরকেও প্রায়শই বলতে শোনা যায়, যন্ত্রের সাথে এইসব গবাদি পশু বা পাখির তেমন কোন পার্থক্য নেই। এই প্রাণীগুলো সংবেদনশীলতা এবং আবেগ বর্জিত এবং তাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতি নেই। মজার ব্যাপার হলো বিজ্ঞানের যে শাখাটি বাণিজ্যিকভাবে দুধ বা ডিম উৎপাদনের অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করেছে, বিজ্ঞানের সে শাখাটিই সাম্প্রতিককালে সন্দেহাতীতভাবে একথা প্রমাণ করেছে যে, এইসব স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিদেরও আছে একটি সংবেদনশীল অনুভূতি ও আবেগের জগত। তারা যে কেবল শারীরিক সুখ-দুঃখ অনুভব করতে পারে তাই নয়, মানসিক যন্ত্রণাও তাদের ভোগায়।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী বন্য অবস্থায় বসবাসকালীন সময়ে গবাদিপশুগুলোর মধ্যে এইসব সামাজিক এবং মানসিক চাহিদার উদ্ভব হয়েছে। সেসময় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বংশবিস্তারের জন্য এই দুটো ব্যাপার ছিল অপরিহার্য। একটি বন্য গরুকে জানতে হত কীভাবে অন্যান্য গরু এবং ষাঁড়ের সাথে তাকে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কারণ, এটা না জানলে তার পক্ষে আত্মরক্ষা এবং বংশবিস্তার করা সম্ভব ছিল না। এইসব অপরিহার্য গুণাবলি অর্জনের জন্য অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো বিবর্তন গরুর বাছুরের ক্ষেত্রেও খেলাধুলার প্রতি একটা তীব্র আগ্রহ গড়ে তুলেছে (স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে খেলাধুলা করা সামাজিক আচরণ শেখার একটা উপায়) । পাশাপাশি বিবর্তন বাছুরের মধ্যে মায়ের সাথে একটা গভীর সম্পর্কের ভিতও রচনা করে দিয়েছে কারণ মায়ের দুধ এবং যত্ন একটি বাছুরের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য।

এখন, একজন পশুপালক যদি একটি মেয়ে বাছুরকে তার মায়ের থেকে আলাদা করে একটি খাঁচায় রাখে, তাকে খাবার, পানি, রোগ প্রতিষেধক টিকা ও ওষুধ দেয় এবং বয়স হলে তাকে একটি ষাঁড়ের শুক্রাণু দিয়ে গর্ভবতী করে, তার অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? বস্তুগতভাবে চিন্তা করলে, টিকে থাকা এবং বংশবিস্তারের জন্য বাছুরটির সামাজিক বন্ধন তৈরির বা খেলার সাথীর আর কোন দরকার নেই। কিন্তু বাছুরটির দিক থেকে বিবেচনা করলে আমরা দেখব তার মধ্যে মায়ের সাথে বন্ধন তৈরি করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যান্য বাছুরের সাথে খেলাধুলা করার ইচ্ছা এখনও ভীষণভাবে উপস্থিত। এ চাহিদাগুলো পূরণ না হলে, বাছুরটি ভীষণরকম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়। এটি বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা- বন্য জীবনে টিকে থাকার জন্য তৈরি হওয়া সামাজিক চাহিদা বর্তমানে টিকে থাকা এবং বংশবিস্তারের জন্য জরুরি না হলেও তা ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বে থেকে যায়। শিল্পনির্ভর কৃষির একটি দুঃখজনক দিক হলো, এটি কেবল প্রাণীদের বস্তুগত চাহিদার দিকে নজর দেয় এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদাগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে যায়।

আমেরিকান মনস্তত্ত্ববিদ হ্যারি হারলো যখন বানরের বিকাশ নিয়ে গবেষণা করছিলেন সেই ১৯৫০ এর দশক থেকে এই তত্ত্ব মানুষের জানা। গবেষণার জন্য হারলো জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরই বাচ্চা বানরগুলোকে তাদের মায়ের থেকে আলাদা করলেন। বাচ্চাগুলোকে আলাদা খাঁচায় পুতুল মা বানরের সাথে রাখা হলো। প্রতিটি খাঁচায় হারলো দুটি পুতুল মা বানর রাখলেন। এর মধ্যে একটি পুতুল ধাতব তার দিয়ে বানানো যার মধ্যে দুধ ভরা একটি বোতল রাখা আছে যেখান থেকে বাচ্চা বানরটি চাইলে দুধ খেতে পারে। অপর পুতুলটি কাঠের উপর কাপড় দিয়ে এমনভাবে বানানো হয়েছিল যাতে সেটাকে দেখতে সত্যিকারের বানরের মতই লাগে। কিন্তু এই পুতুলটির সাথে বাচ্চা বানরকে খাওয়ানোর মত কোন উপকরণ দেয়া হলো না। ধারণা করা হলো, বাচ্চাটি তার প্রয়োজনের তাগিদেই কাঠ ও কাপড় দিয়ে বানানো মা বানরকে ছেড়ে ধাতব তারে বানানো দুধের বোতল ওয়ালা মা বানরের দিকে আকৃষ্ট হবে।

কিন্তু হারলো অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, বাচ্চাটি কাঠ ও কাপড়ে বানানো সত্যিকারের বানরের মতো দেখতে পুতুল মায়ের সাথেই বেশি সময় কাটাচ্ছে। দুটো পুতুল মাকে যখন কাছাকাছি রাখা হলো, তখন দেখা গেল যে, বাচ্চা বানরটি ধাতব তারে বানানো পুতুল মায়ের থেকে দুধ খাবার সময়েও কাপড়ে বানানো মায়ের কাপড় আঁকড়ে ধরে আছে। হারলো ভাবলেন, হয়তো ঘরের তাপমাত্রা কম, এই কারণে বাচ্চাটি পুতুল মায়ের কাপড় আঁকড়ে আছে। একারণে তিনি ধাতব তারে তৈরি মায়ের ভেতর বৈদ্যুতিক বাল্ব স্থাপন করলেন যাতে সেখান থেকে তাপ নির্গত হয়ে জায়গাটা কিছুটা গরম থাকে। এরপরেও দেখা গেল, একদম সদ্যপ্রসূত বাচ্চাগুলো ছাড়া প্রায় সব বাচ্চাই কাপড়ের তৈরি মাকেই বেশি পছন্দ করছে।

harlo.jpg

৪১। হারলোর পরীক্ষার একটি বাচ্চা বানর যেটি ধাতব মায়ের থেকে দুধ খাবার সময়ও কাপড়ে তৈরি মাকে আঁকড়ে ধরে আছে।

পরবর্তী গবেষণাগুলো থেকে জানা গেল, মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে নেয়া হারলোর বাচ্চা বানরগুলোকে সবরকম পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা হলেও তাদের মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তারা বানর সমাজে সহজভাবে মিশতে পারে না, অন্য বানরের সাথে সহজে যোগাযোগ করতে পারে না, দুশ্চিন্তায় ভোগে এবং তাদের মাঝে আগ্রাসী মনোভাব দেখা যায়। এতসব পরীক্ষা একটা কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, বস্তুগত চাহিদার বাইরেও বানরদের মানসিক চাহিদার একটা জগত আছে এবং সেই চাহিদা পূরণ না হলে তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হারলোর এতিম বানরগুলো কাপড়ে তৈরি মা বানরগুলোর সাথে বেশি সময় কাটাচ্ছিল, কারণ কেবল দুধ তাদের চাহিদা ছিল না, তারা চাচ্ছিল মায়ের সাথে একটা মানসিক সম্পর্ক তৈরি করতে। পরবর্তী দশকগুলোতে অনেকগুলো গবেষণা প্রমাণ করে এই মানসিক চাহিদার ব্যাপারটি কেবল বানর নয়, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী এমনকি পাখির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বর্তমানে, খামারে পালন করা কোটি কোটি গবাদি পশুর অবস্থা হারলোর মা থেকে আলাদা করা বানরগুলোর মত, কারণ খামারিরা পৃথকভাবে পালন করার জন্য নিয়মিত বাছুর এবং বাচ্চাগুলোকে তাদের মায়ের থেকে আলাদা করে সরিয়ে নেয়।৮

বর্তমান পৃথিবীতে যান্ত্রিক পশুপালন ব্যবস্থার উপাদান হিসেবে হাজার হাজার কোটি গবাদি প্রাণী বসবাস করে এবং প্রতিবছর পৃথিবী জুড়ে প্রায় পাঁচশত কোটি গবাদি পশুকে হত্যা করা হয়। শিল্পসম্মত যান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে কৃষি উৎপাদন এবং মানুষের খাদ্যের যোগান খুব দ্রুত বহুগুণ বেড়েছে। শস্য এবং পশুপালনের এসব যান্ত্রিক পদ্ধতি গড়ে তুলেছে আধুনিক পৃথিবীর আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি। কৃষির শিল্পায়নের আগে শস্যক্ষেতে বা খামারে উৎপাদিত ফসলের অধিকাংশই কৃষক এবং খামারের প্রাণীদের খাওয়ানোর কাজেই ‘অপচয়’(!) হতো। এসবের পর শিল্পী, শিক্ষক, সাধু-সন্ন্যাসী বা আমলাদের ভোগের জন্য খুব সামান্য অংশই অবশিষ্ট থাকত। এই কারণে, সে সময়ের প্রায় সব সমাজেই মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ ছিল কৃষক। শিল্প বিপ্লবের পর কৃষির যান্ত্রিকীকরনের সাথে সাথে অল্প কিছু সংখ্যক কৃষকের পক্ষে আরও বেশি বেশি কেরানি এবং কারখানার শ্রমিকদের খাদ্যের যোগান দেয়া সম্ভবপর হলো। আজকের দিনের আমেরিকায়, মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই ২ শতাংশ মানুষ যে কেবল আমেরিকার সব মানুষের খাদ্যশস্যের যোগান দেয় তাই নয়, বরং যোগান দেওয়ার পর অতিরিক্ত খাদ্যশস্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশে রপ্তানীও করে থাকে।৯ কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া নগর সভ্যতার বিকাশ সম্ভব হতো না, পাওয়া যেত না কল-কারখানা এবং অফিসে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত হাত ও মস্তিষ্ক।

কৃষিকাজ এবং পশুপালনের দায় থেকে বেরিয়ে আসা এইসব অগণিত হাত আর মস্তিষ্ক তৈরি করতে লাগল অজস্র নতুন নতুন পণ্যের সমাহার। মানুষ এখন আগের যে কোনও সময়ের থেকে বেশি পরিমাণে ইস্পাত, বস্ত্র, বড় বড় দালানকোঠা তৈরি করে। এসব ছাড়াও মানুষ আজকে বৈদ্যুতিক বাতি, মোবাইল ফোন, ক্যামেরা এবং থালাবাসন ধোয়ার যন্ত্রের মত এমন অনেক পণ্য উৎপাদন করে যা আগে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো মানুষের উৎপাদন ছাড়িয়ে গেছে তার চাহিদাকে। আর ফলে সৃষ্টি হয়েছে নতুন একটি সমস্যা- উৎপাদিত এতসব বাড়তি পণ্য কিনবে কে?

কেনাকাটার কাল

একটি হাঙরকে বেঁচে থাকার জন্যযেমন অবিরাম সাঁতরাতে হয়, আধুনিক ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিকেও তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ক্রমাগত উৎপাদন বাড়াতেই হবে। কিন্তু, শুধু উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়। কাউকে না কাউকে অবশ্যই সেসব উৎপাদিত পণ্য কিনতে হবে। এটা সম্ভব না হলে শিল্পপতি এবং বিনিয়োগকারী উভয়েই পথে বসবেন। এই দুরবস্থা এড়ানোর জন্য এবং শিল্পকারখানার উৎপাদিত পণ্যগুলোর বিক্রিবাট্টা নিশ্চিত করার জন্য নতুন একটি ধারণার উদ্ভব হয়েছে তার নাম ‘ভোগবাদ’ (Consumerism)।

ইতিহাসের পুরোটা সময় জুড়ে বেশিরভাগ মানুষকেই নানারকম অভাবের বেড়াজালে বন্দী থাকতে হয়েছে। মিতব্যয়িতা ছিল তাদের জীবনবোধের অংশ। এ সংক্রান্ত দু’টো বিখ্যাত উদাহরণ হলো পিউরিটান (Puritans) এবং স্পার্টানদের (Spartans) জীবনদর্শনে কঠোর কৃচ্ছতাসাধনের উপস্থিতি। একজন ভাল মানুষ সবরকম বিলাসদ্রব্য এড়িয়ে চলবেন, কখনও খাবারের অপচয় করবেন না এবং জামাকাপড় ছিঁড়ে গেলে নতুন জামাকাপড় কেনার বদলে সেলাই করে পুরনো কাপড় দিয়েই চালানোর চেষ্টা করবেন। কেবলমাত্র রাজা এবং অভিজাত ব্যক্তিরাই প্রকাশ্যে জমকালো পোশাক পরে, বিলাস দ্রব্য ব্যবহার করে এই নিয়মের ব্যতিক্রম করতে পারবেন এবং তাদের পরিচয় জাহির করতে পারবেন।

অন্যদিকে ‘ভোগবাদ’ ক্রমাগত নতুন নতুন পণ্য ও সেবা ভোগ করাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে। অসীম পণ্য ও সেবা ভোগের মাধ্যমে তৃপ্তি লাভ, নিজের ক্ষতিসাধন, এমনকি নিজেকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার ব্যাপারেও এটি মানুষকে উৎসাহিত করে। ‘ভোগবাদ’ অনুযায়ী কৃপণতা বা মিতব্যয়িতা হলো একটি অসুখ যার আশু প্রতিকার জরুরি। ভোগবাদের এই মূলনীতি বাস্তবে উপলব্ধি করার জন্য আপনাকে খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। দোকান থেকে কিনে আনা একটি পণ্যের মোড়কে লেখা কথাগুলো পড়ুন। এখানে আমি সকালের নাস্তার জন্য খাওয়া টেলমা (Telma) নামে একটি কোম্পানির তৈরি আমার প্রিয় সিরিয়ালের প্যাকেটে লেখা কথাগুলো তুলে দিচ্ছি-

কখনও আপনার দরকার তৃপ্তির। কখনও আপনার দরকার একটু বেশি উদ্যম। ওজনের দিকে নজর দেয়ার অনেক সময় আপনি পাবেন, কখনো কখনো হয়ত কিছুমিছু একটা খেলেই হল। কিন্তু এখন? টেলমা নিয়ে এসেছে বিভিন্ন স্বাদের মজাদার সিরিয়াল শুধু আপনার জন্য – কোন দ্বিধা ছাড়া খুঁজে নিন আপনার সবটুকু তৃপ্তি।

একই মোড়কে আরেকটি পণ্য ‘হেলথ ট্রিটস’ এর বিজ্ঞাপন বলছে-

হেলথ ট্রিটস পর্যাপ্ত পরিমাণ শস্য, ফল এবং বাদামের সমন্বয়ে আপনাকে দেয় স্বাদ, আনন্দ ও স্বাস্থ্যের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। স্বাস্থ্যের দিকে পুরোপুরি নজর রেখে দুপুর বেলার খাবারে একটু আনন্দ আনার জন্য এর জুড়ি নেই। চমৎকার স্বাদে ভরা একটি পরিপূর্ণ সিরিয়াল।

ইতিহাসের অধিকাংশ সময়েই, কোন পণ্যের মোড়কে এ ধরনের কথা লেখা দেখলে মানুষ সম্ভবত আকৃষ্ট হওয়ার বদলে বিরক্তই হতো। এই ধরনের প্রচারণাকে তারা স্বার্থপর, মূল্যবোধহীন এবং সামাজিক অবক্ষয়ের উপাদান হিসেবেই বিবেচনা করতো। ভোগবাদ অনেক চেষ্টার মাধ্যমে, ‘বেশি না ভেবে করে ফেল’ (Just do it!) – মনস্তত্ত্বের এই জনপ্রিয় ধারণাকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে- মিতব্যয়িতা মানেই নিজের ইচ্ছার সাথে প্রতারণা করা, বেশি ভোগের মাঝেই আছে আনন্দের ফোয়ারা।

ভোগবাদ সফল হয়েছে। আজকে আমরা সকলেই ভাল ভোক্তা। গতকাল পর্যন্ত পৃথিবীতে যার কোনও অস্তিত্ব ছিল না এবং আমাদের কোনও দরকার নেই এমন অসংখ্য পণ্য আজ আমরা কিনি। উৎপাদনকারীরা ইচ্ছা করেই স্বল্পমেয়াদী পণ্য তৈরি করেন, ঠিকঠাক কাজ চলছে এমন একটি পণ্যেরও নতুন মডেল উদ্ভাবন করেন এবং আমরা সবার সাথে তাল মেলানোর জন্য সেসব কিনি। কেনাকাটা করা আজ আমাদের অবসর যাপনের অংশ এবং নানারকম ভোগ্যপণ্য আমাদের পরিবারের সদস্য, জীবনসঙ্গী এবং বন্ধুদের মাঝে সম্পর্কের সেতু হিসেবে কাজ করে। ক্রিসমাসের মতো ধর্মীয় ছুটির দিনগুলো কেনাকাটার উৎসবে পরিণত হয়েছে। এমনকি, আমেরিকায়, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া সাহসী সৈনিকদের স্মরণে তৈরি হওয়া ‘মেমোরিয়াল ডে’ পরিণত হয়েছে দোকান থেকে বিশেষ ছাড়ে পণ্য কেনার উপলক্ষ্যে। বেশিরভাগ মানুষই এই দিনটিকে কেনাকাটা করার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখেন, সম্ভবতঃ কেনাকাটার মধ্য দিয়েই তারা প্রমাণ করতে চান, দেশের স্বাধীনতার জন্য শহীদদের আত্নত্যাগ বৃথা যায়নি।

ভোগবাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় খাবারের দোকানগুলোতে। আগেকার গৎবাঁধা কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতে মানুষের সাথে ছায়ার মতো জড়িয়ে থাকত অনাহার। আজকের সম্পদশালী পৃথিবীতে অন্যতম বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হলো ‘স্থূলতা’। মজার ব্যাপার হলো উন্নত দেশে স্থূলতার এই সমস্যা গরিবদের মাঝেই বেশি, কারণ তারা পেট পুরে হ্যামবার্গার আর পিজ্জা খেতে ভালোবাসে। অপরদিকে ধনীদের মাঝে এই স্থূলতার হার কম কারণ তারা খায় টাটকা সবজিতে তৈরি সালাদ আর ফলের রসে তৈরি স্মুদি। প্রতি বছর বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর মুখে খাবার তুলে দিতে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, আমেরিকান জনগোষ্ঠী তার থেকে বেশি অর্থ ব্যয় করে নিজেদের স্থূলতা কমাতে এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে। স্থূলতার ক্ষেত্রে ভোগবাদ দুই দিক থেকে জয়লাভ করেছে। প্রথমত, কম খাওয়ার বদলে মানুষ বেশি খাচ্ছে, ফলে অর্থনীতির সংকোচন হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, অর্জিত স্থূলতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষ ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য নানা পণ্য কিনছে, ফলে অর্থনীতি আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, পুঁজিবাদে বিশ্বাসী একজন ব্যবসায়ী, ব্যবসায় অর্জিত মুনাফা ব্যয় না করে যিনি নতুন নতুন বিনিয়োগে উৎসাহী, তার ধারণার সাথে ভোগবাদের আরও বেশি ভোগ করার ধারণা কিভাবে একই সময়ে, একই সমাজে সহাবস্থান করে? উত্তরটা সোজা। অতীতের সমাজগুলোর মত আজকের দিনের সমাজেও ধনী ও গরিবের মাঝে একটি সুস্পষ্ট ভেদরেখা বিদ্যমান। মধ্যযুগের ইউরোপে ধনীরা নিজেদের ভোগবিলাসের জন্য যথেচ্ছ অর্থ ব্যয় করতেন, আর গরীবদের বেছে নিতে হত কৃচ্ছ্রতার জীবন, হিসাব করে খরচ করতে হত প্রতিটা পয়সা। আজকে, পাশার দান উল্টে গেছে। আজ, ধনীরা তাদের সম্পদ এবং বিনিয়োগের যত্ন নেয়, হিসেব রাখে, অপরদিকে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণী প্রয়োজন না বুঝেই নতুন গাড়ি বা হাল ফ্যাশনের টেলিভিশন কিনতে গিয়ে ঋণের চোরাবালিতে ডুবতে থাকে।

ধনতন্ত্র আর ভোগবাদ আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, দুটি পরিপূরক বিধান। এক দলের জন্য অনিবার্য বিধান- ‘বিনিয়োগ’, আর বাকি সবার জন্য অনিবার্য বিধান- ‘ভোগ’।

ধনতন্ত্র এবং ভোগবাদের এই সম্মিলিত ধারণা আরেকটি দিক থেকেও বৈপ্লবিক। অতীতের ন্যায়নীতি সংক্রান্ত অধিকাংশ ধারণাগুলোই অনুসরণ করা মানুষের জন্য ছিল দুঃসাধ্য। বেশিরভাগ মত অনুযায়ী, মানুষ ইহকালে যদি দয়াবান ও সহনশীল হয়, রাগ এবং চাহিদা বিসর্জন দেয় এবং আপন স্বার্থপরতার উর্ধ্বে যেতে পারে তবেই কেবলমাত্র তার পক্ষে ভোগের জন্য স্বর্গ পাওয়া সম্ভব। ইহকালে এতকিছু করা বেশিরভাগ মানুষের পক্ষেই ছিল খুবই কঠিন। ন্যায়শাস্ত্রের ইতিহাস তাই দুঃখের ইতিহাস, যেখানে মানুষের জন্য অনেক মহৎ আদর্শের সন্ধান আছে, কিন্তু মানুষ যেগুলোর কোনটিই ঠিকমতো পালন করতে পারেনি। বেশিরভাগ খ্রিস্টান যিশুর জীবনকে অনুকরণ করে চলতে পারেননি, বেশিরভাগ বৌদ্ধ অনুসরণ করতে পারেননি গৌতম বুদ্ধকে এবং বেশিরভাগ কনফুশিয়ানের জীবন যাপন দেখলে কনফুসিয়াস নিজেই হয়তো রাগ সংবরণ করতে পারতেন না।

অপরদিকে, আজকের দিনের বেশিরভাগ মানুষই ধনতন্ত্র ও ভোগবাদের সম্মিলিত আদর্শ পুরোপুরি মেনে চলে। নতুন এই আদর্শের স্বর্গ প্রদানের শর্ত হলো- ধনীদেরকে সবসময় লোভী থাকতে হবে এবং ব্যস্ত থাকতে হবে আরও বেশি মুনাফা অর্জনের চেষ্টায়, আর সাধারণ মানুষদের লাগামছাড়া চাহিদা আর ইচ্ছার ঘোড়ায় সওয়ার হতে হবে এবং আরও বেশি, আরও বেশি পণ্য কিনতে হবে। এটাই প্রথম ধর্ম যার অনুসারীরা ধর্ম তাদেরকে যা করার বিধান দিয়েছে ঠিক তাই মেনে চলছে। নতুন ধর্মের এতসব বিধান মেনে চলার বিনিময়ে যে স্বর্গ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে তার স্বরূপ কি আমরা জানি? জানি, টেলিভিশনের হাজার হাজার রঙিন বিজ্ঞাপনের মাঝে বহুবার, বহুভাবে সেই স্বর্গের রূপ আমরা দেখেছি।


1 Mark, Origins of the Modern World, 109.

2 Nathan S. Lewis and Daniel G. Nocera, ‘Powering the Planet: Chemical Challenges in Solar Energy Utilization’, Proceedings of the National Academy of Sciences 103:43 (2006), 15,731.

3 Kazuhisa Miyamoto (ed.), ‘Renewable Biological Systems for Alternative Sustainable Energy Production, FAO Agricultural Services Bulletin 128 (Osaka: Osaka University, 1997), Chapter 2.1.1, accessed 10 December 2010, http://www.fao.org/docrep/W7241E/w7241eo6.htm#2.1.1percent20solarpercent20energy; James Barber, ‘Biological Solar Energy’, Philosophical Transactions of the Royal Society A 365:1853 (2007), 1007.

4 ‘International Energy Outlook 2010’, US Energy Information Administration, 9, accessed 10 December 2010, http://www.eia.doe.gov/oiaf/ieo/pdf/0484(2010).pdf.

5 S. Venetsky, ‘ “Silver” from Clay’, Metallurgist 13:7 (1969), 451; Fred Aftalion, A History of the International Chemical Industry (Philadelphia: University of Pennsylvania Press, 1991), 64; A. J. Downs, Chemistry of Aluminium, Gallium, Indium and Thallium (Glasgow: Blackie Academic & Professional, 1993), 15.

6 Jan Willem Erisman et al., ‘How a Century of Ammonia Synthesis Changed the World’, Nature Geoscience 1 (2008), 637.

7 G. J. Benson and B. E. Rollin (eds.), The Well-being of Farm Animals: Challenges and Solutions (Ames, IA: Blackwell, 2004); M. C. Appleby, J. A. Mench and B. O. Hughes, Poultry Behaviour and Welfare (Wallingford: CABI Publishing, 2004); J. Webster, Animal Welfare: Limping Towards Eden (Oxford: Blackwell Publishing, 2005); C. Druce and P. Lymbery, Outlawed in Europe: How America is Falling Behind Europe in Farm Animal Welfare (New York: Archimedean Press, 2002).

8 Harry Harlow and Robert Zimmermann, ‘Affectional Responses in the Infant Monkey’, Science 130:3373 (1959), 421–32; Harry Harlow, ‘The Nature of Love’, American Psychologist 13 (1958), 673–85; Laurens D. Young et al., ‘Early stress and later response to separation in rhesus monkeys’, American Journal of Psychiatry 130:4 (1973), 400–5; K. D. Broad, J. P. Curley and E. B. Keverne, ‘Mother-infant bonding and the evolution of mammalian social relationships’, Philosophical Transactions of the Royal Society B 361:1476 (2006), 2,199–214; Florent Pittet et al., ‘Effects of maternal experience on fearfulness and maternal behaviour in a precocial bird’, Animal Behaviour (March 2013), In Press – available online at: http://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0003347213000547).

9 ‘National Institute of Food and Agriculture’, United States Department of Agriculture, accessed 10 December 2010, http://www.csrees.usda.gov/qlinks/extension.html.

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s