১৯. অতঃপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল

 

গত ৫০০ বছরে পৃথিবী নামক এই গ্রহটি অনেকগুলো শ্বাসরুদ্ধকর উত্থান-পতনের ভিতর দিয়ে গেছে। মিলেমিশে এক হয়ে গেছে তার বিভিন্ন অংশের পরিবেশ ও ইতিহাস। অর্থনীতির বিকাশ হয়েছে প্রায় বিস্ফোরণের মতো। আজ সমগ্র মানবজাতির যত সম্পদ, তার পরিমাণ রূপকথাকেও হার মানিয়ে দেয়। ইতিহাসের এই সময়কালে, বিজ্ঞান আর শিল্পের বৈপ্লবিক উন্নতি মানুষকে প্রায় অতিমানবীয় ক্ষমতা এনে দিয়েছে। খোলনলচে বদলে গেছে সামাজিক কাঠামোর, তার সাথে বদলেছে পৃথিবীর রাজনীতি, মানুষের জীবন ও চিন্তাধারা।

কিন্তু এত পরিবর্তনের পরেও সেই পুরনো প্রশ্নটা থেকেই যায়: আমরা কি সুখী হতে পেরেছি? গত পাঁচ শতাব্দীর জমা হওয়া সম্পদ কি আমাদের সন্তুষ্টি দিয়েছে? শক্তির অফুরন্ত ভাণ্ডার আবিষ্কার করেছি আমরা, কিন্তু অফুরন্ত শান্তির খোঁজ কি মিলেছে? মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের পরবর্তী প্রায় ৭০ হাজার বছরে পৃথিবী কি আগের চেয়ে আরও একটু বেশি বাসযোগ্য হয়েছে? চাঁদের মাটিতে অক্ষয় পদচিহ্ন রেখে আসার সময় নীল আর্মস্টং যে আনন্দ অনুভব করেছিলেন, তা কি ৩০ হাজার বছর আগের শভে গুহার দেয়ালে হাতের ছাপ এঁকে দেওয়া নাম-না-জানা যাযাবর মানুষটার চেয়ে বেশি? তা যদি না-ই হবে, তাহলে এতগুলো বছর ধরে কৃষিকাজ, নগর-পত্তন, লেখালেখি, টাকা, সাম্রাজ্য, বিজ্ঞান, শিল্প- এগুলো কেন করতে গেলাম আমরা?

এই প্রশ্নগুলো নিয়ে অবশ্য ঐতিহাসিকেরা তেমন একটা মাথা ঘামান না। উরুক আর ব্যাবিলনের নগরবাসীরা তাদের শিকারি-সংগ্রাহক পূর্বসূরীদের চেয়ে সুখী ছিল কিনা, ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর মিশরের মানুষের জীবন আরেকটু সুন্দর হয়েছিল কিনা, অথবা আফ্রিকা থেকে ইউরোপীয় উপনিবেশগুলো উঠে যাওয়ার পর সেখানকার লাখ লাখ মানুষ শান্তি পেয়েছিল কিনা- ইতিহাসের পাতায় সেসব নিয়ে আলোচনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। অথচ ইতিহাস থেকে মানুষের সবচেয়ে বেশি জানতে চাওয়ার বিষয় এগুলোই। এখনকার অধিকাংশ আদর্শগত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পিছনে তাড়না হিসেবে থাকে এই সুখের সন্ধান। জাতীয়তাবাদীরা বলে রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ই সুখের মূল। সাম্যবাদীরা বলে জীবন সুখের হবে তখনই, যখন নিপীড়িত মানুষেরা সমাজ শাসন করবে। আবার পুঁজিবাদীরা বলবে অন্য কথা। তারা বলবে পণ্যের মুক্ত বাজারই পারে মানুষকে সুখী জীবন দিতে। কারণ এভাবেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসবে, আর তার ফলে মানুষের সম্পদ বাড়বে আর তারা আরও স্বনির্ভর হবে।

কিন্তু কোন উচ্চতর গবেষণা যদি এই দাবিগুলোকে ভুল প্রমাণিত করে, তখন? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর স্বনির্ভরতা যদি মানুষকে সুখী করতে না পারে, তাহলে পুঁজিবাদ কী কাজে লাগবে? বড় কোনো সাম্রাজ্যের প্রজারা যদি কোনো ছোট স্বাধীন দেশের নাগরিকদের চেয়ে সুখে থাকে, তাহলে? এই যেমন, যদি প্রমাণ করা যায় যে, আলজেরিয়ার মানুষেরা ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার আগেই বেশি ভালো ছিল, তাহলে উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের সমর্থকেরা কী বলবেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দূরে থাক, এখন পর্যন্ত কোনো ইতিহাসবিদ এই প্রশ্নগুলোই তোলেননি। ইতিহাস পর্যালোচনায় বাদ যায় না কিছুই- রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, লিঙ্গ, রোগব্যাধি, যৌনতা, ভাত-কাপড়- সবকিছু নিয়েই ইতিহাসে আলোচনা হয়, কেবল এগুলো মানুষকে সুখ দিতে পারে কিনা সে প্রশ্নে সবাই নীরব।

এই ব্যাপারটা নিয়ে অল্প কিছু মানুষ মাথা ঘামালেও সুখী হওয়ার ব্যাপারে জ্ঞানী থেকে অজ্ঞ- সবারই ধারণা অস্পষ্ট। একদিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায়, ইতিহাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আসতে আসতে মানুষের সক্ষমতা অনেকটাই বেড়েছে। আর যেহেতু মানুষ সাধারণত দুর্দশা মোচন ও আশা পূরণ করতেই তার অর্জিত ক্ষমতা ব্যবহার করে, তাই বলা যায় আজকের মানুষ নিঃসন্দেহে মধ্যযুগের মানুষের চেয়ে বেশি সুখী, প্রস্তর যুগের মানুষের চেয়ে তো বটেই।

কিন্তু এই আশাবাদী যুক্তি আসলে তেমন গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আমরা দেখেছি, নতুন নতুন আচরণ ও দক্ষতা মানুষকে উন্নততর জীবন দিতে পারে না। কৃষিবিপ্লবের সময়ে চাষাবাদ করতে শিখে মানুষের সমষ্টিগতভাবে পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও বেড়েছিল। অথচ একজন ব্যক্তি-মানুষের জীবন হয়ে গিয়েছিল আরও রুক্ষ। একজন সংগ্রাহকের তুলনায় একজন কৃষককে একদিকে কাজও করতে হতো অনেক বেশি, অন্যদিকে তার খাবারের বৈচিত্র আর পুষ্টিগুণও ছিল কম। রোগভোগের সম্ভাবনাও কৃষকদেরই বেশি ছিল। আবার ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাম্রাজ্যবিস্তারের ফলে তাদের সমষ্টিগত ক্ষমতা অনেক বেড়েছে, তাদের আদর্শ, চিন্তাধারা, প্রযুক্তি আর বৈচিত্রময় খাবার ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে, বাণিজ্যের নতুন নতুন পথ তৈরি হয়েছে। অথচ আফ্রিকা, আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ার কোটি কোটি আদিবাসী মানুষকে তা অন্তহীন দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। মানুষের মধ্যে ক্ষমতা পেলেই সেটা অপব্যবহার করার একটা প্রবণতা আছে। কাজেই ক্ষমতার চর্চার মাধ্যমে মানুষ সুখী হবে- এমনটা ভাবা বোকামি।

এই তত্ত্বের বিরোধীদের অবস্থান পুরোপুরি উলটো। তাদের মতে, মানুষের ক্ষমতা ও সুখের মধ্যে সম্পর্কটা আসলে বিপরীত। ক্ষমতা সবসময় মানুষকে দুর্নীতি ও অন্যায়ের পথে চালিত করে। তাই মানুষের হাতে যত ক্ষমতা আসছে, ততই এই পৃথিবীটা একটা শীতল যান্ত্রিক পরিবেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যে পরিবেশ আমরা চাইনি। বিবর্তন মানুষকে দেহে-মনে একটা শিকারি-সংগ্রাহক প্রাণী হিসেবেই তৈরি করেছিল। সেখান থেকে প্রথমে কৃষিনির্ভর ও তার পরে শিল্পনির্ভর জীবনে প্রবেশ করে মানুষ তার প্রাকৃতিক জীবন হারিয়েছে। এই কৃত্রিম জীবন তার চাওয়াগুলো পূরণ করতে পারছে না, তার সহজাত প্রবৃত্তিকে প্রকাশিত হতে দিচ্ছে না। তাই তার সন্তুষ্টিও হচ্ছে না। আদিম মানুষের ম্যামথ শিকারের যে সুতীব্র উত্তেজনা আর বুনো উল্লাস, তা আজকের একটা শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবার কল্পনাও করতে পারবে না। আমাদের প্রত্যেকটা নতুন আবিষ্কার আমাদেরকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বর্গ থেকে একটু একটু করে দূরে নিয়ে যাচ্ছে।

আবার সব আবিষ্কারই যে খারাপ- তাও নয়। এর বিপরীত উদাহরণও আছে। আমাদের ভিতর থেকে শিকারি-সংগ্রাহক সত্তাটা হারিয়ে গেছে, কিন্তু কিছু কিছু দিক থেকে দেখলে সেটা খুব খারাপও নয়। গত দুই শতাব্দীতে চিকিৎসা ব্যবস্থার যে উন্নতি হয়েছে তাতে শিশু মৃত্যুহার ৩৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এর ফলে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া সেইসব শিশু ও তাদের পরিবারের জীবনে যে সুখ এসেছে, তা বিনা তর্কে মেনে নিতেই হবে।

তাই অনেকের অবস্থান এই দুরকম যুক্তির মাঝখানে। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব আসার আগের সময়ে ক্ষমতা ও সুখের সম্পর্কটা অস্পষ্ট ছিল। মধ্যযুগের একজন কৃষক হয়তো তার শিকারি-সংগ্রাহক পূর্বসূরীর চেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল। কিন্তু গত কয়েকশ বছরে মানুষ তার ক্ষমতাকে আরও বিচক্ষণতার সাথে কাজে লাগাতে শিখেছে। তারই একটা উদাহরণ হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি। আরও অন্যান্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায় সহিংসতার পরিমাণ অনেকখানি কমে আসা, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া, মহামারী বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া- এসবের কথা।

কিন্তু এই ব্যাখ্যাও একদিক থেকে অতিসরলীকরণ দোষে দুষ্ট। কারণ এই ব্যাখ্যার ভিত্তি হল খুব অল্প কিছু সময়ের তথ্য। আধুনিক চিকিৎসা পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের নাগালে এসেছে ১৮৫০ সালের পরে। আর শিশুমৃত্যুর হার কমে যাওয়া তো কেবল বিংশ শতাব্দীর ঘটনা। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও পৃথিবীতে বিরাট মহামারী হয়েছে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে যখন চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই সেখানে ১ থেকে ৫ কোটি মানুষ মারা গেছে খেতে না পেয়ে। আর আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে কেবল ১৯৪৫ সালের পর, এর মূল কারণ অবশ্য পরমাণু অস্ত্রের ভয়। কাজেই গত কয়েক বছরকে মানুষের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ মনে হলেও এত তাড়াতাড়ি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, এটা কি আসলেই সুন্দর সময়ের শুরু না কেবল ক্ষণস্থায়ী সুসময়। আধুনিক যুগের বিচার করতে গেলে কেবল একুশ শতকের পশ্চিমা দেশের মধ্যবিত্তের চোখ দিয়ে দেখলে হবে না, সাথে দেখতে হবে উনিশ শতকের ওয়েলসের কয়লাখনির শ্রমিক, চীনের আফিম-আসক্ত কিংবা তাসমানিয়ার আদিবাসী মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেও। কারণ, ইতিহাসের চোখে আমেরিকার জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র হোমার সিম্পসনের (Homer Simpson) চেয়ে তাসমানিয়ার নির্যাতিত আদিবাসীদের প্রতিনিধি ট্রুগানিনির (Truganini) গুরুত্ব কিন্তু একটুও কম নয়।

তাছাড়া আপাতদৃষ্টিতে বিগত অর্ধ-শতাব্দীকে মানুষের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলে মনে হলেও এই সময়ের মধ্যেই কিন্তু মানুষ রোপণ করেছে তার ভবিষ্যৎ অমঙ্গলের বীজ। একসময় মানুষসহ সমগ্র জীবজগতই ছিল প্রকৃতির নিয়মের অধীন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে পরিবেশের কর্তৃত্ব হাতে তুলে নিয়েছে মানুষ। ফলে নিজের প্রয়োজনে পরিবেশকে ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার ক্ষমতাও এখন আমাদের আছে। কিন্তু সেই ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে আমরা লাভবান হলেও মোটের উপর পরিবেশের ক্ষতিই হয়েছে বেশি। আমাদের চাহিদা পূরণের মূল্য দিয়েছে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে আমরা যে কতভাবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছি তার হিসাব নেই। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে মানুষের লাভবান হওয়ার চিন্তা করাটা বোকামি। পৃথিবীজোড়া অগণিত মানুষের বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আমরা যে ভবিষ্যতের পৃথিবীকে সম্পদহীন করে ফেলছি, সে কথা ভাবার সময়ও কারো নেই। এর কঠিন পরিণতি এক সময় ভোগ করতেই হবে। ইতোমধ্যেই তার কিছু অশনি সংকেত দেখা যাচ্ছে।

অন্যান্য প্রাণীদের ভয়াবহ পরিণতির কথা বাদ দিয়ে ভাবলে ইতিহাসের এইসব অসামান্য অর্জনের জন্য কৃতিত্বের মুকুটটা মানুষেরই প্রাপ্য বলে মনে হতে পারে। দুর্ভিক্ষ আর মহামারীর হাত থেকে আমরা নিস্তার পেয়েছি বটে, কিন্তু তার মূল্য দিতে হয়েছে গবেষণাগারের বানর আর খামারের অসংখ্য গরু আর মুরগিকে। গত দুইশ বছরে শিল্পের বিকাশের খাতিরে এরকম শত শত কোটি প্রাণীকে যে নিষ্ঠুরতার ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে, তার সমান দৃষ্টান্ত পৃথিবীর সম্পূর্ণ ইতিহাসে আর একটাও নেই। পশু-অধিকার সংগঠনগুলো যে পরিমাণ নিষ্ঠুরতার হিসাব দেয়, তার দশ ভাগের এক ভাগও যদি সত্য হয়, তাহলেও আধুনিক কৃষিব্যবস্থাকে ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধ মনে হবে। তাই, সুখের হিসাব করতে গেলে শুধু সমাজের উপরতলার, অথবা শুধু ইউরোপের, কিংবা কেবল পুরুষ মানুষের হিসেব নিলে চলবে না। সম্ভবত কেবল মানুষের কথা ভাবাটাও অন্যায় হবে।

সুখের মাপকাঠি

এতক্ষণ আমরা সুখী হওয়ার যে মাপকাঠিগুলো দেখলাম, যেমন সুস্বাস্থ্য, খাবার কিংবা সম্পদ- তার সবই বস্তুগত। এদিক দিয়ে দেখলে যে যত ধনী আর স্বাস্থ্যবান, সে তত সুখী। কিন্তু আসলেই কি হিসাবটা এত সহজ? হাজার হাজার বছর ধরে দার্শনিক, ধর্মগুরু আর কবিরা সুখ কী তা জানার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের অনেকেই সুখের জন্য সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোকে বস্তুগত বিষয়গুলোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। আজকের সমাজে একজন সচ্ছল মানুষও এত উন্নত জীবনের মধ্যেও একাকিত্বে ভোগে, জীবনের অর্থ খুঁজে পায় না। অথচ সম্ভবত আমাদের পূর্বপুরুষেরা এতটা সম্পদশালী না হয়েও সামাজিক বন্ধন, ধর্ম ও প্রকৃতির মাঝে আরও বেশি সুখ খুঁজে পেত।

গত কয়েক দশক ধরে এই সুখের সন্ধানের কাজটা করছেন মনোবিজ্ঞানী ও জীববিজ্ঞানীরা। মানুষ কিসে সুখী হয়? টাকা? পরিবার? সৎকর্ম? নাকি জিনের কোনো ভূমিকা আছে এতে? প্রথমে আমাদের জানতে হবে আমরা কী পরিমাপ করতে চাই। সুখের সর্বজনগ্রাহ্য একটা সংজ্ঞা হল ‘ব্যক্তিগতভাবে ভালো থাকা’। এভাবে চিন্তা করলে সুখ হল মানুষের মনের ভিতরের একটা অনুভূতি। সেটা তাৎক্ষণিক আনন্দও হতে পারে, আবার দীর্ঘমেয়াদী সন্তুষ্টির অনুভূতিও হতে পারে। যদি এটা মনের ভিতরেরই ব্যাপার হয়, তাহলে বাইরে থেকে সেটা মাপার উপায় কী? একটা উপায় হল মানুষের কাছে তার অনুভূতি জানতে চাওয়া। এইজন্যই জীববিজ্ঞানী আর মনোবিজ্ঞানীরা মাঝেমধ্যেই সুখী মানুষদের হাতে তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন রকম জরিপের প্রশ্ন ধরিয়ে দেন।

এসব প্রশ্নে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের বক্তব্যে শূন্য থেকে দশের মধ্যে নম্বর দিতে বলা হয়। বক্তব্যগুলো হয় অনেকটা এরকম: ‘যেভাবে চলছে সেটাই ভালো’, ‘জীবন থেকে পাওয়ার অনেক কিছু আছে’, ‘ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমি আশাবাদী’ কিংবা ‘জীবন আসলেই সুন্দর’। নানাজন নানাভাবে এসব বক্তব্যের সাথে একমত বা দ্বিমত পোষণ করে। তাদের দেওয়া নম্বরগুলো থেকে নানারকম হিসাব করে বিজ্ঞানীরা তাদের ‘ভালো থাকার’ পরিমাণটা নির্ণয় করেন।

এসব প্রশ্নোত্তর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি-নিরপেক্ষ বিষয়ের সাথে সুখের সম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। যেমন, ধরা যাক কোনো জরিপে বছরে এক লক্ষ ডলার আয় করে এমন এক হাজার জন মানুষের মতামত নেওয়া হল। অন্য কোনো জরিপে এমন এক হাজার লোকের মতামত নেওয়া হল যাদের বার্ষিক আয় ৫০ হাজার ডলার। এখন এই দুটো জরিপে যদি দেখা যায় প্রথম দলের ‘ভালো থাকার’ গড় মান ৮.৭ আর দ্বিতীয় দলের ৭.৩, তাহলে বলা যায় ব্যক্তিগত ভালো থাকার সাথে টাকার একটা সম্পর্ক আছে। সোজা কথায়, যার টাকা বেশি, তার সুখও বেশি। একই পদ্ধতিতে জানার চেষ্টা করা যায় মানুষ গণতান্ত্রিক দেশে বেশি সুখে থাকে না একনায়কের শাসনে, অথবা বিবাহিত মানুষেরা অবিবাহিত, বিধবা ও বিপত্নীক মানুষের চেয়ে বেশি সুখী হয় কি না।

এই তথ্যগুলো ইতিহাসবিদদেরও কাজে লাগে। এখান থেকে তারা অতীতের মানুষের টাকা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা বিবাহ-বিচ্ছেদের হার কেমন ছিল তা জানতে পারেন। ফলে, যদি দেখা যায়, আগে মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনে বেশি ভালো ছিল, তাহলে তারা যুক্তি দেখাতে পারেন, গত কয়েক দশকে গণতন্ত্রের প্রসার মানুষের সুখ বাড়িয়েছে। আবার যদি দেখা যায় বিবাহিত মানুষেরা বেশি সুখী ছিল, তাহলে বলা যায় এখনকার বিবাহ-বিচ্ছেদের হার বেড়ে যাওয়াটা আসলে মানুষের আরও অসুখী হওয়ার একটা লক্ষ্মণ।

এটা অবশ্য কোনো নির্ভুল পদ্ধতি নয়, তবে এই পদ্ধতির সমস্যাগুলো দেখার আগে এর কিছু ফলাফল দেখা যাক।

একটা মজার পর্যবেক্ষণ হল, টাকা আসলেই সুখ আনে। তবে সেটা একটা পর্যায় পর্যন্ত, সেটা পার হয়ে গেলে টাকার গুরুত্ব তেমন থাকে না। অর্থনীতির একেবারে নিচের তলায় যাদের বাস, তাদের কাছে বেশি টাকা মানেই বেশি সুখ। ধরুন, আমেরিকার একজন একা মা মানুষের ঘর পরিষ্কার করে বছরে ১২ হাজার ডলার আয় করছে। এখন সে যদি হঠাৎ একদিন লটারিতে ৫ লাখ ডলার পেয়ে যায়, তাহলে তার ‘ভালো থাকার’ পরিমাণটা এক লাফে অনেকখানি বেড়ে যাবে, আর সেটা বেশ অনেকদিন থাকবেও। তখন সে দেনায় ডুবে না গিয়েও তার সন্তানদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করতে পারবে। অথচ যে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এমনিতেই বছরে আড়াই লাখ ডলার আয় করছে, সে যদি লটারিতে ১০ লাখ ডলারও পেয়ে যায়, বা কোম্পানি যদি তার বেতন দ্বিগুণ করে দেয়, তার বাড়তি সুখটুকু কিন্তু সপ্তাহখানেকের বেশি থাকবে না। বিভিন্ন জরিপে এমনটাই দেখা যায়। এই বাড়তি টাকা দিয়ে লোকটা হয়তো আরও দামী গাড়ি চালাবে, আরও বড় আর বিলাসবহুল বাড়িতে গিয়ে উঠবে, আরও ভালো খাবার আর পানীয় উপভোগ করবে, কিন্তু কিছুদিন পরেই সেটা তার কাছে একটা সাদামাটা ব্যাপারে পরিণত হবে।

শারীরিক সুস্থতার সাথে সুখের সম্পর্কটাও লক্ষণীয়। জরিপে দেখা যায়, অসুখবিসুখ সাধারণত মানুষকে সাময়িকভাবে অসুখী করে। তবে রোগটা যদি যন্ত্রণাদায়ক হয়, অথবা যারা অনেকদিন ধরে কোনো রোগে ভুগছে, তাদের জন্য সেটা বিরাট অশান্তির কারণ। যারা ডায়াবেটিসের মতো দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়, তারা প্রথমে কিছুদিন প্রচুর অশান্তিতে ভোগে। কিন্তু তাদের শারীরিক অবস্থার যদি অবনতি না হয়, তাহলে তারা সেই অশান্তির সাথে ধীরে ধীরে নিজেদের মানিয়ে নেয়, ফলে একসময় তারা সুস্থ মানুষদের মতোই সুখী জীবনে ফিরে আসে। ধরুন লুসি আর লুক কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের দুই যমজ ভাই-বোন। একটা তথ্য সংগ্রহের জরিপে অংশগ্রহণ করে ফেরার পথে দুটো ঘটনা ঘটল। রাস্তায় একটা বাস লুসির গাড়িটাকে ধাক্কা দিল, ফলে গাড়ি তো গুঁড়িয়ে গেলই, লুসির শরীরের অনেকগুলো হাড় ভাঙল, আর একটা পা অকেজো হয়ে গেল সারা জীবনের জন্য। ওদিকে লুকের কাছে একটা ফোন এল। লুক জানতে পারল, সে এক কোটি ডলারের লটারি জিতে গেছে! দুবছর পর দেখা যাবে লুসি খুঁড়িয়ে হাঁটছে আর লুক অনেক দামী গাড়িতে চড়ছে। তখন যদি দুবছর আগের সেই জরিপে আবার তাদের অংশগ্রহণ করতে বলা হয়, সম্ভবত দুজনেরই বেশিরভাগ উত্তর আগের সেই দিনটার মতোই হবে।

সুখের উপর টাকা আর স্বাস্থ্যের চেয়ে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের প্রভাব আরও বেশি বলেই দেখা যায়। যেসব মানুষের পারিবারিক বন্ধন দুর্বল অথবা যারা অন্যান্য মানুষের কাছ থেকে খুব বেশি সহযোগিতা পায়নি (অথবা নেয়নি), তাদের চেয়ে দৃঢ় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনে থাকা মানুষেরা বেশি সুখী হয়। বিয়ে জিনিসটা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে নানা সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দর বৈবাহিক জীবনের সাথে ভালো থাকা সরাসরি সম্পর্কিত। এই সম্পর্কটা আর্থিক অবস্থা, এমনকি শারীরিক সুস্থতার হেরফের হলেও খাটে। আন্তরিক জীবনসঙ্গী, পরিবার ও উষ্ণ সামাজিক পরিবেশ পেলে একজন হতদরিদ্র অসুস্থ মানুষও একজন একাকী কোটিপতি মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সুখী জীবন কাটাতে পারে। তবে দারিদ্র্য খুব বেশি হলে বা কোনো যন্ত্রণাদায়ক রোগে আক্রান্ত হলে ফলাফল কিছুটা ভিন্ন হতেও পারে।

এসব থেকে আরেকটা সম্ভাবনা দেখা যায়। গত দুইশ বছরে মানুষের বস্তুগত দিক থেকে প্রাচুর্য এসেছে। তাই এমনও হতে পারে যে এই প্রাচুর্যই পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়ার ক্ষতি খানিকটা পূরণ করে দিচ্ছে। যদি তাই হয়, তাহলে ১৮০০ সালের একজন মানুষের চেয়ে এখনকার গড়পড়তা একজন মানুষের বেশি সুখী হওয়ার কথা নয়। এমনকি আমরা যে স্বাধীনতাকে এত গুরুত্ব দিই, সেটাই হয়তো আমাদের জন্য খারাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমাদের এখন জীবনসঙ্গী, বন্ধুবান্ধব বা প্রতিবেশী বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা আছে। আবার তাদেরও তো স্বাধীনতা আছে আমাদের ছেড়ে যাওয়ার! আমাদের নিজের জীবনকে নিজের ইচ্ছামতো সাজানোর স্বাধীনতা যত বাড়ছে, যেকোনো ধরনের বন্ধনে জড়িয়ে পড়াটাও ততই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই এসব বন্ধন আলগা হতে হতে আমরা ক্রমেই একাকী জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

তবে এসব গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল, সুখ আসলে সম্পদ, সুস্বাস্থ্য বা সামাজিক বন্ধনের উপর নির্ভর করে না। বরং সেটা নির্ভর করে মানুষের অবস্থা ও তার ব্যক্তিগত চাহিদার উপর। যদি কেউ একটা গরুর গাড়ি চায়, তাহলে গরুর গাড়ি পেলেই সে সন্তুষ্ট, আর কিছু দরকার নেই। কিন্তু কেউ যদি একটা ঝকঝকে নতুন ফেরারি গাড়ি চায়, একটা পুরনো ফিয়াট গাড়ি পেয়ে তার মন ভরবে না, এটাই স্বাভাবিক। এজন্যই লটারি জেতা আর ভয়ঙ্কর কোনো দুর্ঘটনা দুটোই, অনেক সময় পরে, মানুষকে একই অবস্থায় নিয়ে যায়। যখন আমাদের অবস্থা ভালো থাকে, আমাদের চাহিদাগুলোও ফুলেফেঁপে ওঠে, তাই বড় বড় প্রাপ্তিগুলোও তখন আমাদের সুখ দিতে পারে না। আবার যখন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়, তখন আশার বেলুনও চুপসে যায়, তাই সেই খারাপ পরিস্থিতিতেও নিজেকে অসুখী মনে হয় না।

এখন মনে হতে পারে, এ আর নতুন কী, আর এসব জানার জন্য এত গবেষণারই বা কী আছে। আমরা কী চাই তার চেয়ে আমাদের যা আছে তা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট কি না এটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ- এ কথা তো ধর্মগুরু, কবি আর দার্শনিকেরা কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই বলে আসছে। তবু আমাদের আধুনিক গবেষণার ফল আমাদের প্রাচীন পূর্বসূরীদের চিন্তার সাথে মিলে যাচ্ছে এটা দেখতে ভালোই লাগে।

সুখের ইতিবৃত্ত জানতে হলে আগে আমাদের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে হবে। সুখ যদি কেবলই স্বাস্থ্য, সম্পদ আর সামাজিক সম্পর্কের মতো কিছু ব্যক্তি-নিরপেক্ষ বিষয়ের উপর নির্ভরশীল হতো তাহলে বিষয়টা একটু সহজ হতো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সুখ আসলে ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার উপর নির্ভরশীল, যা প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদা আলাদা। তাই সেটা তলিয়ে দেখাটাও বেশ কঠিন। আমাদের এখন অনেক রকম ব্যথানাশক অথবা ঘুমের ওষুধ আছে। কিন্তু সুখ-শান্তির ব্যাপারে আমাদের চাহিদা আর নানা বিষয়ে অসহিষ্ণুতা এত বেড়ে গেছে যে আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে আমাদের অনেক বেশি দুঃখ-বেদনা সহ্য করতে হচ্ছে।

এই চিন্তাধারাটা মেনে নেওয়া একটু কঠিন। সমস্যার শেকড়টা আসলে লুকিয়ে আছে আমাদের মনস্তত্ত্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা একটি ভুল প্রবণতার মাঝে। আমরা যখন ভাবি যে অন্যরা কতটা সুখী বা আগের মানুষেরা কতটা সুখী ছিল, আমরা সবসময় তাদের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করি। কিন্তু সেটা ঠিক নয়, কারণ এভাবে চিন্তা করতে গেলে আমরা অন্যের উপর নিজের চাহিদাগুলো চাপিয়ে দিই। এখনকার যেকোনো সমৃদ্ধ সমাজে প্রতিদিন গোসল করে নতুন কাপড় পরাটাই রীতি। অথচ মধ্যযুগের একজন কৃষক গোসল না করেই মাসের পর মাস কাটিয়ে দিত। কাপড়ও বদলাত কালে ভদ্রে। এটা চিন্তা করলে আমাদের গা গুলিয়ে আসতে পারে, কিন্তু তাদের এতে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না। তারা তাদের দীর্ঘদিন গোসল-না-করা শরীর আর ময়লা দুর্গন্ধময় কাপড়েই অভ্যস্ত ছিল। এমন নয় যে তারা নতুন কাপড় চায় কিন্তু সেটা পাচ্ছে না- বরং তাদের যা ছিল সেটা নিয়েই তারা সন্তুষ্ট ছিল। কাজেই কাপড় যতদিন টেকে ততদিন তারা সুখী।

অবশ্য একটু চিন্তা করলেই দেখা যায়, এতে আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাদের বিবর্তনীয় আত্মীয় শিম্পাঞ্জিদের কথাই ধরুন। তারাও গোসল করে না বললেই চলে, আর কাপড় বদলানোর ঝক্কি তো তাদের নেইই। আমাদের পোষা বিড়াল-কুকুরও রোজ গোসল করে নতুন কাপড় পরে না। তবু আমরা তাদের কোলে নিই, গায়ে হাত বুলাই। মানবশিশুদের বেলায়ও দেখা যায় তারা গোসল করতে পছন্দ করে না, অথচ বাবা-মায়ের শিক্ষা ও শাসনে থেকে কয়েক বছরের মধ্যেই তারা এই অদ্ভুত রীতিতে দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে যায়। সবই আসলে চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপার।

যদি সুখের সংজ্ঞা হয় ইচ্ছাপূরণ, তাহলে বলতে হয় দুটো জিনিস আমাদের সুখের সঞ্চয় খালি করে দিচ্ছে। একটা হল গণমাধ্যম, অন্যটা হল বিজ্ঞাপন শিল্প। ৫০০০ বছর আগের কোনো গ্রামের একজন আঠারো বছর বয়সী মানুষ নির্দ্বিধায় নিজেকে একজন আকর্ষণীয় মানুষ ভাবতে পারত। কারণ তার গ্রামে আর যে জনাপঞ্চাশেক মানুষ ছিল তাদের বেশিরভাগই হয় বৃদ্ধ নয়তো একেবারে শিশু। কিন্তু আজকের দিনে এরকম বয়সের একজন মানুষ সেই সন্তুষ্টিটুকু না পেয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। তার স্কুলের বাকি সবাই যদি দেখতে খারাপও হয়, তাতেও তার শান্তি নেই, কারণ সে নিজেকে তুলনা করছে চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা, খেলোয়াড় কিংবা সুপারমডেলদের সাথে। আমাদের টেলিভিশন, রাস্তার পাশের বিলবোর্ড আর ফেসবুক তাকে এই তুলনাটা করতে বাধ্য করছে।

কাজেই এমনটাও হতে পারে যে, তৃতীয় বিশ্বের মানুষের অশান্তির কারণ শুধু দারিদ্র্য, রোগবালাই, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাই নয়, তার সাথে যুক্ত হয়েছে উন্নত বিশ্বের জীবনধারাও। দ্বিতীয় রামেসেস বা ক্লিওপেট্রার যুগের চেয়ে হোসনি মোবারকের মিশরে একজন মানুষের না খেয়ে, রোগে ভুগে বা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। দুটোকে মিলিয়ে দেখলে ২০১১ সালে মিশরের একজন নাগরিকের তার সৌভাগ্যের জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে রাস্তায় নেমে নাচানাচি করার কথা। অথচ তারা মোবারককে গদি থেকে নামানোর জন্য আন্দোলন করছে। এর কারণ হল তারা নিজেদের অবস্থাকে ফারাওদের মিশরের সাথে তুলনা করে দেখছে না, তুলনা করছে সমসাময়িক ওবামার আমেরিকার সাথে।

যদি এমনই চলতে থাকে, তাহলে অমরত্বও মানুষকে সুখ দিতে পারবে না। ধরুন বিজ্ঞান একদিন সব রোগের ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলল, অথবা মানুষের বয়স বেড়ে যাওয়া ঠেকিয়ে দিয়ে মানুষের চিরযৌবনের অধিকারী হওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলল। তাহলে তার অবধারিত ফলাফল হবে পৃথিবীজুড়ে তীব্র আক্রোশ আর প্রবল দুশ্চিন্তার মহামারী।

এই ধরনের কোনো কিছু যদি কখনও আবিষ্কার হয়, তাহলে দেখা যাবে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ, যাদের এটা কেনার সামর্থ্য নেই, তারা রাগে ফেটে পড়বে। ইতিহাসে সবসময় একটা জিনিস দেখা গেছে- গরিব-দুঃখী মানুষ একটা জায়গায় সান্ত্বনা খুঁজে পায়- যে মৃত্যুর কাছে ধনী-গরিব সব সমান। সেই জায়গাটাও আর থাকবে না, দেখা যাবে গরিব মানুষ ঠিকই একদিন মারা যাবে আর ধনীরা চিরযৌবন নিয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।

image068.jpg

৪৫। আগে সৌন্দর্যের মাপকাঠি ঠিক করে দিত আশেপাশের মানুষেরা। আজ সেই কাজটা করছে গণমাধ্যম ও ফ্যাশনশিল্প। তারা আমাদের সামনে সৌন্দর্যের একটা কৃত্রিম আদর্শরূপ তুলে ধরছে। তারা সারা পৃথিবী খুঁজে সুন্দর মুখগুলো আমাদেরকে দেখায় দিনরাত। কাজেই নিজের চেহারা নিয়ে মানুষের হতাশ হওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না।

আবার এই অমরত্ব পাওয়ার সামর্থ্য যাদের হবে তারাও যে খুব সুখে থাকবে- এমন নয়। তাদেরও দুশ্চিন্তা থাকবে। এই ব্যবস্থা আয়ু বাড়াতে পারলেও মৃতকে তো আর জীবন দিতে পারবে না। কাজেই গাড়িচাপা পড়ে বা সন্ত্রাসীদের বোমা হামলার মারা পড়ার আশঙ্কাটা থেকেই যাচ্ছে। তাই অমরত্ব পাওয়া মানুষ ঝুঁকি নিতে ভয় পাবে, সামান্যতম ঝুঁকির ভিতরেও তারা যেতে চাইবে না। আর জীবনসঙ্গী, সন্তান বা বন্ধুর মতো প্রিয়জন হারানোর বেদনাটাও তাদেরই হবে সবচেয়ে বেশি।

রাসায়নিক সুখ

সমাজবিজ্ঞানীরা নানারকম প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে মানুষের ভালো থাকার সাথে বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের সম্পর্ক দেখাতে পারেন। জীববিজ্ঞানীরাও একই পদ্ধতিতেই কাজ করেন, কিন্তু তারা এর মাধ্যমে বিভিন্ন জৈবরাসায়নিক ও জিনগত বিষয়ের প্রভাব দেখান। তবে তাদের ফলাফলগুলো আরও বিস্ময়কর।

জীববিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের মানসিকতা ও আবেগঘটিত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে কিছু জৈবরাসায়নিক পদার্থ। এই ব্যবস্থাটা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তৈরি হয়েছে বিবর্তনের মাধ্যমে। অন্যান্য সব মানসিক অবস্থার মতোই আমাদের ভালো লাগার অনুভূতিও বাহ্যিক কোনো কিছুর প্রভাবে হয় না। ভালো বেতন, সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক বা রাজনৈতিক অধিকার- এর কোনোটাই আমাদের ভালো লাগার জন্য দায়ী নয়, দায়ী হল একটা জটিল স্নায়ুতন্ত্র যা গড়ে ওঠে কোটি কোটি নিউরন, সেগুলো যেখানে জোড়া লাগে সেই সব সিনাপ্স, আর সেরোটনিন, ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের মত কিছু জৈবরাসায়নিক পদার্থের সমন্বয়ে।

লটারি জিতে কেউ সুখী হয় না। নতুন বাড়ির মালিক হলেও না, চাকরিতে পদোন্নতি পেলেও না, এমনকি সত্যিকার ভালোবাসার মানুষটাকে পেলেও না। মানুষ কেবল একটা জিনিসেই সুখী হয়- যখন তার শরীরে আনন্দের অনুভূতি হয়, তখন। একজন মানুষ যখন লটারিতে অনেকগুলো টাকা পেয়ে যায় কিংবা তার প্রিয় মানুষটাকে খুঁজে পায়, তখন তার আনন্দের যে বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, সেটা কিন্তু ওই টাকা বা মানুষটার জন্য নয়। এর জন্য দায়ী তার রক্তস্রোতে ছুটে বেড়ানো বিভিন্ন হরমোন আর মস্তিষ্কের ভিতরে তড়িৎ সংকেতের ঝড়।

তবে দুঃখের ব্যাপার হল, এই জৈবরাসায়নিক পদ্ধতিটা এমনভাবেই তৈরি হয়েছে যে সেটা আমাদের সুখের মাত্রাটাকে যত খুশি বাড়তে দেয় না। সুখ জিনিসটার উপর প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে না। এই যেমন একজন সুখী সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর জিন বিলুপ্ত হয়ে যায়, আবার প্রবল দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বাবা-মায়ের জিন ঠিকই সন্তানের মধ্যে টিকে থাকে। সুখ-দুঃখ মানুষের টিকে থাকা আর বংশবিস্তারে প্রভাব ফেলতে পারে- বিবর্তনে এদের ভূমিকা বড়জোর এইটুকুই। হয়তো এমনও হতে পারে যে, বিবর্তনই আমাদের এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে আমাদের সুখ-দুঃখ কোনোটাই খুব বেশি না হয়। তাই আমাদের সাময়িক আনন্দের অনুভূতি হয় ঠিকই, কিন্তু সেটা স্থায়ী হয় না। আগে হোক বা পরে হোক, সুখটুকু মুছে গিয়ে আবার দুঃখকে জায়গা করে দেয়।

উদাহরণ হিসেবে যৌনতার কথা বলা যায়। বিবর্তন পুরুষের জিন নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াটাকে আনন্দময় করে তুলেছে। এই আনন্দটুকু না থাকলে খুব কম পুরুষই এই কাজে আগ্রহী হতো। আবার একই সাথে বিবর্তন এমন ব্যবস্থাও করেছে যাতে এই আনন্দ বেশি সময় স্থায়ী না হয়। এই আনন্দ চিরস্থায়ী হলে পুরুষেরা হয়তো খাবার খুঁজতে যেত না, বা অন্য কোনো নারীকেও খুঁজত না।

অনেকে এই জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াকে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের সাথে তুলনা করেন। বাইরে তুষারঝড়ই হোক কিংবা রোদে ঝলসে যাক, শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ঘরের ভিতরের তাপমাত্রাকে এক জায়গায় স্থির করে রাখে। কোনো কারণে সাময়িকভাবে ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে কিংবা কমে যেতে পারে, কিন্তু এই যন্ত্র আবার সেটাকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে আসে।

এসব যন্ত্রের কোনোটা ঘরের তাপমাত্রা পঁচিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরে রাখে, কোনোটা বিশে। মানুষের ব্যাপারটাও এমনই। মানুষের সুখ-দুঃখকে এক থেকে দশের মধ্যে নম্বর দিলে এক এক জনের নম্বর এক এক রকম হবে। হয়তো দেখা যাবে সহজাতভাবেই হাসিখুশি কোনো মানুষের মানসিক অবস্থা ছয় থেকে দশের মধ্যে ওঠানামা করে, গড়ে আটের আশেপাশে থাকে। এইরকম একজন মানুষ যদি কোনো ব্যস্ত শহরে একা থাকে, যদি একদিন শেয়ার বাজারে তার সব টাকা লোকসান হয় আর পরের দিনই তার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, তবু তাকে খুব একটা দুঃখিত হতে দেখা যায় না। আবার অনেকের মানসিক অবস্থা এমনিতেই তিন থেকে সাতের মধ্যে থাকে, গড়ে পাঁচের কাছাকাছি। এরকম একজন মানুষ অনেক বন্ধুবান্ধবের ভিতরে থেকে, লটারিতে কয়েক লাখ টাকা জিতে অলিম্পিক অ্যাথলেটদের মত স্বাস্থ্য নিয়েও মন খারাপ করে থাকে। আসলেই, আমাদের সবচেয়ে মনমরা বন্ধুটা যদি একদিন সকালে উঠেই দেখে সে এক কোটি টাকার লটারি জিতে গেছে, তারপর দুপুরবেলার মধ্যে এইডস আর ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলে, বিকাল নাগাদ ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনের মধ্যে একটা শান্তিচুক্তি করে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে দেখে যে তার কয়েক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাটা ঘরে ফিরে এসেছে, তবু তার খুশির মাত্রা সাতের উপরে ওঠে না। ঘটনা যা-ই হোক, তার মস্তিষ্কটাই আসলে খুব বেশি খুশি হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।

নিজের আশেপাশের মানুষদের কথাই ভাবুন। এমন একজনকে নিশ্চয়ই খুঁজে পাবেন যে যেকোনো অবস্থায় হাসিখুশি থাকতে পারে। আবার এমন কাউকেও পাবেন যে কোনো কিছুতেই খুশি হয় না। আমাদের ধারণাটাই হয়ে গেছে এমন যে আমরা ভাবি একটা ভালো জায়গায় কাজ করলে, বিয়ে করলে, অর্ধেক লেখা উপন্যাসটা শেষ করলে, নতুন একটা গাড়ি কিনলে কিংবা ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া টাকাটা শোধ করে দিলে তার মতো সুখ আর কিছুতে নেই। কিন্তু সেই ইচ্ছাটা পূরণ হয়ে গেলেও দেখা যায় সেই সুখ আর আসে না। কারণ গাড়ি কেনা বা উপন্যাস লেখা আমাদের ভিতরে স্থায়ী কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায় না। একটা সাময়িক সুখের অনুভূতি দিতে পারে বড়জোর, কিন্তু সেটা কেটে যেতেও সময় লাগে না।

তাহলে একটু আগে যে সুখের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলো নিয়ে কথা হচ্ছিল, তার সাথে এই জৈবরাসায়নিক ব্যাখ্যার সামঞ্জস্যটা কোথায়? এই যেমন, বিবাহিত মানুষ অবিবাহিত মানুষের চেয়ে বেশি সুখী হয়- তার ব্যাখ্যা কী? প্রথমে এটা মেনে নিতে হবে যে, বিয়ে করা আর সুখী হওয়া- কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এ দুটো ঘটনা একসাথে হওয়ার উদাহরণ অনেক বেশি আছে বটে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে একটার কারণে অন্যটা হচ্ছে। হ্যাঁ, একজন গড়পড়তা বিবাহিত মানুষ একজন অবিবাহিত মানুষের চেয়ে সুখী, কিন্তু তাই বলে এটা বলা যাবে না যে বিয়েই তার সুখের উৎস। বরং উল্টোটা হতে পারে- সুখটাই আসলে বিয়ের কারণ। আসলে সেরোটনিন, ডোপামিন ও অক্সিটোসিন- এই তিনটাই বিয়ে হওয়া ও বিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য দায়ী। অনেক মানুষ জন্মগতভাবেই হাসিখুশি ধরনের হয়। এরকম একজন মানুষ জীবনসঙ্গী হিসেবেও ভালো হওয়ার কথা, কাজেই তার বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আবার একজন বিষণ্ণ মানুষের চেয়ে একজন হাসিখুশি মানুষের সাথে বসবাস করা বেশি উপভোগ্য, তাই এরকম মানুষের বিবাহ-বিচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনাও কম। কাজেই দুদিক থেকেই চিন্তা করলে দেখা যাচ্ছে গড়ে একজন বিবাহিত মানুষ একজন অবিবাহিত মানুষের চেয়ে সুখী, কিন্তু তার মানে এটা নয় যে একজন বিষণ্ণ মানুষ বিয়ে করে ফেললেই রাতারাতি সে একজন সুখী মানুষ হয়ে যাবে।

জীববিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বের উপর জোর দিলেও মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিষয়গুলোকেও তাঁরা উড়িয়ে দেন না। আমাদের মানসিক অবস্থার একটা সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা আছে। যেকোনো দিকেই এই সীমা অতিক্রম করাটা প্রায় অসম্ভব। তবে বিয়ে ও বিবাহ-বিচ্ছেদের মতো ঘটনায় সেটা হতেও পারে। যে মানুষ জন্মেছেই গড়ে পাঁচ মাত্রার অনুভূতি নিয়ে, তাকে কখনওই রাস্তায় নাচতে দেখা যাবে না। অথচ একটা সুখী বিবাহিত জীবন পেলে তার সুখী ভাবটা মাঝেমধ্যেই সাত মাত্রায় উঠতে পারে। হয়তো সেটা আর তিনের কাছাকাছি যাবেই না।

যদি আমরা সুখের এই জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটা মেনে নিই, তাহলে ইতিহাসের আর তেমন গুরুত্ব থাকে না। কারণ ইতিহাস তো আর এসব জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে না। হ্যাঁ, সেরোটনিন নিঃসরণ করার মতো ঘটনা ইতিহাসে আছে বটে, কিন্তু তাতে তো আর মানুষের রক্তে সেরোটোনিনের মাত্রা বদলায় না। কাজেই মানুষের সুখী হওয়ার পিছনে ইতিহাসের কোনো ভূমিকাও নেই।

চলুন, মধ্যযুগের একজন ফরাসি কৃষকের জীবনের সাথে আজকের প্যারিসের একজন ব্যাংক কর্মকর্তার জীবনকে মিলিয়ে দেখি। কৃষক থাকত একটা কাদামাটির ঘরে, সেটা এমনভাবে তৈরি করা যেন সেখান থেকে শূকরের খোঁয়াড়টার উপর নজর রাখা যায়। ওদিকে ব্যাংক কর্মকর্তা থাকে আধুনিক প্রযুক্তির জিনিসপত্রে ভরা একটা বড় দালানের সবচেয়ে উপরতলায়, যার জানালা দিয়ে তাকালেই বিরাট শাঁজেলিসি এভিনিউ দেখা যায়। এটুকু জেনেই আমাদের মনে হয় কৃষকের চেয়ে এই কর্মকর্তার জীবন কত সুখের। অথচ আসল ব্যাপার হল, মানুষের সুখের উপর এই কাদামাটির ঘর, উঁচু দালানের ঘর, শূকরের খোঁয়াড় বা চওড়া রাস্তার কোনো ভূমিকাই নেই। সেরোটোনিনের আছে। সেই মধ্যযুগের কৃষক যখন তার কাদামাটির ঘরটা বানাল, তখন তার মস্তিষ্কের নিউরনে সেরোটোনিন ক্ষরণ শুরু হল। ধরা যাক সেই মুহূর্তে তার সেরোটোনিনের মাত্রা হল X। আবার, ২০১৪ সালে ব্যাংক কর্মকর্তাটি যখন তার নতুন বাসার দামের শেষ কিস্তিটা শোধ করল, তখন তারও সেরোটোনিনের মাত্রা দাঁড়াল X এর কাছাকাছি। অবশ্যই মাটির ঘরের চেয়ে এই দামি বাসায় থাকাটা অনেক বেশি আরামদায়ক, কিন্তু তার জন্য সেরোটোনিন নিঃসরণের কোনো হেরফের হচ্ছে না। কাজেই এই আধুনিক ব্যাংক কর্মকর্তার সুখের পরিমাণ তার কয়েক পুরুষ আগের গরিব কৃষকের চেয়ে একটুও বেশি নয়।

এই ব্যাপারটা ব্যক্তিগতভাবে যেমন সত্য, সমষ্টিগতভাবেও সেটা একই রকম সত্য। উদাহরণ হিসেবে ফরাসি বিপ্লবের কথাই ধরুন। সে সময়ে বিপ্লবীরা অনেক কিছু করেছিল। তারা রাজাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, কৃষকের হাতে জমির মালিকানা দিয়েছে, মানবাধিকার নিশ্চিত করেছে, অভিজাতদের বাড়তি সুবিধা পাওয়া বন্ধ করেছে, আর তার সাথে সারা ইউরোপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। কিন্তু এর কোনো কিছুই ফরাসিদের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলেনি। ফলে দেখা গেল এই এত বড় রাজনৈতিক, সামাজিক, আদর্শিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসার পরেও ফরাসি জাতির সুখের উপর তার প্রভাব পড়েছে সামান্যই। যারা জন্মগতভাবেই হাসিখুশি তারা বিপ্লবের আগেও যেমন সুখী ছিল পরেও তেমনই ছিল। আবার যারা এমনিতেই বিষণ্ণ ধরনের তারা বিপ্লবের আগে রাজা ষোড়শ লুই ও রাণী আঁতোয়ানেতকে (Marie Antoinette) নিয়ে অভিযোগ করত, বিপ্লবের পরে তারা রোবেস্পিয়ের (Robespierre) আর নেপোলিয়নের নামে বিষোদগার করতে থাকল।

যদি তাই হয়, তাহলে ফরাসি বিপ্লবে লাভটা কী হল? মানুষের সুখ যদি আগের চেয়ে একটুও না বাড়ে, তাহলে এত বিশৃঙ্খলা, ভয়ভীতি, রক্তপাত, যুদ্ধ- এসব কেন? জীববিজ্ঞানীরা এই বিপ্লব করলে তারা কখনোই বাস্তিল (Bastille) দুর্গ আক্রমণ করতে যেত না। মানুষ ভেবেছিল এই রাজনৈতিক বিপ্লব ও সামাজিক সংস্কার তাদের আরও সুখী করবে, কিন্তু তাদের শরীরের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া বার বার তাদের ধোঁকা দিয়েছে।

তবে একটা ব্যাপারের গুরুত্ব আছে। আজ আমরা জানি, আমাদের সুখের মূলে আছে আমাদের শরীরের কিছু জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া। কাজেই এখন আমরা রাজনীতি, সমাজ-সংস্কার, সরকার-বিরোধী কিংবা নৈতিক আন্দোলন- এসবে সময় নষ্ট না করে বরং সেই জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াটাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিতে পারি। কারণ সুখের উৎসটা ওখানেই। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে আর কীভাবে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেই গবেষণায় যদি এখন থেকে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে একসময় কোনোরকম বিপ্লব ছাড়াই মানুষ এত সুখী হতে পারবে যা আগে কখনও সম্ভব হয়নি। এই যেমন প্রোজ্যাক (Prozac) নামের ওষুধটা দেশের সরকারকে গদি থেকে নামাতে পারে না, কিন্তু একজন মানুষের শরীরে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে তার বিষণ্ণতা দূর করতে পারে।

আজকাল একটা স্লোগান খুব শোনা যায়- ‘সুখের শুরুটা হয় ভিতর থেকে’ (Happiness Begins Within)। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর চেয়ে মোক্ষম স্লোগান আর হয় না। আসলেই, টাকা, সামাজিক মর্যাদা, প্লাস্টিক সার্জারি, সুন্দর বিলাসবহুল বাড়ি, ক্ষমতা- এগুলোর কোনোটাই মানুষকে সুখ এনে দিতে পারে না। স্থায়ী সুখ দিতে পারে কেবল তিনটা জিনিস- সেরোটোনিন, ডোপামিন আর অক্সিটোসিন।১

১৯৩২ এ প্রকাশিত আলডাস হাক্সলির (Aldous Huxley) কল্প-উপন্যাস ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’ এ দেখান হয়েছে, কীভাবে ভবিষ্যতের এক বিষণ্ণ সময়ে সুখ হয়ে যায় মানুষের পরমারাধ্য বস্তু, আর কীভাবে মন-নিয়ন্ত্রক ওষুধ নিয়ে নেয় পুলিশের জায়গা। সেখানে মানুষ প্রতিদিন ‘সোমা’ (Soma) নামের ওষুধের গুণে সুখে থাকে। পৃথিবীজুড়ে প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বরাজ্যে’ যুদ্ধ-বিপ্লব-ধর্মঘট কিছু নেই, কারণ সবাই যার যার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট, কারও কোনও অভিযোগ নেই। জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ নামক উপন্যাসের চেয়েও হাক্সলির দেখানো এই পৃথিবী পাঠকের কাছে বেশি ভয়ঙ্কর মনে হয়। কিন্তু কেন? এর ব্যাখ্যা দেওয়া সহজ নয়। আসলেই তো, যদি সবাই সবসময় সুখেই থাকে, তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

জীবনের অর্থ

হাক্সলির উপন্যাসে কল্পিত ভীতিকর পৃথিবীতে যেটা ধরে নেওয়া হয়েছে তা হল সুখ হচ্ছে আনন্দের অনুভূতি। সুখী হওয়া মানে হল নিখাদ শারীরিক আনন্দলাভ, আর কিছুই না। যেহেতু আমাদের শরীর দীর্ঘ সময় ধরে এই আনন্দের অনুভূতি ধরে রাখতে পারে না, তাই মানুষকে অনেক সময় ধরে সুখে রাখার জন্য শরীরের কলকব্জাগুলো একটু এদিক-সেদিক করতেই হবে।

কিন্তু সুখের এই ধারণাটা নিয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিভেদ আছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কানেম্যান (Daniel Kahneman) একবার একটা বিখ্যাত পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। এই পরীক্ষায় কিছু মানুষকে তাদের একটা কর্মদিবসের বর্ণনা দিতে বলা হয়। তাদের বলা হয় দিনের সবগুলো ঘটনা ধাপে ধাপে বর্ণনা করে সেগুলো কতটুকু ভালো বা খারাপ লেগেছে সেটা বলতে। কানেম্যান দেখলেন, এই জরিপের ফলাফল, অর্থাৎ জীবনের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে ধাঁধায় ফেলে দেয়। উদাহরণ হিসেবে শিশুপালনের কথাই ধরুন। একটা বাচ্চাকে লালনপালন করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় আনন্দদায়ক ও কষ্টদায়ক, দুরকমেরই কাজ আছে। সত্যি বলতে সেখানে কষ্টদায়ক কাজের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। শিশুপালনের বেশিরভাগ জুড়ে আছে বাচ্চার ভেজা কাঁথা বদলানো, প্রচুর থালাবাসন ধোয়া আর তাদের সব উৎপাত সহ্য করা। এর একটাও তো কোনও উপভোগ্য কাজ নয়। অথচ প্রায় সব মা-বাবাই একবাক্যে স্বীকার করবে, তাদের সন্তানই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার মানে কি এই যে, মানুষ আসলে জানেই না যে তার জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ?

এ তো গেল একটা মত। অন্য একটা পরীক্ষায় দেখা গেছে যে সুখ কেবল মানুষের আনন্দদায়ক ও কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার যোগবিয়োগের ফলাফল নয়। বরং একজন মানুষের নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ হিসেবে দেখতে পারাটাই সুখ। হ্যাঁ, সুখ কেবল জৈবিক ব্যাপার নয়। এখানে মানুষের চেতনা ও মূল্যবোধেরও একটা জায়গা আছে। সন্তানপালনকে আমরা ‘একটা স্বৈরাচারী শিশুর আজ্ঞাবহ দাস হয়ে থাকা’ হিসেবে দেখব নাকি ‘একটা নতুন জীবনকে ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তোলা’ হিসেবে দেখব, সেটা নির্ধারণ করে আমাদের মূল্যবোধ।২ নিটশে (Nietzsche) বলেছেন, বেঁচে থাকার পিছনে যদি কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে যেভাবেই হোক, বেঁচে থাকা যায়। কষ্টে ভরা জীবনও প্রচণ্ড স্বস্তিদায়ক হতে পারে, যদি সেই জীবন ধারণের পিছনে কোনও উপযুক্ত কারণ থাকে। আবার একটা অর্থহীন জীবন অনেক আরামের মাঝেও দুঃসহ হয়ে ওঠে।

পৃথিবীর সব সভ্যতা ও সব যুগের মানুষই প্রায় একই রকমের আনন্দ ও কষ্টের ভিতর দিয়ে গিয়েছে, তারপরেও জীবনের অর্থ এক এক মানুষের কাছে এক এক রকম। সেদিক থেকে দেখলে সুখ জিনিসটাকে জীববিজ্ঞানীরা যতটা সহজভাবে দেখেন আসলে তা তত সহজ নয়। আর সেটা আধুনিকতার পক্ষেও যায় না। জীবনকে একেবারে প্রতি মিনিট ধরে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মধ্যযুগের মানুষের জীবন ছিল খুবই কঠিন। তখন যারা পরকালের অনন্ত সুখের জীবনের কথা বিশ্বাস করত, তাদের কাছে নিজের জীবন যথেষ্টই অর্থপূর্ণ ছিল। তার তুলনায় এখনকার একজন নির্ধার্মিক মানুষের জীবনের শেষ পরিণতি হল অর্থহীন বিস্মৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া। ‘মোটের উপর তোমার জীবন নিয়ে কি তুমি সন্তুষ্ট?” এরকম একটা প্রশ্ন দিয়ে যদি একটা জরিপ চালানো যেত সেখানে মধ্যযুগের মানুষেরই বেশি নম্বর পাওয়ার কথা।

তার মানে কি এই যে মধ্যযুগের মানুষেরা পরকালের অলীক কল্পনার মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়ে সুখী ছিল? আসলেই তাই। যতক্ষণ এই কল্পনার বেলুন চুপসে না যাচ্ছে, ততক্ষণ এই কল্পনায় সুখী হতে বাধা কোথায়? তবে বিজ্ঞানের চোখে দেখলে মানবজীবন সম্পূর্ণ অর্থহীন। এই মানুষ নামের প্রাণী প্রজাতিটা আসলে অন্ধ ও উদ্দেশ্যহীন বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফল। আমরা যা কিছু করি তা কোনও মহাজাগতিক পরিকল্পনার অংশ নয়। কাল সকালেই যদি এই পৃথিবী নামক গ্রহটা ধ্বংস হয়ে যায়, তাতে এই মহাবিশ্বের কিছু আসবে যাবে না। বাকি সবকিছু তার নিজের মতোই চলতে থাকবে। অন্তত এটুকু বলা যায় যে মানুষের অনুপস্থিতির কোনো প্রভাব কোথাও পড়বে না। কাজেই দেখা যাচ্ছে মানুষ জীবনের অর্থ নিয়ে যত কথাই বলুক, তার সবটাই আসলে কল্পনা। জীবনের মধ্যে এইসব অপার্থিব অর্থ কেবল মধ্যযুগের মানুষই খুঁজে বের করেনি, সেটা এখনকার মানবতাবাদী, জাতীয়তাবাদী আর পুঁজিবাদী মানুষেরাও যার যার মতো করে যাচ্ছে। একজন বিজ্ঞানী ভাবে মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার আরেকটু সমৃদ্ধ করাটাই জীবনের অর্থ, সৈনিকের কাছে জীবনের অর্থ হল তার দেশকে রক্ষা করা, আবার একজন উদ্যোক্তার কাছে জীবনের মানে হল নিজের গড়া একটা প্রতিষ্ঠান। মধ্যযুগের অনেক মানুষের কাছে জীবন মানে ছিল ধর্মগ্রন্থ পড়া, ধর্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করা আর ধর্মপ্রচারের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। তাহলে তাদের সাথে এখনকার এই মানুষগুলোর পার্থক্য আর কী থাকল?

তার মানে সুখ জিনিসটা সম্ভবত শুধু ব্যক্তিগত ভালো থাকা নয়। সুখ হল সমাজে বিরাজমান সামষ্টিক কল্পনাগুলোর সাথে একজন মানুষের নিজের কল্পনাগুলো এক সুরে মিলিয়ে নেওয়া। যখন একজন মানুষের জীবনবোধ তার আশেপাশের আর দশজনের জীবনবোধের সাথে মিলে যায়, তখনই সে জীবনের অর্থ খুঁজে পায়, নিজেকে সুখী ভাবে।

তবে এই সিদ্ধান্তে আসাটা কিছুটা হতাশাজনকও। সুখ কি আসলেই কল্পনানির্ভর?

নিজেকে জানো

সুখ যদি আনন্দের অনুভূতি হয়, তাহলে সুখী হতে হলে আমাদের শরীরের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর সুখ যদি হয় জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া, তাহলে সুখী হওয়ার জন্য নিজেকে আরও ভালোভাবে ভাসিয়ে দিতে হবে কল্পনায়। এই দুটো ছাড়া সুখী হওয়ার আর কোনও উপায় কি আছে?

এই দুটো ধারণার মধ্যেই একটা জিনিস আছে। সেটা হল, এখানে ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে সুখ হল একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার, সেটা আনন্দই হোক বা জীবনের অর্থ। কাজেই একটা মানুষ সুখী কিনা তা জানতে হলে তার অনুভূতি জানতে হবে। অনেকের কাছে এটাই স্বাভাবিক মনে হবে, কারণ আমরা এখন বাস করছি একটা উদারনৈতিক সময়ে। এই উদারনৈতিক চিন্তাধারা মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির পক্ষেই যাবে। উদারনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অনুভূতিই মানুষের সব কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক। একজন মানুষের কাছে কী ভালো আর কী মন্দ, কোনটা সুন্দর আর কোনটা অসুন্দর, কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়- তার সবকিছুই সে ঠিক করে নেয় তার নিজের মতামত থেকে।

উদারনৈতিক রাজনীতির মূল কথা হল, যারা ভোট দেবে তারাই সবচেয়ে ভালো জানে, তাদেরকে ভালো-মন্দের জ্ঞান দেওয়ার জন্য কোনও কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন নেই। উদারনৈতিক অর্থনীতি বলে, ক্রেতার মতামতই শিরোধার্য, এর উপরে আর কোনও কথা নেই। উদারনৈতিক শিল্পে সৌন্দর্য জিনিসটা আপেক্ষিক, তা কেবল দর্শকের রুচির উপরেই নির্ভর করে। উদারনীতিতে চলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদেরকে নিজের মতো করে চিন্তা করতে শেখায়। বিজ্ঞাপনগুলো আমাদের বলতে চায়, ‘যা করতে ইচ্ছা হয়, করে ফেলো!’। এ যুগের চলচ্চিত্র, নাটক, উপন্যাস, গান- সবকিছুর মধ্যেই সেই একই বার্তা- ‘নিজের কাছে সৎ থাকো’, ‘নিজের মনের কথা শোনো’ কিংবা ‘মন যা চায়, তাই করো’। ফরাসি দার্শনিক জাঁ-জ্যাক রুসো তো সোজাসুজিই বলেছেন, “যেটা আমার কাছে ভালো, সেটাই ভালো, আর যা আমার কাছে খারাপ, তা-ই খারাপ”।

যে মানুষটা একেবারে শিশুকাল থেকে এসব কথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছে, তার কাছে সুখ অবশ্যই একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। একজন মানুষ সুখে আছে কি না সেটা নির্ণয় করতে পারে কেবল সে নিজেই, অন্য কেউ নয়। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল এই উদারনীতিতেই দেখা যায়। ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন ধর্ম ও আদর্শিক মতবাদ সুখের নানা রকম নৈর্ব্যক্তিক মাপকাঠি প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব মতবাদে সুখ জিনিসটা একজন ব্যক্তির নিজের মতামত বা অনুভূতির ঊর্ধ্বে বলেই মনে করা হয়। ডেলফিতে অবস্থিত অ্যাপোলোর মন্দিরের প্রবেশদ্বারেই তীর্থযাত্রীরা দেখতে পেত লেখা আছে, ‘নিজেকে জানো’। এই কথার গূঢ় অর্থ হল, গড়পড়তা একজন মানুষ তার নিজের সম্পর্কেই আসলে জানে না, তাই সুখের সন্ধানও সে আর পায় না। এই কথাটার সাথে ফ্রয়েডও সম্ভবত একমত হতেন।*

খ্রিস্টধর্মের ব্যাপারেও একই কথা খাটে। সেইন্ট পল ও সেইন্ট অগাস্টিন বিলক্ষণ জানতেন, যে বেশিরভাগ মানুষ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা ও যৌনতা- এ দুয়ের মধ্যে দ্বিতীয়টাই বেছে নেবে। তাহলে কি যৌনতাই সুখের উৎস? পল ও অগাস্টিনের উত্তর হল, না। এতে কেবল এটাই প্রমাণিত হয় যে, পাপ করাটাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, মানুষ সহজেই শয়তানের ফাঁদে পা দেয়। খ্রিস্টধর্মের চোখে বেশিরভাগ মানুষের অবস্থা আসলে হেরোইনে আসক্তদের মতো। ধরুন একজন মনোবিজ্ঞানী মাদকাসক্ত মানুষের কাছে সুখের সন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পেলেন, মানুষ কেবল মাদক গ্রহণ করলেই সুখী হয়। তাহলে কি তিনি তার গবেষণাপত্রে লিখবেন, যে হেরোইনই হল সুখের চাবিকাঠি?

অনুভূতি জিনিসটা যে সুখের কোনও নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি নয়, এ কথা কেবল খ্রিস্টানদের একার নয়। অনুভূতির প্রশ্নে ডারউইন আর ডকিন্সও হয়তো সেইন্ট পল ও সেইন্ট অগাস্টিনের সাথে একই সুরে কথা বলবেন। স্বার্থপর জিনতত্ত্ব (selfish gene theory) বলে, প্রাকৃতিক নির্বাচন অন্যান্য জীবের মতো মানুষের ক্ষেত্রেও জিনের স্বার্থই রক্ষা করে, সেটা যদি কোনও ব্যক্তির ক্ষতির কারণ হয়, তবু। অধিকাংশ পুরুষই তাদের সারা জীবন আরাম-আয়েশ না করে দুশ্চিন্তা, খাটা-খাটনি, প্রতিযোগিতা আর মারামারি করেই কাটিয়ে দেয়। কারণ তাদের ডিএনএ তার নিজের স্বার্থ রক্ষা করতেই তাকে দিয়ে এসব করিয়ে নেয়। অর্থাৎ শয়তান যেভাবে কাজ করে, ডিএনএও ঠিক সেভাবেই মানুষকে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে নিজ স্বার্থে কাজ করিয়ে নেয়।

সুখের ব্যাপারে বেশিরভাগ ধর্ম ও আদর্শের অবস্থান এই উদারনীতির চেয়ে আলাদা।৩ এগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বৌদ্ধ ধর্ম এই সুখের সন্ধানকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছে, সম্ভবত আর কোনও কিছুই সেটাকে এত গুরুত্ব দেয়নি। আড়াই হাজার বছর ধরে এই ধর্ম মানুষের সুখের কারণ ও স্বরূপ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছে। এ কারণেই বিজ্ঞানীদের মধ্যেও বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ ও এই ধর্মের বিভিন্ন রকম ধ্যানের কলাকৌশল নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।

বৌদ্ধ ধর্মের যেভাবে সুখের ব্যাখ্যা তার মূল ভাবটা অনেকটা জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মতোই। অর্থাৎ এখানেও বলা হয় যে সুখ মানুষের শরীরেই উৎপন্ন হয়, বাইরে থেকে আসে না। কিন্তু গোড়ার দিকটা একই রকম হলেও এই ধর্ম উপসংহার টেনেছে অন্যদিকে।

বৌদ্ধ ধর্মমতে মানুষ সুখ বুঝতে পারে আনন্দের অনুভূতি দিয়ে, আর দুঃখ বোঝে কষ্টের অনুভূতির মাধ্যমে। তাই মানুষ নিজের অনুভূতিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা কষ্ট এড়িয়ে আরও বেশি আনন্দ পেতে চায়। তাই আমরা যা কিছু করি- পা চুলকাই, চেয়ারে নড়েচড়ে বসি, কিংবা বিশ্বযুদ্ধই বাধাই- সবই করি আনন্দের অনুভূতি পাওয়ার জন্যই।

কিন্তু সমস্যাটা অন্যখানে। বৌদ্ধ ধর্ম বলে, মানুষের এই সুখ আর দুঃখ নিয়ত পরিবর্তনশীল, অনেকটা সাগরের ঢেউয়ের মতো, আসে আর যায়। পাঁচ মিনিট আগেও যে মানুষটা নিজেকে সুখী ভাবছিল, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছিল, পাঁচ মিনিট যেতেই সেই সুখটুকু সরে গিয়ে দুঃখ এসে তাকে গ্রাস করে। তার মানে সুখী হতে হলে তাকে সারাক্ষণ সুখের পিছনে ছুটতে হবে, আর দুঃখ থেকে পালিয়ে বেড়াতে হবে। অথচ এতে যদি সে সফলও হয়, তাতেও কোনও লাভ নেই। কারণ এই অস্থায়ী সুখটুকু ফুরিয়ে গেলেই আবার সবকিছু শুরু করতে হবে প্রথম থেকে।

তাহলে এই ক্ষণস্থায়ী সুখের পিছনে ছুটে কী লাভ? যা ধরে রাখা যায় না তাকে পাওয়ার জন্য কেন এই পণ্ডশ্রম? বৌদ্ধ ধর্ম বলে, মানুষের এই দুর্ভোগের কারণ আসলে এই দুঃখ-কষ্ট নয়। সুখ-দুঃখের এই অর্থহীনতাও নয়। বরং সুখের পিছনে এই অবিরাম অর্থহীন ছুটে বেড়ানোই দুঃখের কারণ। এতে সুখের দেখা তো মেলেই না, বরং দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও অপ্রাপ্তিতে ভরে যায় জীবন। সুখের পিছনে ছুটে কেউ কোনোদিন সন্তুষ্ট হতে পারে না। এমনকি ক্ষণস্থায়ী আনন্দের সময়ও মনের ভিতর উঁকি দিয়ে যায় দুশ্চিন্তা, কারণ এই সুখও তো এক সময় ফুরিয়ে যাবে।

ক্ষণস্থায়ী সুখ মানুষকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে না। এর থেকে মুক্তি মেলে তখনই, যখন সে বুঝতে পারে যে সুখ ক্ষণস্থায়ী, আর বুঝতে পেরে সে সুখের পিছনে ছোটা বন্ধ করে। বৌদ্ধ ধর্মে ধ্যানের উদ্দেশ্য এটাই। ধ্যানের মাধ্যমে মানুষ তার দেহ ও মনকে ভালোভাবে জানতে পারে, অনুভূতির ওঠানামা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে পায়, ফলে বুঝতে পারে এসব কতটা অর্থহীন। এভাবে সুখের সন্ধান বন্ধ করতে পারলেই মনে ধীরতা ও প্রশান্তি আসে। মনের ভিতরে সবরকম অনুভূতি আসবে যাবে- আনন্দ, ক্রোধ, হতাশা কিংবা কামনা যাই হোক- কিন্তু বিশেষ কোনও অনুভূতির জন্য তীব্র বাসনা ত্যাগ করতে পারলেই সবকিছু সহজ হয়ে যায়। কী হতে পারত সেই চিন্তা বাদ দিয়ে কী হচ্ছে সেটাই বড় হয়ে ওঠে।

এই মানসিক প্রশান্তির অনুভূতি এতটাই গভীর যে সারাজীবন সুখের পিছনে ছুটে বেড়ানো একজন মানুষ সেটা কল্পনাও করতে পারে না। ধরুন একজন মানুষ বছরের পর বছর ধরে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে ‘ভালো’ ঢেউগুলোকে ধরে রাখতে আর ‘খারাপ’ ঢেউগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইছে। তার সারাজীবন এভাবে কেটে যাবে, কিন্তু এই কাজে সে সফল হবে না কোনোদিন। অথচ সে যদি এই ব্যর্থ চেষ্টা না করে চুপচাপ বসে সবগুলো ঢেউকে আসতে-যেতে দেয়, তাহলেই তার জীবন ভরে উঠবে প্রশান্তিতে।

কিন্তু এই ধারণাটা আধুনিক পৃথিবীতে এত খাপছাড়া লাগে যে এখনকার উদারনৈতিক মানুষ এটাকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। এখনকার ধারণাটা অনেকটা এমন, “সুখ আসলে বাইরের কোনও কিছুর উপর নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে আমাদের অনুভূতির উপর। তাই মানুষের টাকা, মর্যাদা এসবের পিছনে না ছুটে তার নিজের মানসিক শান্তির দিকে নজর দেওয়া উচিত।” অথবা আরও কম কথায় বলতে গেলে “সুখ আসে ভিতর থেকে।” ঠিক এই কথাটাই জীববিজ্ঞানীরাও বলেন, কিন্তু তারা বোঝাতে চান বুদ্ধ যা বলেছেন তার উল্টোটা।

এই আধুনিক মতবাদ আর জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সাথে বুদ্ধের বাণীর মিল শুধু এইটুকুই। কিন্তু আসল জায়গাটাতেই, অর্থাৎ অনুভূতির ব্যাপারে অমিল আছে। বুদ্ধ বলেন যে সুখ আসলে আমাদের ভিতরের অনুভূতির উপরেও নির্ভর করে না। আসলেই, আমরা যতই আমাদের অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দিই, ততই আমাদের মধ্যে ভালো অনুভূতির চাহিদা তৈরি হয়, আর তাতে আমাদের দুর্ভোগই শুধু বাড়ে। তাই বুদ্ধের পরামর্শ হল, বাহ্যিক অর্জনের সাথে সাথে ভিতরের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াও বন্ধ করতে হবে।

‘ভালো থাকা’ বিষয়ক প্রশ্নে জরিপ চালালে একজন মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি, ব্যক্তিগত সুখ ও আবেগের খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে বৌদ্ধধর্মের মতো কিছু কিছু ধর্ম ও দর্শন বলে, এসব আবেগ-অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে একজন মানুষের নিজেকে পুরোপুরি জানতে পারা, চিনতে পারার মাধ্যমেই মিলবে প্রকৃত সুখের সন্ধান। বেশিরভাগ মানুষই যে ভুলটা করে তা হল, তারা নিজের অনুভূতি, নিজের চিন্তা, পছন্দ-অপছন্দ- এসবের মাঝে নিজের পরিচয় খোঁজে। এর ফলে সারা জীবন ধরে তারা কিছু অনুভূতির পিছু তাড়া করে, আর কিছু অনুভূতি থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। এসব অনুভূতির কারাগারে আটকে থাকা এই মানুষগুলো কখনও বুঝতেই পারে না, যে সুখ আর দুঃখ নয়, বরং এই ছুটে চলা আর পালানোর মনোবৃত্তিই তাদের কখনও মুক্তি দেয় না।

যদি তাই হয়, তাহলে বলা যায় যে সুখের ব্যাপারে আমরা যা যা জেনেছি তার সবই ভুল। একজন মানুষের ইচ্ছাগুলো পূরণ হচ্ছে কি না, বা সে আনন্দ পাচ্ছে কি না- হয়তো সেসবের তেমন কোনও গুরুত্বই নেই। আসল প্রশ্ন হল মানুষ নিজের সম্পর্কে সত্যটা জানতে পারছে কি না। যদি এদিক থেকেই চিন্তা করি, তাহলে সেই আদিম শিকারি-সংগ্রাহক মানুষ বা মধ্যযুগের কৃষকদের চেয়ে আমরা এই সত্যটা কতটুকু বেশি জানতে পেরেছি?

সুখের ইতিবৃত্ত নিয়ে জোরেশোরে গবেষণা শুরু হয়েছে অল্প কয়েক বছর হল। প্রাথমিক কিছু ধারণা তৈরি হচ্ছে, গবেষণা কীভাবে হবে সেসব কর্মপদ্ধতি যাচাই করে দেখা হচ্ছে। কাজেই এখনই এ ব্যাপারে কোনও জোরালো দাবি করা যাচ্ছে না। বরং এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যতভাবে সম্ভব কাজ চালিয়ে যাওয়া ও সঠিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

ইতিহাসের অধিকাংশ জুড়েই আছে বড় বড় মনীষীদের আদর্শের কথা, বীর যোদ্ধাদের সাহসের কথা, ধার্মিক সন্ন্যাসীদের ত্যাগের কথা আর গুণী শিল্পীদের সৃজনশীলতার কথা। ইতিহাস থেকে জানা যায় কীভাবে সমাজ গড়ে ওঠে, কীভাবে তা আবার ভেঙে পড়ে, কীভাবে বড় বড় সব রাজ্য তৈরি হয়ে আবার একদিন ধ্বংস হয়ে যায়, কীভাবে নতুন নতুন আবিষ্কার হয়, কীভাবে নতুন প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। অথচ ক্ষুদ্র ব্যক্তিমানুষের সুখ-দুঃখের কথাগুলোর সেখানে ঠাঁই হয় না। সেখানে রয়ে গেছে বিশাল এক শূন্যস্থান। সেই শূন্যস্থান পূরণ করার এখনই সময়।


* বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক জরিপের উদ্দেশ্য মানুষের সুখ পরিমাপ করা হলেও মনোচিকিৎসার কেন্দ্রীয় বিষয় হল মানুষকে নিজেকে জানতে ও তাদের নিজেদের ক্ষতি করার মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করা।


1 For both the psychology and biochemistry of happiness, the following are good starting points: Jonathan Haidt, The Happiness Hypothesis: Finding Modern Truth in Ancient Wisdom (New York: Basic Books, 2006); R. Wright, The Moral Animal: Evolutionary Psychology and Everyday Life (New York: Vintage Books, 1994); M. Csikszentmihalyi, ‘If We Are So Rich, Why Aren’t We Happy?’, American Psychologist 54:10 (1999): 821–7; F. A. Huppert, N. Baylis and B. Keverne (eds.), The Science of Well-Being (Oxford: Oxford University Press, 2005); Michael Argyle, The Psychology of Happiness, 2nd edition (New York: Routledge, 2001); Ed Diener (ed.), Assessing Well-Being: The Collected Works of Ed Diener (New York: Springer, 2009); Michael Eid and Randy J. Larsen (eds.), The Science of Subjective Well-Being (New York: Guilford Press, 2008); Richard A. Easterlin (ed.), Happiness in Economics (Cheltenham: Edward Elgar Publishing, 2002); Richard Layard, Happiness: Lessons from a New Science (New York: Penguin, 2005).

2 Daniel Kahneman, Thinking, Fast and Slow (New York: Farrar, Straus and Giroux, 2011); Inglehart et al., ‘Development, Freedom and Rising Happiness’, 278–81.

3 D. M. McMahon, The Pursuit of Happiness: A History from the Greeks to the Present (London: Allen Lane, 2006).

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s