শেষ কথা

 

যে প্রাণীটি ঈশ্বর হয়ে উঠলো

সত্তর হাজার বছর আগেও মানুষ ছিল প্রাণিজগতের আর দশটা প্রাণীর মত সাধারণ একটি প্রাণী। তাদের বিচরণও সীমাবদ্ধ ছিল কেবল আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যেই। পরবর্তী সময়টুকুতে মানুষ হয়ে উঠেছে সমস্ত পৃথিবীর শাসক এবং তাবৎ পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানের জন্য হুমকিস্বরূপ। আজ মানুষ নিজেই ঈশ্বর হয়ে ওঠার দ্বারপ্রান্তে, চিরজাগ্রত তারুণ্যকে সে কেবল গ্রাসই করতে চাইছে না, সৃষ্টি এবং ধ্বংসের মত স্বর্গীয় ক্ষমতাগুলোকেও নিজের আয়ত্তে আনবার জন্য সে বদ্ধপরিকর।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, পৃথিবীতে এতদিন রাজত্ব করেও মানুষ খুব একটা বেশি কিছু করতে পারেনি যা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। পুরো সময়টা জুড়ে মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে পেরেছে, বাড়িয়েছে খাদ্যের উৎপাদন, নির্মাণ করেছে নগর-সাম্রাজ্য এবং বিশাল, বিস্তৃত ব্যবসায়িক ক্ষেত্র। কিন্তু, এতসব কাজ কি পৃথিবীতে ব্যক্তি মানুষের দুঃখ-কষ্ট-অশান্তির নিরসন ঘটাতে পেরেছে? ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে, মানুষের অর্জিত বিপুল ক্ষমতা মানুষের জন্য নিয়ে এসেছে কান্না-হাহাকার-ধ্বংসযজ্ঞ। মানুষের নিজের মানসিকতার উন্নতি তো তেমন হয়ই নি, বরং মানুষের কারণে অন্যান্য প্রাণীর জীবন ক্রমাগত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

অবশেষে, গত কয়েক দশকে আমরা এমন কিছু কাজ করতে পেরেছি যেগুলোকে মানবজাতির কল্যাণকর অবদান হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দুর্ভিক্ষ নিরসন, মহামারী নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধের হার কমিয়ে আনা এগুলোর মাঝে অন্যতম। কিন্তু এসবের পাশাপাশি অন্য যে কোনো সময়ের থেকে বর্তমান সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীর অবস্থা অধিকতর শোচনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। মানবতা, উদারতার যেসব মহৎ বুলি আমরা চারপাশে সম্প্রতি শুনতে শুরু করেছি সেসব নিতান্তই নতুন এবং ভবিষ্যতে কতদিন সেসব আমরা শুনতে পারব সে ব্যাপারেও আমরা সন্দিহান।

তার উপর, বর্তমানের মানুষের বিস্ময়কর কাজকর্ম করার ক্ষমতা থাকলেও, আমরা ঠিক জানি না আমাদের লক্ষ্য কী এবং দিনকে দিন আমরা ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি।  আমরা ডিঙি নৌকা থেকে অগ্রসর হয়ে বানিয়েছি বাষ্পচালিত জাহাজ, নির্মাণ করেছি অত্যাধুনিক মহাশূন্যযান – কিন্তু কেউ জানে না মানবজাতির গন্তব্য কী। অন্য যে কোন সময়ের থেকে মানুষ আজ অনেক বেশি ক্ষমতাধর, কিন্তু এতসব ক্ষমতা দিয়ে তার কী করা উচিত সে সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই বললেই চলে। এর চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হল, আজকের মানুষ আগের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বজ্ঞানহীন। আজকে মানুষ নিজেই নিজের ঈশ্বর, তাকে সঙ্গ দেবার জন্য আছে কেবল পদার্থবিজ্ঞানের কিছু সূত্র, কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুন, এছাড়া সে আজ আর কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। আর একটু বেশি সুখ, আর একটু বেশি আমোদের জন্য আমরা আমাদের আশেপাশের প্রাণীকুলের জীবন ও পরিবেশের প্রতি ক্রমাগত হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছি। এতকিছুর পরেও কিন্তু আমরা তৃপ্ত নই, সন্তুষ্ট নই। আমরা অতৃপ্ত, অশান্ত।

একটি পৃথিবীজোড়া অনেকগুলো প্রচণ্ড ক্ষমতাবান, অতৃপ্ত এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন ঈশ্বর যারা নিজেরাই জানে না তারা কী চায়, তাদের চাওয়ার শেষ কোথায় – এর থেকে মারাত্মক পরিস্থিতি আর কী হতে পারে?

 

২০. সেপিয়েন্সের শেষের শুরু

 

পদার্থবিজ্ঞান থেকে রসায়ন, তারপর জীববিজ্ঞান এবং এর উত্তরসূরী হিসেবে মানুষের ইতিহাসকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই বইটির সূচনা। আর সব জীবিত সত্তার মত মানুষের জীবনও নিয়ন্ত্রণ করে একই প্রাকৃতিক শক্তি, রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন পদ্ধতি। প্রাকৃতিক নির্বাচন হয়তো মানুষকে অন্যান্য সকল প্রাণীর থেকে বৃহত্তর ক্ষেত্রে বিচরণের সুযোগ করে দিয়েছে কিন্তু সে বিচরণের সীমারেখাও কিন্তু অসীম নয়। যার কারণে, অনেক চেষ্টা এবং অসংখ্য অর্জন সত্ত্বেও মানুষ এতদিনেও তার শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারেনি।

অবশ্য, আজ একবিংশ শতকের শুরুতে এসে মানুষ তার শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের এতদিনের নিয়ন্ত্রণহীন নকশাকে ভেঙে মানুষ তার বুদ্ধি দিয়ে তৈরি করছে বিবর্তনের নতুন নকশা।

প্রায় চারশ’ কোটি বছর ধরে, পৃথিবীর প্রত্যেকটি প্রাণের বিবর্তন ঘটেছে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ এর মাধ্যমে। বুদ্ধিমান স্রষ্টার তৈরি করা কোনো নকশাই প্রাকৃতিক বিবর্তনের এই নিয়মকে সরিয়ে দিতে পারেনি। জিরাফের পূর্বপুরুষদেরকে উঁচু ডাল থেকে খাবার পেড়ে খাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করতে হতো বলেই আজকের জিরাফের গলা এত লম্বা, কোনো বুদ্ধিমান সত্ত্বার খামখেয়ালি নকশার কারণে নয়। জিরাফের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যাদের গলা লম্বা ছিল তারা অন্যদের তুলনায় বেশি খাবার সংগ্রহ করতে পারত। ফলশ্রুতিতে, তাদের সন্তান জন্ম দেবার এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দেয়ার সুযােগও ছিল বেশি। জিরাফ তো নয়ই, অন্য কোন বুদ্ধিমান সত্ত্বাও নিশ্চয়ই কখনও বলেনি, ‘ইস, জিরাফের গলাটা অনেকখানি লম্বা করে দিলে বেচারা গাছের মগডাল থেকে পাতাগুলো আরামে চিবিয়ে খেতে পারত। দিই ওর গলাটা লম্বা করে।’ ডারউইনের তত্ত্বের সৌন্দর্যটা হলো, জিরাফের লম্বা গলার কারণ ব্যাখ্যা করার জন্য তাকে কোন বুদ্ধিমান নকশার কথা কল্পনা করতে হয় না।

কোটি কোটি বছর ধরে, মানুষের কাছে কোনো বুদ্ধিমান নকশার অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, এমন কোনো বুদ্ধিমত্তারই সন্ধান পাওয়া যায়নি যার পক্ষে প্রতিটি বস্তু ও প্রাণীর স্বরূপের নকশা তৈরি করা সম্ভব। কিছুদিন আগে পর্যন্তও পৃথিবীতে টিকে থাকা একমাত্র জীবিত বস্তু অণুজীবদের কথাই ধরা যাক। টিকে থাকার জন্য এদেরও আছে কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির শরীরে বসবাস করা একটি অণুজীব সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির একটি প্রাণীর জিনগত বৈশিষ্ট্য তার কোষের ভেতর আত্মীকরণ করতে পারে এবং অর্জন করতে পারে নতুন ক্ষমতা। নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা অণুজীবের এই নতুন ধরনের ক্ষমতা তৈরির একটি উদাহরণ। কিন্তু, এত অসাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও আমরা যতদূর জানি, অণুজীবের কোনো নিজস্ব চিন্তা-চেতনা নেই, নেই জীবনের কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য বা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করার কোনো ক্ষমতা।

একটা সময়ে এসে জিরাফ, ডলফিন, শিম্পাঞ্জি এবং নিয়ান্ডার্থালের মত প্রাণীগুলো বিবর্তনের মাধ্যমে চিন্তা-ভাবনা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা করার ক্ষমতা অর্জন করলো। কিন্তু, সেকালের একজন নিয়ান্ডার্থাল ক্ষুধা পেলে হাত বাড়িয়ে ধরা যায় এরকম কোন নাদুস-নুদুস, ধীরগতির মুরগির কথা কল্পনা করতে পারলেও, এই কল্পনাকে বাস্তবায়ন করা তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তাকে ক্ষুধা নিবারণের জন্য প্রাকৃতিকভাবে বিবর্তিত হওয়া বন্য পাখি শিকারের উপরই নির্ভর করতে হতো।

আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে, কৃষি বিপ্লবের সময় থেকে প্রকৃতির উপর মানুষের এই অসহায় নির্ভরশীল অবস্থার পরিবর্তনের সূচনা হলো। যেসব মানুষেরা এতদিন নাদুস-নুদুস, ধীরগতির মুরগির কথা কল্পনা করত, তারা আবিষ্কার করল যে, যদি তারা সবচেয়ে মোটাসোটা মুরগিটার সাথে সবচেয়ে অলস, ধীরগতির মুরগিটির প্রজনন ঘটায়, তাহলে তাদের উৎপাদিত সন্তানের একই সাথে মোটা এবং অলস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এইভাবে উৎপন্ন বাচ্চাগুলো বড় হবার পর যদি তাদের নিজেদের মাঝে প্রজনন ঘটানো যায়, তাহলে আরও অনেক মোটাসোটা, অলস পাখির জন্ম হওয়া সম্ভব। এইভাবে জন্ম নিল মুরগির এমন এক নতুন প্রজাতি, প্রাকৃতিক বিবর্তন যাকে তৈরি করেনি, যার জন্ম হয়েছে একটি বুদ্ধিমান প্রাণীর তৈরি করা নকশা থেকে। এই বুদ্ধিমান সত্তাটি কোনো দেবতা বা ঈশ্বর নন, এই প্রাণীটির নাম মানুষ।

কিন্তু, এত কিছু সত্ত্বেও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের তুলনায় নতুন প্রজাতির জীবের নকশা তৈরিতে মানুষের এই ক্ষমতা ছিল খুবই নগণ্য। মানুষ মুরগির প্রজননকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বড়জোর কিছু বৈশিষ্ট্যকে বাড়তে না দিয়ে এবং কিছু বৈশিষ্ট্যকে বাড়ার সুযোগ দিয়ে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারত। কিন্তু মুরগির জিনে অনুপস্থিত কোনো বৈশিষ্ট্যকে মুরগির মাঝে আনা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল। অন্যভাবে বলতে গেলে জীবজগতে মানুষ ও মুরগির মাঝের এই সম্পর্ক, জীবজগতে আগে থেকে বিদ্যমান আরও কিছু সম্পর্কের থেকে খুব বেশি আলাদা কিছু ছিল না। মৌমাছি যেমন পরাগায়নের জন্য উজ্জ্বল ও রঙিন ফুলগুলোকেই বেছে নিয়ে তাদের বংশবিস্তারে সাহায্য করে, ঠিক তেমনি মানুষও মুরগির প্রজনন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে বেশি বেশি মোটাসোটা ও অলস মুরগির জন্ম নিশ্চিত করেছে।

৪০০ কোটি বছর ধরে টিকে থাকা প্রাকৃতিক বিবর্তনের আধিপত্য আজ সম্পূর্ণ নতুন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি। দুনিয়াজুড়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারেই তৈরি করছেন জীবন্ত প্রাণী। তারা অপ্রতিরোধ্য গতিতে, দক্ষতার সাথে প্রাকৃতিক বিবর্তনের এতদিনের নিয়ম কানুনকে ভেঙেচুরে প্রাণীর বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে জন্ম দিচ্ছেন সম্পূর্ণ নতুন বৈশিষ্ট্যের। এডুয়ার্ডো কাক (Eduardo Kac) নামের একজন জীবকৌশল শিল্পী ২০০০ সালে একটি নতুন শিল্পকর্ম তৈরির পরিকল্পনা করলেন। সেটি হলো- অন্ধকারে ফ্লোরোসেন্ট বাতির মত করে জ্বলা একটি সবুজ জীবন্ত খরগোশ। এরপর, কাক একটি ফরাসি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করলেন এবং উপযুক্ত সম্মানীর বিনিময়ে তার পরিকল্পনা মাফিক খরগোশ তৈরির জন্য ফরমাশ দিলেন। সেখানকার বিজ্ঞানীরা একটি সাধারণ সাদা খরগোশের ভ্রুণ নির্বাচন করলেন, তারপর তার ডিএনএতে সবুজ রঙের আলোজ্বলা জেলিফিসের জিন সংযোগ করলেন। ম্যাজিক! জনাব কাক, এই নিন আপনার কাঙ্ক্ষিত আলোজ্বলা খরগোশ! কাক খরগোশটির নাম রাখলেন ‘অ্যালবা’।

প্রাকৃতিক বিবর্তনের নিয়মকানুন দিয়ে ‘অ্যালবা’র মতো খরগোশের অস্তিত্ব প্রমাণ করা একেবারেই অসম্ভব। সে মানুষের বুদ্ধিমান নকশার ফসল। একই সাথে, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে বুদ্ধিমান নকশা দিয়ে তৈরি যেসব অগণিত প্রাণীর জন্ম হবে, অ্যালবা তাদেরই অগ্রদূত। যদি ‘অ্যালবা’র মত নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাণীর গুরুত্ব পরিপূর্ণরূপে অনুধাবন করা সম্ভব হয় এবং তার আগেই যদি মানবজাতি পৃথিবীর বুক থেকে নিজেদেরকে নিশ্চিহ্ন করে না ফেলে, তাহলে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব কেবল আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও অনেক বিস্তৃতি লাভ করবে। এটি হতে পারে পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাবের পর থেকে ঘটা সবচেয়ে বড় জীববৈজ্ঞানিক বিপ্লব। প্রাকৃতিক বিবর্তনের চারশ কোটি বছর পরে, ‘অ্যালবা’ একটি নতুন মহাজাগতিক যুগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যে যুগে জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে বুদ্ধিমান নকশা। যদি সত্যিই সে যুগের সূচনা হয়, তবে তার আগেকার পৃথিবীর সমস্ত ইতিহাসকেই মনে হতে পারে পৃথিবীতে নানারকম জীবন ভাঙা-গড়ার একটা খেলামাত্র। মহাজাগতিক গণ্ডিতে যেখানে এরকম একটি প্রক্রিয়া বুঝতে কোটি কোটি বছর লেগে যায়, যেখানে মানুষ মাত্র কয়েক হাজার বছরে সে রহস্যের কিনারা করে ফেলবে।

তবে এই ‘বুদ্ধিমান নকশা’ (intelligent design) তত্ত্ব পৃথিবীজুড়ে জীববিজ্ঞানীদের রোষের শিকার হচ্ছে। কারণ একদিকে এই তত্ত্ব ডারউইনের প্রচলিত প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের বিরোধী, অন্যদিকে এই তত্ত্ব আসলে এটাই প্রমাণ করতে চায় যে, এই সব জটিল জৈবিক নকশা আসলে কোনো এক বুদ্ধিমান স্রষ্টার পূর্বপরিকল্পনারই ফল। হ্যাঁ, এতদিন পর্যন্ত যা যা ঘটেছে সেসবের ক্ষেত্রে জীববিজ্ঞানীদের কথাই ঠিক। কিন্তু এই বুদ্ধিমান নকশা নিয়ে মানুষের কাজ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এই নতুন তত্ত্বকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

পৃথিবীজুড়ে জীববিজ্ঞানীরা ‘ইনটেলিজেন্ট ডিজাইন’ তত্ত্বের বিরোধিতায় মত্ত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীর জীবজগতের অন্তহীন বৈচিত্র্য এবং জটিলতা ইঙ্গিত দেয় যে, এসব সৃষ্টির পেছনে একজন মহান বুদ্ধিমান স্রষ্টার হাত আছে, তার নকশাতেই এসব তৈরি হয়েছে। এই ধারণা ডারউইনের ‘প্রাকৃতিক বিবর্তন’ তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিরোধী। ‘ইনটেলিজেন্ট ডিজাইন’ এর বিপরীতে বিজ্ঞানীদের এই ধারণা হয়ত এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে বিকাশ লাভ করা জীবকুলের জন্য প্রযোজ্য, কিন্তু হয়ত আগামীর পৃথিবীতে উদ্ভব হওয়া জীবকুলের পেছনে থাকবে কোন বুদ্ধিমান প্রাণীর নকশা। তখন, সে সময়ের জীবকুলের জন্য ‘ইনটেলিজেন্ট ডিজাইন’ তত্ত্ব মেনে নেয়া ছাড়া তাদের কোন উপায় থাকবে না।

এখন পর্যন্ত, ‘বুদ্ধিমান নকশা’ তিনভাবে ‘প্রাকৃতিক বিবর্তন’কে প্রতিস্থাপন করতে পারে- জীববৈজ্ঞানিক প্রকৌশল এর ব্যবহারের মাধ্যমে, সাইবর্গ (সাইবর্গ হলো জৈব ও অজৈব অংশ জোড়া দিয়ে তৈরি সত্তা) তৈরির মাধ্যমে বা যান্ত্রিক জীব তৈরির মাধ্যমে।

ইঁদুর ও মানুষ

জীববৈজ্ঞানিক প্রকৌশল হলো মানুষের সচেতন তৎপরতার মাধ্যমে কোন জীবকে কাকের শিল্পকর্মের মতো কোন নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ধারণা উপলব্ধি করার উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জীবটির কোন জৈবিক পরিবর্তন ঘটিয়ে (যেমন একটি নতুন জিন প্রবেশ করিয়ে) তার আকার, আকৃতি, সক্ষমতা, চাহিদা কিংবা বাসনা বদলে দেবার একটি পদ্ধতি।

অবশ্য জীববৈজ্ঞানিক প্রকৌশল নতুন কোনো বিষয় নয়। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ নিজের এবং অন্যান্য জীবকুলের পরিবর্তন সাধন করার জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। নপুংসক করে দেওয়ার ঘটনাটি এ ব্যাপারে একটি সহজ উদাহরণ হতে পারে। মানুষ প্রায় দশ হাজার বছর ধরে এঁড়ে গরু তৈরির জন্য ষাঁড়কে খোজা করে আসছে। এঁড়ে গরু ষাঁড়ের থেকে অপেক্ষাকৃত শান্ত ও স্থির, তাই তাকে দিয়ে মাঠের লাঙ্গল টানানো সহজ। এমনকি উচ্চগ্রামের সুকণ্ঠী গায়ক কিংবা রাজা-বাদশাহের হারেম বা অন্তঃপুর পাহারা দেওয়ার জন্য মানুষ অনেককাল আগে থেকেই নিজ প্রজাতির তরুণ ছেলেদেরও খোজা করে আসছে।

কিন্তু, জীবের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে অর্জিত সাম্প্রতিক জ্ঞান বর্তমানের মানুষের জন্য এমন নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে যা আগের দিনের মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। মানুষ কাজে লাগাচ্ছে কোষীয় এমনকি নিউক্লিয়ার পর্যায়ে জীবের শারীরতত্ত্বের খুঁটিনাটি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আজকের দিনের মানুষ কেবল অন্য মানুষকে নপুংসক বানাতে পারে তাই নয়, বরং চাইলে তার অস্ত্রোপচার এবং হরমোন চিকিৎসার মাধ্যমে তার লিঙ্গগত পরিচয়ই পাল্টে দিতে পারে। এখানেই কিন্তু গল্পের শেষ নয়। ভেবে দেখুন, ১৯৯৬ সালের টেলিভিশন ও পত্রিকায় নিচের ছবিটি প্রকাশিত হলে পৃথিবীর মানুষের মাঝে সেটা কতখানি বিস্ময়, বিরক্তি এবং উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল।

image069.jpg

৪৬। বিজ্ঞানীরা গরুর তরুণাস্থির কোষ দিয়ে একটি ইঁদুরের পিঠে একটি কান তৈরি করেছেন। এটা যেন বহুকাল আগে স্ট্যাডেল গুহায় তৈরি সিংহ-মানবের মূর্তির বাস্তব রূপ। ত্রিশ হাজার বছর আগে মানুষ নানারকম জীবের অঙ্গপ্রতঙ্গের মিশেল ঘটিয়ে নতুন জীব তৈরির কথা কেবল কল্পনাতেই ভাবতে পারত। আজ, মানুষ বাস্তব জগতেই তৈরি করতে পারে সুকুমারের হাঁসজারুকে।

এই ছবিটি কিন্তু চাঁদের মাঝে সাঈদীর ছবির মতো করে ফটোশপে তৈরি করা হয়নি। এটা একটা পুরোপুরি অবিকৃত আসল ইঁদুরের ছবি, যার পিঠে বিজ্ঞানীরা গরুর কার্টিলেজ কোষ স্থাপন করেছিলেন। বিজ্ঞানীরা এই কোষগুলো থেকে উৎপন্ন কলার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন এবং তাকে গড়ে তুলেছেন মানুষের কানের আকারে। এই প্রক্রিয়া হয়তো শিগগিরই বিজ্ঞানীদেরকে কৃত্রিম জৈবিক কান তৈরিতে সহায়তা করবে যা হয়তো অচিরেই স্থাপন করা হবে আমাদের শরীরে।১

এমনকি, জিনগত প্রকৌশলকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে এর চেয়েও অনেক বেশি আশ্চর্যজনক, অসংখ্য যুগান্তকারী আবিষ্কার করা সম্ভব। সে কারণেই, বিজ্ঞানের এ শাখাটি নীতিগত, রাজনৈতিক এবং আদর্শিক দিক থেকে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য প্রশ্নের। শুধু যে একেশ্বরবাদী, ধর্মপরায়ণ মানুষরাই একে ‘খোদার উপর খোদকারি’ ভাবছেন এমনটা নয়। অনেক স্বীকৃত নাস্তিক ব্যক্তিরাও একে আশঙ্কার চোখে দেখছেন। এসব ব্যাপারকে তারা দেখছেন প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মের উপর বিজ্ঞানীদের হস্তক্ষেপ হিসেবে। প্রাণী অধিকার নিয়ে সোচ্চার কর্মীরা এসব গবেষণার জন্য ব্যবহৃত প্রাণীদের উপর চালানো কষ্টকর, অমানবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন, প্রাণীদের স্বাভাবিক ইচ্ছা ও চাহিদাকে অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র উৎপাদন বাড়ানোর জন্য খামারে তাদের লালনপালনের পদ্ধতি নিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তারা। মানবাধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন জিনগত প্রকৌশলের উন্নতি একদিন তৈরি করবে ‘সুপারম্যান’, তখন বাকি মানুষদের ‘দাস’ হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। জেরেমিয়ানরা জৈব-একনায়কের কথা কল্পনা করছেন যারা তৈরি করতে পারবে একই রকমের অসংখ্য ভয়হীন যোদ্ধা এবং অনুগত কর্মী। মানুষের ধ্বংস তখন অবধারিত হয়ে পড়বে। মানুষের সমষ্টিগত সাধারণ ধারণা হলো, হুট করে জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন নতুন জীব তৈরি বা পরিবর্তন করার ক্ষমতা মানুষের যতটা বেড়েছে, এই ক্ষমতাকে সঠিকভাবে ব্যবহারের জ্ঞান এবং এর ভবিষ্যত প্রভাব সম্পর্কে সঠিকভাবে ধারণা করার ক্ষমতা মানুষের ততটা বাড়েনি।

ফলশ্রুতিতে, জিনগত প্রকৌশলের অপার সম্ভাবনার কণামাত্রই আমরা বর্তমানে ব্যবহার করতে পারছি। মূলত উদ্ভিদ, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং পোকামাকড়ের মত রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বহীন জীবগুলোকেই বর্তমানে এ প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের অন্ত্রে বসবাসকারী ই-কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়ার কথা কথা ধরা যাক। অতীতে ই-কোলাই এর সংক্রমণে অনেক নানারকম রোগ-ব্যাধি দেখা গেলেও বর্তমানে এর জিনগত রূপান্তরের মাধ্যমে জৈব জ্বালানী তৈরিতে একে ব্যবহার করা হচ্ছে।২ ই-কোলাই এবং ছত্রাকের কিছু জাতকে রূপান্তরের মাধ্যমে ইনসুলিন তৈরি উপযোগী করে তোলা গেছে।৩ যার ফলে কমানো সম্ভব হয়েছে ডায়াবেটিস চিকিৎসার খরচ। মেরু অঞ্চলের মাছের একটি জিনকে আলুর জিনে সংযুক্ত করার ফলে সম্ভব হচ্ছে শীত সহিষ্ণু আলুর জাতের উদ্ভাবন।৪

এছাড়া কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীকে এই জিনগত প্রকৌশলের আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিবছর ম্যাসটাইটিস (mastitis) নামের একটি রোগের কারণে গবাদিপশু শিল্পের কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়। ম্যাসটাইটিস রোগটি দুধ প্রদানকারী গাভীর ওলানের রোগ। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে রূপান্তরিত জিনের গরুদের নিয়ে গবেষণা করছেন যাদের দুধে থাকবে লাইসোস্ট্যাফিন (lysostaphin), একটি জৈব রাসায়নিক যা ম্যাসটাইটিস রোগের জন্য জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করতে পারে।৫ ইদানীং সবাই শুকরের মাংসে থাকা অস্বাস্থ্যকর চর্বির ব্যাপারে সচেতন হওয়ায় শুকরের মাংসের ব্যবসায়ীরা বিপদে আছেন। তাদের জন্য সুখবর হলো, বিজ্ঞানীরা বর্তমানে একটি পরজীবী পোকা থেকে নেয়া জিন শুকরের শরীরে স্থাপন করে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। পরীক্ষা সফল হলে এই নতুন জিন শুকরের মাংসের ক্ষতিকর ওমেগা ৬ ফ্যাটি এসিডকে তার উপকারী জ্ঞাতিভাই ওমেগা ৩ এ রূপান্তরিত করতে পারবে।৬ আর মানুষের শুকরের মাংস খাওয়া নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা থাকবে না।

জিনগত প্রকৌশলের পরবর্তী প্রজন্মে উপকারী চর্বি সম্বলিত শুকর তৈরির ব্যাপারটি ছেলেখেলা হয়ে দাঁড়াবে। জিন বিজ্ঞানীরা কেবল যে পরজীবীদের গড় আয়ু ছয় গুণ বাড়িয়েছেন তাই নয়, তারা চৌকস ইঁদুর তৈরিতেও সক্ষম হয়েছেন যাদের স্মৃতিশক্তি এবং শেখার ক্ষমতা সাধারণ ইঁদুরের থেকে অনেক বেশি। নেংটি ইঁদুর হলো ছোট লেজ ওয়ালা, নাদুস-নুদুস ইঁদুরের একটি প্রকরণ এবং এদের বেশির ভাগ প্রজাতিরই যৌনতার ক্ষেত্রে কোন বাছবিচার নেই।৭ কিন্তু বিজ্ঞানীরা নেংটি ইঁদুরের এমন একটি প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন যারা বিপরীত লিঙ্গের মাত্র একজনের সাথে দীর্ঘস্থায়ী এবং বিশ্বস্ত যৌন সম্পর্ক বজায় রাখে। বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন তারা ইঁদুরের এই একজনের সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য দায়ী জিনকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। একটি স্বেচ্ছাচারী, বহুগামী নেংটি ইঁদুরের শরীরে এই জিনটি সংযুক্ত করা হলে সে যদি একটি একগামী, স্ত্রী অনুরক্ত নেংটি ইঁদুরে পরিণত হয়, তখন ‘জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে কেবল ইঁদুর ও মানুষ নতুন শারীরিক বৈশিষ্ট্যই অর্জন করে না বরং এর মাধ্যমে তাদের সামাজিক কাঠামোও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব’ এমনটা দাবি করাটা কি খুব বেশি অসংগত হবে?৮

ফিরে আসবে নিয়ান্ডার্থাল

কিন্তু জীনবিজ্ঞানীরা কেবল জীবিত প্রাণীকুলের পরিবর্তন সাধন করতে চান এমনটা নয়। তারা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীদেরও উদ্ধারের চেষ্টা করেন। জুরাসিক পার্ক সিনেমার ডাইনোসরই যে উদ্ধার তালিকার একমাত্র সদস্য এমনটা নয়। রাশিয়া, জাপান ও কোরিয়ার বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি সাইবেরিয়ার বরফে জমে থাকা একটি প্রাচীন ম্যামথের জিনের সম্পূর্ণ গঠন জানতে পেরেছেন। বর্তমানে তারা আজকের দিনের একটি হাতির নিষিক্ত ডিম্বাণু নিয়ে, তার মধ্যে হাতির ডিএনএ কে নতুন তৈরি ম্যামথের ডিএনএ এ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চাচ্ছেন। এরপর এই প্রতিস্থাপিত ডিএনএ এর ডিম্বাণুকে তারা হাতির গর্ভে স্থাপন করবেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২২ মাস পর গত ৫০০০ বছরের মধ্যে প্রথম ম্যামথের জন্ম হবে পৃথিবীতে।৯

কিন্তু, মানুষ কেবল ম্যামথেই সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জর্জ চার্চ সম্প্রতি প্রস্তাব করেছেন, নিয়ান্ডার্থাল জিনোম প্রজেক্ট যেহেতু সম্পন্ন হয়েছে, আমরা এখন চাইলেই ম্যামথের মত একটি নবগঠিত নিয়ান্ডার্থাল ডিএনএ সংযুক্ত একটি ডিম্বাণু মানুষের গর্ভাশয়ে স্থাপন করতে পারি। আর এটা করতে পারলে গত ত্রিশ হাজার বছরের মধ্যে পৃথিবী প্রথমবারের মত একটি নিয়ান্ডার্থাল শিশুর মুখ দেখবে। চার্চ দাবি করেছেন মাত্র ত্রিশ মিলিয়ন ডলার পেলেই তিনি এই কাজের দায়িত্ব নিতে রাজি আছেন। কয়েকজন নারীও এই কাজের জন্য স্বেচ্ছায়, বিনা পারিশ্রমিকে তাদের গর্ভাশয় ব্যবহারের সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন।১০

কিন্তু এতদিন পর নিয়ান্ডার্থাল দিয়ে আমরা কী করব? অনেকে দাবি করেন, আমরা যদি সত্যিকারের, জীবিত নিয়ান্ডার্থাল নিয়ে গবেষণা করতে পারি তবে হোমো সেপিয়েন্সের স্বাতন্ত্র্য বা অসাধারণত্ব নিয়ে বহু বছর ধরে চলে আসা অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্তর আমরা দিতে পারব। একটি নিয়ান্ডার্থালের সাথে একটি হোমো সেপিয়েন্সের মস্তিষ্কের তুলনা করে আমরা হয়তো বুঝতে পারব কোন জৈবিক প্রক্রিয়া আমাদের অনুভূতি, চেতনা এসবের জন্য দায়ী। এবং এখানে একটি নৈতিক দায়বদ্ধতারও ব্যাপার আছে। অনেকেই দাবি করেন হোমো সেপিয়েন্স তথা আমরাই নিয়ান্ডার্থালদের বিলুপ্তির জন্য দায়ী। সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে তাদের নতুন করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও আমাদের উপরই বর্তায়। আজকের মানুষের সমাজে নিয়ান্ডার্থাল অন্যভাবেও সহায়ক হতে পারে। অনেক শিল্পপতিই তাদের কারখানায় নিয়ান্ডার্থালদের নিতে চাইবেন। কারণ, তারা হয়তো একজন নিয়ান্ডার্থালকে বেতন দেয়ার মাধ্যমে তাকে দিয়ে দুইজন সেপিয়েন্সের সমান কাজ করিয়ে নিতে পারবেন।

কিন্তু শুধু নিয়ান্ডার্থালেই থেমে থাকলে চলবে কেনো? এরপর কী আমরা চাইব না ঈশ্বরের বানানো মানুষের নকশা তৈরির খেরোখাতায় হাত রাখতে আর সেই নকশার উন্নতি ঘটিয়ে উন্নততর সেপিয়েন্স তৈরি করতে? মানুষের সবরকম সামর্থ্য, চাহিদা এবং কামনার একটি জিনগত ভিত্তি বিদ্যমান এবং মানুষের জিনগত পরিচয় নেংটি ইঁদুরের থেকে খুব বেশি জটিল নয়। ইঁদুরের জিনোমে ২৫০ কোটি নিউক্লিওবেস থাকে, যেখানে মানুষের জিনোমে থাকে ২৯০ কোটি বেস, তার মানে মানুষের জিনভিত্তিক পরিচিতির তালিকা ইঁদুরের জিনভিত্তিক পরিচয়ের থেকে মাত্র ১৪ শতাংশ বড়।১১ বর্তমান শতকের মাঝামাঝি সময়ের দিকে অর্থাৎ আর মাত্র কয়েক দশক পরে জিনগত প্রকৌশল এবং জৈব প্রকৌশলের অন্যান্য শাখাগুলো কেবল যে আমাদের মনস্তত্ত্ব, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং প্রত্যাশিত আয়ু বাড়ানোর ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করবে তাই নয়, মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক এবং আবেগিক দক্ষতার পরিবর্তনেও এদের থাকবে উল্লেখযোগ্য অবদান। জিনগত প্রকৌশল যদি চৌকস ইঁদুর তৈরি করতে পারে তবে চৌকস মানুষ তৈরিতে বাধা কোথায়? আমরা যদি একজন সঙ্গীতে সন্তুষ্ট নেংটি ইঁদুর তৈরি করতে পারি, তবে একজন মানুষও তার একগামিতা নিশ্চিত করতে জিনগত পরিবর্তনের এই সুযোগ নেবে না কেনো?

বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লব হোমো সেপিয়ন্সের মনস্তত্ত্ব কিংবা মস্তিষ্কের বাহ্যিক আকার আকৃতির কোনোরকম দৃশ্যমান পরিবর্তন ছাড়াই সেপিয়েন্সের মত একটি গুরুত্বহীন নরবানর প্রজাতিকে পৃথিবীর প্রভুতে পরিণত করেছে। প্রকৃতপক্ষে, এই বিশাল পটপরিবর্তনের জন্য মস্তিষ্কের কাঠামোর কিছু অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনই যথেষ্ট ছিল। এরকম আরেকটি ছোটখাটো পরিবর্তনই হয়তো একটি নতুন বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের সূচনা করবে, তৈরি করবে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের বুদ্ধিমত্তা বা চেতনা, আর হোমো সেপিয়েন্স নামক প্রজাতিটির খোলনলচে পুরোপুরি পালটে দিয়ে তৈরি করবে ভিন্ন ধরনের কোন প্রজাতি।

একথা সত্য, এইসব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধিভিত্তিক উৎকর্ষ আমরা এখনও অর্জন করতে পারিনি, কিন্তু ভবিষ্যতের ‘অতিমানব’ তৈরির পথে আমাদের সামনে দুর্লঙ্ঘ্য কোন প্রযুক্তিগত বাধাও দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। মূলত দার্শনিক এবং রাজনৈতিক যুক্তি-তর্ক এবং বাধাগুলোই মানুষকে নিয়ে গবেষণার গতিকে খানিকটা মন্থর করেছে। এ সংক্রান্ত দার্শনিক দাবিগুলো যতই যুক্তিসঙ্গত হোক, মানুষের সামনে যদি দীর্ঘতর জীবন, জীবনঘাতী রোগের চিকিৎসা এবং তার বুদ্ধিভিত্তিক এবং আবেগিক দক্ষতা বৃদ্ধির মূলা ঝোলানো থাকে, তবে এসব দার্শনিক বাধা মানুষ নিয়ে গবেষণাকে খুব বেশি বিলম্বিত করতে পারবে বলে মনে হয় না।

কী ঘটবে যদি আমরা যদি স্মৃতিভ্রষ্টতাজনিত অসুখ আলঝেইমার এর চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এমন কিছু আবিষ্কার করে ফেলি যা সুস্থ মানুষকে অসাধারণ স্মৃতিশক্তি দিতে পারে ? মানুষের পক্ষে কি তখন এই সংক্রান্ত গবেষণা স্থগিত রাখা সম্ভব হবে? একবার যদি এই চিকিৎসা আবিষ্কার হয়েই যায়, তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কি পারবে সুস্থ একজন মানুষকে এই চিকিৎসা নিয়ে অতিমানবীয় স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়া থেকে বিরত রেখে কেবল আলঝেইমার রোগীদের মাঝেই তার ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে?

জৈব-প্রকৌশল সত্যিই পৃথিবীর বুকে আবার নিয়ান্ডার্থালদের ফিরিয়ে আনতে পারবে কিনা সে ব্যাপারটি এখনও অনেকটাই অস্পষ্ট, তবে এটি খুব সম্ভবত পৃথিবীতে হোমো সেপিয়েন্সের নাট্যমঞ্চের যবনিকা টেনে দেবে। না, হোমো সেপিয়েন্সের জিনগত পরিবর্তন যে তার দৈহিক মৃত্যু ঘটাবে এমনটা নয়। কিন্তু, জিন পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা হয়তো হোমো সেপিয়েন্সকে এতটাই পাল্টে ফেলবো যে তখন আমাদেরকে হোমো সেপিয়েন্স বলে ডাকাটা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।

যান্ত্রিক জীবন

আরেকটি নতুন প্রযুক্তি জীবনের প্রচলিত নিয়মকানুনকে পাল্টে দিতে পারে, সেটা হলো- সাইবর্গ প্রকৌশল (cyborg engineering)। সাইবর্গ হলো মানুষ এবং যন্ত্রের মিশেলে গড়া একপ্রকার প্রাণী, যেমন ধরুন কৃত্রিম হাতওয়ালা মানুষ। আজকের দিনে আমরা সকলেই কমবেশি চশমা, কৃত্রিম হৃদযন্ত্র, পা সোজা রাখার যন্ত্র এমনকি কম্পিউটার আর মোবাইলের সাহায্যে (শেষের দুটি আমাদের মস্তিষ্কের উপর থেকে বাড়তি কাজের বোঝা কমায়) আমাদের ইন্দ্রিয়ের কাজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়েছি বা ইন্দ্রিয়গুলোর উপর চাপ কমিয়েছি। সে অর্থে আমরাও কমবেশি বায়োনিক (bionic) মানুষ। আমরা এখন সাইবর্গে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি, যখন অজৈব অংশগুলো আমাদের শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে এবং বদলে দেবে আমাদের কর্মক্ষমতা, ইচ্ছা, ব্যক্তিত্ব এবং স্বকীয় পরিচয়।

“ডিফেন্স এ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (DARPA)” নামে একটি আমেরিকান গবেষণা সংস্থা কীটপতঙ্গকে সাইবর্গ বানানোর চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য হলো মাছি বা তেলাপোকার শরীরে ইলেকট্রনিক চিপ, সনাক্তকারী যন্ত্র এবং প্রসেসর বসানো যার মাধ্যমে মানুষ বা কোন যন্ত্রচালিত অপারেটরের পক্ষে দূর থেকে এসব কীটপতঙ্গের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে এবং পতঙ্গগুলোকে তথ্য সংগ্রহ এবং সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এরকম একটি মাছি সহজেই শত্রুঘাঁটির হেডকোয়ার্টারের দেয়ালে বসে শত্রুদের গোপন পরিকল্পনার কথা শুনে ফেলতে পারবে এবং মাকড়সা বা অন্য কোন পতঙ্গ মাছিটিকে খেয়ে না ফেললে সেসব তথ্য সহজেই প্রতিপক্ষের শিবিরে সরবরাহ করতে পারবে।১২ ২০০৬ সালে আমেরিকার “নেভাল আন্ডার সি ওয়ারফেয়ার সেন্টার (NUWC)” সাইবর্গ হাঙর তৈরির ঘোষণায় জানায়- ‘NUWC মাছের মাথায় প্রতিস্থাপনের জন্য একটি ট্যাগ বা যন্ত্র বানাচ্ছে যার কাজ হবে মাছের মস্তিষ্কের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা।’ এ প্রকল্পের উদ্যোক্তারা মনে করেন, এর মাধ্যমে তারা হাঙরের প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত চৌম্বকক্ষেত্র সনাক্ত করার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সাগরের তলদেশে সাবমেরিন এবং চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বোমা সনাক্ত করতে সক্ষম হবেন। হাঙরের এই সনাক্তকরণ ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে সেটা মানুষ নির্মিত যে কোন সনাক্তকারী যন্ত্রের থেকে অনেক ভালো ফলাফল দেবে।১৩

সেপিয়েন্স নিজেও ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে সাইবর্গে। কানে শোনার সহায়ক যন্ত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক গুলোকে অনেক সময় ‘বায়োনিক কান’ নামে অভিহিত করা হয়। এই যন্ত্রগুলো কানের সাথে যুক্ত করা হলে তারা কানের বর্হিভাগ থেকে একটি মাইক্রোফোনের সাহায্যে শব্দ শোনে। তারপর যন্ত্রটি শব্দকে ছেঁকে এর থেকে মানুষের শব্দকে সনাক্ত করে এবং সেই শব্দকে তড়িৎ সংকেতে রূপান্তরিত করে সরাসরি মানুষের কেন্দ্রীয় শব্দবাহী স্নায়ুতে পাঠিয়ে দেয়, সেখান থেকে এই সংকেত সরাসরি পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে।১৪

“রেটিনা ইমপ্ল্যান্ট” নামে সরকারি অনুদানে চলা একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান চোখে বসানোর জন্য একটি কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করছে যেটি অন্ধ মানুষকে আংশিক দৃষ্টি দিতে সহায়তা করবে। দৃষ্টিহীন মানুষের চোখের ভিতরে বসানো হবে একটি ছোট মাইক্রোচিপ। এই মাইক্রোচিপে বসানো আলোক সংবেদী কোষ চোখের উপর পড়া আলোকে পরিণত করবে বৈদ্যুতিক সংকেতে, যেটি উদ্দীপিত করবে চোখের রেটিনার সাথে সংযুক্ত স্নাযু কোষগুলোকে। এসব কোষে তৈরি হওয়া উদ্দীপনা উদ্দীপিত করবে মস্তিষ্ককে এবং সেখানে এই সংকেতগুলো দৃশ্যানুভূতিতে পরিণত হবে। বর্তমানে এই প্রযুক্তি একজন অন্ধ ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে তার নিজের অবস্থান সনাক্ত করতে, অক্ষর চিনতে এমনকি মানুষের মুখ সনাক্ত করতেও সাহায্য করে।১৫

২০০১ সালে জেস সুলিভান নামের একজন আমেরিকান বিদ্যুৎকর্মী এক দুর্ঘটনায় তার দুটি হাতই হারান। বর্তমানে তিনি শিকাগোর পুর্নবাসন কেন্দ্রের সুবাদে দুটি কৃত্রিম হাত ব্যবহার করেন। জেসের ব্যবহার করা কৃত্রিম হাত দুটোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো কেবলমাত্র মস্তিষ্কের চিন্তা দিয়েই সেগুলোকে ব্যবহার করা যায়। জেসের মস্তিষ্ক থেকে আসা স্নায়বিক সংকেতগুলো মাইক্রো-কম্পিউটারের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিণত হয় এবং সে সংকেতের উপর নির্ভর করেই কৃত্রিম হাত দুটো নড়াচড়া করে। একজন সাধারণ মানুষ একটি হাত ওঠানোর সময় অবচেতন মনে যেরকম ভাবেন, জেসও একই রকম চিন্তা করেন এবং তার হাতটি উপরে উঠে যায়। এই কৃত্রিম হাত দুটির কাজের ক্ষমতা জৈবিক হাতের তুলনায় অনেক কম, কিন্তু তা দিয়েই জেসের দৈনন্দিন জীবনের কাজ চলে যায়। এরকমই একটি বায়োনিক হাত সম্প্রতি ক্লডিয়া মিশেল নামক একজন আমেরিকান সৈনিকের শরীরে সংযুক্ত করা হয়েছে যিনি একটি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় তার হাত হারিয়েছিলেন। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, খুব শীঘ্রই কৃত্রিম হাত শুধু মানুষের ইচ্ছামতো নড়াচড়া করতে পারবে তাই নয়, কৃত্রিম হাত মস্তিষ্কেও সংকেত পৌছে দিতে পারবে। তার অর্থ হলো, এটি হাত-পা হারানো একটি মানুষকে কেবল চলতেই সাহায্য করবে না, তাকে ফিরিয়ে দেবে স্পর্শের স্বাদ!১৬

tmr-prosthetic.jpg

৪৭। জেস সালিভান এবং ক্লডিয়া মিশেল পরস্পরের হাত ধরে আছে। তাদের এই যান্ত্রিক হাতের বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হল, এটা পরিচালিত হয় শুধুমাত্র চিন্তা দিয়ে।

বর্তমানে এসব বায়োনিক হাত-পায়ের ক্ষমতা আমাদের স্বাভাবিক জৈবিক হাত-পায়ের তুলনায় নগণ্য, কিন্তু এই ক্ষমতার উন্নতির সম্ভাবনা অসীম। উদাহরণস্বরূপ, একটি বায়োনিক হাতকে এত বেশি শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব যে একজন নামজাদা কুস্তিগীরের হাতের শক্তিও তার কাছে অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে হবে। এছাড়াও বায়োনিক হাতের সুবিধা হলো, কয়েক বছর পরপরই এগুলো পাল্টানো যায়, শরীর থেকে খুলে রেখে দূর থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

সাম্প্রতিককালে নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারটিকে একটি বানরের মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড বসিয়ে হাতে কলমে দেখিয়েছেন। ইলেকট্রোডগুলো বানরের মস্তিষ্ক থেকে সংকেত সংগ্রহ করে অন্য যন্ত্রে পাঠিয়ে দেয়। বানরগুলোকে চিন্তার মাধ্যমে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন, বায়োনিক হাত এবং পা নাড়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অরোরা নামে এরকম একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বানর একই সময়ে তার দুটি জৈবিক হাত নড়ানোর পাশাপাশি চিন্তা দিয়ে দূরে রাখা আরেকটি বায়োনিক হাত নাড়া শিখে ফেলে। অনেকটা হিন্দু দেবদেবীর মতোই অরোরার এখন দুটো নয়, তিনটি হাত এবং তৃতীয় হাতটি থাকতে পারে অন্য কোন ঘরে, এমনকি অন্য কোন শহরেও। সে নর্থ ক্যারোলিনার গবেষণাগারে বসে একহাতে পিঠ এবং অন্য হাতে মাথা চুলকাতে চুলকাতে একই সময়ে তৃতীয় হাত দিয়ে নিউইয়র্কে কলা চুরি করতে পারে (যদিও দূরের হাতের এই চুরি করা কলা দূর থেকেই খাবার প্রক্রিয়াটি এখনও মানুষের স্বপ্নই রয়ে গেছে)। ২০০৮ সালে ইডো য়ানামের এরকম আরেকটি বানর নর্থ ক্যারোলিনার চেয়ার বসে জাপানের, কিয়োটেতে রাখা বায়োনিক পা নাড়ানোর মাধ্যমে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি অর্জন করে। এই বায়োনিক পা গুলোর ওজন ছিল ইডোয়ার শরীরের ওজনের প্রায় বিশ গুণ।১৭

“লকড-ইন সিনড্রোম” (Locked-in syndrome) হলো এমন একটি অবস্থা যখন মানুষের মস্তিষ্ক কর্মক্ষম থাকলেও মানুষ তাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়ানোর সবরকম বা প্রায় সব ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে। এখন পর্যন্ত এই সিনড্রোমে ভোগা রোগীরা কেবলমাত্র চোখের মণির সামান্য নড়াচড়ার মাধ্যমেই বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছেন। এরকম কিছু রোগীর মস্তিষ্কে সংকেত সংগ্রাহক ইলেকট্রোড বসিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। চেষ্টা করা হয়েছে মস্তিষ্কের সংকেতকে কেবলমাত্র যান্ত্রিক হাতের মত বাহ্যিক বস্তুর নড়াচড়ার মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে শব্দেও রূপ দেয়ার। এরকম প্রচেষ্টা সফল হলে, লকড-ইন সিনড্রোমের রোগীরা সরাসরি বাইরের দুনিয়ার সাথে কথা বলতে পারবেন এবং তখন আমরা মানুষের মনের কথা পড়ে ফেলার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারব।১৮

এই ধরনের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৈপ্লবিক হলো মস্তিষ্ক আর কম্পিউটারের মধ্যে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদান পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টা। এই পদ্ধতির ফলে কম্পিউটার সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কের সংকেত বুঝতে সক্ষম হবে এবং কম্পিউটার নিজে মানুষের মস্তিষ্কে বোধগম্য সংকেত পাঠাতে পারবে। এরকম একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে যদি সরাসরি একটি মস্তিষ্ককে ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত করা যায় তাহলে ব্যাপারটা কেমন হবে? এ সংযোগ পদ্ধতি দিয়ে যদি একাধিক মস্তিষ্ককে সরাসরি যুক্ত করে একটি মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক গঠন করা হয়, কেমন হবে সেটা? যদি একটি মস্তিষ্ক একাধিক মস্তিষ্কের স্মৃতিভাণ্ডারের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে তখন একক মানুষের স্মৃতি, তার চেতনা আর অস্তিত্বকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব? এরকম একটি পরিস্থিতিতে একজন সাইবর্গ কোনোদিনও না শুনে, না পড়ে, কল্পনা না করে অন্যের মস্তিষ্কে জমা রাখা একটি ঘটনাকে মনে করতে পারবেন এবং সেই ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে তার নিজের স্মৃতি বলেই মনে হবে। মস্তিস্কগুলো একসাথে সরাসরি যুক্ত থাকলে মানুষের লিঙ্গগত পরিচয়ের রূপটাই বা কেমন দাঁড়াবে? ‘আমি’ বলতে তখন কী বোঝাবে? একজন মানুষের একান্ত স্বতন্ত্র অস্তিত্ব কি থাকবে? মানুষ কী করে তার স্বপ্নের পেছনে দৌড়াবে যদি সেই স্বপ্ন তার মস্তিষ্কের অংশ না হয়ে সমষ্টিগত মস্তিষ্কের স্মৃতিতে জমা স্বপ্নভাণ্ডারের অংশ হয়?

এরকম একটি সাইবর্গ আর মানুষ থাকবে না, সম্ভবত সেটা জৈবিক উপাদানে গড়াও হবে না। এটা হবে সম্পূর্ণ নতুন কিছু। এটা মূলগতভাবেই সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সত্তা হবে যার দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক বা রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে আমাদের কোন রকম ধারণা নেই।

অন্য জীবন

জীবনের নিয়মগুলোকে পাল্টানোর তৃতীয় উপায় হতে পারে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক সত্ত্বা তৈরি করা। সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হতে পারে নিজেরাই স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হতে পারে এমন কিছু কম্পিউটার প্রোগ্রাম এবং ভাইরাস।

বর্তমানে কম্পিউটার বিজ্ঞানের জগতের একটি অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হলো জেনেটিক প্রোগ্রামিং (genetic programming)। এই শাখাটি জীবের জীনগত বিবর্তনের নিয়মগুলিকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। অনেক প্রোগ্রামারই এমন একটি প্রোগ্রাম তৈরির স্বপ্ন দেখেন যেটি তার স্রষ্টার সাহায্য ছাড়াই নতুন নতুন জিনিস নিজে থেকে শিখতে পারবে এবং নিজে বিবর্তিত হতে পারবে। এক্ষেত্রে প্রোগ্রামার কেবল প্রোগ্রামটিকে প্রাথমিকভাবে চলার মত দিকনির্দেশনা দেবেন, কিন্তু এরপরে প্রোগ্রামটি নিজেকে কোন উপায়ে বিবর্তিত করবে সে সম্পর্কে তার স্রষ্টার বা অন্য কোনো মানুষের কোন ধারণা থাকবে না।

এরকম এক ধরনের প্রোগ্রামের নমুনার সাথে আমরা ইতোমধ্যেই কমবেশি পরিচিত- এদের নাম কম্পিউটার ভাইরাস। এরকম নামকরণের কারণ হলো, উৎপত্তির পর এটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, নিজের কোটি কোটি অনুলিপি তৈরি করে, তাকে ধরার জন্য ধেয়ে আসা অ্যান্টিভাইরাস প্রোগ্রামগুলোর সাথে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করে এবং অন্যান্য ভাইরাসগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করে সাইবার জগতে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। একদিন এই ভাইরাস প্রোগ্রামটি নিজের অনুলিপি তৈরির সময় একটু গরমিল করে ফেলে- অনেকটা জৈব মিউটেশনের মতো। এই মিউটেশন সম্ভবত এই কারণে হয় যে প্রোগ্রামার এটিকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যাতে একটি মাঝে মাঝে দৈবচয়নে অনুলিপি তৈরির সময় কিছু ভুলচুক করে ফেলে। সম্ভবত এই মিউটেশন কোন অনিয়মিত, দৈবভাবে ঘটা কোন ভুলের ফসল। যদি এই বিবর্তিত ভাইরাসটি তার কম্পিউটারকে দখল করার ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে আক্রমণকারী অ্যান্টিভাইরাসকে প্রতিহত করতে অধিকতর সক্ষম হয়, তাহলে সেই বিবর্তিত ভাইরাসটি সমস্ত সাইবার জগত জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিবর্তিত ভাইরাসটি টিকে যায় এবং নতুন নতুন অনুলিপি তৈরি করতে থাকে। সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে ভাইরাসের বিবর্তন প্রক্রিয়াটিও চলতে থাকে এবং একসময় সাইবার জগৎ এমন চরিত্রের ভাইরাসে ভরে যায় যাকে কোন প্রোগ্রামার বানায়নি, যার জন্ম সম্ভব হয়েছে ভাইরাসের অজৈব বিবর্তনের ফলে।

এগুলোকে কী জীবন্ত সত্তা বলা যায়? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে কাকে আমরা ‘জীবন্ত সত্তা’ বলে সংজ্ঞায়িত করতে পারি তার উপর। তবে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তারা একটি নতুন বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফসল, যে বিবর্তন প্রক্রিয়া জৈব বিবর্তনের নিয়ম কানুন এবং সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত।

আরেকটি সম্ভাবনার কথা চিন্তা করা যাক। ধরুন, আপনি আপনার মস্তিষ্কের যাবতীয় তথ্য ও স্মৃতি একটি বহনযোগ্য হার্ড ডিস্কে জমা করতে পারেন এবং আপনার ল্যাপটপে সেই চিন্তা ও তথ্যগুলো ব্যবহার করতে পারেন। আপনার ল্যাপটপটি কী তখন একটি সেপিয়েন্সের মতই ভাবতে এবং অনুভব করতে পারবে? যদি পারে, সেটি কি আপনি হবেন না অন্য কেউ? কেমন হবে যদি কম্পিউটার প্রোগ্রামাররা প্রোগ্রামিং এর মাধ্যমে আত্নপরিচয়, চেতনা এবং স্মৃতি সম্বলিত একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল মন বানিয়ে ফেলে? আপনি যখন এই প্রোগ্রামটি আপনার কম্পিউটারে চালাবেন, তখন সেটি কি একটি নতুন মানুষ? আপনি যদি প্রোগ্রামটিকে কম্পিউটার থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলেন, আপনাকে কি মানবহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হবে?

হয়তো আমরা খুব শিগগিরই এসব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাব। ২০০৫ সালে “হিউম্যান ব্রেইন প্রজেক্ট” নামে একটি প্রকল্পের সূচনা হয়। এই প্রকল্প কম্পিউটারের ভেতর একটি পূর্ণাঙ্গ মানব মস্তিষ্ক তৈরি করার আশাবাদ নিয়ে শুরু হয়েছে। যেখানে কম্পিউটারের ভিতরকার ইলেকট্রিক সার্কিটগুলো মানব মস্তিষ্কের নিউরনের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। এই প্রকল্পের পরিচালক দাবি করেছেন, যদি যথাযথ অর্থায়ন পাওয়া যায় তবে এক থেকে দুই দশকের মধ্যে কম্পিউটারের ভেতরে মানব মস্তিষ্কের সমকক্ষ একটি মস্তিষ্ক তৈরি করা সম্ভব যেটি একটি মানুষের মতই কথা বলতে এবং আচরণ করতে পারবে। এই প্রকল্প সফল হলে, চারশ কোটি বছর পর জীবন জৈব যৌগসমূহের সীমাবদ্ধ জগৎ ছাড়িয়ে অজৈব যৌগের অসীম জগতে প্রবেশ করবে। জীবন এমন সব আকার ও আকৃতিতে আবির্ভূত হবে যার কল্পনা করাও বর্তমানের মানুষের পক্ষে অসম্ভব। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, বর্তমানের ডিজিটাল কম্পিউটার এবং মানুষের মস্তিষ্ক ও চিন্তা ভিন্নরকম ভাবে কাজ করে। সেটা সত্যি হলে বর্তমান প্রযুক্তির কম্পিউটার দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানব মস্তিষ্ক গড়ে তোলা হয়তো সম্ভব হবে না। তবে সে চেষ্টা শেষ হবার আগে পর্যন্ত এ সংক্রান্ত ঢালাও মন্তব্য করাটা বোকামির সামিল হতে পারে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার, ২০১৩ সালে এই প্রকল্পটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে ১০০ কোটি ইউরো অনুদান লাভ করেছে।১৯

সিংগুলারিটি

বর্তমানে, ভবিষ্যতের অসংখ্য সম্ভাবনার একটি ক্ষুদ্র অংশ সম্পর্কেই কেবল আমরা ধারণা করতে পারছি। কিন্তু তাতেই, এই ২০১৪ সালে এসে, মানুষের সংস্কৃতিকে জীববিজ্ঞানের গণ্ডি ছাড়িয়ে নতুন পথের সন্ধান করতে হচ্ছে। মানুষ কেবল চারপাশের পৃথিবী নয়, বাহিরের পৃথিবী ছাড়িয়ে নিজেদের শরীর ও মনের ভিতর ও বাহির পালটে দেয়ার ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। ফলশ্রুতিতে জ্ঞানের অনেক শাখা আর প্রচলিত নিয়ম কানুনই এখন নতুন নতুন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। আইনজীবীদের নতুন করে পরিচয় এবং গোপনীয়তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে, সরকারকে গোড়া থেকে ভাবতে হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা আর সম অধিকার নিয়ে, খেলার নিরপেক্ষতা এবং অর্জনকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হচ্ছে ক্রীড়া সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে, অবসর ভাতা এবং শ্রমবাজারের আগে যে বয়স ছিল ষাট, এখন তাকে ত্রিশের সমান হিসেবে ভাবতে হচ্ছে। তাদের সবাইকে নীতি নির্ধারণের সময় জৈব প্রকৌশল, সাইবর্গ এবং অজৈব জীবনের মত ব্যাপারগুলোকে মাথায় রাখতে হচ্ছে।

মানুষের প্রথম জিনোম নকশা তৈরি করতে সময় লেগেছিল পনের বছর, আর খরচ হয়েছিল ৩০০ কোটি ডলার। আজকে মাত্র কয়েকশ ডলার খরচ করে মাত্র কয়েক সপ্তাহে আপনি আপনার জিনের নকশা জেনে নিতে পারেন। শুরু হয়েছে ব্যক্তিগত ওষুধপত্রের যুগ- এমন ওষুধ যা কেবল আপনার ডিএনএর সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। অচিরেই আপনার পারিবারিক চিকিৎসক অনেকটা নিশ্চয়তার সাথেই আপনাকে জানিয়ে দিতে পারবেন ভবিষ্যতে আপনার যকৃৎ ক্যান্সারের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে, হৃদরোগ নিয়ে আপনার তেমন না ভাবলেও চলবে, সেটার সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি নির্ণয় করতে পারবেন যে ওষুধটি শতকরা ৯২ জনের জন্য কাজ করে, সেটি আপনার জন্য কার্যকর হবে না। অপরদিকে, যে ওষুধটি অন্যদের জন্য বিষতুল্য, সেটাও আপনার জন্য যর্থার্থ রূপে কাজ করবে। নিখুঁত ওষুধপত্রের দিন আমাদের সামনেই কড়া নাড়ছে।

কিন্তু, স্বাস্থ্যক্ষেত্রের এতসব উন্নতি অনেক নৈতিক প্রশ্নেরও জন্ম দিচ্ছে। ন্যায়শাস্ত্রবিদ এবং আইনবিদদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে ডিএনএ’র সাথে জড়িত ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি নিয়ে। মানুষের ডিএনএ নকশা জানা সহজলভ্য হওয়ায় জীবনবীমা কোম্পানিগুলো কি সবার কাছে থেকে তাদের ডিএনএর নকশা দাবি করবেন? যার জিনে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের সম্ভাবনা বেশি পাওয়া যাবে তার থেকে বেশি পরিমাণ বীমার অর্থ দাবি করবে? চাকরিপ্রার্থীদেরকে কি চাকরির আবেদনপত্রের বদলে ডিএনএর নকশা ফ্যাক্স করে পাঠাতে হবে? একজন চাকরিদাতা কি জিনের নকশা দেখে উপযুক্ত প্রার্থী বাছাই করবেন? কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের ক্ষেত্রে জিনগত বৈষম্যের জন্য কি অভিযুক্ত করা যাবে? যে প্রতিষ্ঠানটি নতুন জীব বা নতুন কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আবিষ্কার করবে, সে কি তার ডিএনএ নকশার পেটেন্ট করতে পারবে? এটা স্পষ্ট যে, একজন মানুষ একটি মুরগির মালিক হতেই পারে, কিন্তু একজন মানুষের হাতে একটি পুরো প্রজাতির মালিকানা তুলে দেয়া উচিত হবে কি?

এই ধরনের অনিশ্চয়তাগুলো গিলগামেশ প্রকল্পের (Gilgamesh Project) নৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব এবং আমাদের অতিমানব তৈরি করার নতুন সক্ষমতার সম্ভাবনার কাছে স্তিমিত হয়ে আছে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা, সারা বিশ্ব জুড়ে বিদ্যমান সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্প, জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প এবং বিশ্বব্যাপী জাতিগুলোর সংবিধান স্বীকার করে নেয় যে, যথাযথ স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া এবং জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা একটি মানবীয় সমাজের আবশ্যক বৈশিষ্ট্য। যতক্ষণ পর্যন্ত ওষুধগুলো কেবল রোগ প্রতিরোধ এবং অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করার কাজে ব্যবহৃত হত, ততদিন পর্যন্ত এ ব্যবস্থা নিয়ে কারও মনে কোনো সংশয় ছিল না। যখন ওষুধগুলো মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সাহায্য করবে তখন কেমন হবে একটি দেশের স্বাস্থ্য প্রকল্প? সব মানুষকে কি সমান সুবিধা নিয়ে সমানভাবে তাদের ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা হবে, নাকি কেবল ক্ষমতাবানরা এসবের সুবিধা একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করে এক একজন অতিমানব হয়ে উঠবে?

আধুনিক যুগের শেষভাগে এসে ইতিহাসে প্রথমবারের মত আমরা সব মানুষের জন্য কিছুটা হলেও সমতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারার জন্য গর্ববোধ করতে শুরু করেছি। যদিও এই সময়েই তৈরি হয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অসমতা তৈরির সুযোগ। ইতিহাসের পুরোটা সময় জুড়ে অভিজাত শ্রেণীর লোকজন নিজেদেরকে সমাজের নীচু স্তরে বসবাসকারী মানুষদের থেকে শক্তিশালী, চতুর এবং উৎকৃষ্ট বলে দাবি করে এসেছে। তাদের এই দাবি নিছক তাদের ক্ষমতার দম্ভ ছিল, তার কোন জীববৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। কৃষকের ঘরে জন্মানো একজন শিশু এবং রাজপ্রাসাদে জন্ম নেয়া একজন শিশুর সমান বুদ্ধিমান হয়ে জন্ম নেয়ার সুযোগ ছিল। স্বাস্থ্যসেবার নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ফলে ধনিক শ্রেণীর এতদিনের এই মিথ্যে অহংকার বস্তুগত সত্যে রূপ নেয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এটা কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়। অনেক কল্পবিজ্ঞানের গল্পেই আমরা দেখতে পাই এমন একটি বিশ্বকে যেখানে হুবহু আমাদের মত দেখতে মানুষ থাকে, কিন্তু তাদের থাকে উন্নততর প্রযুক্তি, আলোর বেগে চলা মহাকাশযান আর লেজার বন্দুক। এসব গল্পের মূল নীতিগত এবং রাজনৈতিক সংকটের দিকগুলো কিন্তু আমাদের বর্তমান পৃথিবী থেকেই নেওয়া, লেখক কেবল ভবিষ্যতের কল্পিত পটভূমিতে আবেগ এবং সামাজিক উত্তেজনার মাধ্যমে সেটাকে উপস্থাপন করেন। যদিও ভবিষ্যতের প্রযুক্তির প্রধান উৎকর্ষ কেবল গাড়ি, মহাকাশযান বা যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে নয়, বরং তার আসল উৎকর্ষ খোদ মানবপ্রজাতিকে, তাদের আবেগ এবং ইচ্ছার প্রকৃতিকেই পাল্টে দেবার মাঝে নিহিত। একটা চিরতরুণ সাইবর্গ, যাকে সন্তান উৎপাদন করতে হয় না এবং যাদের পৃথক পৃথক যৌন পরিচয় নেই, যে সরাসরি অন্য সাইবর্গের সাথে যোগাযোগ করতে পারে এবং যার মনোনিবেশ করার এবং তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা মানুষের চেয়ে হাজার গুণ বেশি এবং যে কখনও রাগ ও দুঃখ বোধ করে না, কিন্তু যার আছে আমাদের কল্পনার অতীত আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা, তার তুলনায় একটা অত্যাধুনিক মহাকাশযানের গুরুত্বও নিতান্ত নগণ্য নয় কি?

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীগুলো আমাদের এ ধরনের ভবিষ্যতের গল্প শোনায় না। কারণ, সংজ্ঞানুযায়ীই এ ধরনের ভবিষ্যতের একটি সঠিক বর্ণনাও হবে মানুষের বোধের অতীত। নিয়ান্ডার্থাল দর্শকের জন্য ‘হ্যামলেট’ সিনেমা বানানো হলে যেমন তা হৃদয়ঙ্গম করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব, তেমনি ভবিষ্যতের মহা-সাইবর্গদের নিয়ে একটি ছবি বানানো হলে তা বোঝাও আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হবে। তার উপর, আমাদের সাথে নিয়ান্ডার্থাল মানুষের যে পার্থক্য, বর্তমানের মানুষের সাথে ভবিষ্যতের মানুষের পার্থক্য হবে তার চেয়ে অনেক বেশি। অন্ততঃ নিয়ান্ডার্থাল এবং আমরা দুজনেই মানুষ, কিন্তু আমাদের উত্তরপুরুষরা হয়ে উঠবেন ঈশ্বরপ্রতিম। সুতরাং, বর্তমানের মানুষের পক্ষে তাদেরকে বোঝার চেষ্টা করাটাই হবে একরকম ধৃষ্টতা।

পদার্থবিজ্ঞানীরা সৃষ্টির শুরুর সময়কার মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাংয়ের নাম দিয়েছেন ‘সিংগুলারিটি’ (singularity)। এটা এমন একটা সময়, যখন আমাদের চেনা প্রাকৃতিক নিয়ম কানুনের কোন অস্তিত্ব ছিল না। সময়েরই কোন অস্তিত্ব ছিল না। সুতরাং মহাবিস্ফোরণের আগে কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিল কিনা, সে প্রশ্নই ছিল অর্থহীন। হয়তো আমরা খুব শিগগির একটি নতুন ‘সিংগুলারিটি’র দিকে ধাবিত হচ্ছি, যেখানে আমি, তুমি, পুরুষ, নারী, ভালবাসা এবং ঘৃণার মত যেসব ধারণাগুলো আমাদের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলেছে, সেসবের কোন অস্তিত্বই থাকবে না। এর পরে যা কিছু ঘটবে আমাদের বর্তমানের মানুষদের জন্য তা হবে পুরোপুরি অর্থহীন।

ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ভবিষ্যদ্বাণী

১৮১৮ সালে মেরি শেলি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। এই গল্পে একজন বিজ্ঞানী একটি কৃত্রিম সত্ত্বা তৈরি করে যাকে তার স্রষ্টা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন এবং ফলশ্রুতিতে নেমে আসে বিপর্যয়। গত দুই শতকে, ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে আমরা এই একই গল্পের অগণিত রূপের মঞ্চায়ন দেখতে পাই। এই গল্পটি বৈজ্ঞানিক কিংবদন্তীর অবিচ্ছেদ্দ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্পটি আমরা যদি ঈশ্বর সাজার চেষ্টা করি এবং নিজের ইচ্ছানুযায়ী জীবন উৎপাদনের চেষ্টা করি, তবে তার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে সে সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে এই গল্পটির অর্থ আরও গভীর ও ব্যাপক।

শেষের দিনগুলো দ্রুত ঘনিয়ে আসছে- ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্পটি মানুষকে এই সত্যটি সম্পর্কে সজাগ করে দেয়। যদি কোন আকস্মিক নিউক্লিয়ার দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাগড়া না দেয়, প্রযুক্তিগত উন্নতির এই লাগামহীন গতি গল্পের মত অচিরেই হোমো সেপিয়েন্সকে নতুন কোনো প্রজাতি দ্বারা প্রতিস্থাপিত করে ফেলবে। তারা যে কেবল দেখতে আমাদের থেকে আলাদা হবে তাই নয়, তাদের বু্দ্ধিবৃত্তি এবং অনুভূতিও হবে আমাদের থেকে একেবারেই আলাদা। এই ধারণাটিকে বেশিরভাগ মানুষ অস্বস্তির চোখে দেখেন। আমরা বিশ্বাস করতে ভালবাসি, ভবিষ্যতের পৃথিবী হবে আরাম আয়েশে ভরপুর, আমরা চাইলেই মহাকাশযানে চড়ে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে বেড়িয়ে আসতে পারব। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে আমাদের মত আবেগ এবং পরিচয় সম্বলিত মানুষের অস্তিত্ব থাকবে না, আমাদের স্থান দখল করবে নতুন কোন অচেনা জীব যার কাছে আমাদের আজকের দক্ষতা হবে নিতান্তই তুচ্ছ – এরকম একটি ধারণা মেনে নিতে আমাদের কষ্ট হয়।

তার চেয়ে আমরা এইভাবে ভাবতেই পছন্দ করি, ডঃ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন একটি জঘন্য দানব তৈরি করেছিলেন, আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই তাকে হত্যা করতে হয়েছে। আমরা গল্পটিকে এভাবেই বলতে পছন্দ করি, কারণ গল্পটির এই বয়ান পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেয়, আমরাই সকল সৃষ্টির সেরা, অতীতে কখনও আমাদের চেয়ে সেরা কিছু ছিল না, ভবিষ্যতেও কিছু থাকবে না। আমাদের নিজেদেরকে উন্নত করার যে কোন চেষ্টা শেষমেষ ব্যর্থ হবে, কারণ চেষ্টায় শরীরের কিছুটা উন্নতি যদি আমরা করতেও পারি, কোনোভাবেই আমরা মানুষের চিন্তা-আবেগ পরিবর্তন করতে পারব না।

বিজ্ঞানীরা যে চেষ্টা করলে কেবল শরীর নয়, মনও নির্মাণ করতে পারেন, ডঃ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন যে মানুষের চেয়েও উন্নত কিছু বানাতে পারেন, আর সেই উন্নত প্রজাতি যে নিয়ান্ডার্থালদের দিকে সেপিয়েন্স যেরকম অবহেলার চোখে তাকাত, সেরকম অবহেলার চোখে আমাদের দিকে তাকাতে পারে, এই সত্যটা হজম করতে আমাদের বেশ কষ্টই হবে।

আজকের দিনের ফ্রাঙ্কেনস্টাইনরা এইসব ভবিষ্যতবাণীকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কিছু বলার সুযোগ নেই। অনিশ্চিত ভবিষ্যতে উপরের অনুমানগুলো পুরোপুরি সত্যে রূপান্তরিত হলে আমি বরং একটু অবাকই হব। কারণ, ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অনেক কিছুই শেষমেষ বাস্তবে রূপ নেয় না। সামনে এসে দাঁড়ায় কিছু অাকস্মিক বাধা এবং আমলে না আনা নতুন কোন পরিস্থিতি। ১৯৪০ এর দিকে যখন দুনিয়াজুড়ে পারমাণবিক গবেষণার তোড়জোড়, তখন ২০০০ সালের পারমাণবিক শক্তিচালিত বিশ্ব সম্পর্কে অনেকেই অনেক জল্পনা-কল্পনা করেছিলেন। যখন মহাকাশে স্পুটনিক আর অ্যাপোলো ১১ নিক্ষেপ করা হলো, তখন সবাই শতাব্দী শেষ নাগাদ মানুষ মঙ্গল বা প্লুটোয় উপনিবেশ স্থাপন করে বসবাস শুরু করবে এমনটা ভেবেছিলেন। এসব অনুমানের অধিকাংশই বাস্তবে রূপ নেয়নি। অন্যদিকে, সে সময়ে ইন্টারনেটের মত কোনো কিছু সম্পর্কে সেদিনের কেউ অনুমানই করতে পারেনি। অথচ, সেটিই আজকের দিনের বড় বাস্তবতা।

সুতরাং, ভবিষ্যতের কাল্পনিক কোনো যান্ত্রিক সত্ত্বার দায়ের করা আইনি সালিশ থেকে নিরাপদ থাকতে এখনই আপনার বীমা কোম্পানির কাছে দৌড়ানোর দরকার নেই। উপরের কল্পনাগুলো বা দুঃস্বপ্নগুলো কেবল আপনার কল্পনাকে নাড়া দেবার জন্যই। যেটা গুরুত্বের সাথে নেওয়ার বিষয় সেটা হলো, ইতিহাসের পরবর্তী অংশে আমরা যে কেবল প্রযুক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন দেখতে পাব তাই নয়, বরং মানুষের চেতনা এবং পরিচিতির ক্ষেত্রেও সূচিত হবে নানারকম মৌলিক পরিবর্তনের। এসবের মাঝে কিছু পরিবর্তন হয়তো এতটাই বৈপ্লবিক হবে যে তা ‘মানুষ’ নামক প্রাণীটির পরিচয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এসবের আগে আমাদের হাতে আর কতটা সময় অবশিষ্ট আছে? সত্যিকার অর্থে, কেউ এ প্রশ্নের উত্তর জানে না। যেমনটা আগেই বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ হয়তো কিছু মানুষ মৃত্যুকে জয় করতে পারবে। এ সংক্রান্ত অন্যান্য ভবিষ্যদ্বাণীগুলো ইঙ্গিত করে মৃত্যুকে জয় করতে হয়তো মানুষের পরবর্তী শতাব্দী বা পরবর্তী সহস্রাব্দ লেগে যাবে। কিন্তু, সেটাও যদি সত্যি হয়, মানুষের ৭০,০০০ বছরের ইতিহাসের তুলনায় কয়েক সহস্রাব্দ কীই বা এমন বড় সময়?

যদি ইতিহাসের মঞ্চে প্রজাতি হিসেবে সেপিয়েন্স এর যবনিকার পর্দা নেমেই যায়, এই প্রজাতির অন্তিম প্রজন্মগুলোর সদস্য হিসেবে একটা শেষ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ব্যাপারে কিছুটা সময় আমাদের ব্যয় করা উচিত। প্রশ্নটা হলো- আমরা আসলে কী হতে চেয়েছিলাম? এই প্রশ্নটি, যাকে অনেকসময় মানবিক উন্নয়নমূলক প্রশ্ন হিসেবেও অভিহিত করা হয়, হুট করেই আমাদের বর্তমান পৃথিবীর রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, পণ্ডিত এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিদ্যমান অগণিত বিতর্ককে কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্তব্ধ করে দেয়। যদি আমাদের উত্তরসূরীরা একটি ভিন্নরকম চেতনার অধিকারী হয় (বা অধিকারী হয় চেতনার চেয়েও উচ্চতর কিছুর যা আমাদের বোধের বাইরে), তাদের কি আদৌ কোন মাথাব্যথা থাকবে খ্রিস্ট ধর্ম, ইসলাম বা আজকের দিনের প্রচলিত অন্য কোনো ধর্ম নিয়ে, সমাজের গঠন সমাজতন্ত্র নাকি পুঁজিবাদ অনুসারে হবে তা কি তাদের কাছে এতটুকু গুরুত্ব বহন করবে, সমাজের ধারণাটাই কি থাকবে আজকের মতো অথবা নারী-পুরুষের লিঙ্গগত বৈষম্য বা সমানাধিকার নিয়ে মাতামাতি করার ইচ্ছে হবে তাদের?

তা সত্ত্বেও ইতিহাসের এই বড় বড় বিতর্কগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মানুষের তৈরি এসব দেবতাদের প্রথম প্রজন্ম বিকশিত হবে মানুষেরই গড়ে দেয়া ছাঁচে। পুঁজিবাদ, ইসলাম নাকি নারীবাদ কোন ছাঁচ অনুযায়ী আমরা তাদের গড়ে তুলব? এই প্রশ্নের উত্তরের উপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের পৃথিবীর ইতিহাস।

বেশিরভাগ মানুষই এসব নিয়ে ভাবতে চান না। এমনকি জৈবনৈতিকতার মত বিষয়গুলোও মূলতঃ আরেকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেয়। সেটা হলো- ‘আমাদের কী কী করা অনুচিত?’ জীবিত মানুষের উপর কি জিনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত অথবা পরিত্যক্ত ভ্রুণের উপর? স্টেম কোষের উপর? একটি ভেড়ার হুবহু অনুলিপি তৈরি করা কি যুক্তিযুক্ত? অথবা শিম্পাঞ্জির? কিংবা মানুষের? নিঃসন্দেহে এসব প্রশ্ন অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এরকম ভাবা সত্যিই বোকামি হবে যে, এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মানুষের নিজেকে অন্য প্রজাতিতে রূপান্তর করে ফেলার মতো এইসব বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোকে স্থগিত রাখা সম্ভব হবে। এই প্রকল্পগুলো গিলগামেশ প্রকল্পের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। বিজ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করুন কেন তারা জিনোম নিয়ে পড়াশোনা করছেন বা একটি মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন বা কম্পিউটারের ভেতর মানব মন বা মানব মস্তিষ্ক তৈরির চেষ্টা করছেন। দশজনের মাঝে নয়জন আপনাকে সেই পরিচিত উত্তর দেবেন- আমরা এসব করছি রোগমুক্তির জন্য, মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য। যদিও কম্পিউটারের মধ্যে মানব মস্তিষ্ক তৈরি করার প্রভাব মানসিক রোগ সারানোর চেয়ে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী, কিন্তু এটিই তাদের কাজের ন্যায্যতা প্রমাণের সাধারণ ব্যাখ্যা, কারণ কোনো মানুষই এই ব্যাখ্যার বিরূদ্ধে যেতে পারবে না। এই কারণেই গিলগামেশ প্রকল্প বিজ্ঞানের প্রকল্পগুলোর আলোকবর্তিকা স্বরূপ। এটি বিজ্ঞান যাই করুক, তাকেই ন্যায্য বলে বা সঠিক বলে প্রমাণের দায়িত্ব নেয়। এই সুযোগে ডঃ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন গিলগামেশের কাঁধে চড়ে নৃত্য করেন। যেহেতু গিলগামেশকে থামানো অসম্ভব, অসম্ভব থামানো ডঃ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকেও।

যে একটা কাজ আমরা করতে পারি, সেটা হলো বিজ্ঞানের গতিপথকে কিছুটা হলেও আমরা প্রভাবিত করতে পারি। যেহেতু খুব শীঘ্রই আমরা আমাদের ইচ্ছা ও চাহিদাকে নির্মাণ করাও শিখে যাবো, সুতরাং তখন ‘আমরা ভবিষ্যতে কী হতে চাই?’ এ প্রশ্নটা হবে অবান্তর। তখনকার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে ‘আমরা নিজের ভেতর কী হবার চাহিদা তৈরি করতে চাই?’ এই প্রশ্নটা দেখেও এখনও যারা আতঙ্কে শিউরে ওঠেননি, তারা সম্ভবতঃ এখনও ব্যাপারটি নিয়ে বোঝবার মত করে ভাবেননি।


1 Keith T. Paige et al., ‘De Novo Cartilage Generation Using Calcium Alginate-Chondrocyte Constructs’, Plastic and Reconstructive Surgery 97:1 (1996), 168–78.

2 David Biello, ‘Bacteria Transformed into Biofuels Refineries’, Scientific American, 27 January 2010, accessed 10 December 2010, http://www.scientificamerican.com/article.cfm?id=bacteria-transformed-into-biofuel-refineries.

3 Gary Walsh, ‘Therapeutic Insulins and Their Large-Scale Manufacture’, Applied Microbiology and Biotechnology 67:2 (2005), 151–9.

4 James G. Wallis et al., ‘Expression of a Synthetic Antifreeze Protein in Potato Reduces Electrolyte Release at Freezing Temperatures’, Plant Molecular Biology 35:3 (1997), 323–30.

5 Robert J. Wall et al., ‘Genetically Enhanced Cows Resist Intramammary Staphylococcus Aureus Infection’, Nature Biotechnology 23:4 (2005), 445–51.

6 Liangxue Lai et al., ‘Generation of Cloned Transgenic Pigs Rich in Omega-3 Fatty Acids’, Nature Biotechnology 24:4 (2006), 435–6.

7 Ya-Ping Tang et al., ‘Genetic Enhancement of Learning and Memory in Mice’, Nature 401 (1999), 63–9.

8 Zoe R. Donaldson and Larry J. Young, ‘Oxytocin, Vasopressin and the Neurogenetics of Sociality’, Science 322:5903 (2008), 900–904; Zoe R. Donaldson, ‘Production of Germline Transgenic Prairie Voles (Microtus Ochrogaster) Using Lentiviral Vectors’, Biology of Reproduction 81:6 (2009), 1,189–95.

9 Terri Pous, ‘Siberian Discovery Could Bring Scientists Closer to Cloning Woolly Mammoth’, Time, 17 September 2012, accessed 19 February 2013; Pasqualino Loi et al, ‘Biological time machines: a realistic approach for cloning an extinct mammal’, Endangered Species Research 14 (2011), 227–33; Leon Huynen, Craig D. Millar and David M. Lambert, ‘Resurrecting ancient animal genomes: The extinct moa and more’, Bioessays 34 (2012), 661–9.

10 Nicholas Wade, ‘Scientists in Germany Draft Neanderthal Genome’, New York Times, 12 February 2009, accessed 10 December 2010, http://www.nytimes.com/2009/02/13/science/13neanderthal.html?_r=2&ref=science; Zack Zorich, ‘Should We Clone Neanderthals?’, Archaeology 63:2 (2009), accessed 10 December 2010, http://www.archaeology.org/1003/etc/neanderthals.html.

11 Robert H. Waterston et al., ‘Initial Sequencing and Comparative Analysis of the Mouse Genome’, Nature 420:6915 (2002), 520.

12 ‘Hybrid Insect Micro Electromechanical Systems (HI-MEMS)’, Microsystems Technology Office, DARPA, accessed 22 March 2012, http://www.darpa.mil/Our_Work/MTO/Programs/Hybrid_Insect_Micro_Electromechanical_Systems_percent28HI-MEMSpercent29.aspx. See also: Sally Adee, ‘Nuclear-Powered Transponder for Cyborg Insect’, IEEE Spectrum, December 2009, accessed 10 December 2010, http://spectrum.ieee.org/semiconductors/devices/​nuclearpowered-transponder-for-cyborg-insect?​utm_source=feedburner&utm_medium=feed&utm_campaign=Feedpercent3A​+IeeeSpectrum+percent28IEEE+​Spectrumpercent29&utm_content=Google+Reader; Jessica Marshall, ‘The Fly Who Bugged Me’, New Scientist 197:2646 (2008), 40–3; Emily Singer, ‘Send in the Rescue Rats’, New Scientist 183:2466 (2004), 21–2; Susan Brown, ‘Stealth Sharks to Patrol the High Seas’, New Scientist 189:2541 (2006), 30–1.

13 Bill Christensen, ‘Military Plans Cyborg Sharks’, Live Science, 7 March 2006, accessed 10 December 2010, http://www.livescience.com/technology/060307_shark_implant.html.

14 ‘Cochlear Implants’, National Institute on Deafness and Other Communication Disorders, accessed 22 March 2012, http://www.nidcd.nih.gov/health/hearing/pages/coch.aspx.

15 Retina Implant, http://www.retina-implant.de/en/doctors/technology/default.aspx.

16 David Brown, ‘For 1st Woman With Bionic Arm, a New Life is Within Reach’, Washington Post, 14 September 2006, accessed 10 December 2010, http://www.washingtonpost.com/wp-dyn/content/article/2006/o9/13/AR2006091302271.html?nav=E8.

17 Miguel Nicolelis, Beyond Boundaries: The New Neuroscience of Connecting Brains and Machines – and How it Will Change Our Lives (New York: Times Books, 2011).

18 Chris Berdik, ‘Turning Thought into Words’, BU Today, 15 October 2008, accessed 22 March 2012, http://www.bu.edu/today/2008/turning-thoughts-into-words/.

19 Jonathan Fildes, ‘Artificial Brain “10 years away” ’, BBC News, 22 July 2009, accessed 19 September 2012, http://news.bbc.c0.uk/2/hi/8164060.stm.

20 Radoje Drmanac et al., ‘Human Genome Sequencing Using Unchained Base Reads on Self-Assembling DNA Nanoarrays’, Science 327:5961 (2010), 78–81; ‘Complete Genomics’ website: http://www.completegenomics.com/; Rob Waters, ‘Complete Genomics Gets Gene Sequencing under $5000 (Update 1)’, Bloomberg, 5 November 2009, accessed 10 December 2010; http://www.bloomberg.com/apps/news?pid=newsarchive&sid=aWutnyE4S0Ww; Fergus Walsh, ‘Era of Personalized Medicine Awaits’, BBC News, last updated 8 April 2009, accessed 22 March 2012, http://news.bbc.co.Uk/2/hi/health/7954968.stm; Leena Rao, ‘PayPal Co-Founder and Founders Fund Partner Joins DNA Sequencing Firm Halcyon Molecular’, TechCrunch, 24 September 2009, accessed 10 December 2010, http://techcrunch.com/2009/09/24/paypal-co-founder-and-founders-​fund-partner-joins-dna-sequencing-firm-halcyon-molecular/.

 

১৯. অতঃপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল

 

গত ৫০০ বছরে পৃথিবী নামক এই গ্রহটি অনেকগুলো শ্বাসরুদ্ধকর উত্থান-পতনের ভিতর দিয়ে গেছে। মিলেমিশে এক হয়ে গেছে তার বিভিন্ন অংশের পরিবেশ ও ইতিহাস। অর্থনীতির বিকাশ হয়েছে প্রায় বিস্ফোরণের মতো। আজ সমগ্র মানবজাতির যত সম্পদ, তার পরিমাণ রূপকথাকেও হার মানিয়ে দেয়। ইতিহাসের এই সময়কালে, বিজ্ঞান আর শিল্পের বৈপ্লবিক উন্নতি মানুষকে প্রায় অতিমানবীয় ক্ষমতা এনে দিয়েছে। খোলনলচে বদলে গেছে সামাজিক কাঠামোর, তার সাথে বদলেছে পৃথিবীর রাজনীতি, মানুষের জীবন ও চিন্তাধারা।

কিন্তু এত পরিবর্তনের পরেও সেই পুরনো প্রশ্নটা থেকেই যায়: আমরা কি সুখী হতে পেরেছি? গত পাঁচ শতাব্দীর জমা হওয়া সম্পদ কি আমাদের সন্তুষ্টি দিয়েছে? শক্তির অফুরন্ত ভাণ্ডার আবিষ্কার করেছি আমরা, কিন্তু অফুরন্ত শান্তির খোঁজ কি মিলেছে? মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের পরবর্তী প্রায় ৭০ হাজার বছরে পৃথিবী কি আগের চেয়ে আরও একটু বেশি বাসযোগ্য হয়েছে? চাঁদের মাটিতে অক্ষয় পদচিহ্ন রেখে আসার সময় নীল আর্মস্টং যে আনন্দ অনুভব করেছিলেন, তা কি ৩০ হাজার বছর আগের শভে গুহার দেয়ালে হাতের ছাপ এঁকে দেওয়া নাম-না-জানা যাযাবর মানুষটার চেয়ে বেশি? তা যদি না-ই হবে, তাহলে এতগুলো বছর ধরে কৃষিকাজ, নগর-পত্তন, লেখালেখি, টাকা, সাম্রাজ্য, বিজ্ঞান, শিল্প- এগুলো কেন করতে গেলাম আমরা?

এই প্রশ্নগুলো নিয়ে অবশ্য ঐতিহাসিকেরা তেমন একটা মাথা ঘামান না। উরুক আর ব্যাবিলনের নগরবাসীরা তাদের শিকারি-সংগ্রাহক পূর্বসূরীদের চেয়ে সুখী ছিল কিনা, ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর মিশরের মানুষের জীবন আরেকটু সুন্দর হয়েছিল কিনা, অথবা আফ্রিকা থেকে ইউরোপীয় উপনিবেশগুলো উঠে যাওয়ার পর সেখানকার লাখ লাখ মানুষ শান্তি পেয়েছিল কিনা- ইতিহাসের পাতায় সেসব নিয়ে আলোচনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। অথচ ইতিহাস থেকে মানুষের সবচেয়ে বেশি জানতে চাওয়ার বিষয় এগুলোই। এখনকার অধিকাংশ আদর্শগত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পিছনে তাড়না হিসেবে থাকে এই সুখের সন্ধান। জাতীয়তাবাদীরা বলে রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ই সুখের মূল। সাম্যবাদীরা বলে জীবন সুখের হবে তখনই, যখন নিপীড়িত মানুষেরা সমাজ শাসন করবে। আবার পুঁজিবাদীরা বলবে অন্য কথা। তারা বলবে পণ্যের মুক্ত বাজারই পারে মানুষকে সুখী জীবন দিতে। কারণ এভাবেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসবে, আর তার ফলে মানুষের সম্পদ বাড়বে আর তারা আরও স্বনির্ভর হবে।

কিন্তু কোন উচ্চতর গবেষণা যদি এই দাবিগুলোকে ভুল প্রমাণিত করে, তখন? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর স্বনির্ভরতা যদি মানুষকে সুখী করতে না পারে, তাহলে পুঁজিবাদ কী কাজে লাগবে? বড় কোনো সাম্রাজ্যের প্রজারা যদি কোনো ছোট স্বাধীন দেশের নাগরিকদের চেয়ে সুখে থাকে, তাহলে? এই যেমন, যদি প্রমাণ করা যায় যে, আলজেরিয়ার মানুষেরা ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার আগেই বেশি ভালো ছিল, তাহলে উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের সমর্থকেরা কী বলবেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দূরে থাক, এখন পর্যন্ত কোনো ইতিহাসবিদ এই প্রশ্নগুলোই তোলেননি। ইতিহাস পর্যালোচনায় বাদ যায় না কিছুই- রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, লিঙ্গ, রোগব্যাধি, যৌনতা, ভাত-কাপড়- সবকিছু নিয়েই ইতিহাসে আলোচনা হয়, কেবল এগুলো মানুষকে সুখ দিতে পারে কিনা সে প্রশ্নে সবাই নীরব।

এই ব্যাপারটা নিয়ে অল্প কিছু মানুষ মাথা ঘামালেও সুখী হওয়ার ব্যাপারে জ্ঞানী থেকে অজ্ঞ- সবারই ধারণা অস্পষ্ট। একদিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায়, ইতিহাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আসতে আসতে মানুষের সক্ষমতা অনেকটাই বেড়েছে। আর যেহেতু মানুষ সাধারণত দুর্দশা মোচন ও আশা পূরণ করতেই তার অর্জিত ক্ষমতা ব্যবহার করে, তাই বলা যায় আজকের মানুষ নিঃসন্দেহে মধ্যযুগের মানুষের চেয়ে বেশি সুখী, প্রস্তর যুগের মানুষের চেয়ে তো বটেই।

কিন্তু এই আশাবাদী যুক্তি আসলে তেমন গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আমরা দেখেছি, নতুন নতুন আচরণ ও দক্ষতা মানুষকে উন্নততর জীবন দিতে পারে না। কৃষিবিপ্লবের সময়ে চাষাবাদ করতে শিখে মানুষের সমষ্টিগতভাবে পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও বেড়েছিল। অথচ একজন ব্যক্তি-মানুষের জীবন হয়ে গিয়েছিল আরও রুক্ষ। একজন সংগ্রাহকের তুলনায় একজন কৃষককে একদিকে কাজও করতে হতো অনেক বেশি, অন্যদিকে তার খাবারের বৈচিত্র আর পুষ্টিগুণও ছিল কম। রোগভোগের সম্ভাবনাও কৃষকদেরই বেশি ছিল। আবার ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাম্রাজ্যবিস্তারের ফলে তাদের সমষ্টিগত ক্ষমতা অনেক বেড়েছে, তাদের আদর্শ, চিন্তাধারা, প্রযুক্তি আর বৈচিত্রময় খাবার ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে, বাণিজ্যের নতুন নতুন পথ তৈরি হয়েছে। অথচ আফ্রিকা, আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ার কোটি কোটি আদিবাসী মানুষকে তা অন্তহীন দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। মানুষের মধ্যে ক্ষমতা পেলেই সেটা অপব্যবহার করার একটা প্রবণতা আছে। কাজেই ক্ষমতার চর্চার মাধ্যমে মানুষ সুখী হবে- এমনটা ভাবা বোকামি।

এই তত্ত্বের বিরোধীদের অবস্থান পুরোপুরি উলটো। তাদের মতে, মানুষের ক্ষমতা ও সুখের মধ্যে সম্পর্কটা আসলে বিপরীত। ক্ষমতা সবসময় মানুষকে দুর্নীতি ও অন্যায়ের পথে চালিত করে। তাই মানুষের হাতে যত ক্ষমতা আসছে, ততই এই পৃথিবীটা একটা শীতল যান্ত্রিক পরিবেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যে পরিবেশ আমরা চাইনি। বিবর্তন মানুষকে দেহে-মনে একটা শিকারি-সংগ্রাহক প্রাণী হিসেবেই তৈরি করেছিল। সেখান থেকে প্রথমে কৃষিনির্ভর ও তার পরে শিল্পনির্ভর জীবনে প্রবেশ করে মানুষ তার প্রাকৃতিক জীবন হারিয়েছে। এই কৃত্রিম জীবন তার চাওয়াগুলো পূরণ করতে পারছে না, তার সহজাত প্রবৃত্তিকে প্রকাশিত হতে দিচ্ছে না। তাই তার সন্তুষ্টিও হচ্ছে না। আদিম মানুষের ম্যামথ শিকারের যে সুতীব্র উত্তেজনা আর বুনো উল্লাস, তা আজকের একটা শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবার কল্পনাও করতে পারবে না। আমাদের প্রত্যেকটা নতুন আবিষ্কার আমাদেরকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বর্গ থেকে একটু একটু করে দূরে নিয়ে যাচ্ছে।

আবার সব আবিষ্কারই যে খারাপ- তাও নয়। এর বিপরীত উদাহরণও আছে। আমাদের ভিতর থেকে শিকারি-সংগ্রাহক সত্তাটা হারিয়ে গেছে, কিন্তু কিছু কিছু দিক থেকে দেখলে সেটা খুব খারাপও নয়। গত দুই শতাব্দীতে চিকিৎসা ব্যবস্থার যে উন্নতি হয়েছে তাতে শিশু মৃত্যুহার ৩৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এর ফলে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া সেইসব শিশু ও তাদের পরিবারের জীবনে যে সুখ এসেছে, তা বিনা তর্কে মেনে নিতেই হবে।

তাই অনেকের অবস্থান এই দুরকম যুক্তির মাঝখানে। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব আসার আগের সময়ে ক্ষমতা ও সুখের সম্পর্কটা অস্পষ্ট ছিল। মধ্যযুগের একজন কৃষক হয়তো তার শিকারি-সংগ্রাহক পূর্বসূরীর চেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল। কিন্তু গত কয়েকশ বছরে মানুষ তার ক্ষমতাকে আরও বিচক্ষণতার সাথে কাজে লাগাতে শিখেছে। তারই একটা উদাহরণ হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি। আরও অন্যান্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায় সহিংসতার পরিমাণ অনেকখানি কমে আসা, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া, মহামারী বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া- এসবের কথা।

কিন্তু এই ব্যাখ্যাও একদিক থেকে অতিসরলীকরণ দোষে দুষ্ট। কারণ এই ব্যাখ্যার ভিত্তি হল খুব অল্প কিছু সময়ের তথ্য। আধুনিক চিকিৎসা পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের নাগালে এসেছে ১৮৫০ সালের পরে। আর শিশুমৃত্যুর হার কমে যাওয়া তো কেবল বিংশ শতাব্দীর ঘটনা। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও পৃথিবীতে বিরাট মহামারী হয়েছে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে যখন চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই সেখানে ১ থেকে ৫ কোটি মানুষ মারা গেছে খেতে না পেয়ে। আর আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে কেবল ১৯৪৫ সালের পর, এর মূল কারণ অবশ্য পরমাণু অস্ত্রের ভয়। কাজেই গত কয়েক বছরকে মানুষের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ মনে হলেও এত তাড়াতাড়ি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, এটা কি আসলেই সুন্দর সময়ের শুরু না কেবল ক্ষণস্থায়ী সুসময়। আধুনিক যুগের বিচার করতে গেলে কেবল একুশ শতকের পশ্চিমা দেশের মধ্যবিত্তের চোখ দিয়ে দেখলে হবে না, সাথে দেখতে হবে উনিশ শতকের ওয়েলসের কয়লাখনির শ্রমিক, চীনের আফিম-আসক্ত কিংবা তাসমানিয়ার আদিবাসী মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেও। কারণ, ইতিহাসের চোখে আমেরিকার জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র হোমার সিম্পসনের (Homer Simpson) চেয়ে তাসমানিয়ার নির্যাতিত আদিবাসীদের প্রতিনিধি ট্রুগানিনির (Truganini) গুরুত্ব কিন্তু একটুও কম নয়।

তাছাড়া আপাতদৃষ্টিতে বিগত অর্ধ-শতাব্দীকে মানুষের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলে মনে হলেও এই সময়ের মধ্যেই কিন্তু মানুষ রোপণ করেছে তার ভবিষ্যৎ অমঙ্গলের বীজ। একসময় মানুষসহ সমগ্র জীবজগতই ছিল প্রকৃতির নিয়মের অধীন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে পরিবেশের কর্তৃত্ব হাতে তুলে নিয়েছে মানুষ। ফলে নিজের প্রয়োজনে পরিবেশকে ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার ক্ষমতাও এখন আমাদের আছে। কিন্তু সেই ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে আমরা লাভবান হলেও মোটের উপর পরিবেশের ক্ষতিই হয়েছে বেশি। আমাদের চাহিদা পূরণের মূল্য দিয়েছে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে আমরা যে কতভাবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছি তার হিসাব নেই। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে মানুষের লাভবান হওয়ার চিন্তা করাটা বোকামি। পৃথিবীজোড়া অগণিত মানুষের বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আমরা যে ভবিষ্যতের পৃথিবীকে সম্পদহীন করে ফেলছি, সে কথা ভাবার সময়ও কারো নেই। এর কঠিন পরিণতি এক সময় ভোগ করতেই হবে। ইতোমধ্যেই তার কিছু অশনি সংকেত দেখা যাচ্ছে।

অন্যান্য প্রাণীদের ভয়াবহ পরিণতির কথা বাদ দিয়ে ভাবলে ইতিহাসের এইসব অসামান্য অর্জনের জন্য কৃতিত্বের মুকুটটা মানুষেরই প্রাপ্য বলে মনে হতে পারে। দুর্ভিক্ষ আর মহামারীর হাত থেকে আমরা নিস্তার পেয়েছি বটে, কিন্তু তার মূল্য দিতে হয়েছে গবেষণাগারের বানর আর খামারের অসংখ্য গরু আর মুরগিকে। গত দুইশ বছরে শিল্পের বিকাশের খাতিরে এরকম শত শত কোটি প্রাণীকে যে নিষ্ঠুরতার ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে, তার সমান দৃষ্টান্ত পৃথিবীর সম্পূর্ণ ইতিহাসে আর একটাও নেই। পশু-অধিকার সংগঠনগুলো যে পরিমাণ নিষ্ঠুরতার হিসাব দেয়, তার দশ ভাগের এক ভাগও যদি সত্য হয়, তাহলেও আধুনিক কৃষিব্যবস্থাকে ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধ মনে হবে। তাই, সুখের হিসাব করতে গেলে শুধু সমাজের উপরতলার, অথবা শুধু ইউরোপের, কিংবা কেবল পুরুষ মানুষের হিসেব নিলে চলবে না। সম্ভবত কেবল মানুষের কথা ভাবাটাও অন্যায় হবে।

সুখের মাপকাঠি

এতক্ষণ আমরা সুখী হওয়ার যে মাপকাঠিগুলো দেখলাম, যেমন সুস্বাস্থ্য, খাবার কিংবা সম্পদ- তার সবই বস্তুগত। এদিক দিয়ে দেখলে যে যত ধনী আর স্বাস্থ্যবান, সে তত সুখী। কিন্তু আসলেই কি হিসাবটা এত সহজ? হাজার হাজার বছর ধরে দার্শনিক, ধর্মগুরু আর কবিরা সুখ কী তা জানার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের অনেকেই সুখের জন্য সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোকে বস্তুগত বিষয়গুলোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। আজকের সমাজে একজন সচ্ছল মানুষও এত উন্নত জীবনের মধ্যেও একাকিত্বে ভোগে, জীবনের অর্থ খুঁজে পায় না। অথচ সম্ভবত আমাদের পূর্বপুরুষেরা এতটা সম্পদশালী না হয়েও সামাজিক বন্ধন, ধর্ম ও প্রকৃতির মাঝে আরও বেশি সুখ খুঁজে পেত।

গত কয়েক দশক ধরে এই সুখের সন্ধানের কাজটা করছেন মনোবিজ্ঞানী ও জীববিজ্ঞানীরা। মানুষ কিসে সুখী হয়? টাকা? পরিবার? সৎকর্ম? নাকি জিনের কোনো ভূমিকা আছে এতে? প্রথমে আমাদের জানতে হবে আমরা কী পরিমাপ করতে চাই। সুখের সর্বজনগ্রাহ্য একটা সংজ্ঞা হল ‘ব্যক্তিগতভাবে ভালো থাকা’। এভাবে চিন্তা করলে সুখ হল মানুষের মনের ভিতরের একটা অনুভূতি। সেটা তাৎক্ষণিক আনন্দও হতে পারে, আবার দীর্ঘমেয়াদী সন্তুষ্টির অনুভূতিও হতে পারে। যদি এটা মনের ভিতরেরই ব্যাপার হয়, তাহলে বাইরে থেকে সেটা মাপার উপায় কী? একটা উপায় হল মানুষের কাছে তার অনুভূতি জানতে চাওয়া। এইজন্যই জীববিজ্ঞানী আর মনোবিজ্ঞানীরা মাঝেমধ্যেই সুখী মানুষদের হাতে তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন রকম জরিপের প্রশ্ন ধরিয়ে দেন।

এসব প্রশ্নে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের বক্তব্যে শূন্য থেকে দশের মধ্যে নম্বর দিতে বলা হয়। বক্তব্যগুলো হয় অনেকটা এরকম: ‘যেভাবে চলছে সেটাই ভালো’, ‘জীবন থেকে পাওয়ার অনেক কিছু আছে’, ‘ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমি আশাবাদী’ কিংবা ‘জীবন আসলেই সুন্দর’। নানাজন নানাভাবে এসব বক্তব্যের সাথে একমত বা দ্বিমত পোষণ করে। তাদের দেওয়া নম্বরগুলো থেকে নানারকম হিসাব করে বিজ্ঞানীরা তাদের ‘ভালো থাকার’ পরিমাণটা নির্ণয় করেন।

এসব প্রশ্নোত্তর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি-নিরপেক্ষ বিষয়ের সাথে সুখের সম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। যেমন, ধরা যাক কোনো জরিপে বছরে এক লক্ষ ডলার আয় করে এমন এক হাজার জন মানুষের মতামত নেওয়া হল। অন্য কোনো জরিপে এমন এক হাজার লোকের মতামত নেওয়া হল যাদের বার্ষিক আয় ৫০ হাজার ডলার। এখন এই দুটো জরিপে যদি দেখা যায় প্রথম দলের ‘ভালো থাকার’ গড় মান ৮.৭ আর দ্বিতীয় দলের ৭.৩, তাহলে বলা যায় ব্যক্তিগত ভালো থাকার সাথে টাকার একটা সম্পর্ক আছে। সোজা কথায়, যার টাকা বেশি, তার সুখও বেশি। একই পদ্ধতিতে জানার চেষ্টা করা যায় মানুষ গণতান্ত্রিক দেশে বেশি সুখে থাকে না একনায়কের শাসনে, অথবা বিবাহিত মানুষেরা অবিবাহিত, বিধবা ও বিপত্নীক মানুষের চেয়ে বেশি সুখী হয় কি না।

এই তথ্যগুলো ইতিহাসবিদদেরও কাজে লাগে। এখান থেকে তারা অতীতের মানুষের টাকা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা বিবাহ-বিচ্ছেদের হার কেমন ছিল তা জানতে পারেন। ফলে, যদি দেখা যায়, আগে মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনে বেশি ভালো ছিল, তাহলে তারা যুক্তি দেখাতে পারেন, গত কয়েক দশকে গণতন্ত্রের প্রসার মানুষের সুখ বাড়িয়েছে। আবার যদি দেখা যায় বিবাহিত মানুষেরা বেশি সুখী ছিল, তাহলে বলা যায় এখনকার বিবাহ-বিচ্ছেদের হার বেড়ে যাওয়াটা আসলে মানুষের আরও অসুখী হওয়ার একটা লক্ষ্মণ।

এটা অবশ্য কোনো নির্ভুল পদ্ধতি নয়, তবে এই পদ্ধতির সমস্যাগুলো দেখার আগে এর কিছু ফলাফল দেখা যাক।

একটা মজার পর্যবেক্ষণ হল, টাকা আসলেই সুখ আনে। তবে সেটা একটা পর্যায় পর্যন্ত, সেটা পার হয়ে গেলে টাকার গুরুত্ব তেমন থাকে না। অর্থনীতির একেবারে নিচের তলায় যাদের বাস, তাদের কাছে বেশি টাকা মানেই বেশি সুখ। ধরুন, আমেরিকার একজন একা মা মানুষের ঘর পরিষ্কার করে বছরে ১২ হাজার ডলার আয় করছে। এখন সে যদি হঠাৎ একদিন লটারিতে ৫ লাখ ডলার পেয়ে যায়, তাহলে তার ‘ভালো থাকার’ পরিমাণটা এক লাফে অনেকখানি বেড়ে যাবে, আর সেটা বেশ অনেকদিন থাকবেও। তখন সে দেনায় ডুবে না গিয়েও তার সন্তানদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করতে পারবে। অথচ যে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এমনিতেই বছরে আড়াই লাখ ডলার আয় করছে, সে যদি লটারিতে ১০ লাখ ডলারও পেয়ে যায়, বা কোম্পানি যদি তার বেতন দ্বিগুণ করে দেয়, তার বাড়তি সুখটুকু কিন্তু সপ্তাহখানেকের বেশি থাকবে না। বিভিন্ন জরিপে এমনটাই দেখা যায়। এই বাড়তি টাকা দিয়ে লোকটা হয়তো আরও দামী গাড়ি চালাবে, আরও বড় আর বিলাসবহুল বাড়িতে গিয়ে উঠবে, আরও ভালো খাবার আর পানীয় উপভোগ করবে, কিন্তু কিছুদিন পরেই সেটা তার কাছে একটা সাদামাটা ব্যাপারে পরিণত হবে।

শারীরিক সুস্থতার সাথে সুখের সম্পর্কটাও লক্ষণীয়। জরিপে দেখা যায়, অসুখবিসুখ সাধারণত মানুষকে সাময়িকভাবে অসুখী করে। তবে রোগটা যদি যন্ত্রণাদায়ক হয়, অথবা যারা অনেকদিন ধরে কোনো রোগে ভুগছে, তাদের জন্য সেটা বিরাট অশান্তির কারণ। যারা ডায়াবেটিসের মতো দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়, তারা প্রথমে কিছুদিন প্রচুর অশান্তিতে ভোগে। কিন্তু তাদের শারীরিক অবস্থার যদি অবনতি না হয়, তাহলে তারা সেই অশান্তির সাথে ধীরে ধীরে নিজেদের মানিয়ে নেয়, ফলে একসময় তারা সুস্থ মানুষদের মতোই সুখী জীবনে ফিরে আসে। ধরুন লুসি আর লুক কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের দুই যমজ ভাই-বোন। একটা তথ্য সংগ্রহের জরিপে অংশগ্রহণ করে ফেরার পথে দুটো ঘটনা ঘটল। রাস্তায় একটা বাস লুসির গাড়িটাকে ধাক্কা দিল, ফলে গাড়ি তো গুঁড়িয়ে গেলই, লুসির শরীরের অনেকগুলো হাড় ভাঙল, আর একটা পা অকেজো হয়ে গেল সারা জীবনের জন্য। ওদিকে লুকের কাছে একটা ফোন এল। লুক জানতে পারল, সে এক কোটি ডলারের লটারি জিতে গেছে! দুবছর পর দেখা যাবে লুসি খুঁড়িয়ে হাঁটছে আর লুক অনেক দামী গাড়িতে চড়ছে। তখন যদি দুবছর আগের সেই জরিপে আবার তাদের অংশগ্রহণ করতে বলা হয়, সম্ভবত দুজনেরই বেশিরভাগ উত্তর আগের সেই দিনটার মতোই হবে।

সুখের উপর টাকা আর স্বাস্থ্যের চেয়ে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের প্রভাব আরও বেশি বলেই দেখা যায়। যেসব মানুষের পারিবারিক বন্ধন দুর্বল অথবা যারা অন্যান্য মানুষের কাছ থেকে খুব বেশি সহযোগিতা পায়নি (অথবা নেয়নি), তাদের চেয়ে দৃঢ় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনে থাকা মানুষেরা বেশি সুখী হয়। বিয়ে জিনিসটা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে নানা সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দর বৈবাহিক জীবনের সাথে ভালো থাকা সরাসরি সম্পর্কিত। এই সম্পর্কটা আর্থিক অবস্থা, এমনকি শারীরিক সুস্থতার হেরফের হলেও খাটে। আন্তরিক জীবনসঙ্গী, পরিবার ও উষ্ণ সামাজিক পরিবেশ পেলে একজন হতদরিদ্র অসুস্থ মানুষও একজন একাকী কোটিপতি মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সুখী জীবন কাটাতে পারে। তবে দারিদ্র্য খুব বেশি হলে বা কোনো যন্ত্রণাদায়ক রোগে আক্রান্ত হলে ফলাফল কিছুটা ভিন্ন হতেও পারে।

এসব থেকে আরেকটা সম্ভাবনা দেখা যায়। গত দুইশ বছরে মানুষের বস্তুগত দিক থেকে প্রাচুর্য এসেছে। তাই এমনও হতে পারে যে এই প্রাচুর্যই পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়ার ক্ষতি খানিকটা পূরণ করে দিচ্ছে। যদি তাই হয়, তাহলে ১৮০০ সালের একজন মানুষের চেয়ে এখনকার গড়পড়তা একজন মানুষের বেশি সুখী হওয়ার কথা নয়। এমনকি আমরা যে স্বাধীনতাকে এত গুরুত্ব দিই, সেটাই হয়তো আমাদের জন্য খারাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমাদের এখন জীবনসঙ্গী, বন্ধুবান্ধব বা প্রতিবেশী বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা আছে। আবার তাদেরও তো স্বাধীনতা আছে আমাদের ছেড়ে যাওয়ার! আমাদের নিজের জীবনকে নিজের ইচ্ছামতো সাজানোর স্বাধীনতা যত বাড়ছে, যেকোনো ধরনের বন্ধনে জড়িয়ে পড়াটাও ততই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই এসব বন্ধন আলগা হতে হতে আমরা ক্রমেই একাকী জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

তবে এসব গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল, সুখ আসলে সম্পদ, সুস্বাস্থ্য বা সামাজিক বন্ধনের উপর নির্ভর করে না। বরং সেটা নির্ভর করে মানুষের অবস্থা ও তার ব্যক্তিগত চাহিদার উপর। যদি কেউ একটা গরুর গাড়ি চায়, তাহলে গরুর গাড়ি পেলেই সে সন্তুষ্ট, আর কিছু দরকার নেই। কিন্তু কেউ যদি একটা ঝকঝকে নতুন ফেরারি গাড়ি চায়, একটা পুরনো ফিয়াট গাড়ি পেয়ে তার মন ভরবে না, এটাই স্বাভাবিক। এজন্যই লটারি জেতা আর ভয়ঙ্কর কোনো দুর্ঘটনা দুটোই, অনেক সময় পরে, মানুষকে একই অবস্থায় নিয়ে যায়। যখন আমাদের অবস্থা ভালো থাকে, আমাদের চাহিদাগুলোও ফুলেফেঁপে ওঠে, তাই বড় বড় প্রাপ্তিগুলোও তখন আমাদের সুখ দিতে পারে না। আবার যখন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়, তখন আশার বেলুনও চুপসে যায়, তাই সেই খারাপ পরিস্থিতিতেও নিজেকে অসুখী মনে হয় না।

এখন মনে হতে পারে, এ আর নতুন কী, আর এসব জানার জন্য এত গবেষণারই বা কী আছে। আমরা কী চাই তার চেয়ে আমাদের যা আছে তা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট কি না এটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ- এ কথা তো ধর্মগুরু, কবি আর দার্শনিকেরা কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই বলে আসছে। তবু আমাদের আধুনিক গবেষণার ফল আমাদের প্রাচীন পূর্বসূরীদের চিন্তার সাথে মিলে যাচ্ছে এটা দেখতে ভালোই লাগে।

সুখের ইতিবৃত্ত জানতে হলে আগে আমাদের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে হবে। সুখ যদি কেবলই স্বাস্থ্য, সম্পদ আর সামাজিক সম্পর্কের মতো কিছু ব্যক্তি-নিরপেক্ষ বিষয়ের উপর নির্ভরশীল হতো তাহলে বিষয়টা একটু সহজ হতো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সুখ আসলে ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার উপর নির্ভরশীল, যা প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদা আলাদা। তাই সেটা তলিয়ে দেখাটাও বেশ কঠিন। আমাদের এখন অনেক রকম ব্যথানাশক অথবা ঘুমের ওষুধ আছে। কিন্তু সুখ-শান্তির ব্যাপারে আমাদের চাহিদা আর নানা বিষয়ে অসহিষ্ণুতা এত বেড়ে গেছে যে আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে আমাদের অনেক বেশি দুঃখ-বেদনা সহ্য করতে হচ্ছে।

এই চিন্তাধারাটা মেনে নেওয়া একটু কঠিন। সমস্যার শেকড়টা আসলে লুকিয়ে আছে আমাদের মনস্তত্ত্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা একটি ভুল প্রবণতার মাঝে। আমরা যখন ভাবি যে অন্যরা কতটা সুখী বা আগের মানুষেরা কতটা সুখী ছিল, আমরা সবসময় তাদের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করি। কিন্তু সেটা ঠিক নয়, কারণ এভাবে চিন্তা করতে গেলে আমরা অন্যের উপর নিজের চাহিদাগুলো চাপিয়ে দিই। এখনকার যেকোনো সমৃদ্ধ সমাজে প্রতিদিন গোসল করে নতুন কাপড় পরাটাই রীতি। অথচ মধ্যযুগের একজন কৃষক গোসল না করেই মাসের পর মাস কাটিয়ে দিত। কাপড়ও বদলাত কালে ভদ্রে। এটা চিন্তা করলে আমাদের গা গুলিয়ে আসতে পারে, কিন্তু তাদের এতে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না। তারা তাদের দীর্ঘদিন গোসল-না-করা শরীর আর ময়লা দুর্গন্ধময় কাপড়েই অভ্যস্ত ছিল। এমন নয় যে তারা নতুন কাপড় চায় কিন্তু সেটা পাচ্ছে না- বরং তাদের যা ছিল সেটা নিয়েই তারা সন্তুষ্ট ছিল। কাজেই কাপড় যতদিন টেকে ততদিন তারা সুখী।

অবশ্য একটু চিন্তা করলেই দেখা যায়, এতে আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাদের বিবর্তনীয় আত্মীয় শিম্পাঞ্জিদের কথাই ধরুন। তারাও গোসল করে না বললেই চলে, আর কাপড় বদলানোর ঝক্কি তো তাদের নেইই। আমাদের পোষা বিড়াল-কুকুরও রোজ গোসল করে নতুন কাপড় পরে না। তবু আমরা তাদের কোলে নিই, গায়ে হাত বুলাই। মানবশিশুদের বেলায়ও দেখা যায় তারা গোসল করতে পছন্দ করে না, অথচ বাবা-মায়ের শিক্ষা ও শাসনে থেকে কয়েক বছরের মধ্যেই তারা এই অদ্ভুত রীতিতে দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে যায়। সবই আসলে চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপার।

যদি সুখের সংজ্ঞা হয় ইচ্ছাপূরণ, তাহলে বলতে হয় দুটো জিনিস আমাদের সুখের সঞ্চয় খালি করে দিচ্ছে। একটা হল গণমাধ্যম, অন্যটা হল বিজ্ঞাপন শিল্প। ৫০০০ বছর আগের কোনো গ্রামের একজন আঠারো বছর বয়সী মানুষ নির্দ্বিধায় নিজেকে একজন আকর্ষণীয় মানুষ ভাবতে পারত। কারণ তার গ্রামে আর যে জনাপঞ্চাশেক মানুষ ছিল তাদের বেশিরভাগই হয় বৃদ্ধ নয়তো একেবারে শিশু। কিন্তু আজকের দিনে এরকম বয়সের একজন মানুষ সেই সন্তুষ্টিটুকু না পেয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। তার স্কুলের বাকি সবাই যদি দেখতে খারাপও হয়, তাতেও তার শান্তি নেই, কারণ সে নিজেকে তুলনা করছে চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা, খেলোয়াড় কিংবা সুপারমডেলদের সাথে। আমাদের টেলিভিশন, রাস্তার পাশের বিলবোর্ড আর ফেসবুক তাকে এই তুলনাটা করতে বাধ্য করছে।

কাজেই এমনটাও হতে পারে যে, তৃতীয় বিশ্বের মানুষের অশান্তির কারণ শুধু দারিদ্র্য, রোগবালাই, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাই নয়, তার সাথে যুক্ত হয়েছে উন্নত বিশ্বের জীবনধারাও। দ্বিতীয় রামেসেস বা ক্লিওপেট্রার যুগের চেয়ে হোসনি মোবারকের মিশরে একজন মানুষের না খেয়ে, রোগে ভুগে বা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। দুটোকে মিলিয়ে দেখলে ২০১১ সালে মিশরের একজন নাগরিকের তার সৌভাগ্যের জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে রাস্তায় নেমে নাচানাচি করার কথা। অথচ তারা মোবারককে গদি থেকে নামানোর জন্য আন্দোলন করছে। এর কারণ হল তারা নিজেদের অবস্থাকে ফারাওদের মিশরের সাথে তুলনা করে দেখছে না, তুলনা করছে সমসাময়িক ওবামার আমেরিকার সাথে।

যদি এমনই চলতে থাকে, তাহলে অমরত্বও মানুষকে সুখ দিতে পারবে না। ধরুন বিজ্ঞান একদিন সব রোগের ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলল, অথবা মানুষের বয়স বেড়ে যাওয়া ঠেকিয়ে দিয়ে মানুষের চিরযৌবনের অধিকারী হওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলল। তাহলে তার অবধারিত ফলাফল হবে পৃথিবীজুড়ে তীব্র আক্রোশ আর প্রবল দুশ্চিন্তার মহামারী।

এই ধরনের কোনো কিছু যদি কখনও আবিষ্কার হয়, তাহলে দেখা যাবে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ, যাদের এটা কেনার সামর্থ্য নেই, তারা রাগে ফেটে পড়বে। ইতিহাসে সবসময় একটা জিনিস দেখা গেছে- গরিব-দুঃখী মানুষ একটা জায়গায় সান্ত্বনা খুঁজে পায়- যে মৃত্যুর কাছে ধনী-গরিব সব সমান। সেই জায়গাটাও আর থাকবে না, দেখা যাবে গরিব মানুষ ঠিকই একদিন মারা যাবে আর ধনীরা চিরযৌবন নিয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।

image068.jpg

৪৫। আগে সৌন্দর্যের মাপকাঠি ঠিক করে দিত আশেপাশের মানুষেরা। আজ সেই কাজটা করছে গণমাধ্যম ও ফ্যাশনশিল্প। তারা আমাদের সামনে সৌন্দর্যের একটা কৃত্রিম আদর্শরূপ তুলে ধরছে। তারা সারা পৃথিবী খুঁজে সুন্দর মুখগুলো আমাদেরকে দেখায় দিনরাত। কাজেই নিজের চেহারা নিয়ে মানুষের হতাশ হওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না।

আবার এই অমরত্ব পাওয়ার সামর্থ্য যাদের হবে তারাও যে খুব সুখে থাকবে- এমন নয়। তাদেরও দুশ্চিন্তা থাকবে। এই ব্যবস্থা আয়ু বাড়াতে পারলেও মৃতকে তো আর জীবন দিতে পারবে না। কাজেই গাড়িচাপা পড়ে বা সন্ত্রাসীদের বোমা হামলার মারা পড়ার আশঙ্কাটা থেকেই যাচ্ছে। তাই অমরত্ব পাওয়া মানুষ ঝুঁকি নিতে ভয় পাবে, সামান্যতম ঝুঁকির ভিতরেও তারা যেতে চাইবে না। আর জীবনসঙ্গী, সন্তান বা বন্ধুর মতো প্রিয়জন হারানোর বেদনাটাও তাদেরই হবে সবচেয়ে বেশি।

রাসায়নিক সুখ

সমাজবিজ্ঞানীরা নানারকম প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে মানুষের ভালো থাকার সাথে বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের সম্পর্ক দেখাতে পারেন। জীববিজ্ঞানীরাও একই পদ্ধতিতেই কাজ করেন, কিন্তু তারা এর মাধ্যমে বিভিন্ন জৈবরাসায়নিক ও জিনগত বিষয়ের প্রভাব দেখান। তবে তাদের ফলাফলগুলো আরও বিস্ময়কর।

জীববিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের মানসিকতা ও আবেগঘটিত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে কিছু জৈবরাসায়নিক পদার্থ। এই ব্যবস্থাটা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তৈরি হয়েছে বিবর্তনের মাধ্যমে। অন্যান্য সব মানসিক অবস্থার মতোই আমাদের ভালো লাগার অনুভূতিও বাহ্যিক কোনো কিছুর প্রভাবে হয় না। ভালো বেতন, সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক বা রাজনৈতিক অধিকার- এর কোনোটাই আমাদের ভালো লাগার জন্য দায়ী নয়, দায়ী হল একটা জটিল স্নায়ুতন্ত্র যা গড়ে ওঠে কোটি কোটি নিউরন, সেগুলো যেখানে জোড়া লাগে সেই সব সিনাপ্স, আর সেরোটনিন, ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের মত কিছু জৈবরাসায়নিক পদার্থের সমন্বয়ে।

লটারি জিতে কেউ সুখী হয় না। নতুন বাড়ির মালিক হলেও না, চাকরিতে পদোন্নতি পেলেও না, এমনকি সত্যিকার ভালোবাসার মানুষটাকে পেলেও না। মানুষ কেবল একটা জিনিসেই সুখী হয়- যখন তার শরীরে আনন্দের অনুভূতি হয়, তখন। একজন মানুষ যখন লটারিতে অনেকগুলো টাকা পেয়ে যায় কিংবা তার প্রিয় মানুষটাকে খুঁজে পায়, তখন তার আনন্দের যে বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, সেটা কিন্তু ওই টাকা বা মানুষটার জন্য নয়। এর জন্য দায়ী তার রক্তস্রোতে ছুটে বেড়ানো বিভিন্ন হরমোন আর মস্তিষ্কের ভিতরে তড়িৎ সংকেতের ঝড়।

তবে দুঃখের ব্যাপার হল, এই জৈবরাসায়নিক পদ্ধতিটা এমনভাবেই তৈরি হয়েছে যে সেটা আমাদের সুখের মাত্রাটাকে যত খুশি বাড়তে দেয় না। সুখ জিনিসটার উপর প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে না। এই যেমন একজন সুখী সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর জিন বিলুপ্ত হয়ে যায়, আবার প্রবল দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বাবা-মায়ের জিন ঠিকই সন্তানের মধ্যে টিকে থাকে। সুখ-দুঃখ মানুষের টিকে থাকা আর বংশবিস্তারে প্রভাব ফেলতে পারে- বিবর্তনে এদের ভূমিকা বড়জোর এইটুকুই। হয়তো এমনও হতে পারে যে, বিবর্তনই আমাদের এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে আমাদের সুখ-দুঃখ কোনোটাই খুব বেশি না হয়। তাই আমাদের সাময়িক আনন্দের অনুভূতি হয় ঠিকই, কিন্তু সেটা স্থায়ী হয় না। আগে হোক বা পরে হোক, সুখটুকু মুছে গিয়ে আবার দুঃখকে জায়গা করে দেয়।

উদাহরণ হিসেবে যৌনতার কথা বলা যায়। বিবর্তন পুরুষের জিন নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াটাকে আনন্দময় করে তুলেছে। এই আনন্দটুকু না থাকলে খুব কম পুরুষই এই কাজে আগ্রহী হতো। আবার একই সাথে বিবর্তন এমন ব্যবস্থাও করেছে যাতে এই আনন্দ বেশি সময় স্থায়ী না হয়। এই আনন্দ চিরস্থায়ী হলে পুরুষেরা হয়তো খাবার খুঁজতে যেত না, বা অন্য কোনো নারীকেও খুঁজত না।

অনেকে এই জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াকে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের সাথে তুলনা করেন। বাইরে তুষারঝড়ই হোক কিংবা রোদে ঝলসে যাক, শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ঘরের ভিতরের তাপমাত্রাকে এক জায়গায় স্থির করে রাখে। কোনো কারণে সাময়িকভাবে ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে কিংবা কমে যেতে পারে, কিন্তু এই যন্ত্র আবার সেটাকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে আসে।

এসব যন্ত্রের কোনোটা ঘরের তাপমাত্রা পঁচিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরে রাখে, কোনোটা বিশে। মানুষের ব্যাপারটাও এমনই। মানুষের সুখ-দুঃখকে এক থেকে দশের মধ্যে নম্বর দিলে এক এক জনের নম্বর এক এক রকম হবে। হয়তো দেখা যাবে সহজাতভাবেই হাসিখুশি কোনো মানুষের মানসিক অবস্থা ছয় থেকে দশের মধ্যে ওঠানামা করে, গড়ে আটের আশেপাশে থাকে। এইরকম একজন মানুষ যদি কোনো ব্যস্ত শহরে একা থাকে, যদি একদিন শেয়ার বাজারে তার সব টাকা লোকসান হয় আর পরের দিনই তার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, তবু তাকে খুব একটা দুঃখিত হতে দেখা যায় না। আবার অনেকের মানসিক অবস্থা এমনিতেই তিন থেকে সাতের মধ্যে থাকে, গড়ে পাঁচের কাছাকাছি। এরকম একজন মানুষ অনেক বন্ধুবান্ধবের ভিতরে থেকে, লটারিতে কয়েক লাখ টাকা জিতে অলিম্পিক অ্যাথলেটদের মত স্বাস্থ্য নিয়েও মন খারাপ করে থাকে। আসলেই, আমাদের সবচেয়ে মনমরা বন্ধুটা যদি একদিন সকালে উঠেই দেখে সে এক কোটি টাকার লটারি জিতে গেছে, তারপর দুপুরবেলার মধ্যে এইডস আর ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলে, বিকাল নাগাদ ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনের মধ্যে একটা শান্তিচুক্তি করে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে দেখে যে তার কয়েক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাটা ঘরে ফিরে এসেছে, তবু তার খুশির মাত্রা সাতের উপরে ওঠে না। ঘটনা যা-ই হোক, তার মস্তিষ্কটাই আসলে খুব বেশি খুশি হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।

নিজের আশেপাশের মানুষদের কথাই ভাবুন। এমন একজনকে নিশ্চয়ই খুঁজে পাবেন যে যেকোনো অবস্থায় হাসিখুশি থাকতে পারে। আবার এমন কাউকেও পাবেন যে কোনো কিছুতেই খুশি হয় না। আমাদের ধারণাটাই হয়ে গেছে এমন যে আমরা ভাবি একটা ভালো জায়গায় কাজ করলে, বিয়ে করলে, অর্ধেক লেখা উপন্যাসটা শেষ করলে, নতুন একটা গাড়ি কিনলে কিংবা ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া টাকাটা শোধ করে দিলে তার মতো সুখ আর কিছুতে নেই। কিন্তু সেই ইচ্ছাটা পূরণ হয়ে গেলেও দেখা যায় সেই সুখ আর আসে না। কারণ গাড়ি কেনা বা উপন্যাস লেখা আমাদের ভিতরে স্থায়ী কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায় না। একটা সাময়িক সুখের অনুভূতি দিতে পারে বড়জোর, কিন্তু সেটা কেটে যেতেও সময় লাগে না।

তাহলে একটু আগে যে সুখের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলো নিয়ে কথা হচ্ছিল, তার সাথে এই জৈবরাসায়নিক ব্যাখ্যার সামঞ্জস্যটা কোথায়? এই যেমন, বিবাহিত মানুষ অবিবাহিত মানুষের চেয়ে বেশি সুখী হয়- তার ব্যাখ্যা কী? প্রথমে এটা মেনে নিতে হবে যে, বিয়ে করা আর সুখী হওয়া- কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এ দুটো ঘটনা একসাথে হওয়ার উদাহরণ অনেক বেশি আছে বটে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে একটার কারণে অন্যটা হচ্ছে। হ্যাঁ, একজন গড়পড়তা বিবাহিত মানুষ একজন অবিবাহিত মানুষের চেয়ে সুখী, কিন্তু তাই বলে এটা বলা যাবে না যে বিয়েই তার সুখের উৎস। বরং উল্টোটা হতে পারে- সুখটাই আসলে বিয়ের কারণ। আসলে সেরোটনিন, ডোপামিন ও অক্সিটোসিন- এই তিনটাই বিয়ে হওয়া ও বিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য দায়ী। অনেক মানুষ জন্মগতভাবেই হাসিখুশি ধরনের হয়। এরকম একজন মানুষ জীবনসঙ্গী হিসেবেও ভালো হওয়ার কথা, কাজেই তার বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আবার একজন বিষণ্ণ মানুষের চেয়ে একজন হাসিখুশি মানুষের সাথে বসবাস করা বেশি উপভোগ্য, তাই এরকম মানুষের বিবাহ-বিচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনাও কম। কাজেই দুদিক থেকেই চিন্তা করলে দেখা যাচ্ছে গড়ে একজন বিবাহিত মানুষ একজন অবিবাহিত মানুষের চেয়ে সুখী, কিন্তু তার মানে এটা নয় যে একজন বিষণ্ণ মানুষ বিয়ে করে ফেললেই রাতারাতি সে একজন সুখী মানুষ হয়ে যাবে।

জীববিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বের উপর জোর দিলেও মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিষয়গুলোকেও তাঁরা উড়িয়ে দেন না। আমাদের মানসিক অবস্থার একটা সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা আছে। যেকোনো দিকেই এই সীমা অতিক্রম করাটা প্রায় অসম্ভব। তবে বিয়ে ও বিবাহ-বিচ্ছেদের মতো ঘটনায় সেটা হতেও পারে। যে মানুষ জন্মেছেই গড়ে পাঁচ মাত্রার অনুভূতি নিয়ে, তাকে কখনওই রাস্তায় নাচতে দেখা যাবে না। অথচ একটা সুখী বিবাহিত জীবন পেলে তার সুখী ভাবটা মাঝেমধ্যেই সাত মাত্রায় উঠতে পারে। হয়তো সেটা আর তিনের কাছাকাছি যাবেই না।

যদি আমরা সুখের এই জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটা মেনে নিই, তাহলে ইতিহাসের আর তেমন গুরুত্ব থাকে না। কারণ ইতিহাস তো আর এসব জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে না। হ্যাঁ, সেরোটনিন নিঃসরণ করার মতো ঘটনা ইতিহাসে আছে বটে, কিন্তু তাতে তো আর মানুষের রক্তে সেরোটোনিনের মাত্রা বদলায় না। কাজেই মানুষের সুখী হওয়ার পিছনে ইতিহাসের কোনো ভূমিকাও নেই।

চলুন, মধ্যযুগের একজন ফরাসি কৃষকের জীবনের সাথে আজকের প্যারিসের একজন ব্যাংক কর্মকর্তার জীবনকে মিলিয়ে দেখি। কৃষক থাকত একটা কাদামাটির ঘরে, সেটা এমনভাবে তৈরি করা যেন সেখান থেকে শূকরের খোঁয়াড়টার উপর নজর রাখা যায়। ওদিকে ব্যাংক কর্মকর্তা থাকে আধুনিক প্রযুক্তির জিনিসপত্রে ভরা একটা বড় দালানের সবচেয়ে উপরতলায়, যার জানালা দিয়ে তাকালেই বিরাট শাঁজেলিসি এভিনিউ দেখা যায়। এটুকু জেনেই আমাদের মনে হয় কৃষকের চেয়ে এই কর্মকর্তার জীবন কত সুখের। অথচ আসল ব্যাপার হল, মানুষের সুখের উপর এই কাদামাটির ঘর, উঁচু দালানের ঘর, শূকরের খোঁয়াড় বা চওড়া রাস্তার কোনো ভূমিকাই নেই। সেরোটোনিনের আছে। সেই মধ্যযুগের কৃষক যখন তার কাদামাটির ঘরটা বানাল, তখন তার মস্তিষ্কের নিউরনে সেরোটোনিন ক্ষরণ শুরু হল। ধরা যাক সেই মুহূর্তে তার সেরোটোনিনের মাত্রা হল X। আবার, ২০১৪ সালে ব্যাংক কর্মকর্তাটি যখন তার নতুন বাসার দামের শেষ কিস্তিটা শোধ করল, তখন তারও সেরোটোনিনের মাত্রা দাঁড়াল X এর কাছাকাছি। অবশ্যই মাটির ঘরের চেয়ে এই দামি বাসায় থাকাটা অনেক বেশি আরামদায়ক, কিন্তু তার জন্য সেরোটোনিন নিঃসরণের কোনো হেরফের হচ্ছে না। কাজেই এই আধুনিক ব্যাংক কর্মকর্তার সুখের পরিমাণ তার কয়েক পুরুষ আগের গরিব কৃষকের চেয়ে একটুও বেশি নয়।

এই ব্যাপারটা ব্যক্তিগতভাবে যেমন সত্য, সমষ্টিগতভাবেও সেটা একই রকম সত্য। উদাহরণ হিসেবে ফরাসি বিপ্লবের কথাই ধরুন। সে সময়ে বিপ্লবীরা অনেক কিছু করেছিল। তারা রাজাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, কৃষকের হাতে জমির মালিকানা দিয়েছে, মানবাধিকার নিশ্চিত করেছে, অভিজাতদের বাড়তি সুবিধা পাওয়া বন্ধ করেছে, আর তার সাথে সারা ইউরোপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। কিন্তু এর কোনো কিছুই ফরাসিদের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলেনি। ফলে দেখা গেল এই এত বড় রাজনৈতিক, সামাজিক, আদর্শিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসার পরেও ফরাসি জাতির সুখের উপর তার প্রভাব পড়েছে সামান্যই। যারা জন্মগতভাবেই হাসিখুশি তারা বিপ্লবের আগেও যেমন সুখী ছিল পরেও তেমনই ছিল। আবার যারা এমনিতেই বিষণ্ণ ধরনের তারা বিপ্লবের আগে রাজা ষোড়শ লুই ও রাণী আঁতোয়ানেতকে (Marie Antoinette) নিয়ে অভিযোগ করত, বিপ্লবের পরে তারা রোবেস্পিয়ের (Robespierre) আর নেপোলিয়নের নামে বিষোদগার করতে থাকল।

যদি তাই হয়, তাহলে ফরাসি বিপ্লবে লাভটা কী হল? মানুষের সুখ যদি আগের চেয়ে একটুও না বাড়ে, তাহলে এত বিশৃঙ্খলা, ভয়ভীতি, রক্তপাত, যুদ্ধ- এসব কেন? জীববিজ্ঞানীরা এই বিপ্লব করলে তারা কখনোই বাস্তিল (Bastille) দুর্গ আক্রমণ করতে যেত না। মানুষ ভেবেছিল এই রাজনৈতিক বিপ্লব ও সামাজিক সংস্কার তাদের আরও সুখী করবে, কিন্তু তাদের শরীরের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া বার বার তাদের ধোঁকা দিয়েছে।

তবে একটা ব্যাপারের গুরুত্ব আছে। আজ আমরা জানি, আমাদের সুখের মূলে আছে আমাদের শরীরের কিছু জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া। কাজেই এখন আমরা রাজনীতি, সমাজ-সংস্কার, সরকার-বিরোধী কিংবা নৈতিক আন্দোলন- এসবে সময় নষ্ট না করে বরং সেই জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াটাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিতে পারি। কারণ সুখের উৎসটা ওখানেই। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে আর কীভাবে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেই গবেষণায় যদি এখন থেকে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে একসময় কোনোরকম বিপ্লব ছাড়াই মানুষ এত সুখী হতে পারবে যা আগে কখনও সম্ভব হয়নি। এই যেমন প্রোজ্যাক (Prozac) নামের ওষুধটা দেশের সরকারকে গদি থেকে নামাতে পারে না, কিন্তু একজন মানুষের শরীরে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে তার বিষণ্ণতা দূর করতে পারে।

আজকাল একটা স্লোগান খুব শোনা যায়- ‘সুখের শুরুটা হয় ভিতর থেকে’ (Happiness Begins Within)। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর চেয়ে মোক্ষম স্লোগান আর হয় না। আসলেই, টাকা, সামাজিক মর্যাদা, প্লাস্টিক সার্জারি, সুন্দর বিলাসবহুল বাড়ি, ক্ষমতা- এগুলোর কোনোটাই মানুষকে সুখ এনে দিতে পারে না। স্থায়ী সুখ দিতে পারে কেবল তিনটা জিনিস- সেরোটোনিন, ডোপামিন আর অক্সিটোসিন।১

১৯৩২ এ প্রকাশিত আলডাস হাক্সলির (Aldous Huxley) কল্প-উপন্যাস ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’ এ দেখান হয়েছে, কীভাবে ভবিষ্যতের এক বিষণ্ণ সময়ে সুখ হয়ে যায় মানুষের পরমারাধ্য বস্তু, আর কীভাবে মন-নিয়ন্ত্রক ওষুধ নিয়ে নেয় পুলিশের জায়গা। সেখানে মানুষ প্রতিদিন ‘সোমা’ (Soma) নামের ওষুধের গুণে সুখে থাকে। পৃথিবীজুড়ে প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বরাজ্যে’ যুদ্ধ-বিপ্লব-ধর্মঘট কিছু নেই, কারণ সবাই যার যার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট, কারও কোনও অভিযোগ নেই। জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ নামক উপন্যাসের চেয়েও হাক্সলির দেখানো এই পৃথিবী পাঠকের কাছে বেশি ভয়ঙ্কর মনে হয়। কিন্তু কেন? এর ব্যাখ্যা দেওয়া সহজ নয়। আসলেই তো, যদি সবাই সবসময় সুখেই থাকে, তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

জীবনের অর্থ

হাক্সলির উপন্যাসে কল্পিত ভীতিকর পৃথিবীতে যেটা ধরে নেওয়া হয়েছে তা হল সুখ হচ্ছে আনন্দের অনুভূতি। সুখী হওয়া মানে হল নিখাদ শারীরিক আনন্দলাভ, আর কিছুই না। যেহেতু আমাদের শরীর দীর্ঘ সময় ধরে এই আনন্দের অনুভূতি ধরে রাখতে পারে না, তাই মানুষকে অনেক সময় ধরে সুখে রাখার জন্য শরীরের কলকব্জাগুলো একটু এদিক-সেদিক করতেই হবে।

কিন্তু সুখের এই ধারণাটা নিয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিভেদ আছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কানেম্যান (Daniel Kahneman) একবার একটা বিখ্যাত পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। এই পরীক্ষায় কিছু মানুষকে তাদের একটা কর্মদিবসের বর্ণনা দিতে বলা হয়। তাদের বলা হয় দিনের সবগুলো ঘটনা ধাপে ধাপে বর্ণনা করে সেগুলো কতটুকু ভালো বা খারাপ লেগেছে সেটা বলতে। কানেম্যান দেখলেন, এই জরিপের ফলাফল, অর্থাৎ জীবনের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে ধাঁধায় ফেলে দেয়। উদাহরণ হিসেবে শিশুপালনের কথাই ধরুন। একটা বাচ্চাকে লালনপালন করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় আনন্দদায়ক ও কষ্টদায়ক, দুরকমেরই কাজ আছে। সত্যি বলতে সেখানে কষ্টদায়ক কাজের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। শিশুপালনের বেশিরভাগ জুড়ে আছে বাচ্চার ভেজা কাঁথা বদলানো, প্রচুর থালাবাসন ধোয়া আর তাদের সব উৎপাত সহ্য করা। এর একটাও তো কোনও উপভোগ্য কাজ নয়। অথচ প্রায় সব মা-বাবাই একবাক্যে স্বীকার করবে, তাদের সন্তানই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার মানে কি এই যে, মানুষ আসলে জানেই না যে তার জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ?

এ তো গেল একটা মত। অন্য একটা পরীক্ষায় দেখা গেছে যে সুখ কেবল মানুষের আনন্দদায়ক ও কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার যোগবিয়োগের ফলাফল নয়। বরং একজন মানুষের নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ হিসেবে দেখতে পারাটাই সুখ। হ্যাঁ, সুখ কেবল জৈবিক ব্যাপার নয়। এখানে মানুষের চেতনা ও মূল্যবোধেরও একটা জায়গা আছে। সন্তানপালনকে আমরা ‘একটা স্বৈরাচারী শিশুর আজ্ঞাবহ দাস হয়ে থাকা’ হিসেবে দেখব নাকি ‘একটা নতুন জীবনকে ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তোলা’ হিসেবে দেখব, সেটা নির্ধারণ করে আমাদের মূল্যবোধ।২ নিটশে (Nietzsche) বলেছেন, বেঁচে থাকার পিছনে যদি কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে যেভাবেই হোক, বেঁচে থাকা যায়। কষ্টে ভরা জীবনও প্রচণ্ড স্বস্তিদায়ক হতে পারে, যদি সেই জীবন ধারণের পিছনে কোনও উপযুক্ত কারণ থাকে। আবার একটা অর্থহীন জীবন অনেক আরামের মাঝেও দুঃসহ হয়ে ওঠে।

পৃথিবীর সব সভ্যতা ও সব যুগের মানুষই প্রায় একই রকমের আনন্দ ও কষ্টের ভিতর দিয়ে গিয়েছে, তারপরেও জীবনের অর্থ এক এক মানুষের কাছে এক এক রকম। সেদিক থেকে দেখলে সুখ জিনিসটাকে জীববিজ্ঞানীরা যতটা সহজভাবে দেখেন আসলে তা তত সহজ নয়। আর সেটা আধুনিকতার পক্ষেও যায় না। জীবনকে একেবারে প্রতি মিনিট ধরে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মধ্যযুগের মানুষের জীবন ছিল খুবই কঠিন। তখন যারা পরকালের অনন্ত সুখের জীবনের কথা বিশ্বাস করত, তাদের কাছে নিজের জীবন যথেষ্টই অর্থপূর্ণ ছিল। তার তুলনায় এখনকার একজন নির্ধার্মিক মানুষের জীবনের শেষ পরিণতি হল অর্থহীন বিস্মৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া। ‘মোটের উপর তোমার জীবন নিয়ে কি তুমি সন্তুষ্ট?” এরকম একটা প্রশ্ন দিয়ে যদি একটা জরিপ চালানো যেত সেখানে মধ্যযুগের মানুষেরই বেশি নম্বর পাওয়ার কথা।

তার মানে কি এই যে মধ্যযুগের মানুষেরা পরকালের অলীক কল্পনার মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়ে সুখী ছিল? আসলেই তাই। যতক্ষণ এই কল্পনার বেলুন চুপসে না যাচ্ছে, ততক্ষণ এই কল্পনায় সুখী হতে বাধা কোথায়? তবে বিজ্ঞানের চোখে দেখলে মানবজীবন সম্পূর্ণ অর্থহীন। এই মানুষ নামের প্রাণী প্রজাতিটা আসলে অন্ধ ও উদ্দেশ্যহীন বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফল। আমরা যা কিছু করি তা কোনও মহাজাগতিক পরিকল্পনার অংশ নয়। কাল সকালেই যদি এই পৃথিবী নামক গ্রহটা ধ্বংস হয়ে যায়, তাতে এই মহাবিশ্বের কিছু আসবে যাবে না। বাকি সবকিছু তার নিজের মতোই চলতে থাকবে। অন্তত এটুকু বলা যায় যে মানুষের অনুপস্থিতির কোনো প্রভাব কোথাও পড়বে না। কাজেই দেখা যাচ্ছে মানুষ জীবনের অর্থ নিয়ে যত কথাই বলুক, তার সবটাই আসলে কল্পনা। জীবনের মধ্যে এইসব অপার্থিব অর্থ কেবল মধ্যযুগের মানুষই খুঁজে বের করেনি, সেটা এখনকার মানবতাবাদী, জাতীয়তাবাদী আর পুঁজিবাদী মানুষেরাও যার যার মতো করে যাচ্ছে। একজন বিজ্ঞানী ভাবে মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার আরেকটু সমৃদ্ধ করাটাই জীবনের অর্থ, সৈনিকের কাছে জীবনের অর্থ হল তার দেশকে রক্ষা করা, আবার একজন উদ্যোক্তার কাছে জীবনের মানে হল নিজের গড়া একটা প্রতিষ্ঠান। মধ্যযুগের অনেক মানুষের কাছে জীবন মানে ছিল ধর্মগ্রন্থ পড়া, ধর্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করা আর ধর্মপ্রচারের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। তাহলে তাদের সাথে এখনকার এই মানুষগুলোর পার্থক্য আর কী থাকল?

তার মানে সুখ জিনিসটা সম্ভবত শুধু ব্যক্তিগত ভালো থাকা নয়। সুখ হল সমাজে বিরাজমান সামষ্টিক কল্পনাগুলোর সাথে একজন মানুষের নিজের কল্পনাগুলো এক সুরে মিলিয়ে নেওয়া। যখন একজন মানুষের জীবনবোধ তার আশেপাশের আর দশজনের জীবনবোধের সাথে মিলে যায়, তখনই সে জীবনের অর্থ খুঁজে পায়, নিজেকে সুখী ভাবে।

তবে এই সিদ্ধান্তে আসাটা কিছুটা হতাশাজনকও। সুখ কি আসলেই কল্পনানির্ভর?

নিজেকে জানো

সুখ যদি আনন্দের অনুভূতি হয়, তাহলে সুখী হতে হলে আমাদের শরীরের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর সুখ যদি হয় জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া, তাহলে সুখী হওয়ার জন্য নিজেকে আরও ভালোভাবে ভাসিয়ে দিতে হবে কল্পনায়। এই দুটো ছাড়া সুখী হওয়ার আর কোনও উপায় কি আছে?

এই দুটো ধারণার মধ্যেই একটা জিনিস আছে। সেটা হল, এখানে ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে সুখ হল একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার, সেটা আনন্দই হোক বা জীবনের অর্থ। কাজেই একটা মানুষ সুখী কিনা তা জানতে হলে তার অনুভূতি জানতে হবে। অনেকের কাছে এটাই স্বাভাবিক মনে হবে, কারণ আমরা এখন বাস করছি একটা উদারনৈতিক সময়ে। এই উদারনৈতিক চিন্তাধারা মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির পক্ষেই যাবে। উদারনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অনুভূতিই মানুষের সব কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক। একজন মানুষের কাছে কী ভালো আর কী মন্দ, কোনটা সুন্দর আর কোনটা অসুন্দর, কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়- তার সবকিছুই সে ঠিক করে নেয় তার নিজের মতামত থেকে।

উদারনৈতিক রাজনীতির মূল কথা হল, যারা ভোট দেবে তারাই সবচেয়ে ভালো জানে, তাদেরকে ভালো-মন্দের জ্ঞান দেওয়ার জন্য কোনও কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন নেই। উদারনৈতিক অর্থনীতি বলে, ক্রেতার মতামতই শিরোধার্য, এর উপরে আর কোনও কথা নেই। উদারনৈতিক শিল্পে সৌন্দর্য জিনিসটা আপেক্ষিক, তা কেবল দর্শকের রুচির উপরেই নির্ভর করে। উদারনীতিতে চলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদেরকে নিজের মতো করে চিন্তা করতে শেখায়। বিজ্ঞাপনগুলো আমাদের বলতে চায়, ‘যা করতে ইচ্ছা হয়, করে ফেলো!’। এ যুগের চলচ্চিত্র, নাটক, উপন্যাস, গান- সবকিছুর মধ্যেই সেই একই বার্তা- ‘নিজের কাছে সৎ থাকো’, ‘নিজের মনের কথা শোনো’ কিংবা ‘মন যা চায়, তাই করো’। ফরাসি দার্শনিক জাঁ-জ্যাক রুসো তো সোজাসুজিই বলেছেন, “যেটা আমার কাছে ভালো, সেটাই ভালো, আর যা আমার কাছে খারাপ, তা-ই খারাপ”।

যে মানুষটা একেবারে শিশুকাল থেকে এসব কথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছে, তার কাছে সুখ অবশ্যই একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। একজন মানুষ সুখে আছে কি না সেটা নির্ণয় করতে পারে কেবল সে নিজেই, অন্য কেউ নয়। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল এই উদারনীতিতেই দেখা যায়। ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন ধর্ম ও আদর্শিক মতবাদ সুখের নানা রকম নৈর্ব্যক্তিক মাপকাঠি প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব মতবাদে সুখ জিনিসটা একজন ব্যক্তির নিজের মতামত বা অনুভূতির ঊর্ধ্বে বলেই মনে করা হয়। ডেলফিতে অবস্থিত অ্যাপোলোর মন্দিরের প্রবেশদ্বারেই তীর্থযাত্রীরা দেখতে পেত লেখা আছে, ‘নিজেকে জানো’। এই কথার গূঢ় অর্থ হল, গড়পড়তা একজন মানুষ তার নিজের সম্পর্কেই আসলে জানে না, তাই সুখের সন্ধানও সে আর পায় না। এই কথাটার সাথে ফ্রয়েডও সম্ভবত একমত হতেন।*

খ্রিস্টধর্মের ব্যাপারেও একই কথা খাটে। সেইন্ট পল ও সেইন্ট অগাস্টিন বিলক্ষণ জানতেন, যে বেশিরভাগ মানুষ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা ও যৌনতা- এ দুয়ের মধ্যে দ্বিতীয়টাই বেছে নেবে। তাহলে কি যৌনতাই সুখের উৎস? পল ও অগাস্টিনের উত্তর হল, না। এতে কেবল এটাই প্রমাণিত হয় যে, পাপ করাটাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, মানুষ সহজেই শয়তানের ফাঁদে পা দেয়। খ্রিস্টধর্মের চোখে বেশিরভাগ মানুষের অবস্থা আসলে হেরোইনে আসক্তদের মতো। ধরুন একজন মনোবিজ্ঞানী মাদকাসক্ত মানুষের কাছে সুখের সন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পেলেন, মানুষ কেবল মাদক গ্রহণ করলেই সুখী হয়। তাহলে কি তিনি তার গবেষণাপত্রে লিখবেন, যে হেরোইনই হল সুখের চাবিকাঠি?

অনুভূতি জিনিসটা যে সুখের কোনও নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি নয়, এ কথা কেবল খ্রিস্টানদের একার নয়। অনুভূতির প্রশ্নে ডারউইন আর ডকিন্সও হয়তো সেইন্ট পল ও সেইন্ট অগাস্টিনের সাথে একই সুরে কথা বলবেন। স্বার্থপর জিনতত্ত্ব (selfish gene theory) বলে, প্রাকৃতিক নির্বাচন অন্যান্য জীবের মতো মানুষের ক্ষেত্রেও জিনের স্বার্থই রক্ষা করে, সেটা যদি কোনও ব্যক্তির ক্ষতির কারণ হয়, তবু। অধিকাংশ পুরুষই তাদের সারা জীবন আরাম-আয়েশ না করে দুশ্চিন্তা, খাটা-খাটনি, প্রতিযোগিতা আর মারামারি করেই কাটিয়ে দেয়। কারণ তাদের ডিএনএ তার নিজের স্বার্থ রক্ষা করতেই তাকে দিয়ে এসব করিয়ে নেয়। অর্থাৎ শয়তান যেভাবে কাজ করে, ডিএনএও ঠিক সেভাবেই মানুষকে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে নিজ স্বার্থে কাজ করিয়ে নেয়।

সুখের ব্যাপারে বেশিরভাগ ধর্ম ও আদর্শের অবস্থান এই উদারনীতির চেয়ে আলাদা।৩ এগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বৌদ্ধ ধর্ম এই সুখের সন্ধানকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছে, সম্ভবত আর কোনও কিছুই সেটাকে এত গুরুত্ব দেয়নি। আড়াই হাজার বছর ধরে এই ধর্ম মানুষের সুখের কারণ ও স্বরূপ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছে। এ কারণেই বিজ্ঞানীদের মধ্যেও বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ ও এই ধর্মের বিভিন্ন রকম ধ্যানের কলাকৌশল নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।

বৌদ্ধ ধর্মের যেভাবে সুখের ব্যাখ্যা তার মূল ভাবটা অনেকটা জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মতোই। অর্থাৎ এখানেও বলা হয় যে সুখ মানুষের শরীরেই উৎপন্ন হয়, বাইরে থেকে আসে না। কিন্তু গোড়ার দিকটা একই রকম হলেও এই ধর্ম উপসংহার টেনেছে অন্যদিকে।

বৌদ্ধ ধর্মমতে মানুষ সুখ বুঝতে পারে আনন্দের অনুভূতি দিয়ে, আর দুঃখ বোঝে কষ্টের অনুভূতির মাধ্যমে। তাই মানুষ নিজের অনুভূতিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা কষ্ট এড়িয়ে আরও বেশি আনন্দ পেতে চায়। তাই আমরা যা কিছু করি- পা চুলকাই, চেয়ারে নড়েচড়ে বসি, কিংবা বিশ্বযুদ্ধই বাধাই- সবই করি আনন্দের অনুভূতি পাওয়ার জন্যই।

কিন্তু সমস্যাটা অন্যখানে। বৌদ্ধ ধর্ম বলে, মানুষের এই সুখ আর দুঃখ নিয়ত পরিবর্তনশীল, অনেকটা সাগরের ঢেউয়ের মতো, আসে আর যায়। পাঁচ মিনিট আগেও যে মানুষটা নিজেকে সুখী ভাবছিল, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছিল, পাঁচ মিনিট যেতেই সেই সুখটুকু সরে গিয়ে দুঃখ এসে তাকে গ্রাস করে। তার মানে সুখী হতে হলে তাকে সারাক্ষণ সুখের পিছনে ছুটতে হবে, আর দুঃখ থেকে পালিয়ে বেড়াতে হবে। অথচ এতে যদি সে সফলও হয়, তাতেও কোনও লাভ নেই। কারণ এই অস্থায়ী সুখটুকু ফুরিয়ে গেলেই আবার সবকিছু শুরু করতে হবে প্রথম থেকে।

তাহলে এই ক্ষণস্থায়ী সুখের পিছনে ছুটে কী লাভ? যা ধরে রাখা যায় না তাকে পাওয়ার জন্য কেন এই পণ্ডশ্রম? বৌদ্ধ ধর্ম বলে, মানুষের এই দুর্ভোগের কারণ আসলে এই দুঃখ-কষ্ট নয়। সুখ-দুঃখের এই অর্থহীনতাও নয়। বরং সুখের পিছনে এই অবিরাম অর্থহীন ছুটে বেড়ানোই দুঃখের কারণ। এতে সুখের দেখা তো মেলেই না, বরং দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও অপ্রাপ্তিতে ভরে যায় জীবন। সুখের পিছনে ছুটে কেউ কোনোদিন সন্তুষ্ট হতে পারে না। এমনকি ক্ষণস্থায়ী আনন্দের সময়ও মনের ভিতর উঁকি দিয়ে যায় দুশ্চিন্তা, কারণ এই সুখও তো এক সময় ফুরিয়ে যাবে।

ক্ষণস্থায়ী সুখ মানুষকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে না। এর থেকে মুক্তি মেলে তখনই, যখন সে বুঝতে পারে যে সুখ ক্ষণস্থায়ী, আর বুঝতে পেরে সে সুখের পিছনে ছোটা বন্ধ করে। বৌদ্ধ ধর্মে ধ্যানের উদ্দেশ্য এটাই। ধ্যানের মাধ্যমে মানুষ তার দেহ ও মনকে ভালোভাবে জানতে পারে, অনুভূতির ওঠানামা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে পায়, ফলে বুঝতে পারে এসব কতটা অর্থহীন। এভাবে সুখের সন্ধান বন্ধ করতে পারলেই মনে ধীরতা ও প্রশান্তি আসে। মনের ভিতরে সবরকম অনুভূতি আসবে যাবে- আনন্দ, ক্রোধ, হতাশা কিংবা কামনা যাই হোক- কিন্তু বিশেষ কোনও অনুভূতির জন্য তীব্র বাসনা ত্যাগ করতে পারলেই সবকিছু সহজ হয়ে যায়। কী হতে পারত সেই চিন্তা বাদ দিয়ে কী হচ্ছে সেটাই বড় হয়ে ওঠে।

এই মানসিক প্রশান্তির অনুভূতি এতটাই গভীর যে সারাজীবন সুখের পিছনে ছুটে বেড়ানো একজন মানুষ সেটা কল্পনাও করতে পারে না। ধরুন একজন মানুষ বছরের পর বছর ধরে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে ‘ভালো’ ঢেউগুলোকে ধরে রাখতে আর ‘খারাপ’ ঢেউগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইছে। তার সারাজীবন এভাবে কেটে যাবে, কিন্তু এই কাজে সে সফল হবে না কোনোদিন। অথচ সে যদি এই ব্যর্থ চেষ্টা না করে চুপচাপ বসে সবগুলো ঢেউকে আসতে-যেতে দেয়, তাহলেই তার জীবন ভরে উঠবে প্রশান্তিতে।

কিন্তু এই ধারণাটা আধুনিক পৃথিবীতে এত খাপছাড়া লাগে যে এখনকার উদারনৈতিক মানুষ এটাকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। এখনকার ধারণাটা অনেকটা এমন, “সুখ আসলে বাইরের কোনও কিছুর উপর নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে আমাদের অনুভূতির উপর। তাই মানুষের টাকা, মর্যাদা এসবের পিছনে না ছুটে তার নিজের মানসিক শান্তির দিকে নজর দেওয়া উচিত।” অথবা আরও কম কথায় বলতে গেলে “সুখ আসে ভিতর থেকে।” ঠিক এই কথাটাই জীববিজ্ঞানীরাও বলেন, কিন্তু তারা বোঝাতে চান বুদ্ধ যা বলেছেন তার উল্টোটা।

এই আধুনিক মতবাদ আর জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সাথে বুদ্ধের বাণীর মিল শুধু এইটুকুই। কিন্তু আসল জায়গাটাতেই, অর্থাৎ অনুভূতির ব্যাপারে অমিল আছে। বুদ্ধ বলেন যে সুখ আসলে আমাদের ভিতরের অনুভূতির উপরেও নির্ভর করে না। আসলেই, আমরা যতই আমাদের অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দিই, ততই আমাদের মধ্যে ভালো অনুভূতির চাহিদা তৈরি হয়, আর তাতে আমাদের দুর্ভোগই শুধু বাড়ে। তাই বুদ্ধের পরামর্শ হল, বাহ্যিক অর্জনের সাথে সাথে ভিতরের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াও বন্ধ করতে হবে।

‘ভালো থাকা’ বিষয়ক প্রশ্নে জরিপ চালালে একজন মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি, ব্যক্তিগত সুখ ও আবেগের খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে বৌদ্ধধর্মের মতো কিছু কিছু ধর্ম ও দর্শন বলে, এসব আবেগ-অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে একজন মানুষের নিজেকে পুরোপুরি জানতে পারা, চিনতে পারার মাধ্যমেই মিলবে প্রকৃত সুখের সন্ধান। বেশিরভাগ মানুষই যে ভুলটা করে তা হল, তারা নিজের অনুভূতি, নিজের চিন্তা, পছন্দ-অপছন্দ- এসবের মাঝে নিজের পরিচয় খোঁজে। এর ফলে সারা জীবন ধরে তারা কিছু অনুভূতির পিছু তাড়া করে, আর কিছু অনুভূতি থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। এসব অনুভূতির কারাগারে আটকে থাকা এই মানুষগুলো কখনও বুঝতেই পারে না, যে সুখ আর দুঃখ নয়, বরং এই ছুটে চলা আর পালানোর মনোবৃত্তিই তাদের কখনও মুক্তি দেয় না।

যদি তাই হয়, তাহলে বলা যায় যে সুখের ব্যাপারে আমরা যা যা জেনেছি তার সবই ভুল। একজন মানুষের ইচ্ছাগুলো পূরণ হচ্ছে কি না, বা সে আনন্দ পাচ্ছে কি না- হয়তো সেসবের তেমন কোনও গুরুত্বই নেই। আসল প্রশ্ন হল মানুষ নিজের সম্পর্কে সত্যটা জানতে পারছে কি না। যদি এদিক থেকেই চিন্তা করি, তাহলে সেই আদিম শিকারি-সংগ্রাহক মানুষ বা মধ্যযুগের কৃষকদের চেয়ে আমরা এই সত্যটা কতটুকু বেশি জানতে পেরেছি?

সুখের ইতিবৃত্ত নিয়ে জোরেশোরে গবেষণা শুরু হয়েছে অল্প কয়েক বছর হল। প্রাথমিক কিছু ধারণা তৈরি হচ্ছে, গবেষণা কীভাবে হবে সেসব কর্মপদ্ধতি যাচাই করে দেখা হচ্ছে। কাজেই এখনই এ ব্যাপারে কোনও জোরালো দাবি করা যাচ্ছে না। বরং এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যতভাবে সম্ভব কাজ চালিয়ে যাওয়া ও সঠিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

ইতিহাসের অধিকাংশ জুড়েই আছে বড় বড় মনীষীদের আদর্শের কথা, বীর যোদ্ধাদের সাহসের কথা, ধার্মিক সন্ন্যাসীদের ত্যাগের কথা আর গুণী শিল্পীদের সৃজনশীলতার কথা। ইতিহাস থেকে জানা যায় কীভাবে সমাজ গড়ে ওঠে, কীভাবে তা আবার ভেঙে পড়ে, কীভাবে বড় বড় সব রাজ্য তৈরি হয়ে আবার একদিন ধ্বংস হয়ে যায়, কীভাবে নতুন নতুন আবিষ্কার হয়, কীভাবে নতুন প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। অথচ ক্ষুদ্র ব্যক্তিমানুষের সুখ-দুঃখের কথাগুলোর সেখানে ঠাঁই হয় না। সেখানে রয়ে গেছে বিশাল এক শূন্যস্থান। সেই শূন্যস্থান পূরণ করার এখনই সময়।


* বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক জরিপের উদ্দেশ্য মানুষের সুখ পরিমাপ করা হলেও মনোচিকিৎসার কেন্দ্রীয় বিষয় হল মানুষকে নিজেকে জানতে ও তাদের নিজেদের ক্ষতি করার মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করা।


1 For both the psychology and biochemistry of happiness, the following are good starting points: Jonathan Haidt, The Happiness Hypothesis: Finding Modern Truth in Ancient Wisdom (New York: Basic Books, 2006); R. Wright, The Moral Animal: Evolutionary Psychology and Everyday Life (New York: Vintage Books, 1994); M. Csikszentmihalyi, ‘If We Are So Rich, Why Aren’t We Happy?’, American Psychologist 54:10 (1999): 821–7; F. A. Huppert, N. Baylis and B. Keverne (eds.), The Science of Well-Being (Oxford: Oxford University Press, 2005); Michael Argyle, The Psychology of Happiness, 2nd edition (New York: Routledge, 2001); Ed Diener (ed.), Assessing Well-Being: The Collected Works of Ed Diener (New York: Springer, 2009); Michael Eid and Randy J. Larsen (eds.), The Science of Subjective Well-Being (New York: Guilford Press, 2008); Richard A. Easterlin (ed.), Happiness in Economics (Cheltenham: Edward Elgar Publishing, 2002); Richard Layard, Happiness: Lessons from a New Science (New York: Penguin, 2005).

2 Daniel Kahneman, Thinking, Fast and Slow (New York: Farrar, Straus and Giroux, 2011); Inglehart et al., ‘Development, Freedom and Rising Happiness’, 278–81.

3 D. M. McMahon, The Pursuit of Happiness: A History from the Greeks to the Present (London: Allen Lane, 2006).

 

১৮. চিরস্থায়ী বিপ্লব

 

শিল্প বিপ্লব প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে প্রয়োজনমতো কাজে লাগানোর মাধ্যমে এবং নানা রকম পণ্য উৎপাদনের নিত্যনতুন উপায় উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানবজাতিকে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপর নিরুপায় নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করেছে। এরপর মানুষ বন জঙ্গল কেটে ফেলেছে, জলাভূমি শুকিয়ে ফেলেছে, নদীতে বাঁধ দিয়েছে, সমতলভূমিতে পানি এনেছে, হাজার হাজার কিলোমিটার রেললাইন বসিয়েছে আর উঁচু উঁচু ইমারতের বিশাল সব শহর বানিয়েছে। যেহেতু মানুষ পুরো পৃথিবীকেই একেবারে ঢেলে সাজিয়েছে শুধুমাত্র নিজেদের বসবাসের জন্য, সেটা করতে গিয়ে তারা অন্য অনেক প্রাণীর বাসস্থান ধ্বংস করে ফেলেছে আর অনেক প্রজাতি হয়েছে নিশ্চিহ্ন। আমাদের এক সময়কার নীল-সবুজ পৃথিবী এখন হয়েছে কংক্রিট আর প্লাস্টিকের এক বিশাল বাজার।

আজকে পৃথিবীর মহাদেশগুলোতে সব মিলিয়ে প্রায় ৭০০ কোটি মানুষের বসবাস। এতগুলো মানুষকে এক জায়গায় করে একটা বিশাল দাঁড়িপাল্লায় ফেলতে পারলে তাদের মোট ভর হতো প্রায় ৩০ কোটি টন। তারপর যদি আমাদের সকল গৃহস্থালি পশুকে নেওয়া হয়, যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া, শুয়োর আর মুরগি তাহলে তাদের মোট ভর দাঁড়াবে প্রায় ৭০ কোটি টন। অন্যদিকে বাকি সমস্ত জীবিত প্রাণীদের যদি নেওয়া হয় – সজারু আর পেঙ্গুইন থেকে শুরু করে হাতি আর তিমি পর্যন্ত – সব মিলিয়ে ১০ কোটি টনেরও কম হবে। অথচ আমাদের শিশুদের বই, আমাদের মূর্তিশিল্প কিংবা আমাদের টেলিভিশনের পর্দাগুলো এখনও ভরে থাকে জিরাফ, নেকড়ে আর শিম্পাঞ্জিতে। সত্যিকার পৃথিবীতে তাদের সংখ্যাটা খুবই অল্প। পৃথিবীতে এখন প্রায় আশি হাজার জিরাফ আছে যেখানে গবাদিপশু আছে প্রায় দেড়শ কোটি; দুই লাখ নেকড়ে অবশিষ্ট আছে যেখানে চল্লিশ কোটি পোষা কুকুর; মাত্র আড়াই লাখ শিম্পাঞ্জী আছে যেখানে কোটি কোটি মানুষ। অস্বীকার করার আর উপায় নেই, মানুষ আসলেই পৃথিবী দখল করে ফেলেছে। ১

পরিবেশের অবক্ষয় আর সম্পদের ঘাটতি কিন্তু একরকম ব্যাপার নয়। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি মানব জাতির সম্পদের পরিমাণ দিনকে দিন বাড়ছে আর তা হয়তো বাড়তেই থাকবে। সেইজন্যেই সব সম্পদ ফুরিয়ে গেলে যে কঠিন দিন আসবে বলে ভয় দেখানো হয় সেটা আসলে ধোপে টেকে না। বরং পরিবেশের অবক্ষয় নিয়ে আমাদের যতটা ভীত হওয়া দরকার ততটা আমরা এখনও হইনি। ভবিষ্যতে হয়তো দেখা যাবে মানুষ নতুন নতুন উপকরণ আর শক্তির উৎসের প্রাচুর্য উপভোগ করছে, কিন্তু একই সময় ধ্বংস করে ফেলছে প্রাকৃতিক জগতের যা কিছু টিকে আছে তার সবকিছুই। সেই সাথে নিশ্চিহ্ন করে ফেলছে বাকি সমস্ত প্রাণিকুল।

সত্যি বলতে কি, পরিবেশের এই অশান্তি মানুষের টিকে থাকাকেই হুমকির মধ্যে ফেলে দেবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ব্যাপক মাত্রার দূষণ পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের জন্যই অনুপযুক্ত করে ফেলবে। ভবিষ্যৎ পৃথিবী হয়তো ঘনঘনই একটা যুদ্ধ দেখবে- মানুষের ক্ষমতা আর মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক দূর্যোগের পাল্টাপাল্টি যুদ্ধ। যেহেতু মানুষ প্রকৃতির শক্তির বিরুদ্ধে তার ক্ষমতা ব্যবহার করে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকে নিজের খেয়ালখুশি মত অধীনস্থ করে রাখতে চেষ্টা করে, তার ফলে হয়তো আরও বেশি বেশি অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হতে থাকবে। এরপর সেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে আরও প্রচণ্ড রকমের হস্তক্ষেপ করতে হবে পরিবেশের উপর, যার ফলাফল হবে আরও ভয়াবহ।

অনেকেই এই প্রক্রিয়াটাকে “প্রকৃতির ধ্বংসযজ্ঞ” বলছেন। এটা কিন্তু আসলে ঠিক ধ্বংসযজ্ঞ না, এটা হল পরিবর্তন। প্রকৃতি কখনও ধ্বংস করা যায় না। সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে একটা গ্রহাণু এসে পুরো ডাইনোসর প্রজাতিকে মুছে ফেলেছিল, আর তার ফলেই কিন্তু স্তন্যপায়ীদের জন্য নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছিল। আজকে মানবজাতি অনেক প্রজাতিকেই বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে, এমনকি সে নিজেও হয়তো নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ অন্য কিছু জীব কিন্তু বেশ ভালোই আছে। উদাহরণস্বরূপ, ইঁদুর আর তেলাপোকা তো এখন তাদের পূর্ণবিকাশের পথে আছে। এই কঠিন প্রাণের জীবগুলো নিজেদের ডিএনএকে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য হয়তো একদিন একটা পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের তলা থেকেও হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসবে। হয়তো আজ থেকে সাড়ে ছয় কোটি বছর পর বুদ্ধিমান ইঁদুরেরা খুব কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে মানবজাতির ঐ ধ্বংসযজ্ঞকে, ঠিক যেমন আমরা স্মরণ করি ডাইনোসরদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া গ্রহাণুটিকে।

তারপরও, আমাদের নিজেদের বিলুপ্তির গুজবটা বেশ অকালপক্ব। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানুষের জনসংখ্যা আগেকার যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক দ্রুত বেড়েছে। ১৭০০ সালের দিকে দুনিয়ায় মানুষ ছিল প্রায় ৭০ কোটি। ১৮০০ সালে এসে সেটা হল ৯৫ কোটি। ১৯০০ সালে আমরা নিজেদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করে ১৬০ কোটি করে ফেললাম। আর ২০০০ সালে এসে সেটা প্রায় চারগুণ হয়ে হলো ৬০০ কোটি। আজ আমরা ৭০০ কোটিরও বেশি।

আধুনিক যুগ

যখন এই বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রকৃতির খেয়ালখুশিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দ্রুততার সাথে সংখ্যায় বেড়েছে তখনি কিন্তু তারা আবার আরও বেশি করে আধুনিক বাণিজ্য আর সরকারের গোলাম হয়ে গিয়েছে। শিল্প বিপ্লব আসলে মানুষের সামাজিকতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার এক বিরাট সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তার ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ও মানসিকতায় এসেছে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন। এরকম অনেক উদাহরণের মধ্যে একটা হতে পারে- গতানুগতিক কৃষিকাজের প্রাকৃতিক ছন্দের জায়গায় কলকারখানার নিখুঁত উৎপাদন ব্যবস্থার আগমন।

মানুষের গতানুগতিক কৃষিকাজ প্রাকৃতিক ঋতুচক্র আর জৈবিক বৃদ্ধির উপর পুরোপুরি নির্ভর করত। বেশিরভাগ সমাজই পুঙ্খানুপুঙ্খ সময়ের হিসাব করতে পারত না, এমনকি তাদের তেমন গরজও ছিল না। শুধুমাত্র সূর্যের ঘূর্ণন আর উদ্ভিদের জৈবিক বৃদ্ধির উপর ভরসা করে পৃথিবীটা কোন সময়সূচি ছাড়াই বেশ চলছিল। কোন নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছিল না। সব কাজের সময়সূচি এক ঋতু থেকে আরেক ঋতুতে দারুণ ভাবে বদলে যেত। মানুষ জানতো সূর্য এই মুহুর্তে কোথায়। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো বর্ষার কিংবা হেমন্তের কিছু লক্ষণ দেখার জন্য। কিন্তু ঠিক দিন তারিখটা তারা জানতো না। কোন পথভোলা সময়যাত্রী (time traveller) যদি মধ্যযুগের এক গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হয়ে রাস্তায় কাউকে জিজ্ঞেস করে “এটা কত সাল?”, তাহলে সেই গ্রামবাসী তার প্রশ্ন শুনে থতমত খেয়ে যাবে। কারণ তখনকার দিনে এই প্রশ্নটা হবে ঐ সময়যাত্রীর পোশাকের মতোই উদ্ভট।

মধ্যযুগের কৃষক কিংবা মুচির বিপরীতে আজকের আধুনিক শিল্পকারখানা সূর্য আর ঋতুচক্রকে থোড়াই কেয়ার করে। বরং এটি নির্ভুলতা আর অভিন্নতার পুজো করে। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যযুগের একটা কারখানায় প্রতিটি মুচিই একটা গোটা জুতো বানিয়ে ফেলত, একদম সোল থেকে শুরু করে ফিতে পর্যন্ত। যদি একজন মুচি কাজে দেরিতে আসতো সেটা অন্যদের কাজের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াত না। কিন্তু আজকের জুতো তৈরির কারখানার অ্যাসেম্বলি লাইনে এক একজন শ্রমিক আসলে এক একটা যন্ত্র চালায় যেখানে জুতোর একটা নির্দিষ্ট অংশ তৈরি করে পরের যন্ত্রের কাছে দিয়ে দেয়া হয়। ৫ নম্বর যন্ত্রে যে কাজ করে সে যদি ঘুম থেকে দেরিতে ওঠে তাহলে এর পরের সব যন্ত্রকে থেমে যেতে হয়। এই ধরনের সমস্যা দূর করার জন্য প্রত্যেককে একটা নির্দিষ্ট সময় মেনে চলতে হয়। প্রত্যেক শ্রমিক একই সময়ে কাজে আসে। খিদে লাগুক আর নাই লাগুক প্রত্যেকে একই সময়ে দুপুরের খাবার খায়। হাতের কাজ শেষ হয়ে গেলেই কেউ বাড়ি যায় না, সবাই অপেক্ষা করে একটা বাঁশি বাজার যেটা জানিয়ে দেবে যে তাদের কর্মঘণ্টা শেষ হয়েছে।

000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000000165155155555554.jpg

৪২। মডার্ন টাইমস (১৯৩৬) চলচ্চিত্রে একজন সাধারণ কারখানা শ্রমিকের বেশে চার্লি চ্যাপলিন ।

শিল্প বিপ্লব সময়সূচি এবং অ্যাসেম্বলি লাইনকে মানুষের সকল কাজকর্মের একটা সাধারণ ধাঁচ বানিয়ে ফেলল। কলকারখানাগুলো তাদের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করার পরপরই স্কুলগুলোও সময় বেঁধে দিল, তারপর হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর এমনকি মুদি দোকানও। যেসব জায়গায় কোন অ্যাসেম্বলি লাইন কিংবা যন্ত্র নেই সেখানেও সময়সূচি হয়ে গেল রাজা। যদি কারখানার কাজ শেষ হয় ঠিক বিকাল ৫টায়, তাহলে মদের দোকানটা ৫টার পরপর খোলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

সময়সূচির এই ব্যাপক প্রসারের সাথে জনপরিবহনের একটা নিগূঢ় সম্পর্ক ছিল। যদি শ্রমিকদের ঠিক সকাল ৮টায় কাজ শুরু করতে হয় তাহলে ট্রেন আর বাসগুলোকেও কারখানার গেটে পৌঁছাতে হবে ঠিক ৭টা ৫৫র মধ্যে। কয়েক মিনিটের দেরিও উৎপাদন ঘাটতি তৈরি করবে, তার ফলে দেরিতে আসা শ্রমিকটা তার চাকরিও হারাতে পারে। ব্রিটেনে ১৭৮৪ সালে নির্দিষ্ট সময়সূচির ঘোষণা দিয়ে একটা পরিবহন ব্যবস্থা চালু হয়। এর সময়সূচিতে শুধু কখন ছাড়বে সেটা উল্লেখ করা হত, কখন পৌঁছাবে সেটা নয়। সেইসময় প্রতিটা ব্রিটিশ শহরের নিজেদের আলাদা সময়ের মানদণ্ড ছিল যা লন্ডনের সময়ের সাথে প্রায় আধা ঘণ্টার ব্যবধানে হতে পারত। লন্ডনে যখন দুপুর ১২টা , তখন লিভারপুলে হয়ত ১২টা ২০ আর ক্যান্টারবেরিতে ১১টা ৫০। যেহেতু কোন টেলিফোন, রেডিও কিংবা টেলিভিশন ছিল না তাই কেউই জানত না অন্য কোথায় কটা বাজে। আসলে কেউ মাথাও ঘামাত না।২

প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রেলগাড়ি চলা শুরু হয় লিভারপুল আর ম্যানচেস্টারের মধ্যে, ১৮৩০ সালে। এর দশ বছর পর প্রথম ট্রেনের সময়সূচি ঘোষণা করা হয়। ট্রেনগুলো আগেকার পরিবহনগুলোর চেয়ে অনেক দ্রুতগামী ছিল বলে বিভিন্ন এলাকার বিচিত্র সময়ের মানদণ্ড একটা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াল। ১৮৪৭ সালে সব ব্রিটিশ ট্রেন কোম্পানিগুলো একজোট হয়ে ঠিক করল এখন থেকে সকল ট্রেন এলাকাভিত্তিক সময় বাদ দিয়ে গ্রিনিচ মানমন্দিরের সময় মেনে চলবে। এরপর আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ট্রেন কোম্পানিগুলোর এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে থাকল। অবশেষে ১৮৮০ সালে ব্রিটিশ সরকার এক অভূতপূর্ব ঘোষণার মাধ্যমে জানাল যে ব্রিটেনের সকল সময়সূচি হতে হবে গ্রীনিচ সময় অনুসারে। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মত একটা দেশ জাতীয়ভাবে সময়ের মানদণ্ড গ্রহণ করল আর এর মাধ্যমে তার অধিবাসীদেরকে বাধ্য করলো সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয়ের চক্রকে ভুলে গিয়ে একটা কৃত্রিম ঘড়ির সময় অনুযায়ী জীবন যাপন করতে।

এই দুর্দান্ত শুরুটা আস্তে আস্তে একটা বিশ্বব্যাপী সময়সূচির সূচনা করল যেটা কিনা সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পরিমাণেও নিখুঁত। সম্প্রচার মাধ্যমগুলো – প্রথমে রেডিও, পরে টেলিভিশন যখন শুভসূচনা করল তারা প্রবেশ করল একই সময়সূচির জগতে আর তারপর আস্তে আস্তে তারাই এর ধারক ও বাহকে পরিণত হল। রেডিও স্টেশনগুলো প্রথম যে তথ্য সম্প্রচার করতো সেটা ছিল সময়, কিছু বিপ বিপ শব্দ যেটা অনেক দূরবর্তী জাহাজ আর বসতিকে নিজেদের ঘড়ির সময়টা ঠিক করে নিতে সাহায্য করত। তারপর রেডিও স্টেশনগুলো প্রতি ঘণ্টায় সংবাদ প্রচারের ধারণা বাস্তবায়ন করল। এখনও যেকোন খবর সম্প্রচারের প্রথম উপাদানই হল সময়, এমনকি এটা যুদ্ধের ঘোষণার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, নাৎসি অধিকৃত ইউরোপে বিবিসি সংবাদ সম্প্রচারিত হত। প্রতিটা সংবাদ অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিগ বেনের ঘড়ির ঢং ঢং শব্দ সরাসরি সম্প্রচারে শোনানো হত – সে যেন মুক্তির এক জাদুময় শব্দ। কয়েকজন প্রতিভাবান জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী এই সম্প্রচারিত ঢং ঢং শব্দের সামান্য তারতম্য থেকে লন্ডনের আবহাওয়ার অবস্থা বের করে ফেলেছিলেন। এই তথ্য জার্মানদের যুদ্ধবিমানগুলোকে দারুণ সাহায্য করেছিল। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা যখন ব্যাপারটা জানতে পারল, তারা সাথে সাথে ঘণ্টার শব্দ সরাসরি সম্প্রচারের জায়গায় একটা রেকর্ড করা শব্দ শোনানো শুরু করল।

সময়সূচির এই মহাযজ্ঞ চালানোর জন্য সস্তা এবং সহজে বহনযোগ্য ঘড়ি হয়ে গেল সহজলভ্য। আসিরীয়, সাসানিদ কিংবা ইনকা সভ্যতার শহরগুলোতে বড়জোর হাতে গোনা কয়েকটা সূর্যঘড়ি থাকত। ইউরোপের মধ্যযুগীয় শহরগুলোতে সাধারণত একটাই ঘড়ি থাকত – শহরের মাঝখানে একটা বড়সড় মিনারের উপর বসানো এক বিশাল যন্ত্র। ঐসব ঘড়িগুলো বেজায় রকমের ভুল সময় দিত। কিন্তু যেহেতু শহরে আর কোন ঘড়ি ছিল না যে তারতম্যটা বোঝা যাবে সুতরাং কিছুই আসত যেত না। আজকের দিনে, একটা স্বচ্ছল পরিবারে যতগুলো ঘড়ি আছে মধ্যযুগে একটা পুরো দেশেও হয়তো ততগুলো থাকতো না! এখন আপনি সময়টা বলতে পারেন হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে, অ্যান্ড্রয়েড ফোনটার পর্দায় তাকিয়ে, বিছানার পাশে রাখা এলার্ম ঘড়িটার দিকে ভুরু কুঁচকে, রান্নাঘরের দেয়ালে বড় ঘড়িটায় চোখ বুলিয়ে, মাইক্রোওয়েভ ওভেনের দিকে তাকিয়ে, টেলিভিশন কিংবা ডিভিডি প্লেয়ারের পর্দায় কিংবা চোখের কোণ দিয়ে কম্পিউটারের টাস্কবারে তাকিয়ে। এখন বরং সময়টা না জেনে থাকার জন্য অনেক কষ্ট করতে হবে।

এখনকার একজন সাধারণ মানুষ দিনের মধ্যে প্রায় কয়েক ডজন বার সময় দেখে নেয়, কারণ আমরা যা কিছু করি তার প্রায় সবকিছুই সময়মত করতে হয়। একটা এলার্ম ঘড়ি আমাদের সকাল ৭টায় উঠিয়ে দেয়, এরপর আমরা আমাদের হিমায়িত খাবারগুলো মাইক্রোওয়েভ ওভেনে দিয়ে ঠিক ৫০ সেকেন্ড গরম করে নেই, দাঁত ব্রাশ করি তিন মিনিট ধরে যতক্ষণ না ইলেক্ট্রিক টুথব্রাশটা একটা বিপ শব্দ করে জানান দেয়, ৭টা ৪০ এর ট্রেনটা ধরি কাজের জন্য, কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আমাদের প্রিয় অনুষ্ঠানটা দেখতে টেলিভিশনের সামনে বসি ৭টার সময়, এর মাঝে বিরক্ত হই কিছু বিজ্ঞাপন দেখে যেগুলোর প্রতি সেকেন্ডের মূল্য প্রায় এক হাজার ডলার। নিজেদের সকল রাগ ঝাড়ি একজন পেশাদার মনোবিদের কাছে যাকে একটানা ৫০ মিনিটের বেশি পাওয়া যায় না।

শিল্প বিপ্লব মানব সমাজে প্রায় ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বয়ে নিয়ে আসে। কলকারখানার সময়ের সাথে জীবনকে মানিয়ে নেওয়া তার মধ্যে একটি মাত্র। অন্যান্য উল্লেখ করার মত উদাহরণগুলোর মধ্যে আছে নগরায়ন, কৃষকের সংখ্যা কমে যাওয়া, কলকারখানায় কাজ করা খেটে খাওয়া মানুষের উদ্ভব, সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্রের প্রসার, তারুণ্য নির্ভর সংস্কৃতি এবং পুরুষশাসিত সমাজের ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাওয়া।

এতসব পরিবর্তন যদিও চমকপ্রদ, কিন্তু এর চেয়েও ঢের বেশি চমকপ্রদ পরিবর্তন এসেছে মানুষের সমাজে। ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিপ্লবটা হল, পরিবার আর এলাকাভিত্তিক সম্প্রদায়ের পতন এবং তার জায়গায় রাষ্ট্র আর বাজারের উত্থান। ইতিহাসের একদম শুরু থেকে, যতদূর পর্যন্ত আমরা জানতে পারি, প্রায় ১০ লাখ বছরেরও আগে, মানুষ ছোট ছোট কাছাকাছি থাকা কিছু সম্প্রদায়ে বসবাস করতো। সেসব সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ সদস্যই ছিল একে অপরের আত্মীয়। বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লব কিংবা কৃষি বিপ্লব এসেও সেটার তেমন পরিবর্তন ঘটায়নি। সেটা বরং পরিবার আর সম্প্রদায়গুলোকে আরও কাছাকাছি এনে গোষ্ঠী, শহর, রাজত্ব এবং সাম্রাজ্য গঠন করেছে। সেখানেও মানব সমাজের গঠনগত মৌলিক উপাদান ছিল পরিবার কিংবা সম্প্রদায়। অন্যদিকে, শিল্প বিপ্লব এসে মাত্র দুই শতকের মধ্যেই এই মৌলিক উপাদানকে ভেঙ্গে ফেলল। গতানুগতিক যেসব দায়িত্ব পরিবার আর সম্প্রদায় পালন করে আসছিল, তার অনেকগুলোই এরপর থেকে রাষ্ট্র আর বাজারের হাতে চলে গেল।

পরিবার আর সম্প্রদায়ের পতন

শিল্প বিপ্লবের আগে বেশির ভাগ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ৩টি কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকত: একক পরিবার, যৌথ পরিবার আর অন্তরঙ্গ সম্প্রদায়।* বেশিরভাগ মানুষই পারিবারিক ব্যবসায় নিয়োজিত থাকতো – সেটা হতে পারে পারিবারিক খামার কিংবা পারিবারিক কারখানা। কেউ কেউ হয়তো প্রতিবেশীর পারিবারিক ব্যবসাতেও কাজ করত। পরিবার নিজেই ছিল একাধারে কল্যাণ সংস্থা, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, শিক্ষা কেন্দ্র, নির্মাণ শিল্প-কারখানা, শ্রমকল্যাণ সমিতি, পেনশন তহবিল, বীমা কোম্পানি, রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্রিকা, ব্যাংক এমনকি পুলিশ পর্যন্ত।

একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ত পরিবার তার দেখাশোনা করত। একজন বুড়ো হয়ে গেলে পরিবারই তার সমর্থন যোগাত আর তার ছেলেমেয়েরা হত তার পেনশন তহবিল। একজন মানুষ মারা গেলে পরিবার তার অনাথ শিশুদের দেখভাল করত। কেউ যদি একটা কুঁড়েঘর বানাতে চাইতো, পরিবার তাতে হাত লাগাত। কেউ নতুন ব্যবসা শুরু করতে চাইলে পরিবার দরকারি মূলধনের যোগান দেওয়ার চেষ্টা করত। কেউ যদি বিয়ে করতে চাইতো তার জীবনসঙ্গী পরিবারই খুঁজে দিত কিংবা অন্তত গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিত। প্রতিবেশীর সাথে কোন গোলমাল হলে পুরো পরিবার তাতে জড়িয়ে পড়তো। কিন্তু যদি কারো অসুস্থতা এতই মারাত্নক হত যে পরিবারের পক্ষে দেখাশোনা করা সম্ভব না, কিংবা কারো নতুন ব্যবসার জন্যে যে পরিমাণ টাকা লাগবে সেটা পরিবারের পক্ষে দেয়া সম্ভব না, অথবা প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়াটা রীতিমত মারামারির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে এরকম সব অবস্থায় এলাকার মানুষজন সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসত।

সম্প্রদায়ের মানুষজন এলাকার ঐতিহ্য আর অর্থনৈতিক সুবিধার কথা বিবেচনা করেই সাহায্য করত। তাদের সাহায্যের ধরন অনেক ক্ষেত্রেই মুক্ত বাজারের চাহিদা আর যোগানের নিয়ম কানুনের সাথে একেবারেই মেলে না। পুরনো ধাঁচের মধ্যযুগীয় কোনো এক সম্প্রদায়ে আমার প্রতিবেশী অভাবে পড়লে কোনো রকম প্রতিদানের আশা ছাড়াই আমি তার বাড়ি বানাতে আর তার ভেড়ার পাল পাহারা দিতে সাহায্য করতাম। আবার যখন আমি বিপদে পড়তাম, আমার প্রতিবেশীও আমাকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করত। একই সময়ে এলাকার ক্ষমতাবান ব্যাক্তিটি হয়তো আমাদের গ্রামের সবাইকে দিয়ে তার প্রাসাদটি বানিয়ে নিত আমাদের কোন টাকাপয়সা না দিয়েই। এর বিনিময়ে আমরা তার উপর ভরসা করতাম যে সে ডাকাত কিংবা বর্বরদের থেকে আমাদের রক্ষা করবে। গ্রাম্য জীবনে অনেক লেনদেন হত কিন্তু সেখানে টাকাপয়সার আদানপ্রদান ছিল না। কিছু বাজারও ছিল যদিও, কিন্তু সেগুলোর অবদান ছিল সীমিত। হয়তো বাজার থেকে দূর্লভ মশলা, কাপড় কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা যেত অথবা উকিল আর ডাক্তারের সেবা পাওয়া যেত। কিন্তু তারপরও সাধারণভাবে ব্যবহার করার মত জিনিসপত্রের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগেরও কম জিনিস বাজারে পাওয়া যেত। মানুষের বেশিরভাগ প্রয়োজনই মিটে যেত পরিবার আর সম্প্রদায়ের মধ্যেই।

সে সময় রাজত্ব আর সাম্রাজ্যেরও অস্তিত্ব ছিল। সেগুলো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজও করতো, যেমন যুদ্ধ করা, রাস্তাঘাট বানানো আর প্রাসাদ নির্মাণ করা। এইসব কারণেই রাজারা খাজনা বাড়াত আর মাঝে মাঝে নতুন সৈন্য আর শ্রমিক নিয়োগ দিত। তারপরও অল্প কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া তারা পরিবার আর সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করত না। যদি তারা হস্তক্ষেপ করতেও চাইতো, তবু বেশিরভাগ রাজাই খুব একটা সুবিধা করতে পারত না। গতানুগতিক কৃষি অর্থনীতি নির্ভর সমাজে বাড়তি উৎপাদন তেমন একটা হত না যা দিয়ে গাদা গাদা সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, সমাজসেবী, শিক্ষক আর ডাক্তারদের বেতন দেয়া যাবে। ফলাফলস্বরূপ, বেশিরভাগ শাসকই বড় পরিসরে কোনো কল্যাণ তহবিল, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। তারা সেসব ব্যাপার পরিবার আর সম্প্রদায়ের উপরই ছেড়ে দিয়েছিল। এমনকি খুব বিরল কিছু মুহূর্তে, যখন শাসক কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনে জোর করে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছে (যেমনটা হয়েছিল চীনের চিন সাম্রাজ্যে), তখনও তারা সেটা করেছে পরিবারের প্রধান কিংবা সম্প্রদায় প্রধানদেরকে হাত করে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দূরবর্তী সম্প্রদায়ে যোগাযোগ আর পরিবহন ব্যবস্থা এত বাজে ছিল যে, অনেক রাজ্যই খাজনা আদায় কিংবা দ্বন্দ্ব মিটমাটের মত খুব সাধারণ রাজকীয় দায়দায়িত্বগুলোও সম্প্রদায়ের উপরই ছেড়ে দিত। উদাহরণস্বরূপ, অটোমান সাম্রাজ্য গৃহস্থালি বিবাদ মিটমাটের ভার পরিবারের উপরই ছেড়ে দিয়েছিল, এর জন্য কোন রাজপেয়াদা নিয়োগ না করেই। যদি আমার ভাই কাউকে মেরে ফেলে থাকে, তাহলে নিহতের ভাই আমাকে মেরে ফেলতে পারে। এই প্রতিশোধটা ছিল অনুমোদিত। যতক্ষণ সবকিছু একটা সীমার মধ্যে থাকছে ততক্ষণ ইস্তানবুলের সুলতান কিংবা প্রাদেশিক প্রতিনিধি এসব দ্বন্দ্বের মধ্যে হস্তক্ষেপ করত না।

চীনের মিং সাম্রাজ্যে (১৩৬৮-১৬৪৪), সব অধিবাসীরা সংগঠিত ছিল ‘বাওজিয়া’ পদ্ধতিতে। দশটা পরিবার মিলে হত একটা ‘জিয়া’ আর দশটা জিয়া মিলে তৈরি হত একটা ‘বাও’। কোনো একটা বাওয়ের কোন সদস্য যদি অপরাধ করত তাহলে ঐ বাওয়ের অন্য কোনো সদস্য শাস্তি পেতে পারত, বিশেষ করে বৃদ্ধ সদস্যরা। সরকারি খাজনাও নির্ধারিত হত বাওয়ের মাধ্যমেই। সরকারি কোন কর্মকর্তা নয়, বরং বাওয়ের গুরুজনেরাই ঠিক করত কোন পরিবারের কতটুকু খাজনা দিতে হবে। সাম্রাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে এই পদ্ধতিটা খুব সুবিধাজনক ছিল। হাজার হাজার খাজনা সংক্রান্ত কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার বদলে এইসব কাজ সম্প্রদায়ের গুরুজনদের হাতে ছেড়ে দেয়া সম্ভব হয়েছিল। গুরুজনেরা জানত প্রতিটি গ্রামবাসীর মূল্য কীরকম আর তাই তারা কোনো রাজপেয়াদার হস্তক্ষেপ ছাড়াই খাজনা আদায় করতে পারত।

অনেক রাজত্ব এবং সাম্রাজ্য সত্যিকার অর্থে ছিল নিরাপত্তার স্বার্থে পোষা গুণ্ডার মত। রাজা ছিল গুণ্ডাসর্দার যে এলাকাবাসীর থেকে পয়সা নিত আর বিনিময়ে নিশ্চিত করত অন্য এলাকার গুণ্ডা পাণ্ডারা যেন তার এলাকায় ঝামেলা না করে। এর বাইরে রাজার তেমন কোনো কাজ ছিল না।

পরিবার আর সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরের জীবন মোটেই আদর্শ ছিল না। অনেক পরিবার কিংবা সম্প্রদায় তার সদস্যদের শোষণ করত। সেই শোষণ এখনকার রাষ্ট্র কিংবা বাজারের শোষণের তুলনায় কোন অংশে কম নয়। তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়-আশয় ছিল দুশ্চিন্তা আর হিংস্রতায় ভরপুর। তারপরও মানুষের খুব একটা উপায়ও ছিল না। ১৭৫০ সালে যে মানুষ তার পরিবার কিংবা সম্প্রদায় হারিয়েছে সে প্রায় মৃত মানুষের সমান। তার না ছিল কোনো কাজ, কোনো শিক্ষা কিংবা বিপদ আপদে সাহায্য পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা। কেউ তাকে টাকাপয়সা ধারও দিত না কিংবা কোনো ঝামেলায় জড়ালে তার পক্ষও নিত না। কোনো পুলিশ, সমাজসেবী কিংবা বাধ্যতামূলক শিক্ষার চল ছিল না। বেঁচে থাকার জন্য সেই মানুষটিকে যত দ্রুত সম্ভব নতুন কোন পরিবার বা সম্প্রদায়ে যোগ দিতে হতো। যেসব ছেলেমেয়েরা বাড়ি ছেড়ে পালাত তারা খুব বেশি হলে অন্য কোন পরিবারের চাকর হিসেবে বসবাস করতে পারত। কপাল খারাপ হলে তাদের জায়গা হতো সেনাবাহিনীতে কিংবা পতিতালয়ে।

এই সবকিছুই গত দুই শতাব্দীতে বদলে যায় নাটকীয় ভাবে। শিল্প বিপ্লব বাজার ব্যবস্থার হাতে নতুন এবং অপরিমেয় শক্তি এনে দেয়। রাষ্ট্রকে দেয় নতুন ধরনের যোগাযোগ আর পরিবহন ব্যবস্থা। সরকারের হাতে চলে আসে একগাদা কর্মচারী, শিক্ষক, পুলিশ আর সমাজসেবী। প্রথমদিকে রাষ্ট্র আর বাজার ব্যবস্থা আবিষ্কার করল যে, গতানুগতিক পরিবার আর সম্প্রদায় তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিভাবক এবং এলাকার গুরুজনেরা তাদের সন্তানদের জাতীয়তাবাদী মতবাদে বিশ্বাসী শিক্ষাব্যবস্থায় যোগ দিতে, বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে কিংবা শহুরে শ্রমিক হওয়ার ব্যাপারে বেশ অনিচ্ছুক ছিল।

ধীরে ধীরে রাষ্ট্রযন্ত্র তার ক্রমবর্ধমান শক্তি ব্যবহার করে পরিবার ব্যবস্থার গতানুগতিক বন্ধন ভেঙ্গে দিতে সমর্থ হল। রাষ্ট্র তার পুলিশবাহিনীকে পাঠাতে লাগল পারিবারিক বিবাদ নিরসনে। দরকার হলে আদালত পর্যন্ত গড়াত ব্যাপারটা। বাজার ব্যবস্থা পাঠাতে লাগল তার হকারদের, যার ফলে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ঐতিহ্য সরে গিয়ে জায়গা করে দিল নিয়ত পরিবর্তনশীল বাণিজ্যিক ঢং। এতসবও যথেষ্ট ছিল না, পরিবার ব্যবস্থার শক্তিকে পুরোপুরি ভাঙ্গার জন্য তাকে আরেকটি নতুন কৌশলের সাহায্য নিতে হল।

রাষ্ট্রযন্ত্র মানুষজনকে এমন একটা প্রস্তাব দিল যে প্রস্তাব ফেরানো যায় না। তারা বলল “স্বাধীন ব্যক্তি হও”। “যাকে খুশি তাকে বিয়ে কর, বাবা মাকে জিজ্ঞেস করার কি দরকার। যে কাজ করতে ইচ্ছে হয় সেটাই করো, গুরুজনের ভ্রুকুটিকে পাত্তা দিও না। যেখানে খুশি বসবাস কর, তাতে যদি প্রতি সপ্তাহে বাড়ি যেতে নাও পার তো কি হয়েছে। তুমি এখন আর পরিবার কিংবা সম্প্রদায়ের উপর নির্ভরশীল নও। আমরা, রাষ্ট্রযন্ত্র, আমরাই তোমাদের দেখভাল করব। আমরা তোমাদের খাবার দেব, আশ্রয় দিব, শিক্ষা দেব, স্বাস্থ্যসেবা দেব আর কাজ দেব। আমরা পেনশন দেব, বীমা দেব এবং নিরাপত্তাও দেব।”

রোমান্টিক সাহিত্য অনেক সময় ব্যক্তিমানুষকে রাষ্ট্র আর বাজারের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে। এর চেয়ে ডাহা মিথ্যে আর হয় না। ব্যক্তি মানুষের বাবা মা হল রাষ্ট্র আর বাজার, তাদের জন্যই সে বাঁচতে পারে। বাজার ব্যবস্থা আমাদের কাজ দেয়, বীমা দেয় আর পেনশন দেয়। কোনো কাজ শিখতে চাইলে সরকারি স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে আমরা তা শিখতে পারি। আমরা ব্যবসা করতে চাইলে ব্যাংক আমাদের টাকা ধার দেয়। আমরা বাড়ি বানাতে চাইলে নির্মাণ কোম্পানি আমাদের বাড়ি বানিয়ে দেয় আর ব্যাংক সেটা বন্ধক রাখে, মাঝে মাঝে তো সরকারি বীমাও থাকে। সবরকম ঝামেলা সামলানোর জন্য আছে পুলিশ। আমরা যদি মাসের পর মাস দুর্বল হয়ে পড়ে থাকি, সামাজিক নিরাপত্তা বাহিনী ছুটে আসে। আমাদের যদি সার্বক্ষণিক সেবার দরকার হয় আমরা একজন নার্সকে ভাড়া করে আনতে পারি। হয়তো পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে আশা সম্পুর্ণ অপরিচিত একজন নার্স আমাদের এমন আন্তরিকতার সাথে দেখভাল করবে যেটা আমরা নিজের সন্তানের কাছেও আশা করি না। উপযুক্ত কারণ থাকলে, আমরা আমাদের জীবনের সুবর্ণ সময়টা কোন এক অপিরিচিত গুরুজনের বাড়িতেও কাটিয়ে দিতে পারি। খাজনা আদায় দপ্তর আমাদের একেকজনকে স্বাধীন ব্যাক্তি হিসেবেই গণ্য করে, তাই আমরা শুধু নিজের খাজনাই দিই, প্রতিবেশীরটা না। আদালতও আমাদের ব্যাক্তি হিসেবে দেখে, তাই আমাদের কখনো আমাদের আত্মীয়ের করা অপরাধের জন্য শাস্তি পেতে হয় না।

শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষই নয়, নারী এবং শিশুকেও ব্যাক্তিমানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। পুরো ইতিহাস জুড়ে নারী ছিল পরিবার কিংবা সম্প্রদায়ের সম্পত্তি। অন্যদিকে, আধুনিক রাষ্ট্র নারীকে একজন ব্যাক্তিমানুষ হিসেবে দেখে যে কিনা পরিবার কিংবা সম্প্রদায় ছাড়াই অর্থনৈতিক আর আইনগত অধিকার স্বাধীনভাবে ভোগ করে। তারা তাদের নিজেদের ব্যাংক একাউন্ট রাখতে পারে, কাকে বিয়ে করবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদ করে একা একাই বসবাস করতে পারে।

ব্যাক্তিমানুষের এই স্বাধীনতা এসেছে একটা চড়া মূল্যের বিনিময়ে। আমরা অনেকেই এখন দূঃখ করি হারিয়ে যাওয়া শক্তিশালী পরিবার আর সম্প্রদায়ের কথা ভেবে। আমরা নিজেদের খুব নিঃসঙ্গ মনে করি আর সবসময় ভয়ে থাকি যে রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের জীবন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে। পরস্পরবিচ্ছিন্ন ব্যাক্তিমানুষ দিয়ে গড়া যে সমাজ সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র খুব সহজেই হস্তক্ষেপ করতে পারবে, যেটা পরিবার আর সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজে সম্ভব ছিল না। যেখানে একই দালানে থাকা দুজন প্রতিবেশী তাদের দারোয়ানকে কয় টাকা বেতন দেবে সেই হিসাবেই একমত হতে পারে না সেখানে তারা রাষ্ট্রকে থামাবে কীভাবে?

রাষ্ট্র, বাজার ব্যবস্থা আর ব্যাক্তিমানুষের মধ্যেকার বোঝাপড়াটা খুব একটা সহজ নয়। রাষ্ট্র এবং বাজার ব্যবস্থা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে কখনই একমত হতে পারে না। ওদিকে ব্যাক্তিমানুষ অভিযোগ করে ঐ দুই পক্ষই চায় অনেক বেশি কিন্তু দেয় খুব কম। অনেক সময়ই দেখা যায়, ব্যাক্তিমানুষ বাজার ব্যবস্থার খপ্পরে পড়ে ব্যবহৃত হয় আর রাষ্ট্র তার আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশ দিয়ে তাদের নিরাপত্তা দেয়ার বদলে নির্যাতন করে। তারপরও দারুণ আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই ত্রিমুখী ব্যবস্থাটা বেশ চলছে, তার যতই খুঁত থাকুক না কেন। এই ব্যবস্থা অসংখ্য প্রজন্ম ধরে চলে আসা মানুষের সমাজ ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এক ধাক্কায়। লাখ লাখ বছরের বিবর্তন আমাদের তৈরি করেছে নিজেদেরকে সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে মনে করে জীবন যাপন করতে। অথচ মাত্র দুই শতকের মধ্যেই আমরা পরস্পরবিচ্ছিন্ন ব্যাক্তিমানুষে পরিণত হলাম। সংস্কৃতির দুর্দান্ত ক্ষমতার এর চেয়ে ভাল প্রমাণ আর কীই বা হতে পারে?

এতকিছুর পরও আধুনিক সময়ের দৃশ্যপট থেকে একক পরিবারের ধারণাটা কিন্তু একদম উধাও হয়ে যায়নি। যখন রাষ্ট্রযন্ত্র পরিবারের কাছে থেকে তার বেশিরভাগ অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দায়ভার কেড়ে নিল, তখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর দায়িত্ব রেখেও এসেছিল। আধুনিক পরিবার এখনও মানুষের কিছু অন্তরঙ্গ চাহিদা পূরণ করে যেটা রাষ্ট্রযন্ত্র পারে না (অন্তত এখন পর্যন্ত)। কিন্তু এখানেও পরিবার নিয়মিতভাবেই বাইরের হস্তক্ষেপের শিকার হচ্ছে। দিনকে দিন বাজার ব্যবস্থা আরও বেশি করে মানুষের ব্যাক্তিগত এবং যৌন জীবনকে প্রভাবিত করছে। যেখানে আগেকার দিনে পরিবারই ছিল মূল ঘটক, আজকের দিনে বাজার ব্যবস্থা প্রথমে আমাদের মধ্যে প্রণয়ঘটিত এবং যৌনাচারের পছন্দসই চাহিদা তৈরি করছে, তারপর একটা মোটা ফিয়ের বিনিময়ে সেটা পূরণ করছে। আগেকার সময় বর-বধূর প্রথম দেখা হতো পরিবারের বৈঠকখানায়, তারপর তাদের পিতাদের মধ্যে কিছু টাকাপয়সার আদানপ্রদান হতো। ইদানীং প্রেমিক প্রেমিকার প্রথম দর্শন হয় বারে কিংবা কফি হাউজে আর টাকা পয়সা যায় প্রেমিকের হাত থেকে ওয়েটারের হাতে। তার চেয়েও বেশি টাকা চলে যায় ফ্যাশন ডিজাইনার, জিম ম্যানেজার, ডায়েটিশিয়ান, কসমেটিশিয়ান এবং প্লাস্টিক সার্জনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যারা আমাদের বাজারের চলতি মাপকাঠিতে ‘সুন্দর’ করে তোলে।

পরিবার ও সম্প্রদায় বনাম রাষ্ট্র ও বাজার ব্যবস্থা

এদিকে অনেক রাষ্ট্রও কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের উপর বেশ তীক্ষ্ণ নজর রাখে, বিশেষ করে পিতামাতা আর সন্তানের মধ্যে। পিতামাতা তার সন্তানদের রাষ্ট্রীয় পদ্ধতিতে শিক্ষিত করতে বাধ্য। যেসব পিতামাতা সন্তানদের সাথে হিংস্র আচরণ করে তাদেরকে রাষ্ট্র সংযত হতে বাধ্য করে। দরকার পড়লে রাষ্ট্র সেইসব পিতামাতাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দিতে পারে কিংবা তাদের সন্তানদের অন্য পরিবারের কাছে সঁপে দিতে পারে। বেশিদিন আগের কথা না, রাষ্ট্র যে পিতামাতাকে তাদের সন্তানদের প্রহার করা কিংবা অপমান করা থেকে বিরত রাখবে এই ধারণাটাই খুবই হাস্যকর আর অকেজো শোনাত। অনেক সমাজেই পিতামাতার কর্তৃত্ব ছিল পবিত্র। পিতামাতাকে সম্মান করা এবং তাদের প্রতি অনুগত থাকা সবচেয়ে পুণ্যের কাজ ছিল। পিতামাতার অধিকার ছিল তার সন্তানদের নিয়ে যা খুশি তাই করার। তারা চাইলে নবজাতককে হত্যা করতে পারত, সন্তানদের দাস হিসেবে বিক্রি করে দিতে পারতো কিংবা মেয়ে শিশুদের তাদের বয়সের চেয়ে দ্বিগুণ বয়সের পুরুষের সাথে বিয়েও দিতে পারত। আজকালকার দিনে পিতামাতার কর্তৃত্ব প্রায় উঠেই যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে পিতামাতার অবাধ্য হওয়াটাকে ততই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। উল্টো সন্তানের জীবনের যে কোন ঝামেলার জন্য পিতামাতাকেই দায়ী করা হচ্ছে। স্ট্যালিনের সময়ের পঞ্চায়েতে যেমন পিতামাতারা দাঁড়াতো বাদীর আসনে, ঠিক তেমনই এখন তারা হরহামেশাই দাঁড়াচ্ছে ফ্রয়েডের কাঠগড়ায়।

কাল্পনিক সম্প্রদায়

একক পরিবারের মতই সম্প্রদায়ও কোন উপযুক্ত প্রতিস্থাপন ছাড়া এমনি এমনি উধাও হয়ে যেতে পারেনি। আগেকার দিনে সম্প্রদায় আমাদের যেসব বস্তুগত চাহিদা মেটাতে পারতো এখনকার রাষ্ট্র আর বাজার ব্যবস্থাও সেসবের প্রায় পুরোটাই মেটাতে পারে। কিন্তু শুধু বস্তুগত চাহিদা মেটালেই তো হবে না, সামাজিক বন্ধনেরও তো যোগান দিতে পারতে হবে।

সেই চাহিদা পূরণ করার জন্য বাজার ব্যবস্থা আর রাষ্ট্রযন্ত্র কিছু “কাল্পনিক সম্প্রদায়” তৈরি করে। এসব সম্প্রদায়ে লাখ লাখ অপরিচিত লোকজন থাকে। সম্প্রদায়গুলো সাজানো হয় রাষ্ট্রীয় এবং বাণিজ্যিক প্রয়োজন অনুসারে। একটা কাল্পনিক সম্প্রদায় হল এমন কিছু মানুষের সম্প্রদায় যারা একে অপরকে চেনে না কিন্তু কল্পনা করে নেয় যে চেনে। এরকম সম্প্রদায় কিন্তু নতুন কোন আবিষ্কার না। রাজত্ব, সাম্রাজ্য এবং চার্চ এরকমই কাল্পনিক সম্প্রদায় হিসেবে হাজার বছর টিকে ছিল। প্রাচীন চীনে, লাখ লাখ মানুষ নিজেদেরকে একটা মাত্র পরিবারের সদস্য মনে করত আর সম্রাটকে মনে করত তাদের পিতা। মধ্যযুগে, লাখ লাখ মুসলমান কল্পনা করত যে ইসলামের পতাকাতলে তারা সবাই ভাইবোন। তারপরও ইতিহাস জুড়ে এরকম কাল্পনিক সম্প্রদায়গুলো আসলে অতটা অন্তরঙ্গ ছিল না যতটা ছিল কয়েক ডজন কাছাকাছি থাকা পরস্পর বেশ ভালভাবে পরিচিত মানুষের সম্প্রদায়। ঐ অন্তরঙ্গ সম্প্রদায়গুলো তার সদস্যদের মানসিক চাহিদা মেটাতে পারত এবং ভালোভাবে টিকে থাকার জন্য এটা খুব গুরুত্বপূর্ণও ছিল। গত দুই শতাব্দীতে সেইসব অন্তরঙ্গ সম্প্রদায়গুলো ম্লান হয়ে গেছে আর তাদের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য উত্থান হয়েছে কাল্পনিক সম্প্রদায়ের।

কাল্পনিক সম্প্রদায়ের উত্থানের অন্যতম দুটো বড় উদাহরণ হল জাতি এবং ভোক্তা গোষ্ঠী। জাতি হল রাষ্ট্রের তৈরি কাল্পনিক সম্প্রদায়। ভোক্তা গোষ্ঠী হল বাজার ব্যবস্থার তৈরি কাল্পনিক সম্প্রদায়। এগুলা কাল্পনিক সম্প্রদায়, কারণ আগেকার গ্রামে যেমন সবাই সবাইকে চিনত, আজকের এই সম্প্রদায়গুলোতে সেটা অসম্ভব। কোন জার্মান লোকের পক্ষে জার্মান জাতির ৮ কোটি লোককে কিংবা ইউরোপের খোলা বাজারের ৫০ কোটি ভোক্তাকে অন্তরঙ্গভাবে চেনা সম্ভব না।

ভোগবাদ এবং জাতীয়তাবাদ খুব পরিশ্রম করে আমাদেরকে এটা বুঝিয়ে দিয়েছে, এই যে আমরা লাখ লাখ মানুষ, আমরা সবাই একই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, আমাদের সবার একই অতীত, একইরকম স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতও একই। এটা ঠিক মিথ্যে না, এটা কল্পনা। টাকা, কোম্পানি এবং মানবাধিকারের মত, জাতি আর ভোক্তা গোষ্ঠীও হল আন্তর্ব্যক্তিক বাস্তবতা (inter-subjective reality)। এগুলোর অস্তিত্ব আছে শুধুমাত্র আমাদের সামষ্টিক কল্পনায়, তবু এর ক্ষমতা অপরিসীম। যতদিন পর্যন্ত লাখ লাখ জার্মান মিলে একটা জার্মান জাতিতে বিশ্বাস করবে, জার্মানির জাতীয় প্রতীক দেখে রোমাঞ্চিত হবে ততদিন জার্মানি পৃথিবীর বুকে অন্যতম শক্তিশালী জাতি হিসেবে টিকে থাকবে।

একটা জাতি তার কাল্পনিক চরিত্রটাকে ঢেকে রাখার জন্য সবরকম চেষ্টা করে থাকে। বেশিরভাগ জাতিই দাবি করে তারা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এবং অনন্তকালের অবিচ্ছেদ্য এক স্বত্তা। মাতৃভূমির মাটির সাথে জনমানুষের রক্ত মিলে মিশে তাদের সৃষ্টি হয়েছিল। এরকম দাবি আসলে বাড়াবাড়ি রকমের মেকি। আগেও অনেক জাতি ছিল পৃথিবীতে, কিন্তু এখনকার তুলনায় তাদের গুরুত্ব ছিল অনেক কম, কারণ রাষ্ট্রের গুরুত্বই তখন ছিল অনেক কম। মধ্যযুগের নুরেমবার্গের একজন অধিবাসী হয়তো জার্মান জাতির প্রতি অনুগত ছিল, কিন্তু সে তার চেয়ে ঢের বেশি অনুগত ছিল তার নিজের পরিবার আর সম্প্রদায়ের প্রতি। কারণ পরিবার আর সম্প্রদায়ই তার বেশিরভাগ প্রয়োজন মেটাত। তার উপর প্রাচীন জাতিগুলোর প্রভাব যতটুকুই থাকুক না কেন সেসবের মধ্যে শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল মাত্র অল্প কিছু। এখনকার জাতিগুলোর মধ্যে বেশিরভাগের উদ্ভবই হয়েছে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে।

মধ্য প্রাচ্যে এরকম অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। সিরিয়ান, লেবানিজ, জর্ডানিয়ান এবং ইরাকি জাতিগুলো আসলে ফরাসি আর ব্রিটিশ কূটনীতিকদের বালির উপর এলোমেলো সীমারেখা টানার ফলাফল। তারা এই রেখা টানার সময় আঞ্চলিক ইতিহাস, ভূতত্ত্ব এবং অর্থনীতিকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছিল। এইসব কূটনীতিকরাই ১৯১৮ সালে ঠিক করল যে কুর্দিস্তান, বাগদাদ আর বাসরার মানুষের সবাই এখন থেকে “ইরাকি”। ফরাসিরাই প্রথম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কারা হবে সিরিয়ান আর কারা হবে লেবানিজ। সাদ্দাম হোসেন আর হাফেজ আল আসাদ তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল ইংরেজ-ফরাসি মদদপুষ্ট জাতীয়তাবাদী চেতনা ছড়িয়ে দিতে। কিন্তু চিরায়ত ইরাকি এবং সিরিয়ান জাতি নিয়ে তাদের আড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা ছিল পুরোটাই ফাঁপা।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কেবল হাওয়া থেকে একটা জাতিকে তৈরি করা যায় না। যারা ইরাক কিংবা সিরিয়া তৈরি করার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করেছিল তারা সত্যিকার ইতিহাস, ভূতত্ত্ব এবং সাংস্কৃতিক উপাদান ব্যবহার করেছিল। সেসবের মধ্যে কিছু কিছু তো হাজার বছরের পুরনো। সাদ্দাম হোসেন ইরাক জাতিসত্ত্বার সাথে আব্বাসীয় খেলাফত আর ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যের সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, এমনকি তার একটি সাঁজোয়া বাহিনীর নাম দিয়েছিলেন হামুরাবি ডিভিশন। কিন্তু এইসব করেও কিন্তু ইরাককে একটি আদি অকৃত্রিম সত্তা বানিয়ে ফেলা যায়নি। আমি যদি গত দুমাস ধরে পড়ে থাকা আটা, তেল আর চিনি দিয়ে একটি কেক বানিয়ে ফেলি তার মানে এই না যে ঐ কেকটাও দুমাসের পুরনো।

ইদানীং জাতীয় সম্প্রদায়গুলো ক্রমেই ঢেকে যাচ্ছে বিভিন্ন রকম ভোক্তা গোষ্ঠী দিয়ে যারা একে অপরকে ভালভাবে চেনে না কিন্তু একই রকম পণ্য ভোগ করে অভ্যস্ত। তাই তারা নিজেদের একই গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত মনে করে। এই ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত শোনালেও আমাদের চারপাশে এরকম উদাহরণের অভাব নেই। যেমন ধরেন, ম্যাডোনার ভক্তরা মিলে একটা ভোক্তা গোষ্ঠী তৈরি করে। তারা নিজেদের সংজ্ঞায়িত করে মোটামুটি তাদের কেনাকাটা দিয়েই। তারা ম্যাডোনার কনসার্টের টিকেট কেনে, সিডি কেনে, পোস্টার কেনে, শার্ট কেনে কিংবা রিংটোন কেনে। এসব কেনার মাধ্যমেই তারা জানান দেয় যে তারা কারা। একইভাবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ভক্তরা, নিরামিষাশীরা এবং পরিবেশবাদীরাও বিভিন্ন ভোক্তা গোষ্ঠীর উদাহরণ। তারাও মোটামুটি সংজ্ঞায়িত হয় তারা কোন সব পণ্য কেনে তা দিয়েই। এটাই তাদের পরিচয়ের চাবিকাঠি। একজন জার্মান নিরামিষাশী হয়তো একজন জার্মান সর্বভূকের চেয়ে একজন ফরাসি নিরামিষাশীকেই বিয়ে করতে চাইবে।

অবিরাম গতি

গত দুই শতাব্দীর বৈপ্লবিক পরিবর্তনগুলো এতোটা যুগান্তকারী এবং এত দ্রুত ঘটেছে যে আমাদের সমাজের একদম মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোই সম্পূর্ণ বদলে গেছে। শুরুতে আমাদের সামাজিক গঠনটা বেশ কঠিন এবং অনমনীয় ছিল। স্থায়িত্ব এবং ধারাবাহিকতা ছিল সুনিশ্চিত। খুব দ্রুত কোনো পরিবর্তন ছিল ব্যতিক্রম এবং যেকোনো সামাজিক পরিবর্তনই ছোট ছোট ধাপের সমন্বয়ে হত। মানুষ ধরেই নিয়েছিল মানব সমাজ কাঠামো অপরিবর্তনীয় এবং অনন্ত। পরিবার আর সম্প্রদায় হয়তো সামাজিক কাঠামোতে নিজেদের অবস্থান কিছুটা বদলাতে পারত, কিন্তু সমাজের মৌলিক গঠনটা বদলে ফেলা ছিল অভাবনীয়। মানুষজন সবসময় নিজেদের এভাবেই সান্ত্বনা দিত যে “এভাবেই তো চলে আসছে, এভাবেই তো চলবে”।

কিন্তু গত দুই শতাব্দীতে পরিবর্তনের গতিটা এত বেড়ে গেছে যে সামাজিক কাঠামোটা খুব গতিময় আর নমনীয় হয়ে গেছে। এটা এখন একটা নিয়ত পরিবর্তনশীল অবস্থায় আছে। আধুনিক বিপ্লবের কথা বললে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব, ১৮৪৮ সালের ইউরোপের বসন্ত অথবা ১৯১৭ সালের রাশিয়ান বিপ্লব। সত্যি কথা বলতে আজকালকার দিনে প্রতিটা বছরই বৈপ্লবিক। এখন একজন ৩০ বছর বয়সী লোকও তরুণদের গল্প বলতে পারে এভাবে- “আমরা যখন ছোট ছিলাম তখনকার পৃথিবীটা ছিল অন্যরকম”। উদাহরণস্বরুপ, ইন্টারনেট জিনিসটাই তো নব্বইয়ের দশকে তৈরি, মাত্র বছর পঁচিশ আগের কথা। অথচ আজ আমরা ইন্টারনেট ছাড়া পৃথিবীর কথা কল্পনাই করতে পারি না।

এই কারণেই আধুনিক সমাজের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করাটা অনেকটা কোনো এক বহুরুপীর রূপ বর্ণনা করার মত ব্যাপার। তার একমাত্র যে বৈশিষ্ট্যটির ব্যাপারে আমরা একমত হতে পারি সেটা হল অবিশ্রান্ত পরিবর্তন। মানুষজন ইতোমধ্যেই এই ব্যাপারটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সবাই এখন মনে করে সামাজিক কাঠামো আসলে একটা নমনীয় ব্যাপার, আমরা চাইলেই প্রয়োজনমত এটা বদলাতে পারি। পূর্বাধুনিক যুগের শাসকেরা সাধারণত আশ্বাস দিত যে তারা প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণ করবে, এমনকি ফিরে যাবে গৌরবান্বিত সময়ে। কিন্তু গত দুই শতক ধরে দেখা যাচ্ছে শাসকেরা তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে পুরাতনকে ছুঁড়ে ফেলে নতুন পৃথিবী গড়ার প্রত্যয়। একদম গোঁড়া মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোকেও বলতে দেখা যাচ্ছে না যে তারা সবকিছু আগের মত রাখার চেষ্টা করবে। সবাই আজকাল সামাজিক সংশোধন, শিক্ষা ব্যবস্থার সংশোধন কিংবা অর্থনৈতিক সংশোধনের প্রত্যয় ব্যক্ত করছে। মাঝে মাঝে তারা সত্যি সত্যিই সেসব সংশোধন করেও ফেলছে।

ভূতাত্বিকেরা যেমন টেকটনিক স্তরগুলোর নড়াচড়া থেকে ভূমিকম্প কিংবা আগ্নেয়গিরির আশংকা করেন, তেমনি আমরা আশংকা করতে পারি এইসব দ্রুতগতির সামাজিক পট পরিবর্তন হয়তো রক্তাক্ত হিংস্রতা বয়ে নিয়ে আসবে। ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস বর্ণনা করতে গেলেও কিন্তু আমাদের কিছু ভয়ংকর যুদ্ধ, গণহত্যা আর বিপ্লবের কথা বলতে হয়। নতুন জুতো পরা একটি শিশু যেমন রাস্তায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে লাফিয়ে বেড়ায়, তেমনি ইতিহাসও এক রক্তগঙ্গা থেকে আরেক রক্তগঙ্গার পথে হাঁটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তারপর স্নায়ুযুদ্ধ, আর্মেনিয়ান গণহত্যা থেকে শুরু করে ইহুদি নিধন, রুয়ান্ডার গণহত্যা, রোবস্পিয়ার থেকে লেনিন তারপর হিটলার।

সুতরাং আশংকাটা আসলে সত্যি, কিন্তু এই বহুল পরিচিত দুর্যোগগুলো উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করাটা কিছুটা বিভ্রান্তিকরও বটে। আমরা খানা খন্দে এত বেশি বুঁদ হয়ে থাকি যে পথে যে শুকনো জায়গাও আছে তা আমাদের চোখে পড়ে না। উত্তরাধুনিক যুগ যে শুধু অভূতপূর্ব রকমের হিংস্রতা আর বর্বরতা দেখেছে তাই নয়, সেই সাথে শান্তি ও শুভ্রতার দারুণ নিদর্শনও দেখতে পেয়েছে। চার্লস ডিকেন্স ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে বলেছিলেন “এটাই ছিল শ্রেষ্ঠ সময়, আবার এটাই ছিল নিকৃষ্ট সময়”। কথাটা যে শুধু ফরাসী বিপ্লবের জন্য সত্য তাই নয়, পুরো যুগটার জন্যও প্রযোজ্য।

কথাটা বিশেষভাবে প্রযোজ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই সাত যুগের ক্ষেত্রে। এই সময়ে মানবজাতি প্রথমবারের মত নিজেদের সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার হুমকির সম্মুখীন হয়েছে এবং বেশ ভালো সংখ্যক যুদ্ধ ও গণহত্যা দেখেছে। এতকিছুর পরও এই কয়েক যুগই কিন্তু বেশ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শান্তিময় সময়। এটা খুবই আশ্চর্যজনক, কারণ এই সময়েই কিন্তু আমরা আগের চাইতেই আরও বেশি বেশি অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তন দেখেছি। ইতিহাসের টেকটোনিক স্তরগুলো পাগলের মত নড়াচড়া করছে, অথচ আগ্নেয়গিরি শান্ত। মনে হচ্ছে এই নতুন নমনীয় সামাজিক কাঠামো যেন সবকিছু আগলে রাখতে পারে, এমনকি দরকার হলে কোনো হিংস্রতা ছাড়াই প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে।৩

আমাদের শান্তির যুগ

বেশিরভাগ মানুষই মানতে চায় না আমরা কত শান্তিপূর্ণ এক সময়ে বসবাস করছি। আমাদের কেউই হাজার বছর আগে বেঁচে ছিল না। এই কারণেই বোধহয় আমরা ভুলে যাই পৃথিবী আগে কতটা হিংস্র ছিল। আর যেহেতু যুদ্ধ জিনিসটা আগের চেয়ে অনেক বিরল হয়ে গেছে, তাই এর প্রতি মানুষের আকর্ষণও বেড়ে গেছে। বেশিরভাগ মানুষই এখন আফগানিস্তান কিংবা ইরাকের যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা বলে। কিন্তু ব্রাজিল কিংবা ভারতের লোকেরা কতটা শান্তিতে বসবাস করছে সে কথা খুব কম লোকই আলোচনা করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, পুরো মানবজাতিকে নিয়ে ভাবার চেয়ে ব্যাক্তিগত সুখ দুঃখের কথা ভাবাটা অনেকসহজ। স্থূল দৃষ্টিতে ইতিহাসের গতিপথ বুঝতে গেলে আমাদের আসলে ব্যাক্তিগত গল্প না শুনে বড়সড় পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে হবে। ২০০০ সালে যুদ্ধের কারণে মৃত্যু হয় লাখ তিনেক মানুষের। এছাড়া হিংস্রতার দরুন আরও লাখ পাঁচেক মানুষ মারা যায়। এটা সত্য যে প্রতিটি মানুষের মৃত্যুই আসলে একটা জগতের অপমৃত্যু, একটা পরিবারের ধ্বংসযজ্ঞ, বন্ধু ও আত্মীয়দের জন্য সারাজীবনের এক দুঃসহ বেদনা। কিন্তু তারপরও, একটু স্থূল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই আট লাখ মৃত্যু আসলে ২০০০ সালের মোট সাড়ে পাঁচ কোটি মৃত্যুর মাত্র শতকরা দেড় ভাগ। ঐ একই বছর ১০ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে গাড়ি দুর্ঘটনায় (মোট মৃত্যুর শতকরা ২.২৫ ভাগ) এবং ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করেছে (শতকরা ১.৪৫ ভাগ)।৪

২০০২ সালের সংখ্যাগুলোতো আরও চমকপ্রদ। সাড়ে পাঁচ কোটি মৃত্যুর মধ্যে মাত্র পৌনে দু লাখ মানুষ মারা গেছে যুদ্ধের কারণে আর সাড়ে পাঁচ লাখের মত হিংস্রতায় (হিংস্রতার কারণে মৃত্যু মোট সাড়ে সাত লাখের কাছাকাছি)। অন্যদিকে, পৌনে নয় লাখ মানুষ আত্মহত্যা করেছে।৫ দেখ গেল, ৯/১১ এর সন্ত্রাসী হামলার পরের বছর, যখন সবাই সন্ত্রাস আর যুদ্ধ নিয়ে কথা বলছে, তখন একজন সাধারণ মানুষের অন্যের হাতে মরার চেয়ে আত্মহত্যা করে মরার সম্ভাবনাই বেশি ছিল।

পৃথিবীর বেশির ভাগ প্রান্তেই মানুষ রাতে যখন ঘুমাতে যায় তখন তাদের এই ভয় করতে হয় না যে, প্রতিবেশী গোষ্ঠীর লোকেরা হয়তো মাঝরাতে হামলা করবে আর সবাইকে মেরে ফেলবে। ব্রিটেনের সচ্ছল লোকেরা প্রতিদিন যখন শেরউড জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নটিংহ্যামে থেকে লন্ডনে যায় তখন তাদের এই ভয়ে থাকতে হয় না যে, এই বুঝি জঙ্গল থেকে রবিন হুড আর তার দলবল বের হয়ে এসে তাদের আটক করবে আর সব ধনসম্পদ লুটে নিয়ে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিবে (অথবা তাদের মেরে ফেলবে আর নিজেরাই সব সম্পদ ভোগ করবে)। ছাত্রছাত্রীদেরকে শিক্ষকের বেত্রাঘাত সহ্য করতে হয় না, ছেলেমেয়েদের এই ভয়ে থাকতে হয় না যে তাদেরকে তাদের বাবা মায়েরা অভাবের জন্য দাস হিসেবে বেচে দেবে। আজকের নারীরা এটা জানে যে আইনগতভাবে তাদের স্বামীদের কোন অধিকার নেই তাদেরকে প্রহার করার কিংবা বাড়ির মধ্যে আটকে রাখার। সারা পৃথিবীজুড়ে এইসব ধারণাগুলো খুব দ্রুত বাস্তবায়িত হয়ে যাচ্ছে।

হিংস্রতার পরিমাণ কমে আসার পেছনে আসলে রাষ্ট্রের অবদানই বেশি। ইতিহাসজুড়ে বেশিরভাগ হিংস্রতাই হতো মূলত পরিবার কিংবা সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্বে। (উপরের পরিসংখ্যান থেকেও তো এটা পরিষ্কার যে আজকালকার যুগেও আঞ্চলিক অপরাধই কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধের চেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ।) আমরা তো আগেই দেখেছি, প্রথম দিককার কৃষকেরা, যারা আঞ্চলিক সম্প্রদায়ের বাইরে আর কোনো রকম সংগঠন চোখেই দেখেনি, তারাও প্রতিনিয়ত হিংস্রতায় জড়িয়ে পড়ত।৬ রাজত্ব আর সাম্রাজ্য যতই শক্তিশালী হতে থাকল ততই তারা সম্প্রদায়গুলোতে হস্তক্ষেপ করতে থাকল আর ক্রমশ হিংস্রতার পরিমাণ কমে আসলো। মধ্যযুগীয় ইউরোপের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সভ্যতায়, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় চল্লিশজনই খুন হত। ইদানীংকালে, যখন রাষ্ট্রযন্ত্র হয়ে উঠেছে সর্বেসর্বা আর সম্প্রদায় প্রথা একরকম হারিয়ে গেছে, তখন হিংস্রতার পরিমাণও অনেকটাই কমে গেছে। সারা পৃথিবীর বিচারে এখন প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র নয়জন খুনের শিকার হয়। এইসব খুনোখুনির বেশিরভাগই হয় সোমালিয়া কিংবা কলম্বিয়ার মত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে। সমগ্র ইউরোপের ক্ষেত্রে এখন সেই সংখ্যাটা প্রতি এক লাখে মাত্র একজন।৭

অবশ্য এমন নজিরও আছে যে রাষ্ট্র নিজেই তার নিজের জনগণকে মেরে ফেলছে। এইরকম ঘটনাগুলোই আমাদের স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে যায়। পুরো বিংশ শতাব্দীতে প্রায় এক কোটি লোক নিহত হয়েছে তাদেরই দেশের প্রতিরক্ষাবাহিনীর হাতে। তারপরও, একটা স্থূল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলতে হয় রাষ্ট্র পরিচালিত আদালত এবং পুলিশবাহিনী সারা পৃথিবীর নিরাপত্তা আসলে বাড়িয়ে দিয়েছে। যদি পূর্বাধুনিক যুগের সাথে তুলনা করি, তাহলে এখনকার দিনের একজন জাঁদরেল একনায়কের আমলেও একজন মানুষের অন্য মানুষের হাতে মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনা অনেক কম। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে সেনাবাহিনীর শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঐ শাসনেই দেশটা চলেছে। এই ২০ বছরে বেশ কয়েক হাজার ব্রাজিলিয়ান তাদের শাসকের হাতে মারা পড়ে। আরও কয়েক হাজার জেলহাজতে যায় এবং নির্যাতিত হয়। এত কিছুর পরও, সবচেয়ে খারাপ বছরটাতেও, ব্রাজিলের একজন গড়পড়তা মানুষের অন্য মানুষের হাতে মারা পড়ার সম্ভাবনা বরং হুয়ারানি (Waorani), আরাওয়েতে (Arawete) কিংবা ইয়ানোমামোর (Yanomamo) উপজাতিদের তুলনায় অনেক কম। হুয়ারানি, আরাওয়েতে আর ইয়ানোমামোরা হল আমাজন জঙ্গলের গহীনে বসবাসকারী উপজাতি যাদের কোন সৈন্য, পুলিশ কিংবা জেলখানা নেই। নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে এসব উপজাতি জনগোষ্ঠীর পুরুষদের প্রায় অর্ধেক মারা যায় পারস্পরিক দ্বন্দ্বে। এসব দ্বন্দ্ব সাধারণত সম্পদ, নারী কিংবা আত্মসম্মান সংক্রান্ত হয়ে থাকে।৮

সাম্রাজ্যের পতন

১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রের অধীনে হিংস্রতা বেড়েছে নাকি কমেছে এটা আসলে তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু যে ব্যাপারটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না সেটা হল, আন্তর্জাতিকভাবে হিংস্রতা এখন ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পতন সম্ভবত এর পক্ষে সবচেয়ে জোরালো উদাহরণ। ইতিহাসজুড়ে সাম্রাজ্যগুলো বিদ্রোহীদের শক্তহাতে দমন করে এসেছে। যখন তার শেষের ঘণ্টা বেজেছে, তখন একটি ডুবন্ত সাম্রাজ্য তার শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বিদ্রোহ দমন করার চেষ্টা করেছে, যার ফলাফল হয়েছে রক্তগঙ্গা। এর চূড়ান্ত পতন ডেকে এনেছে অরাজকতা এবং যুদ্ধ। কিন্তু ১৯৪৫ সাল থেকে বেশিরভাগ সাম্রাজ্যই নিজে থেকে শান্তিপুর্ণভাবে সরে দাঁড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। তাদের পতনের ধরনটা হয়েছে বেশ দ্রুত, শান্ত এবং সুশৃঙ্খল।

১৯৪৫ সালে ব্রিটেন পুরো পৃথিবীর প্রায় চার ভাগের একভাগ শাসন করত। ৩০ বছর পর শাসন করত কেবল ছোট ছোট কিছু দ্বীপ। মাঝের এই কয়েক যুগে ব্রিটেন তার বেশিরভাগ উপনিবেশ থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে সরে এসেছে। যদিও মালয় এবং কেনিয়ার মত কিছু কিছু জায়গায় তারা অস্ত্রের জোরে টিকে থাকতে চেয়েছে, তবু বেশিরভাগ জায়গাতেই তারা তাদের সাম্রাজ্যের পতনটা কোন উচ্চবাচ্য ছাড়াই একরকম অক্ষম দীর্ঘশ্বাসের সাথেই মেনে নিয়েছে। তারা তাদের সকল প্রচেষ্টা নিবদ্ধ করেছিল যথাসম্ভব মসৃণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দিকে, ক্ষমতা ধরে রাখার দিকে নয়। মহাত্মা গান্ধী অহিংস আন্দোলনের জন্য যে পর্বত প্রমাণ প্রশংসা পেয়ে থাকেন তার কিছুটা কৃতিত্ব আসলে ব্রিটিশ সরকারকেও দিতে হয়। অনেক বছরের তিক্ততা ও হিংস্র লড়াই সত্ত্বেও যখন ব্রিটিশ রাজের দিন ফুরিয়ে আসলো তখন কিন্তু ভারতীয়দের দিল্লী বা কলকাতার রাস্তায় নেমে ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ করতে হয়নি। সাম্রাজ্যের জায়গাটা নিয়েছিল কিছু স্বাধীন রাষ্ট্র, যারা এর আগ পর্যন্ত একসঙ্গে মিলে মিশে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত। এটা সত্য যে, হাজার হাজার মানুষ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাতে মৃত্যুবরণ করেছে। কিছু কিছু জায়গায় সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে শুরু হয়েছে জাতিগত দাঙ্গা (বিশেষ করে ভারতে)। তারপর দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানের সাথে তুলনা করলে বৃটিশদের প্রস্থান শান্তি ও শৃঙ্খলার এক উদাহরণ ছিল। ফরাসি সাম্রাজ্য বরং এর চেয়ে অনেক বেশি একগুঁয়ে ছিল। তাদের পতনের সময় পলায়নপর সৈন্যরা হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। ভিয়েতনাম এবং আলজেরিয়া তার সাক্ষী হয়ে আছে। তবু ফরাসিরা অন্য সব জায়গা থেকে বেশ দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবেই প্রস্থান করেছিল এবং রেখে এসেছিল একটি শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল দেশ।

১৯৮৯ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ছিল আরও শান্তিপূর্ণ। যদিও বলকান, ককেশাস এবং মধ্য এশিয়ার কিছু জায়গায় জাতিগত দাঙ্গা লেগেছিল তারপরও বলা যায়, ইতিহাসে এর আগে এত বড় কোন সাম্রাজ্যের পতন এত দ্রুত এবং এত শান্তভাবে হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐ পতনের সময় এক আফগানিস্তান ছাড়া আর কোথাও সামরিক পরাজয় বরণ করতে হয়নি। কোথাও কোন বহিরাগতদের আক্রমণ হয়নি, কোন বিদ্রোহ হয়নি, এমনকি মার্টিন লুথার কিংয়ের মত বড় ধরনের অসহযোগ আন্দোলনও কেউ করেনি। সোভিয়েতদের তখনও লাখ লাখ সৈন্য ছিল, হাজার হাজার ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমান ছিল। পুরো মানবজাতিকে কয়েক দফা ধ্বংস করার মত যথেষ্ট পরিমাণে পারমাণবিক অস্ত্রও ছিল। লাল সেনা এবং অন্যান্য ওয়ার’শ সেনারাও ছিল অনুগত। সর্বশেষ সোভিয়েত শাসক মিখাইল গর্বাচেভ যদি একবার আদেশ দিতেন,তাহলেই লাল সেনারা সাধারণ জনগণের উপর প্রকাশ্যে গুলি চালাতে পারত।

এতকিছুর পরও সোভিয়েত অভিজাতরা এবং কম্যুনিস্টপন্থীরা পূর্ব ইউরোপের বেশিরভাগ জুড়েই (রোমানিয়া আর সার্বিয়া ছিল ব্যতিক্রম) সামরিক ক্ষমতার এক ফোঁটাও ব্যবহার করেনি। যখন তাদের সদস্যরা বুঝতে পারলো যে কম্যুনিজম দেউলিয়া হয়ে গেছে, তারা সাথে সাথে সকল বাহিনী প্রত্যাহার করে নিল, নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে নিল, তারপর নিজেদের বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি চলে গেল। গর্বাচেভ এবং তার সহকর্মীরা বিনা সংগ্রামে শুধু যে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দখল করা এলাকাই ছেড়ে দিল তাই না, তাদের বহু পুরনো জার আমলের জয় করা বাল্টিক, ইউক্রেন, ককেশাস এবং মধ্য এশিয়াও ছেড়ে দিল। গর্বাচেভ যদি সার্বিয়ার নেতাদের মত কিংবা আলজেরিয়ায় ফরাসিদের মত আচরণ করত তাহলে কি হত সেটা ভাবলে এখনও শিউরে উঠতে হয়।

আণবিক সমঝোতা

সাম্রাজ্যগুলো সরে গিয়ে যে স্বাধীন দেশগুলো তৈরি হল তারা যুদ্ধের ব্যাপারে একেবারেই আগ্রহী ছিল না। ১৯৪৫ সালের পর থেকে, অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে কোন দেশই অন্য কোন দেশকে দখল করার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়নি। অথচ স্মরণাতীতকালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরকম দখলদারী হামলা ছিল রীতিমত হাতের মোয়া। এভাবেই আসলে অনেক বড় বড় সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। বেশির ভাগ শাসক এমনকি মানুষজনও ভেবেছিল এভাবেই চলবে পৃথিবী। কিন্তু রোমান, মোঙ্গল কিংবা অটোমানদের মত ভোগদখল আজকের দুনিয়ায় প্রায় অসম্ভব। ১৯৪৫ সালের পর থেকে জাতিসংঘ স্বীকৃত কোনো স্বাধীন দেশই পৃথিবীর ম্যাপ থেকে উধাও হয়ে যায়নি। সীমিত সংখ্যায় যুদ্ধ বিগ্রহ এখনও হয় আর তাতে লাখ লাখ মানুষ প্রাণও হারায় কিন্তু যুদ্ধ এখন মোটেই আর হাতের মোয়া নয়।

অনেকে মনে করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যুদ্ধের অনুপস্থিতি পশ্চিম ইউরোপের ধনী দেশগুলোর জন্য একেবারে নতুন একটা অভিজ্ঞতা। সত্যি বলতে কি, প্রথমে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং পরেই সেটা ইউরোপে পৌঁছায়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ছিল ১৯৪১ সালের পেরু-ইকুয়েডরের যুদ্ধ এবং ১৯৩২ সালের বলিভিয়া-প্যারাগুয়ের যুদ্ধ। এসবের আগে দক্ষিণ আমেরিকায় বেশ বড়সড় একটা যুদ্ধ লেগেছিল ১৮৭৯-৮৪ সালে চিলির সাথে বলিভিয়া আর পেরুর।

আমরা আরব এলাকাটাকে একদমই শান্তিপূর্ণ মনে করি না। অথচ স্বাধীনতার পর আরব দেশগুলোর মধ্যে মাত্র একবার পুরো মাত্রায় যুদ্ধ বেধেছিল (১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণ)। সীমান্তে বেশ কিছু ঝামেলা হয়েছিল (সিরিয়া আর জর্ডানের মধ্যে, ১৯৭০ সালে), বেশ কিছু সেনা অনুপ্রবেশ (লেবাননে সিরিয়ার প্রবেশ), অসংখ্য গৃহযুদ্ধ (আলজেরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া) এবং অগুনতি সেনা অভ্যুত্থান ও বিদ্রোহও হয়েছিল। এতকিছুর পরও, এক উপসাগরীয় যুদ্ধ ছাড়া আরব দেশগুলোর মধ্যে কোন পূর্ণ মাত্রার আন্তর্জাতিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। এমনকি পুরো মুসলিম জগতের সীমানা বাড়ানোর প্রচেষ্টার উদাহরণও পাওয়া যায় মাত্র একটা, ইরান-ইরাক যুদ্ধ। কখনই তুরস্ক-ইরান, পাকিস্তান-আফগানিস্তান কিংবা ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া যুদ্ধ বাধেনি।

আফ্রিকার ব্যাপারটা খুব একটা সুখকর না। কিন্তু সেখানেও বেশিরভাগ দ্বন্দ্বই ছিল গৃহযুদ্ধ অথবা সেনা অভ্যুত্থান। যেহেতু আফ্রিকার দেশগুলো স্বাধীনতা পেয়েছে অনেক পরে ১৯৬০-৭০ এর দিকে, মাত্র অল্প কয়েকটা দেশই একে অপরের উপর আক্রমণ করেছে দখল করার আশায়।

অতীতেও তুলনামূলক শান্ত কিছু সময় ছিল, যেমন ১৮৭১ থেকে ১৯১৪ সালের ইউরোপ। এরপরের সময়টা অবশ্য সব খারাপকে ছাপিয়ে গেছে। এখন ব্যাপারটা একদম অন্যরকম। সত্যিকার শান্তি কিন্তু শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি না। এখন সত্যিকার অর্থেই শান্তি বিরাজ করছে পৃথিবীতে। ১৮৭১ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যেও কিন্তু একটা ইউরোপীয় যুদ্ধ প্রায় অবশ্যম্ভাবী ছিল। তখনকার সেনাবাহিনী, রাজনীতি এবং এমনকি সাধারণ নাগরিকের উপরও যুদ্ধের আশংকার প্রভাব ছিল। ইতিহাসের অন্য সব শান্তিপূর্ণ সময়ের জন্যও এই একই লক্ষণ প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটা চিরন্তন বিধান ছিলঃ “যে কোনো দুটো প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এমন কিছু পরিস্থিতির তৈরি হবে যে তারা বছর খানেকের মধ্যেই একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে”। এই “জঙ্গলের নিয়ম” সক্রিয় ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপে, মধ্যযুগীয় ইউরোপে, প্রাচীন চীনে এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রিসে। স্পার্টা এবং এথেন্স যদি ৪৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে পারস্পরিক শান্তিতে থেকে থাকে তাহলে খুব ভালো একটা সম্ভাবনা ছিল যে এর পরের বছর, ৪৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই তারা আবার যুদ্ধে জড়াবে।

আজ মানবজাতি সেই জঙ্গলের আইন ভেঙ্গে ফেলেছে। অবশেষে শুধু যে যুদ্ধবিগ্রহ মিটেছে তাই না, সত্যিই শান্তি এসেছে। এখনকার বেশিরভাগ রাজনীতির ক্ষেত্রেই এমন কোন সম্ভাবনা দেখা যায় না যে বছরখানেকের মধ্যেই তারা যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে। সামনের বছরেই জার্মানি আর ফ্রান্সের যুদ্ধে জড়ানোর কোন কারণ আছে কি? অথবা চীন এবং জাপান? অথবা ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা? সীমান্তে ছোটখাট ঝামেলা হয়তো হলেও হতে পারে। কিন্তু এই ২০১৭ সালেই যদি রীতিমত ভয়ঙ্কর অবস্থা তৈরি করতে হয় তাহলে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মধ্যে আগেকার আমলের মত পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ বাধতে হবে। আর্জেন্টিনা হয়তো তার সেনাবাহিনী দিয়ে সবকিছু গুড়িয়ে দিয়ে রিও’র দরজায় পৌঁছে যাবে আর ব্রাজিলের কার্পেট-বোমা ফেলে হয়তো বুয়েনস আইরেসের আসেপাশের এলাকা গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলবে। এরকম যুদ্ধ অবশ্য এখন হতে পারে বেশ কিছু দেশের মধ্যে, যেমন ইসরায়েল আর সিরিয়া, ইথিওপিয়া আর এরিত্রিয়া অথবা আমেরিকা আর ইরান। কিন্তু এগুলো সবই আসলে ব্যতিক্রম যেটা প্রমাণ করে যে জঙ্গলের আইনটা আসলে আর টিকে নেই।

ভবিষ্যতে হয়তো এই অবস্থার পরিবর্তন হবে এবং তারপরই হয়তো আমাদের বোধোদয় হবে যে, আজকের দিনের দুনিয়া আসলে খুবই সাদাসিধে। তারপরও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, আমাদের এই সাদাসিধে ভাবটা খুবই চমকপ্রদ। এর আগে কখনও এতটা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আসেনি যে মানুষজন যুদ্ধের কথা প্রায় ভুলেই যাবে।

বিশেষজ্ঞরা এই দারুণ সুখের ব্যাপারটা এত এত বই এবং প্রবন্ধে লিখেছেন যে আপনি পড়েই শেষ করতে পারবেন না। তারা এর কিছু উল্লেখযোগ্য দিকও চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, যুদ্ধের মূল্যটা নাটকীয়ভাবে অনেক বেড়ে গেছে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারটা আসলে রবার্ট ওপেনহাইমার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গকে দেয়া উচিত পারমাণবিক বোমা বানানোর জন্য। পারমাণবিক অস্ত্রগুলোর কারণেই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যুদ্ধটা অনেকটা সামগ্রিক আত্মহত্যার মতো হয়ে যায়। আর এই কারণেই অস্ত্রের মুখে পৃথিবী শাসন করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, একদিকে যেমন যুদ্ধের মূল্যটা বেড়েছে একই সাথে তার মুনাফাও কমে গেছে। ইতিহাসের প্রায় পুরোটা জুড়েই রাজনৈতিক শক্তিগুলো শত্রু এলাকায় লুট দখলের মাধ্যমে নিজেদের উন্নতি করতে পারত। বেশিরভাগ সম্পদই ছিল শস্যক্ষেত্র, গবাদিপশু, দাস এবং স্বর্ণ। এগুলো হাতিয়ে নেয়াটা সহজ ছিল। কিন্তু আজকের দিনে, সম্পদ বলতে মূলত বোঝায় মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আর ব্যাংকের মত আর্থ-সামাজিক কাঠামো। সঙ্গত কারণেই এই জিনিসগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়া বা স্থানান্তরিত করা খুবই কঠিন।

shortcountry-1-622.jpg

৪৩। গোল্ডরাশের (Gold rush) সময় ক্যালিফোর্নিয়ার খনিশ্রমিকরা।

ক্যালিফোর্নিয়ার কথাই ধরুন। প্রাথমিক দিকে এর মূল সম্পদ ছিল বেশ কিছু সোনার খনি। কিন্তু আজ এর ভিত্তিই হল সিলিকন আর সেলুলয়েড – সিলিকন ভ্যালি এবং হলিউডের সেলুলয়েড পাহাড়। এখন যদি চীনারা ক্যালফোর্নিয়ায় সশস্ত্র আক্রমণ করে? সানফ্রানসিসকোর সমুদ্রসৈকতে লাখ লাখ সৈন্য নামায়? তারা কিন্তু আসলে খুব বেশি কিছু পাবে না। সিলিকন ভ্যালিতে কোন সিলিকনের খনি নেই। বেশিরভাগ সম্পদই আসলে আছে গুগলের প্রকৌশলী কিংবা হলিউডের লেখক, পরিচালক কিংবা বিশেষ দৃশ্য নির্মাতাদের মাথায় যারা কিনা চীনের আক্রমণের আগেই প্রথম প্লেনটা ধরে ব্যাঙ্গালোর কিংবা মুম্বাইয়ে চলে যাবে। এই কারণেই এটা মোটেই কাকতালীয় নয় যে এখনো যেসব পূর্ণমাত্রার আন্তর্জাতিক যুদ্ধ হয়, যেমন ইরাকের কুয়েত আক্রমণ, এগুলো এমন সব জায়গাতেই হয় যেখানে সম্পদগুলো পুরনো আমলের মত বস্তুগত। কুয়েতের শেখরা হয়তো পালিয়ে যেত কিন্তু তাদের তেল খনিগুলো থেকে যেত এবং দখল হয়ে যেত।

d105def020694e5cf2db12cb35930d50.jpg

৪৪। সানফ্রানসিসকোর কাছকাছি ফেসবুকের সদর দপ্তর। ১৮৪৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ভাগ্য খুলে দিয়েছিল সোনা। আর আজ ক্যালিফোর্নিয়ার ভাগ্য খুলে গেছে সিলিকন দিয়ে। কিন্তু ১৮৪৯ সালে যেখানে সোনা ক্যালিফোর্নিয়ার মাটিতে মিশে ছিল, সেখানে আজকের সিলিকন ভ্যালির সত্যিকার কোষাগার হল বড় বড় প্রযুক্তিবিদদের মাথার ভেতর।

যখনই যুদ্ধ ব্যাপারটা অনেক কম লাভজনক হয়ে গেল, শান্তি তখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে লাগলো। শান্তি যে খুব লাভ এনেছে তা না, কিন্তু শান্তি আসায় অন্তত যুদ্ধের মূল্যটাতো এড়ানো গেছে। যদি ১৪০০ সালের ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে শান্তি বিরাজ করত, তাহলে ফরাসিদের যুদ্ধের জন্য চড়া মূল্যও দিতে হতো না, আবার ভয়ঙ্কর ইংরেজ ধ্বংসযজ্ঞও সইতে হতো না। কিন্তু অন্য কোনোভাবে তাদের পকেটও ভরতো না। গতানুগতিক কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে দূরবর্তী বাণিজ্য কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ অনেকটা বাড়তি অলংকারের মত ছিল। আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বৈদেশিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগই সর্বেসর্বা। সুতরাং শান্তি বেশ লাভজনক। যতক্ষণ পর্যন্ত চীন এবং আমেরিকার মধ্যে শান্তি বিরাজ করছে, চীনারা আমেরিকায় পণ্য বেচে, ওয়াল স্ট্রিটে ব্যবসা করে এবং আমেরিকার বিনিয়োগ নিয়ে নিজেদের উন্নতি করতে পারবে।

সর্বশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির টেকটনিক প্লেটে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। ইতিহাসের অনেক অভিজাতরা, যেমন হান নেতারা, সম্ভ্রান্ত ভাইকিংরা এবং অ্যাজটেক পুরোহিতেরা যুদ্ধ ব্যাপারটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতেন। অন্যরা এটাকে খারাপ কিছুই মনে করত কিন্তু এও জানত যে যুদ্ধ এড়ানো যাবে না। সুতরাং সেখান থেকে কোন লাভ করতে পারলেই ভালো। আমরাই ইতিহাসে প্রথম এমন একটা সময়ে বাস করছি যখন সব সম্ভ্রান্তরাই শান্তিপ্রিয়। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী এবং শিল্পী এরা সবাই সত্যিকার অর্থেই মনে করে যুদ্ধ খুবই খারাপ এবং এটাকে এড়ানোও সম্ভব। (পূর্বেও শান্তিপ্রিয় সম্ভ্রান্ত লোকজন ছিল, যেমন প্রথম দিককার খ্রিস্টানরা, কিন্তু কালেভদ্রে যখনই তারা ক্ষমতা পেত, তখনি তারা তাদের “অন্য গাল পেতে দেয়া”র মন্ত্রটা ভুলে যেত।)

এই চারটে দিকের মধ্যেই কিন্তু আবার একটা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া চক্র কাজ করে। পারমাণবিক হত্যাকাণ্ডের হুমকি শান্তিবাদকে চালিত করে, যখন শান্তির বার্তা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন যুদ্ধ দূরে সরে যায় আর বাণিজ্যের প্রসার হয়, আর এই বাণিজ্যের প্রসার পক্ষান্তরে শান্তির লাভ আর যুদ্ধের লোকসানকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সময়ের সাথে সাথে এই প্রতিক্রিয়া চক্র যুদ্ধের জন্য আরেকটা বাধা তৈরি করে, যেটা হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। জালের মত ছড়িয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক যোগাযোগের শক্ত বন্ধন বেশিরভাগ দেশেরই স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে। এর ফলে যেটা হয়, এদের মধ্যে কোনো একটা দেশ যে একা একাই যুদ্ধ বাধিয়ে বসবে সেই সম্ভাবনাটা প্রায় নেই বললেই চলে। বেশিরভাগ দেশই যে পুরো মাত্রার যুদ্ধে আর জড়ায় না তার একটা খুব সহজ কারণ হল তারা আর মোটেই স্বাধীন নেই। যদিও ইসরায়েল, ইটালি, মেক্সিকো কিংবা থাইল্যান্ডের লোকজন হয়তো স্বাধীনতার একটা মোহ ধারণ করে, কিন্তু সত্যি বলতে তাদের সরকারের পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাধীন অর্থনৈতিক অথবা বৈদেশিক নীতি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। আর নিশ্চিতভাবেই তাদের পক্ষে কোন পুরো মাত্রার যুদ্ধ নিজে নিজে শুরু করা সম্ভব না। এগারো অধ্যায়ে যেমন ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি একটা বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের উত্থান। আগের সব সাম্রাজ্যের মতই এই সাম্রাজ্যও এর নিজের সীমারেখায় শান্তি নিশ্চিত করে। আর যেহেতু এর সীমারেখা হল পুরো পৃথিবী, তার মানে এই “বিশ্ব সাম্রাজ্য” কার্যকরভাবেই বিশ্ব শান্তি নিশ্চিত করে।

সুতরাং, আধুনিক যুগ মানে কি মস্তিষ্কবিবর্জিত হত্যাকাণ্ড? যুদ্ধ আর নিপীড়ন? যার চরিত্রায়ন করা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দিয়ে? হিরোশিমার উপর পারমাণবিক মেঘ দিয়ে? এবং হিটলারের রক্তাক্ত উন্মাদনা দিয়ে? নাকি এই যুগ হল শান্তির? যার চরিত্রায়ন করা যায় দক্ষিণ আমেরিকার খনন না হওয়া পরিখাটি দিয়ে? মস্কো বা নিউইয়র্কের মাথার উপর যে পারমাণবিক মেঘটা কখনও ওড়েনি সেটা দিয়ে? নাকি মহাত্মা গান্ধী এবং মার্টিন লুথার কিংয়ের অমলিন মুখ দিয়ে?

উত্তরটা সময়ই বলে দেবে। অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণাটা মাত্র ক’বছর আগের কিছু ঘটনার কারণে অনেক সময়েই বিকৃত হয়ে যায়। এই অধ্যায়টা যদি ১৯৪৫ কিংবা ১৯৬২ সালে লেখা হত এর চেহারা হয়তো অনেক মলিন হত। যেহেতু এটা লেখা হয়েছে ২০১৪তে এই আধুনিক সময়ে, তাই এটা বেশ প্রাণবন্ত।

আশাবাদী এবং নিরাশাবাদী দুই দলকেই খুশি করতে হলে আমরা এভাবে বলে শেষ করতে পারি যে, আমরা স্বর্গ এবং নরক দুটোরই খুব কাছাকাছি আছি। খুব অস্থিরভাবে একটার দরজা থেকে অন্যটার অভ্যর্থনাকক্ষের দিকে ছোটাছুটি করছি। ইতিহাস এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি আমরা কোন দিকে শেষমেশ যাব। মাত্র অল্প কিছু ঘটনার যোগসূত্র আমাদেরকে যেকোনো দিকেই ঠেলে দিতে পারে।


* একটি “অন্তরঙ্গ সম্প্রদায়” বলতে এমন একদল মানুষকে বোঝায় যারা নিজেদেরকে খুব ভালভাবে চেনে এবং টিকে থাকার জন্য একে অপরের উপর নির্ভরশীল।


1 Vaclav Smil, The Earth’s Biosphere: Evolution, Dynamics and Change (Cambridge, Mass.: MIT Press, 2002); Sarah Catherine Walpole et al., ‘The Weight of Nations: An Estimation of Adult Human Biomass’, BMC Public Health 12:439 (2012), http://www.biomedcentral.com/1471–2458/12/439.

2 William T. Jackman, The Development of Transportation in Modern England (London: Frank Cass & Co., 1966), 324–7; H. J. Dyos and D. H. Aldcroft, British Transport-An Economic Survey From the Seventeenth Century to the Twentieth (Leicester: Leicester University Press, 1969), 124–31; Wolfgang Schivelbusch, The Railway Journey: The Industrialization of Time and Space in the 19th Century (Berkeley: University of California Press, 1986).

3 For a detailed discussion of the unprecedented peacefulness of the last few decades, see in particular Steven Pinker, The Better Angels of Our Nature: Why Violence Has Declined (New York: Viking, 2011); Joshua S. Goldstein, Winning the War on War: The Decline of Armed Conflict Worldwide (New York: Dutton, 2011); Gat, War in Human Civilization.

4 ‘World Report on Violence and Health: Summary, Geneva 2002’, World Health Organization, accessed 10 December 2010, http://www.who.int/whr/2001/en/whr01_annex_en.pdf. For mortality rates in previous eras see: Lawrence H. Keeley, War before Civilization: The Myth of the Peaceful Savage (New York: Oxford University Press, 1996).

5 ‘World Health Report, 2004’, World Health Organization, 124, accessed 10 December 2010, http://www.who.int/whr/2004/en/reporto4_en.pdf.

6 Raymond C. Kelly, Warless Societies and the Origin of War (Ann Arbor: University of Michigan Press, 2000), 21. See also Gat, War in Human Civilization, 129–31; Keeley, War before Civilization.

7 Manuel Eisner, ‘Modernization, Self-Control and Lethal Violence’, British Journal of Criminology 41:4 (2001), 618–638; Manuel Eisner, ‘Long-Term Historical Trends in Violent Crime’, Crime and Justice: A Review of Research 30 (2003), 83–142; ‘World Report on Violence and Health: Summary, Geneva 2002’, World Health Organization, accessed 10 December 2010, http://www.who.int/whr/2001/en/whr01_annex_en.pdf; ‘World Health Report, 2004’, World Health Organization, 124, accessed 10 December 2010, http://www.who.int/whr/2004/en/reporto4_en.pdf.

8 Walker and Bailey, ‘Body Counts in Lowland South American Violence’, 30.

 

১৭. শিল্পের রথ

 

আধুনিক যুগের অর্থনীতি বিকাশ লাভের পেছনে দুটো উপাদানের অবদান অনস্বীকার্য। একটা হল, ভবিষ্যতের উপর আমাদের অগাধ বিশ্বাস, আর আরেকটা হল পুঁজিপতিদের নতুন নতুন পণ্যের উৎপাদনে ক্রমাগত বিনিয়োগ। কিন্তু অর্থনীতির বিকাশে কেবল এই দুটি উপাদানই যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য আরও প্রয়োজন শক্তির যোগান এবং কাঁচামাল। এসবের পরিমাণ সীমিত। যখন এই দুটো উপাদানের যোগান ফুরিয়ে আসবে, সমস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো তখন মুখ থুবড়ে পড়বে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কাঁচামাল এবং শক্তির এই সীমাবদ্ধতার ব্যাপারটি কাগুজে তত্ত্ব মাত্র। বিগত কয়েক শতকে মানুষের শক্তি এবং কাঁচামালের ব্যবহার আগের তুলনায় বহুগুন বেড়েছে এবং তা সত্ত্বেও বিস্ময়করভাবে মানুষের ব্যবহার উপযোগী শক্তির পরিমাণ কমে যাওয়ার বদলে উল্টো বেড়েছে। যখনই এই দুই উপাদানের যে কোন একটির অভাবে অর্থনৈতিক উন্নতির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে, তখনই বিনিয়োগকারীরা সেই সমস্যা সমাধানের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত গবেষণায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলেছেন। এইসব বিনিয়োগ কেবল কাঁচামাল এবং শক্তিকে সাশ্রয়ী ভাবে ব্যবহারের কৌশলই উদ্ভাবন করেনি, সন্ধান দিয়েছে শক্তি এবং কাঁচামালের সম্পূর্ণ নতুন উৎসের।

পরিবহন শিল্পের কথাই ধরুন। বিগত তিনশ’ বছরে মানুষ পশুবাহিত মাল গাড়ি, এক চাকার ঠেলাগাড়ি থেকে শুরু করে ট্রেন, মোটরগাড়ি, শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির বিমান, মহাকাশযান ইত্যাদি নানা ধরনের কোটি কোটি সংখ্যক যানবাহন তৈরি করেছে। এত বিপুল সংখ্যক যানবাহন তৈরির ফলে পরিবহন শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও কাঁচামালের ঘাটতি তৈরি হওয়ার কথা এবং পরিবহন শিল্পের সাথে জড়িতদের তলানিতে পড়ে থাকা কাঁচামাল নিয়ে কাড়াকাড়ি করার কথা। বাস্তব অবস্থা কিন্তু এর পুরোপুরি বিপরীত। যেখানে ১৭০০ সালে পরিবহন শিল্পকে উৎপাদনের জন্য প্রধানত কাঠ এবং লোহার উপর নির্ভর করতে হত, আজকে তাদের জন্য আছে প্লাস্টিক, রাবার, অ্যালুমিনিয়াম এবং টাইটেনিয়ামের মত নতুন উদ্ভাবিত অনেক কাঁচামালের পর্যাপ্ত যোগান, যেসবের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের পূর্বপুরুষদের কোনও ধারণাই ছিল না। ১৭০০ সালে যেখানে অধিকাংশ গাড়ি তৈরি হত ছুতার আর কামারের পেশীশক্তিকে অবলম্বন করে, সেখানে আজ পেট্রোলিয়াম চালিত ইঞ্জিন আর পারমাণবিক শক্তিতে টয়োটা এবং বোয়িং নামের বড় বড় যানবাহন তৈরির কারখানাগুলো চালিত হচ্ছে। প্রায় একই ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ছোঁয়া আমরা আজকাল শিল্পের অন্যান্য খাতেও দেখতে পাই। এই বিপ্লবের নাম শিল্প বিপ্লব।

শিল্প বিপ্লবের হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ জানত কীভাবে বিভিন্ন ধরনের শক্তির উৎসকে ব্যবহার করতে হয়। তারা কাঠ পুড়িয়ে উৎপন্ন তাপে লোহা গলাত, বাড়িঘর গরম রাখত আর পিঠা তৈরি করত। পালতোলা জাহাজ বাতাসের শক্তি ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াত আর পানিচালিত কলে নদীর স্রোতকে কাজে লাগিয়ে মাড়াই করা হত ধান। তা সত্ত্বেও এই প্রত্যেক উৎসের ব্যবহারের কিছু সীমাবদ্ধতা এবং সমস্যা ছিল। গাছের যোগান সব জায়গায় পাওয়া যেত না, দরকার পড়লেই বায়ুকল চালানোর জন্য বাতাস বইতো না এবং কেবলমাত্র নদীর কাছাকাছি বসবাস করলেই নদীর স্রোতকে কাজে লাগানো সম্ভব হতো।

তার চেয়েও বড় সমস্যা যেটা ছিল তা হল, মানুষ এক ধরনের শক্তিকে অন্য ধরনের শক্তিতে রূপান্তর করতে পারত না। তারা বাতাস এবং স্রোতের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পালতোলা জাহাজ চালাতে বা কলে মাড়াই করতে পারত, কিন্তু তারা এসব দিয়ে পানি গরম করতে কিংবা লোহা গলাতে পারত না। একইভাবে, তারা কাঠ পুড়িয়ে উৎপন্ন তাপ ব্যবহার করে মাড়াইকলের চাকা ঘুরাতে পারত না। সেকালে, শক্তির রূপান্তর করতে পারে এমন একটি যন্ত্রের কথাই কেবল মানুষ জানত, তা হলো শরীর। পরিপাক নামক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী খাদ্য নামক জৈব জ্বালানি গ্রহণ করত এবং পেশী নড়াচড়ার মাধ্যমে নতুন উপায়ে সে শক্তি ব্যবহার করত। নর, নারী এবং অন্যান্য প্রাণী নানা ধরনের শস্য এবং মাংস খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত, সেসব থেকে পাওয়া শর্করা এবং চর্বি পুড়িয়ে তারা রিকশা চালাত বা লাঙ্গল ঠেলত।

যেহেতু মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর শরীরই ছিল শক্তি রূপান্তরের একমাত্র অবলম্বন, সে কারণে পেশীশক্তিই ছিল মানুষের সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। মানুষের পেশী ঠেলাগাড়ি আর বাড়ি বানাত, গরুর পেশী মাঠে চালাত লাঙ্গল আর ঘোড়ার পেশী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হত। জৈবিক পেশীশক্তি চালিত এসব যন্ত্রের একটিই শক্তি আহরণের উৎস ছিল- সেটি হল গাছপালা। গাছপালা আবার শক্তির জন্য নির্ভরশীল ছিল সূর্যের উপর। সালোকসংশ্লেষণ নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা সূর্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করত এবং তাকে রূপান্তরিত করত ফল, মূল, বীজ ইত্যাদি নানা জৈব উপাদানে। সুতরাং, এ পর্যন্ত মানুষ যা কিছু করেছে তার পেছনের শক্তির মূল যোগানদাতা ছিল সূর্য, গাছ যার আলো গ্রহণ করেছে এবং গাছ থেকে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী তা গ্রহণ করে তাকে পেশীশক্তিতে পরিণত করেছে।

সুতরাং, এতদিন মানুষের ইতিহাস নির্ভরশীল ছিল দু’টো প্রধান চক্রের উপর- গাছপালার বেড়ে ওঠার চক্র আর সূর্যের আলোর চক্র (দিন বা রাত, গ্রীষ্ম কিংবা শীত)। কোন অঞ্চলে যখন সূর্যের আলো কম, ক্ষেতে শস্য এখনও পেকে ওঠে নি, সেখানে তখন মানুষের শক্তি থাকত কম। ফাঁকা থাকত গোলা, কর সংগ্রহকারী পাইক পেয়াদারও করার কিছু থাকত না, সৈন্যদের পক্ষে যুদ্ধ জয় করতে যাওয়া সম্ভব হত না আর রাজারাও তখন তাঁবু টানিয়ে শান্তিতে ঝিমোতেন। আবার সূর্য যখন পূর্ণ তেজে জ্বলে উঠত, ফসলের ক্ষেত ভরে উঠত পাকা ফসলে, কৃষকেরা তখন ফসল কাটতে আর গোলায় ফসল জমানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তো। কর সংগ্রহকারী পাইক-পেয়াদারা কর সংগ্রহে হন্যে হয়ে উঠতো। সৈন্যদের পেশীর জোর আর তলোয়ারের ধার যেত বেড়ে। রাজামশাই আয়োজন করতেন বড় বড় সভার এবং সিদ্ধান্ত নিতেন রাজ্যের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে। সকলেরই চালিকা শক্তি ছিল ভুট্টা, ধান এবং আলুর মাঝে জমে থাকা সৌর শক্তি।

হেঁশেলে লুকিয়ে থাকা মানিক

হাজার হাজার বছর ধরে শক্তি উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি দিনরাত মানুষের হাতের কাছেই ঘুরঘুর করেছে। কিন্তু, আশ্চর্যজনকভাবে, কেউ সেটা খেয়াল করে দেখেনি। একজন গৃহিণী বা চাকর যতবার চায়ের জন্য কেটলিতে পানি ফুটিয়েছে বা আলু সিদ্ধ করার জন্য হাঁড়িতে পানি চড়িয়ে উনুনে রেখেছে, ততবার এই আবিষ্কার মানুষের চোখে চোখ রেখে মুখ টিপে হেসেছে। পানি যখনই ফুটতে শুরু করেছে, কেটলি বা হাঁড়ির ঢাকনা ঠিক একটু পরেই লাফিয়ে উঠেছে। তাপ রূপান্তরিত হয়েছে বস্তুকে নাড়িয়ে দেয়ার শক্তিতে। কিন্তু, পানি ফোটার পর সময়মত কেটলি বা হাঁড়ির ঢাকনা না সরানো হলে বারবার ঢাকনার লাফিয়ে ওঠা একটা বিরক্তিকর ব্যাপার। তাই, কেউ এই বিষয়টাকে আগ্রহের সাথে লক্ষ্য করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি।

উনবিংশ শতকে বারুদ আবিষ্কারের পরপরই তাপকে বস্তুর নড়াচড়া বা সরণে রূপান্তর করার একটি প্রক্রিয়ার আংশিক উদ্ভাবন হয়। প্রথম প্রথম কামানের গোলায় বারুদ ব্যবহারের চিন্তাটাই এত আজগুবি ছিল যে মানুষ শত শত বছর ধরে কেবলমাত্র আতশবাজি তৈরির কাজেই বারুদ ব্যবহার করে এসেছে। পরবর্তীতে, সম্ভবত যেদিন বারুদ গুঁড়ো করতে গিয়ে হামানদিস্তা থেকে পেষণীটা ছুটে বেরিয়ে গেল, সেদিনই তৈরি হলো প্রথম বন্দুক।- আর সেদিন থেকেই জন্ম হল বন্দুকের। বারুদের আবিষ্কার এবং সত্যিকারের যুদ্ধাস্ত্রে তার ব্যবহার হতে প্রায় ছয়শ বছর লেগে গেল।

এতকিছুর পরেও, সে সময় তাপকে সরণে পরিণত করার ধারণাটি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে, তাপ ব্যবহার করে বস্তু সরানোর প্রথম যন্ত্রটি তৈরি করতে মানুষের আরও তিনশ বছর লেগে গেছে। প্রায় তিনশ বছর পর এই নতুন প্রযুক্তি জন্ম নিল ব্রিটেনের কয়লা খনিতে। সে সময়, জনসংখ্যা বাড়ার দরুন বর্ধিত জনগণের আবাস আর চাষের জমির জন্য ব্রিটেনের বনভূমি উজাড় হতে শুরু করেছে। ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে জ্বালানি কাঠের যোগান। মানুষ কাঠের বদলে খনিজ কয়লাকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। তখনকার ব্রিটেনে অনেক কয়লাখনিই ছিল জলমগ্ন এলাকায়। বন্যার কারণে এসব কয়লাখনির নিচের স্তরগুলো থেকে কয়লা উত্তোলন করা একরকম অসম্ভব হয়ে পড়ল। সবার কাছেই তাই এ সমস্যার আশু সমাধান জরুরি হয়ে পড়ল। অবশেষে, আনুমানিক ১৭০০ সালের দিকে এক নতুন, অচেনা শব্দের গুঞ্জনে ব্রিটেনের কয়লাখনিগুলো সচকিত হয়ে উঠল। সেই গুঞ্জন- একসময় হয়ে উঠল শিল্প বিপ্লবের অগ্রদূত। প্রথমে মৃদু, তারপর কয়েক দশকে ক্রমশই উচ্চগ্রামে উঠতে লাগল সেই শব্দ, ছড়িয়ে পড়ল এবং শেষ পর্যন্ত সমস্ত পৃথিবীকে সে তার বিপুল শব্দের চিৎকারে ভরিয়ে তুলল। এই শব্দ ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিনের।

বাষ্পীয় ইঞ্জিনের অনেক রকমফের থাকলেও তাদের সবারই মূলনীতি এক। আপনি কয়লা বা কাঠের মত কোন একটি জ্বালানী পোড়াবেন, তা দিয়ে পানি ফুটানো হবে আর তার ফলে তৈরি হবে বাষ্প। বাষ্প যখন গরম হয়ে প্রসারিত হবে তখন এটি পিস্টনকে ঠেলে দেবে। পিস্টনের নড়াচড়ার ফলে এর সাথে সংযুক্ত কোন জিনিসও নড়াচড়া করতে শুরু করবে। ব্যাস, তাপশক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল! অষ্টাদশ শতকে ব্রিটেনের কয়লাখনিতে পিস্টনগুলো একটি পানি সেচ করার পাম্পের সাথে যুক্ত থাকত যেগুলো খনির তলদেশ থেকে পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহৃত হতো। প্রথম দিককার ইঞ্জিনগুলোতে অনেক বেশি জ্বালানির অপচয় হতো। একগাদা কয়লা পুড়িয়ে নামমাত্র পানি নিষ্কাশন করা যেত। কিন্তু, এর ফলেই কয়লাখনির কয়লা উত্তোলন হয়ে যেত অনেক সহজ আর পোড়ানোর জন্য কয়লারও অভাব থাকত না। সুতরাং, সেসব অপচয় নিয়ে কেউ মাথাও ঘামাতো না।

পরবর্তী দশকগুলোতে ব্রিটিশ উদ্যোক্তাগণ বাষ্পীয় ইঞ্জিনের দক্ষতা অনেকখানি বাড়িয়ে তুললেন এবং কয়লাখনির গণ্ডি থেকে তুলে এনে তা দিয়ে শুরু করলেন সুতা তৈরি আর কাপড় বোনার কাজ। আর এর ফলে আমূল পাল্টে গেল বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন পদ্ধতি এবং আগের যে কোন সময়ের চেয়ে কম খরচে এবং বেশি পরিমাণ বস্ত্র উৎপাদন সম্ভবপর হলো। চোখের নিমিষে তাবৎ পৃথিবীর উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠল ব্রিটেন। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, কয়লাখনি পেরিয়ে বস্ত্রশিল্পে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ব্যবহার মানুষের একটি বিশাল মানসিক সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙে দিল। যদি কয়লা পুড়িয়ে তাঁত কারখানার চাকা সচল রাখা যায়, তবে তা দিয়ে গাড়ির চাকাও তো ঘোরানো যেতে পারে!

১৮২৫ সালে খনির কয়লাভর্তি বগিওয়ালা একটি ট্রেনের সাথে একজন ব্রিটিশ প্রকৌশলী একটি বাষ্পীয় ইঞ্জিন জুড়ে দিলেন। এই ইঞ্জিন লোহার তৈরি একটি রেললাইনের উপর দিয়ে বগিগুলোকে কয়লাখনি থেকে বিশ কিলোমিটার দূরের এক বন্দরে পৌছে দিল। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম বাষ্পচালিত যান। এরপরের হিসেব আরও সহজ, বাষ্পচালিত ইঞ্জিন যদি কয়লাভর্তি বগি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, তবে অন্যান্য জিনিস কেন নয়? আর তাতে মানুষই বা চড়তে পারবে না কেন? ১৮৩০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মানুষ বহন করার জন্য লিভারপুল থেকে ম্যানচেস্টার পর্যন্ত প্রথম বাণিজ্যিক রেললাইন চালু হল। যে বাষ্পের শক্তি কয়লা খনির পানি নিষ্কাশন আর তাঁতকল চালাতে ব্যবহৃত হতো, সেই একই শক্তি ব্যবহার করেই চলতে শুরু করল এই ট্রেন। পরবর্তী বিশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ব্রিটেনে দশ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্যের রেললাইন জুড়ে রেলগাড়ি চলতে শুরু করল।

এইসব ঘটনা থেকে মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মাল যে, যন্ত্র ব্যবহার করে একরকম শক্তিকে অন্য শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। উপযুক্ত যন্ত্র থাকলে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে, যে কোন ধরনের শক্তিকে আমরা অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, মানুষ যখন জানলো যে, পরমাণুর মধ্যে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত থাকে, তৎক্ষণাৎ তার মনে চিন্তা জন্মাল, কীভাবে পরমাণুর এই শক্তিকে অবমুক্ত করা যায় এবং তা দিয়ে বিদ্যুৎ, যুদ্ধের সাবমেরিন বা নগর ধ্বংসকারী পারমাণবিক বোমা বানানো যায়। চীনাদের বারুদ আবিষ্কার এবং তা ব্যবহার করে বানানো কামান দিয়ে তুর্কিদের কনস্টানটিনোপলের দেয়াল ধ্বংস করার মধ্যবর্তী সময় ছিল ছয়শ’ বছর। অথচ আইনস্টাইনের ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করার গাণিতিক সূত্র E=mc2 আবিষ্কার আর পারমাণবিক বোমা দিয়ে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরকে ধুলিসাৎ করে দেওয়া বা বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র গজিয়ে ওঠার মধ্যবর্তী সময় ছিল মাত্র চল্লিশ বছর!

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল অন্তর্দহ (internal combustion) ইঞ্জিনের আবিষ্কার, যেটি এক প্রজন্মের কিছুটা বেশি সময়ের মধ্যেই পরিবহন ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে এবং পেট্রোলিয়াম পরিণত হয় তরল রাজনৈতিক শক্তিতে। এর হাজার বছর আগে থেকেই পানিরোধী ঘরের ছাদ তৈরিতে বা গাড়ির চাকার পিচ্ছিলকারক পদার্থ হিসেবে পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। কিন্তু, গত একশ বছরের আগে পেট্রোলিয়ামের অন্য কোন সম্ভাবনার কথা কারও মাথায়ই আসেনি। সে সময় তেলের মালিকানা লাভের জন্য যুদ্ধ ও রক্তস্রোত বইয়ে দেবার মত ধারণাই ছিল হাস্যকর। হ্যাঁ, রাজ্য, সোনাদানা, মরিচ কিংবা দাস অধিকার করার জন্য যুদ্ধ হতেই পারে, কিন্তু তেলের জন্য যুদ্ধ, অসম্ভব!

বিদ্যুতের গল্প আরও বেশি রোমাঞ্চকর। দুইশ বছর আগেও অর্থনীতিতে বিদ্যুতের কোন অবদানই ছিল না। কিছু গোপন বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর সস্তা জাদুর খেলা দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এর ব্যবহার। কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন বিদ্যুৎকে পরিণত করলো জাদুর প্রদীপের দৈত্যে। আজকে আমাদের এক তুড়িতে বিদ্যুৎ ছাপিয়ে ফেলে বই, সেলাই করে কাপড়, তরতাজা রাখে শাকসবজি, জমিয়ে তোলে আইসক্রিম, রান্না করে খাবার আর মৃত্যুদণ্ড দেয় অপরাধীদের, লিপিবদ্ধ করে আমাদের ভাবনা-চিন্তা আর ফ্রেমে বন্দী করে আমাদের হাসি-কান্না, রাতকে জাগিয়ে তোলে দিনের আলোয় আর টিভির অগণিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের দেয় বিনোদনের খোরাক। বিদ্যুৎ কীভাবে এগুলো করে সেটা খুব কম লোকই জানে, অথচ বিদ্যুৎ ছাড়া জীবনের কথা কেউ আজ কল্পনাও করতে পারে না।

শক্তির সাগর

একবারে শিকড় থেকে চিন্তা করলে, শিল্প বিপ্লব আসলে শক্তির রূপান্তরের বিপ্লব। এটা বারবার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে, মানুষের ব্যবহারযোগ্য শক্তির যোগান সীমাহীন। আরও সঠিক ভাবে বললে, শক্তির পরিমাণকে একমাত্র সীমাবদ্ধ করে তুলতে পারে মানুষের অজ্ঞতা। কয়েক দশক পর পরই আমরা শক্তির নতুন একটি উৎসের সন্ধান পাই এবং মানুষের ব্যবহারযোগ্য শক্তির পরিমাণ বাড়তে থাকে।

তাহলে, দুনিয়াজুড়ে এত মানুষ শক্তির ফুরিয়ে যাবার আশঙ্কায় ভীত কেন? কেন তারা জীবাশ্ম জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে দুনিয়াজুড়ে আসন্ন মহাবিপর্যয় সম্পর্কে বারবার আমাদের সতর্ক করেন? এটা তো নিশ্চিত পৃথিবীতে শক্তির কোন অভাব নেই। আমাদের প্রধান সমস্যা হলো সে শক্তিকে আহরণ করা এবং আমাদের প্রয়োজন অনুসারে রূপান্তরিত করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব। গোটা দুনিয়ায় যে পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানির যোগান আছে, সূর্য একদিনে বিনামূল্যে তার বহুগুণ শক্তি আমাদের দিয়ে থাকে। সূর্যের মোট শক্তির মাত্র সামান্য একটা অংশ পৃথিবীতে আসে। এই সামান্য অংশটুকুরই বাৎসরিক পরিমাণ ৩,৭৬৬,৮০০ এক্সাজুল (১ এক্সাজুল = ১০১৮ জুল, জুল হলো মেট্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী শক্তি পরিমাপের একক, মোটামুটিভাবে এক জুল হলো একটি আপেলকে মাটি থেকে এক গজ উপরে তুলতে প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণ। এক্সাজুল মানে এক কোটি কোটি জুল। অর্থাৎ, এক এক্সাজুল শক্তি দিয়ে এক কোটি কোটি আপেলকে মাটি থেকে উপরে তোলা যাবে)।২ পৃথিবীর সকল গাছপালা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য উৎপাদনের জন্য এর মধ্যে মাত্র ৩,০০০ এক্সাজুল শক্তি ব্যবহার করে।৩ মানুষ এক বছরে সকল কর্মকাণ্ড এবং শিল্প কারখানায় মোট খরচ করে ৫০০ এক্সাজুল, যা নব্বই মিনিটে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসা সৌরশক্তির সমান।৪ এসব তো গেল কেবল সৌরশক্তির কথা। সূর্য ছাড়াও পারমাণবিক শক্তি এবং অভিকর্ষের মত শক্তিগুলো আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। এর মাঝে চাঁদের পৃথিবীর প্রতি আকর্ষণের কারণে সাগরে সৃষ্ট জোয়ার থেকে অভিকর্ষ শক্তির ধারণা সহজেই বোঝা যায়।

শিল্প বিপ্লবের আগে মানুষের শক্তির বাজার পুরোপুরি গাছপালার উপরেই নির্ভরশীল ছিল। সুতরাং, মানুষকে দুনিয়াব্যাপী ৩,০০০ এক্সাজুল শক্তি গ্রহণকারী উৎস গাছপালার কাছাকাছি বসবাস করতে হত, গাছপালা তার গ্রহণকৃত শক্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ মানুষের গ্রহণোপযোগী খাদ্যে রূপান্তর করে ফেরত দিত। গাছের এই রূপান্তর করে দেয়া শক্তির পরিমাণ ছিল সীমিত। শিল্প বিপ্লবের সময় আমরা বুঝতে পারলাম, আমরা আসলে অনেকগুলো শক্তির সাগরের উপর বসবাস করছি যাদের প্রতিটি উৎসের কোটি কোটি এক্সাজুল শক্তি দেয়ার সক্ষমতা আছে। আমাদের কেবল সেসব শক্তি উত্তোলন বা সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে।

যথাযথ উপায়ে শক্তি সংগ্রহ ও রূপান্তর সম্পর্কে জানার চেষ্টা অর্থনীতিকে শ্লথ করে দেয়া আরেকটি সমস্যা সমাধান করতে মানুষকে সাহায্য করল। সেটি হলো- কাঁচামালের দুষ্পাপ্র্যতা। মানুষ যত কম খরচে বেশি পরিমাণ শক্তি আহরণ করা শিখতে লাগল, ততই মানুষের নতুন নতুন কাঁচামাল সংগ্রহ (উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সাইবেরিয়ার পতিত জমি থেকে লোহা উত্তোলনের কথা) এবং দূর-দূরান্ত থেকে কাঁচামাল পরিবহনের (যেমন একটি ব্রিটিশ পোশাক কারখানায় অস্ট্রেলীয় উলের সরবরাহ) সক্ষমতা বাড়তে লাগল। একই সাথে, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি মানুষকে প্লাস্টিকের মত সম্পূর্ণ নতুন কাঁচামাল উদ্ভাবন এবং সিলিকন, অ্যালুমিনিয়ামের মত অচেনা কাঁচামাল আবিষ্কার করতে সহায়তা করল।

বিজ্ঞানীরা ১৮২০ সালের দিকে এসে অ্যালুমিনিয়ামের সন্ধান পান। কিন্তু, আকরিক থেকে অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশন ছিল কষ্টসাধ্য এবং প্রচুর ব্যয়সাপেক্ষ। কয়েক দশক যাবৎ অ্যালুমিনিয়াম ছিল সোনার চেয়ে দামী ধাতু। ১৮৬০ সালের দিকে ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ান, তার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত অতিথিদেরকে অ্যালুমিনিয়ামের থালাবাসনে অাপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন। এর থেকে অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদার অতিথিরা পেতেন সোনার ছুরি এবং কাঁটাচামচ দিয়ে ভোজনের সুযোগ।৫ ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে এসে কিছু রসায়নবিদ অনেক কম খরচে বিপুল পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশনের উপায় বের করেন এবং বর্তমান বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি টন অ্যালুমিনিয়াম উৎপন্ন হয়। তৃতীয় নেপোলিয়ান যদি জানতেন তার উত্তরসূরীরা আজ অ্যালুমিনিয়ামে বানানো মোড়ক দিয়ে স্যান্ডউইচ মুড়ে রাখে এবং খাওয়া শেষে অ্যালুমিনিয়ামের মোড়কটিকে আবর্জনার বাক্সে ফেলে দেয়, নিশ্চয়ই বিস্ময়ে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যেত।

দুই হাজার বছর আগে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের অধিবাসীরা ত্বকের শুষ্কতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হাতে শুধু জলপাইয়ের তেল মালিশ করতেন। আজ, তারা শুষ্কতা প্রতিরোধের জন্য হ্যান্ডক্রিমের টিউবের ঢাকনা খোলেন। আমি স্থানীয় একটি দোকান থেকে যে সাধারণ হ্যান্ডক্রিমটি কিনেছি, তার উপাদানগুলো নিম্নরূপ-

পরিশ্রুত পানি, স্টিয়ারিক এসিড, গ্লিসারিন, ক্যাপ্রিলিক/ক্যাপ্রিকটিগ্লাইসেরাইড, প্রোপাইলিন গ্লাইকল, আইসোপ্রোপাইল মাইরিস্টেট, পানাক্স জিনসেং শেকড়ের নির্যাস, সুগন্ধী, সিটাইল অ্যালকোহল, ট্রাইথানোলামাইন, ডাইমেটিকোন, বিয়ারবেরী পাতার নির্যাস, ম্যাগনেসিয়াম অ্যাসকোবাইল ফসফেট, ইমিডাজলিডিনল ইউরিয়া, মিথাইল প্যারাবেন, ক্যামফর, প্রোপাইল প্যারাবেন, হাউড্রক্সিআইসোহেক্সাইল ৩-সাইক্লোহেক্সেন কার্বোক্সাল্ডিহাইড, হাইড্রোক্সাইল-সাইট্রোনেলাল, লিনালুল, বিউটাইল ফেনাইল মিথাইল প্রোপলোনাল, সাইট্রোনেলোল, লিমোনিন, জেরানিয়ল।

এর বেশিরভাগই উপাদানই উদ্ভাবিত অথবা আবিষ্কৃত হয়েছে গত দুই শতকের মাঝে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি অবরোধের শিকার হয় এবং তাদের কাঁচামাল শূন্যতা দেখা দেয়। বিশেষ করে সংকট তৈরি হয় বারুদ এবং অন্যান্য বিস্ফোরক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সল্টপিটারের (saltpetre)। সল্টপিটার প্রধান যোগান ছিল চিলি আর ভারতে, জার্মানীর নাগালের বাইরে। সল্টপিটার বিকল্প রাসায়নিক ছিল অ্যামোনিয়া, কিন্তু তখন অ্যামোনিয়ার উৎপাদন ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। জার্মানদের জন্য সুখের খবর এই যে, ১৯০৮ সালে ফ্রিটজ হ্যাবার নামের একজন ইহুদি জার্মান আক্ষরিক অর্থেই বাতাস থেকে অ্যামোনিয়া তৈরির একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যখন যুদ্ধ শুরু হলো, তখন জার্মানরা হ্যাবারের আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে বাতাসকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে যুদ্ধাস্ত্রের উৎপাদন শুরু করল। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, হ্যাবারের আবিষ্কার না থাকলে জার্মানি ১৯১৮ সালের অনেক আগেই আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হত। হ্যাবারের এই আবিষ্কার (যুদ্ধের সময় বিষাক্ত গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রেও যিনি ছিলেন পুরোধা ব্যক্তিত্ব) তাকে এনে দেয় নোবেল পুরস্কার। অবশ্য তাকে শান্তিতে নোবেল দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছে রসায়নে।

খাঁচায় বন্দী জীবন

শিল্প বিপ্লব এনে দিয়েছে ব্যয়সাশ্রয়ী শক্তি ও কাঁচামালের প্রাচুর্য। ফলশ্রুতিতে অস্বাভাবিক গতিতে বেড়েছে উৎপাদন। উৎপাদনের এই বিস্ফোরক গতির পরিচয় প্রথম পাওয়া যায় কৃষিক্ষেত্রে। এমনিতে শিল্প বিপ্লবের কথা চিন্তা করলেই আমাদের চোখে ভাসে কালো ধোঁয়া উঠা চিমনি সমতে একটি শহরের ছবি বা মাটির তলদেশের কয়লাখনিতে খননকাজে লিপ্ত ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত শ্রমিকদের ছবি। কিন্তু, এ সবকিছুর পরেও শিল্প বিপ্লব প্রধানত দ্বিতীয় কৃষি বিপ্লব।

গত দুইশ বছরে শিল্পজাত উপকরণ কৃষিকাজের প্রধান অবলম্বনে পরিণত হয়েছে। ট্রাক্টরের মত যন্ত্রগুলো এককালের অসম্ভব অথবা পেশীশক্তির উপরে একান্ত নির্ভরশীল কাজগুলো সহজে করতে সহায়তা করছে। কৃত্রিম সার, কীটনাশক, নতুন নতুন হরমোন আর ওষুধের গুণে মাঠের ফসল আর গবাদি পশুর উৎপাদন দুটোই বেড়ে গেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, জাহাজ আর বিমান উৎপাদিত পণ্য মাসের পর মাস সংরক্ষণ করতে, সুলভে এবং দ্রুত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিবহন করতে সাহায্য করছে। ফলশ্রুতিতে, একজন ইউরোপিয়ানের রাতের খাবারের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে আর্জেন্টিনার তাজা গোমাংস কিংবা জাপানে তৈরি সুশি।

উদ্ভিদ এবং প্রাণীরাও এই যান্ত্রিক বিপ্লবের শিকারে পরিণত হয়েছে। মানবতাবাদী ধর্মগুলো যখন তাদের চর্চিত মূল্যবোধ দ্বারা মানুষের জীবনকে স্বর্গীয় সুষমায় বিভূষিত করছে, সেই একই সময়ে খামারে পালিত গবাদিপশুগুলোকে দেখা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক অনুভূতিহীন উৎপাদন যন্ত্র হিসেবে। আজকের দিনে এই গবাদিপশুগুলোকে শিল্পকারখানায় উৎপাদিত অন্যান্য পণ্যের মতই বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করা হয়, ব্যবসায়িক চাহিদার কথা চিন্তা করেই গড়ে তোলা হয় তাদের শারীরিক গড়ন। তাদের পুরো জীবনটা যেন একটি বিশাল শিল্পোৎপাদন পদ্ধতির নিছক একটা উপকরণ মাত্র। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভ-ক্ষতিই নির্ধারণ করে দেয় তাদের জীবনকাল এবং প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ যত্ন নেয় এবং পর্যাপ্ত দানাপানির যোগান দেয়, তখনও তারা প্রাণীগুলোর সামাজিক ও মানসিক চাহিদার কথা ভাবে না (যদি না এসব চাহিদা উৎপাদনের পরিমাণের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত না হয়), ব্যবসায়িক লাভের কথা চিন্তা করেই তারা এমনটা করে।

ডিম পাড়া মুরগির কথাই ধরা যাক, এদেরও আচরণ ও উদ্দীপনাগত চাহিদার একটি জটিল, সূক্ষ্ম জগত আছে। নিজস্ব পরিবেশে বেড়ে ওঠা, ঘুরে ঘুরে ঠুকরে খাবার সংগ্রহ করা, সামাজিক স্তরবিন্যাস তৈরি করা, বাসা তৈরি এবং নিজেদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলার ব্যাপারে এদেরও আছে তীব্র আকর্ষণ। কিন্তু ডিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত একটা ছোট খাঁচার মধ্যে মুরগিগুলোকে বন্দী করে রাখে এবং প্রায়ই দেখা যায় একটি ছোট খাঁচায় গাদাগাদি করে চারটি মুরগি রাখা, প্রতিটা মুরগির জন্য বরাদ্দ জায়গা যেখানে মাত্র দৈর্ঘ্যে পঁচিশ ও প্রস্থে বাইশ সেন্টিমিটার। মুরগিগুলোকে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার দেয়া হয় কিন্তু নিজের বাড়ি বানানো, সামাজিক ও প্রাকৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন এবং নিজের আবাস বলে ভাবার মতো কোন জায়গা তার জন্য বরাদ্দ থাকে না। এমনকি খাঁচাগুলো অনেকসময় এতটাই ছোট হয় যে মুরগিগুলো ঠিকমত সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা ডানা ঝাপটাতে পর্যন্ত পারে না।

বুদ্ধিমত্তা ও কৌতূহলের বিচারে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম হল শুকর, সম্ভবত নরবানরদের পরেই এদের স্থান। তা সত্ত্বেও খামারগুলোতে পূর্ণবয়স্ক শুকরীদের প্রায়ই এত ছোট একটি কাঠের খাঁচার মাঝে রাখা হয় যেখানে তারা হাঁটা বা চরে বেড়ানো তো দূরের কথা, ঘুরে বসতে পর্যন্ত পারে না। বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর চার সপ্তাহ সমস্ত দিন-রাত বাচ্চাগুলোকে মা শুকরীর সাথে এই আবদ্ধ খাঁচায় রাখা হয়। এরপর বাচ্চাগুলোকে মোটাতাজা করার জন্য মায়ের থেকে আলাদা করা হয় এবং মা শুকরীকে আবার গর্ভধারণ করতে বাধ্য করা হয়।

অনেক গরুর খামারেই গরুগুলোকে তাদের জীবনের পুরোটাই কাটাতে হয় একটি ছোট্ট আবদ্ধ পরিবেশে। নিজেদের মল-মূত্রের উপরই শোয়া, বসা আর ঘুমানোই হয়ে ওঠে তাদের নিয়তি। কতকগুলো যন্ত্র তাদের নিয়মিত খাবার, হরমোন আর ওষুধপত্র সরবরাহ করে। আর কতকগুলো যন্ত্র নিয়মিত এসে দুইয়ে নিয়ে যায় দুধ। গাভীগুলোকে যেন একটি যন্ত্রবিশেষ, যে মুখ দিয়ে কাঁচামাল গ্রহণ করে আর ওলান দিয়ে উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করে। জটিল অনুভূতির জগত সম্পন্ন এসব প্রাণীদেরকে যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করার ফলে তাদেরকে যে কেবল শারীরিক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাই নয়, তাদের সামাজিক এবং মানসিক জীবনেও মানুষের এসব আচরণ তৈরি করছে অসহনীয় চাপ।৭

image062.jpg

৪০। একটি বাণিজ্যিক মুরগি খামারে কনভেয়র বেল্টের উপর বসানো মুরগির বাচ্চা। মোরগ এবং ত্রুটিযুক্ত মেয়ে মুরগিগুলোকে এখান থেকে আলাদা করা হয়। এরপর গ্যাস চেম্বারে তাদের শ্বাসরূদ্ধ করে মারা হয় এবং স্বয়ংক্রিয় মেশিনে কেটে ফেলা হয় বা কখনও তাদেরকে স্রেফ আবর্জনায় ছুড়ে ফেলা হয় এবং পিষে মারা হয়। এ ধরনের বড় মুরগি খামারে এভাবে প্রতিবছর কোটি কোটি মুরগি মারা যায়।

আফ্রিকানদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব থেকে যেমন আটলান্টিক অঞ্চলে দাস ব্যবসার জন্ম হয়নি, ঠিক একইভাবে প্রাণীদের প্রতি কোনও বিদ্বেষ থেকেও বড় আকারের গবাদি পশু শিল্প গড়ে ওঠেনি। কিন্তু, অস্বীকার করার উপায় নেই, আফ্রিকান এবং প্রাণীদের প্রতি উদাসীন মনোভাবই এসব ব্যবসার গতিশীল হবার মূল কারণ। যারা ডিম, দুধ বা মাংসের ভোক্তা তাদের মাঝে খুব কম সংখ্যক মানুষই এসবের সাথে জড়িত মুরগি, গরু বা শুকরের জীবনের পরিণতি নিয়ে ভাবেন। যে অল্প কজন ভাবেন, তাদেরকেও প্রায়শই বলতে শোনা যায়, যন্ত্রের সাথে এইসব গবাদি পশু বা পাখির তেমন কোন পার্থক্য নেই। এই প্রাণীগুলো সংবেদনশীলতা এবং আবেগ বর্জিত এবং তাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতি নেই। মজার ব্যাপার হলো বিজ্ঞানের যে শাখাটি বাণিজ্যিকভাবে দুধ বা ডিম উৎপাদনের অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করেছে, বিজ্ঞানের সে শাখাটিই সাম্প্রতিককালে সন্দেহাতীতভাবে একথা প্রমাণ করেছে যে, এইসব স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিদেরও আছে একটি সংবেদনশীল অনুভূতি ও আবেগের জগত। তারা যে কেবল শারীরিক সুখ-দুঃখ অনুভব করতে পারে তাই নয়, মানসিক যন্ত্রণাও তাদের ভোগায়।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী বন্য অবস্থায় বসবাসকালীন সময়ে গবাদিপশুগুলোর মধ্যে এইসব সামাজিক এবং মানসিক চাহিদার উদ্ভব হয়েছে। সেসময় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বংশবিস্তারের জন্য এই দুটো ব্যাপার ছিল অপরিহার্য। একটি বন্য গরুকে জানতে হত কীভাবে অন্যান্য গরু এবং ষাঁড়ের সাথে তাকে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কারণ, এটা না জানলে তার পক্ষে আত্মরক্ষা এবং বংশবিস্তার করা সম্ভব ছিল না। এইসব অপরিহার্য গুণাবলি অর্জনের জন্য অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো বিবর্তন গরুর বাছুরের ক্ষেত্রেও খেলাধুলার প্রতি একটা তীব্র আগ্রহ গড়ে তুলেছে (স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে খেলাধুলা করা সামাজিক আচরণ শেখার একটা উপায়) । পাশাপাশি বিবর্তন বাছুরের মধ্যে মায়ের সাথে একটা গভীর সম্পর্কের ভিতও রচনা করে দিয়েছে কারণ মায়ের দুধ এবং যত্ন একটি বাছুরের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য।

এখন, একজন পশুপালক যদি একটি মেয়ে বাছুরকে তার মায়ের থেকে আলাদা করে একটি খাঁচায় রাখে, তাকে খাবার, পানি, রোগ প্রতিষেধক টিকা ও ওষুধ দেয় এবং বয়স হলে তাকে একটি ষাঁড়ের শুক্রাণু দিয়ে গর্ভবতী করে, তার অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? বস্তুগতভাবে চিন্তা করলে, টিকে থাকা এবং বংশবিস্তারের জন্য বাছুরটির সামাজিক বন্ধন তৈরির বা খেলার সাথীর আর কোন দরকার নেই। কিন্তু বাছুরটির দিক থেকে বিবেচনা করলে আমরা দেখব তার মধ্যে মায়ের সাথে বন্ধন তৈরি করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যান্য বাছুরের সাথে খেলাধুলা করার ইচ্ছা এখনও ভীষণভাবে উপস্থিত। এ চাহিদাগুলো পূরণ না হলে, বাছুরটি ভীষণরকম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়। এটি বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা- বন্য জীবনে টিকে থাকার জন্য তৈরি হওয়া সামাজিক চাহিদা বর্তমানে টিকে থাকা এবং বংশবিস্তারের জন্য জরুরি না হলেও তা ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বে থেকে যায়। শিল্পনির্ভর কৃষির একটি দুঃখজনক দিক হলো, এটি কেবল প্রাণীদের বস্তুগত চাহিদার দিকে নজর দেয় এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদাগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে যায়।

আমেরিকান মনস্তত্ত্ববিদ হ্যারি হারলো যখন বানরের বিকাশ নিয়ে গবেষণা করছিলেন সেই ১৯৫০ এর দশক থেকে এই তত্ত্ব মানুষের জানা। গবেষণার জন্য হারলো জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরই বাচ্চা বানরগুলোকে তাদের মায়ের থেকে আলাদা করলেন। বাচ্চাগুলোকে আলাদা খাঁচায় পুতুল মা বানরের সাথে রাখা হলো। প্রতিটি খাঁচায় হারলো দুটি পুতুল মা বানর রাখলেন। এর মধ্যে একটি পুতুল ধাতব তার দিয়ে বানানো যার মধ্যে দুধ ভরা একটি বোতল রাখা আছে যেখান থেকে বাচ্চা বানরটি চাইলে দুধ খেতে পারে। অপর পুতুলটি কাঠের উপর কাপড় দিয়ে এমনভাবে বানানো হয়েছিল যাতে সেটাকে দেখতে সত্যিকারের বানরের মতই লাগে। কিন্তু এই পুতুলটির সাথে বাচ্চা বানরকে খাওয়ানোর মত কোন উপকরণ দেয়া হলো না। ধারণা করা হলো, বাচ্চাটি তার প্রয়োজনের তাগিদেই কাঠ ও কাপড় দিয়ে বানানো মা বানরকে ছেড়ে ধাতব তারে বানানো দুধের বোতল ওয়ালা মা বানরের দিকে আকৃষ্ট হবে।

কিন্তু হারলো অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, বাচ্চাটি কাঠ ও কাপড়ে বানানো সত্যিকারের বানরের মতো দেখতে পুতুল মায়ের সাথেই বেশি সময় কাটাচ্ছে। দুটো পুতুল মাকে যখন কাছাকাছি রাখা হলো, তখন দেখা গেল যে, বাচ্চা বানরটি ধাতব তারে বানানো পুতুল মায়ের থেকে দুধ খাবার সময়েও কাপড়ে বানানো মায়ের কাপড় আঁকড়ে ধরে আছে। হারলো ভাবলেন, হয়তো ঘরের তাপমাত্রা কম, এই কারণে বাচ্চাটি পুতুল মায়ের কাপড় আঁকড়ে আছে। একারণে তিনি ধাতব তারে তৈরি মায়ের ভেতর বৈদ্যুতিক বাল্ব স্থাপন করলেন যাতে সেখান থেকে তাপ নির্গত হয়ে জায়গাটা কিছুটা গরম থাকে। এরপরেও দেখা গেল, একদম সদ্যপ্রসূত বাচ্চাগুলো ছাড়া প্রায় সব বাচ্চাই কাপড়ের তৈরি মাকেই বেশি পছন্দ করছে।

harlo.jpg

৪১। হারলোর পরীক্ষার একটি বাচ্চা বানর যেটি ধাতব মায়ের থেকে দুধ খাবার সময়ও কাপড়ে তৈরি মাকে আঁকড়ে ধরে আছে।

পরবর্তী গবেষণাগুলো থেকে জানা গেল, মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে নেয়া হারলোর বাচ্চা বানরগুলোকে সবরকম পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা হলেও তাদের মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তারা বানর সমাজে সহজভাবে মিশতে পারে না, অন্য বানরের সাথে সহজে যোগাযোগ করতে পারে না, দুশ্চিন্তায় ভোগে এবং তাদের মাঝে আগ্রাসী মনোভাব দেখা যায়। এতসব পরীক্ষা একটা কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, বস্তুগত চাহিদার বাইরেও বানরদের মানসিক চাহিদার একটা জগত আছে এবং সেই চাহিদা পূরণ না হলে তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হারলোর এতিম বানরগুলো কাপড়ে তৈরি মা বানরগুলোর সাথে বেশি সময় কাটাচ্ছিল, কারণ কেবল দুধ তাদের চাহিদা ছিল না, তারা চাচ্ছিল মায়ের সাথে একটা মানসিক সম্পর্ক তৈরি করতে। পরবর্তী দশকগুলোতে অনেকগুলো গবেষণা প্রমাণ করে এই মানসিক চাহিদার ব্যাপারটি কেবল বানর নয়, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী এমনকি পাখির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বর্তমানে, খামারে পালন করা কোটি কোটি গবাদি পশুর অবস্থা হারলোর মা থেকে আলাদা করা বানরগুলোর মত, কারণ খামারিরা পৃথকভাবে পালন করার জন্য নিয়মিত বাছুর এবং বাচ্চাগুলোকে তাদের মায়ের থেকে আলাদা করে সরিয়ে নেয়।৮

বর্তমান পৃথিবীতে যান্ত্রিক পশুপালন ব্যবস্থার উপাদান হিসেবে হাজার হাজার কোটি গবাদি প্রাণী বসবাস করে এবং প্রতিবছর পৃথিবী জুড়ে প্রায় পাঁচশত কোটি গবাদি পশুকে হত্যা করা হয়। শিল্পসম্মত যান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে কৃষি উৎপাদন এবং মানুষের খাদ্যের যোগান খুব দ্রুত বহুগুণ বেড়েছে। শস্য এবং পশুপালনের এসব যান্ত্রিক পদ্ধতি গড়ে তুলেছে আধুনিক পৃথিবীর আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি। কৃষির শিল্পায়নের আগে শস্যক্ষেতে বা খামারে উৎপাদিত ফসলের অধিকাংশই কৃষক এবং খামারের প্রাণীদের খাওয়ানোর কাজেই ‘অপচয়’(!) হতো। এসবের পর শিল্পী, শিক্ষক, সাধু-সন্ন্যাসী বা আমলাদের ভোগের জন্য খুব সামান্য অংশই অবশিষ্ট থাকত। এই কারণে, সে সময়ের প্রায় সব সমাজেই মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ ছিল কৃষক। শিল্প বিপ্লবের পর কৃষির যান্ত্রিকীকরনের সাথে সাথে অল্প কিছু সংখ্যক কৃষকের পক্ষে আরও বেশি বেশি কেরানি এবং কারখানার শ্রমিকদের খাদ্যের যোগান দেয়া সম্ভবপর হলো। আজকের দিনের আমেরিকায়, মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই ২ শতাংশ মানুষ যে কেবল আমেরিকার সব মানুষের খাদ্যশস্যের যোগান দেয় তাই নয়, বরং যোগান দেওয়ার পর অতিরিক্ত খাদ্যশস্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশে রপ্তানীও করে থাকে।৯ কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া নগর সভ্যতার বিকাশ সম্ভব হতো না, পাওয়া যেত না কল-কারখানা এবং অফিসে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত হাত ও মস্তিষ্ক।

কৃষিকাজ এবং পশুপালনের দায় থেকে বেরিয়ে আসা এইসব অগণিত হাত আর মস্তিষ্ক তৈরি করতে লাগল অজস্র নতুন নতুন পণ্যের সমাহার। মানুষ এখন আগের যে কোনও সময়ের থেকে বেশি পরিমাণে ইস্পাত, বস্ত্র, বড় বড় দালানকোঠা তৈরি করে। এসব ছাড়াও মানুষ আজকে বৈদ্যুতিক বাতি, মোবাইল ফোন, ক্যামেরা এবং থালাবাসন ধোয়ার যন্ত্রের মত এমন অনেক পণ্য উৎপাদন করে যা আগে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো মানুষের উৎপাদন ছাড়িয়ে গেছে তার চাহিদাকে। আর ফলে সৃষ্টি হয়েছে নতুন একটি সমস্যা- উৎপাদিত এতসব বাড়তি পণ্য কিনবে কে?

কেনাকাটার কাল

একটি হাঙরকে বেঁচে থাকার জন্যযেমন অবিরাম সাঁতরাতে হয়, আধুনিক ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিকেও তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ক্রমাগত উৎপাদন বাড়াতেই হবে। কিন্তু, শুধু উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়। কাউকে না কাউকে অবশ্যই সেসব উৎপাদিত পণ্য কিনতে হবে। এটা সম্ভব না হলে শিল্পপতি এবং বিনিয়োগকারী উভয়েই পথে বসবেন। এই দুরবস্থা এড়ানোর জন্য এবং শিল্পকারখানার উৎপাদিত পণ্যগুলোর বিক্রিবাট্টা নিশ্চিত করার জন্য নতুন একটি ধারণার উদ্ভব হয়েছে তার নাম ‘ভোগবাদ’ (Consumerism)।

ইতিহাসের পুরোটা সময় জুড়ে বেশিরভাগ মানুষকেই নানারকম অভাবের বেড়াজালে বন্দী থাকতে হয়েছে। মিতব্যয়িতা ছিল তাদের জীবনবোধের অংশ। এ সংক্রান্ত দু’টো বিখ্যাত উদাহরণ হলো পিউরিটান (Puritans) এবং স্পার্টানদের (Spartans) জীবনদর্শনে কঠোর কৃচ্ছতাসাধনের উপস্থিতি। একজন ভাল মানুষ সবরকম বিলাসদ্রব্য এড়িয়ে চলবেন, কখনও খাবারের অপচয় করবেন না এবং জামাকাপড় ছিঁড়ে গেলে নতুন জামাকাপড় কেনার বদলে সেলাই করে পুরনো কাপড় দিয়েই চালানোর চেষ্টা করবেন। কেবলমাত্র রাজা এবং অভিজাত ব্যক্তিরাই প্রকাশ্যে জমকালো পোশাক পরে, বিলাস দ্রব্য ব্যবহার করে এই নিয়মের ব্যতিক্রম করতে পারবেন এবং তাদের পরিচয় জাহির করতে পারবেন।

অন্যদিকে ‘ভোগবাদ’ ক্রমাগত নতুন নতুন পণ্য ও সেবা ভোগ করাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে। অসীম পণ্য ও সেবা ভোগের মাধ্যমে তৃপ্তি লাভ, নিজের ক্ষতিসাধন, এমনকি নিজেকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার ব্যাপারেও এটি মানুষকে উৎসাহিত করে। ‘ভোগবাদ’ অনুযায়ী কৃপণতা বা মিতব্যয়িতা হলো একটি অসুখ যার আশু প্রতিকার জরুরি। ভোগবাদের এই মূলনীতি বাস্তবে উপলব্ধি করার জন্য আপনাকে খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। দোকান থেকে কিনে আনা একটি পণ্যের মোড়কে লেখা কথাগুলো পড়ুন। এখানে আমি সকালের নাস্তার জন্য খাওয়া টেলমা (Telma) নামে একটি কোম্পানির তৈরি আমার প্রিয় সিরিয়ালের প্যাকেটে লেখা কথাগুলো তুলে দিচ্ছি-

কখনও আপনার দরকার তৃপ্তির। কখনও আপনার দরকার একটু বেশি উদ্যম। ওজনের দিকে নজর দেয়ার অনেক সময় আপনি পাবেন, কখনো কখনো হয়ত কিছুমিছু একটা খেলেই হল। কিন্তু এখন? টেলমা নিয়ে এসেছে বিভিন্ন স্বাদের মজাদার সিরিয়াল শুধু আপনার জন্য – কোন দ্বিধা ছাড়া খুঁজে নিন আপনার সবটুকু তৃপ্তি।

একই মোড়কে আরেকটি পণ্য ‘হেলথ ট্রিটস’ এর বিজ্ঞাপন বলছে-

হেলথ ট্রিটস পর্যাপ্ত পরিমাণ শস্য, ফল এবং বাদামের সমন্বয়ে আপনাকে দেয় স্বাদ, আনন্দ ও স্বাস্থ্যের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। স্বাস্থ্যের দিকে পুরোপুরি নজর রেখে দুপুর বেলার খাবারে একটু আনন্দ আনার জন্য এর জুড়ি নেই। চমৎকার স্বাদে ভরা একটি পরিপূর্ণ সিরিয়াল।

ইতিহাসের অধিকাংশ সময়েই, কোন পণ্যের মোড়কে এ ধরনের কথা লেখা দেখলে মানুষ সম্ভবত আকৃষ্ট হওয়ার বদলে বিরক্তই হতো। এই ধরনের প্রচারণাকে তারা স্বার্থপর, মূল্যবোধহীন এবং সামাজিক অবক্ষয়ের উপাদান হিসেবেই বিবেচনা করতো। ভোগবাদ অনেক চেষ্টার মাধ্যমে, ‘বেশি না ভেবে করে ফেল’ (Just do it!) – মনস্তত্ত্বের এই জনপ্রিয় ধারণাকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে- মিতব্যয়িতা মানেই নিজের ইচ্ছার সাথে প্রতারণা করা, বেশি ভোগের মাঝেই আছে আনন্দের ফোয়ারা।

ভোগবাদ সফল হয়েছে। আজকে আমরা সকলেই ভাল ভোক্তা। গতকাল পর্যন্ত পৃথিবীতে যার কোনও অস্তিত্ব ছিল না এবং আমাদের কোনও দরকার নেই এমন অসংখ্য পণ্য আজ আমরা কিনি। উৎপাদনকারীরা ইচ্ছা করেই স্বল্পমেয়াদী পণ্য তৈরি করেন, ঠিকঠাক কাজ চলছে এমন একটি পণ্যেরও নতুন মডেল উদ্ভাবন করেন এবং আমরা সবার সাথে তাল মেলানোর জন্য সেসব কিনি। কেনাকাটা করা আজ আমাদের অবসর যাপনের অংশ এবং নানারকম ভোগ্যপণ্য আমাদের পরিবারের সদস্য, জীবনসঙ্গী এবং বন্ধুদের মাঝে সম্পর্কের সেতু হিসেবে কাজ করে। ক্রিসমাসের মতো ধর্মীয় ছুটির দিনগুলো কেনাকাটার উৎসবে পরিণত হয়েছে। এমনকি, আমেরিকায়, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া সাহসী সৈনিকদের স্মরণে তৈরি হওয়া ‘মেমোরিয়াল ডে’ পরিণত হয়েছে দোকান থেকে বিশেষ ছাড়ে পণ্য কেনার উপলক্ষ্যে। বেশিরভাগ মানুষই এই দিনটিকে কেনাকাটা করার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখেন, সম্ভবতঃ কেনাকাটার মধ্য দিয়েই তারা প্রমাণ করতে চান, দেশের স্বাধীনতার জন্য শহীদদের আত্নত্যাগ বৃথা যায়নি।

ভোগবাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় খাবারের দোকানগুলোতে। আগেকার গৎবাঁধা কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতে মানুষের সাথে ছায়ার মতো জড়িয়ে থাকত অনাহার। আজকের সম্পদশালী পৃথিবীতে অন্যতম বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হলো ‘স্থূলতা’। মজার ব্যাপার হলো উন্নত দেশে স্থূলতার এই সমস্যা গরিবদের মাঝেই বেশি, কারণ তারা পেট পুরে হ্যামবার্গার আর পিজ্জা খেতে ভালোবাসে। অপরদিকে ধনীদের মাঝে এই স্থূলতার হার কম কারণ তারা খায় টাটকা সবজিতে তৈরি সালাদ আর ফলের রসে তৈরি স্মুদি। প্রতি বছর বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর মুখে খাবার তুলে দিতে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, আমেরিকান জনগোষ্ঠী তার থেকে বেশি অর্থ ব্যয় করে নিজেদের স্থূলতা কমাতে এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে। স্থূলতার ক্ষেত্রে ভোগবাদ দুই দিক থেকে জয়লাভ করেছে। প্রথমত, কম খাওয়ার বদলে মানুষ বেশি খাচ্ছে, ফলে অর্থনীতির সংকোচন হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, অর্জিত স্থূলতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষ ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য নানা পণ্য কিনছে, ফলে অর্থনীতি আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, পুঁজিবাদে বিশ্বাসী একজন ব্যবসায়ী, ব্যবসায় অর্জিত মুনাফা ব্যয় না করে যিনি নতুন নতুন বিনিয়োগে উৎসাহী, তার ধারণার সাথে ভোগবাদের আরও বেশি ভোগ করার ধারণা কিভাবে একই সময়ে, একই সমাজে সহাবস্থান করে? উত্তরটা সোজা। অতীতের সমাজগুলোর মত আজকের দিনের সমাজেও ধনী ও গরিবের মাঝে একটি সুস্পষ্ট ভেদরেখা বিদ্যমান। মধ্যযুগের ইউরোপে ধনীরা নিজেদের ভোগবিলাসের জন্য যথেচ্ছ অর্থ ব্যয় করতেন, আর গরীবদের বেছে নিতে হত কৃচ্ছ্রতার জীবন, হিসাব করে খরচ করতে হত প্রতিটা পয়সা। আজকে, পাশার দান উল্টে গেছে। আজ, ধনীরা তাদের সম্পদ এবং বিনিয়োগের যত্ন নেয়, হিসেব রাখে, অপরদিকে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণী প্রয়োজন না বুঝেই নতুন গাড়ি বা হাল ফ্যাশনের টেলিভিশন কিনতে গিয়ে ঋণের চোরাবালিতে ডুবতে থাকে।

ধনতন্ত্র আর ভোগবাদ আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, দুটি পরিপূরক বিধান। এক দলের জন্য অনিবার্য বিধান- ‘বিনিয়োগ’, আর বাকি সবার জন্য অনিবার্য বিধান- ‘ভোগ’।

ধনতন্ত্র এবং ভোগবাদের এই সম্মিলিত ধারণা আরেকটি দিক থেকেও বৈপ্লবিক। অতীতের ন্যায়নীতি সংক্রান্ত অধিকাংশ ধারণাগুলোই অনুসরণ করা মানুষের জন্য ছিল দুঃসাধ্য। বেশিরভাগ মত অনুযায়ী, মানুষ ইহকালে যদি দয়াবান ও সহনশীল হয়, রাগ এবং চাহিদা বিসর্জন দেয় এবং আপন স্বার্থপরতার উর্ধ্বে যেতে পারে তবেই কেবলমাত্র তার পক্ষে ভোগের জন্য স্বর্গ পাওয়া সম্ভব। ইহকালে এতকিছু করা বেশিরভাগ মানুষের পক্ষেই ছিল খুবই কঠিন। ন্যায়শাস্ত্রের ইতিহাস তাই দুঃখের ইতিহাস, যেখানে মানুষের জন্য অনেক মহৎ আদর্শের সন্ধান আছে, কিন্তু মানুষ যেগুলোর কোনটিই ঠিকমতো পালন করতে পারেনি। বেশিরভাগ খ্রিস্টান যিশুর জীবনকে অনুকরণ করে চলতে পারেননি, বেশিরভাগ বৌদ্ধ অনুসরণ করতে পারেননি গৌতম বুদ্ধকে এবং বেশিরভাগ কনফুশিয়ানের জীবন যাপন দেখলে কনফুসিয়াস নিজেই হয়তো রাগ সংবরণ করতে পারতেন না।

অপরদিকে, আজকের দিনের বেশিরভাগ মানুষই ধনতন্ত্র ও ভোগবাদের সম্মিলিত আদর্শ পুরোপুরি মেনে চলে। নতুন এই আদর্শের স্বর্গ প্রদানের শর্ত হলো- ধনীদেরকে সবসময় লোভী থাকতে হবে এবং ব্যস্ত থাকতে হবে আরও বেশি মুনাফা অর্জনের চেষ্টায়, আর সাধারণ মানুষদের লাগামছাড়া চাহিদা আর ইচ্ছার ঘোড়ায় সওয়ার হতে হবে এবং আরও বেশি, আরও বেশি পণ্য কিনতে হবে। এটাই প্রথম ধর্ম যার অনুসারীরা ধর্ম তাদেরকে যা করার বিধান দিয়েছে ঠিক তাই মেনে চলছে। নতুন ধর্মের এতসব বিধান মেনে চলার বিনিময়ে যে স্বর্গ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে তার স্বরূপ কি আমরা জানি? জানি, টেলিভিশনের হাজার হাজার রঙিন বিজ্ঞাপনের মাঝে বহুবার, বহুভাবে সেই স্বর্গের রূপ আমরা দেখেছি।


1 Mark, Origins of the Modern World, 109.

2 Nathan S. Lewis and Daniel G. Nocera, ‘Powering the Planet: Chemical Challenges in Solar Energy Utilization’, Proceedings of the National Academy of Sciences 103:43 (2006), 15,731.

3 Kazuhisa Miyamoto (ed.), ‘Renewable Biological Systems for Alternative Sustainable Energy Production, FAO Agricultural Services Bulletin 128 (Osaka: Osaka University, 1997), Chapter 2.1.1, accessed 10 December 2010, http://www.fao.org/docrep/W7241E/w7241eo6.htm#2.1.1percent20solarpercent20energy; James Barber, ‘Biological Solar Energy’, Philosophical Transactions of the Royal Society A 365:1853 (2007), 1007.

4 ‘International Energy Outlook 2010’, US Energy Information Administration, 9, accessed 10 December 2010, http://www.eia.doe.gov/oiaf/ieo/pdf/0484(2010).pdf.

5 S. Venetsky, ‘ “Silver” from Clay’, Metallurgist 13:7 (1969), 451; Fred Aftalion, A History of the International Chemical Industry (Philadelphia: University of Pennsylvania Press, 1991), 64; A. J. Downs, Chemistry of Aluminium, Gallium, Indium and Thallium (Glasgow: Blackie Academic & Professional, 1993), 15.

6 Jan Willem Erisman et al., ‘How a Century of Ammonia Synthesis Changed the World’, Nature Geoscience 1 (2008), 637.

7 G. J. Benson and B. E. Rollin (eds.), The Well-being of Farm Animals: Challenges and Solutions (Ames, IA: Blackwell, 2004); M. C. Appleby, J. A. Mench and B. O. Hughes, Poultry Behaviour and Welfare (Wallingford: CABI Publishing, 2004); J. Webster, Animal Welfare: Limping Towards Eden (Oxford: Blackwell Publishing, 2005); C. Druce and P. Lymbery, Outlawed in Europe: How America is Falling Behind Europe in Farm Animal Welfare (New York: Archimedean Press, 2002).

8 Harry Harlow and Robert Zimmermann, ‘Affectional Responses in the Infant Monkey’, Science 130:3373 (1959), 421–32; Harry Harlow, ‘The Nature of Love’, American Psychologist 13 (1958), 673–85; Laurens D. Young et al., ‘Early stress and later response to separation in rhesus monkeys’, American Journal of Psychiatry 130:4 (1973), 400–5; K. D. Broad, J. P. Curley and E. B. Keverne, ‘Mother-infant bonding and the evolution of mammalian social relationships’, Philosophical Transactions of the Royal Society B 361:1476 (2006), 2,199–214; Florent Pittet et al., ‘Effects of maternal experience on fearfulness and maternal behaviour in a precocial bird’, Animal Behaviour (March 2013), In Press – available online at: http://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0003347213000547).

9 ‘National Institute of Food and Agriculture’, United States Department of Agriculture, accessed 10 December 2010, http://www.csrees.usda.gov/qlinks/extension.html.

 

১৬. পুঁজিবাদের দর্শন

 

সাম্রাজ্য তৈরি আর বিজ্ঞানের বিকাশের পিছনে টাকার বড় রকমের ভূমিকা ছিল ঠিকই। কিন্তু টাকাই কি এই দুটো কাজের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল?

ইতিহাসে অর্থনীতির আসল ভূমিকাটা চট করে বুঝে ওঠা যায় না। টাকা যুগে যুগে সাম্রাজ্য তৈরি আর ধ্বংস করেছে, নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, শিল্পকারখানার চাকা ঘুরিয়েছে, আবার লাখ লাখ মানুষকে বানিয়েছে দাস, শত শত প্রাণী আর উদ্ভিদকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে এই টাকাই। সেসব নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বই লিখে ফেলা যায়। অথচ মাত্র একটা শব্দে এর পুরোটা বুঝিয়ে দেওয়া যায়- ‘বৃদ্ধি’। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর অবস্থা ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন, অর্থনীতির বৃদ্ধি কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। সে সামনে যা পায় সেটাই গ্রাস করে, আর সাথে সাথেই আরও বড় হয়ে যায় চোখের পলকে।

ইতিহাসের শুরুর বেশিরভাগ সময় জুড়েই অর্থনীতি মোটামুটি স্থবির ছিল। হ্যাঁ, পৃথিবীর মোট উৎপাদন বেড়েছে বটে, কিন্তু সেটা হয়েছে মানুষের নতুন নতুন জায়গায় যাওয়া আর নতুন নতুন দেশ আবিষ্কারের জন্য। মাথাপিছু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়েনি। কিন্তু এই আধুনিক যুগে এসেই পরিস্থিতি পালটে গেল। ১৫০০ সালে পৃথিবীর সব পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট উৎপাদন ছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি ডলারের মতো। আর আজকে সেটা প্রায় ৬০ লক্ষ কোটি ডলার! তার চেয়ে বড় কথা, ১৫০০ সালে মাথাপিছু উৎপাদনের মূল্য ছিল বছরে গড়ে ৫৫০ ডলার, আর আজকের দিনে সকল নারী-পুরুষ-শিশু মিলে গড় বার্ষিক মাথাপিছু উৎপাদন ৮৮০০ ডলার হয়ে গেছে!১ এই বিপুল বৃদ্ধির কারণটা কী?

অর্থনীতি বেশ বাজে রকমের জটিল বিষয়। তার মধ্যেও আসুন একটা সহজ উদাহরণ দেখি।

ধরুন, ক্যালিফোর্নিয়ার এল ডোরাডোর তুখোড় পুঁজিপতি স্যামুয়েল গ্রিডি একদিন একটা ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করলেন।

একই শহরের উঠতি ঠিকাদার এ এ স্টোন তার প্রথম বড় কাজটা শেষ করে হাতে পেলেন নগদ লাখ দশেক ডলার। সেটা নিয়ে তিনি সোজা চলে গেলেন গ্রিডির ব্যাঙ্কে জমা করে দিতে। এখন ব্যাঙ্কের পুঁজির পরিমাণ হয়ে গেল দশ লাখ ডলার।

এদিকে শহরের একজন ঝানু রাঁধুনি জেন ম্যাকডোনাট খেয়াল করলেন যে, শহরে ভালো কোনো বেকারি নেই, কাজেই এই সুযোগ একটা নতুন ব্যবসা শুরু করার। কিন্তু সেটা করার মতো টাকা তার কাছে নেই। কাজেই তিনিও গেলেন ব্যাঙ্কে, গিয়ে গ্রিডিকে বোঝালেন যে এই বেকারিটা হবে টাকা খাটানোর মোক্ষম জায়গা। বুঝিয়ে সুঝিয়ে তিনি দশ লাখ ডলার ধার নেওয়ার ব্যবস্থাও করে ফেললেন। ব্যাঙ্কের হিসাবের খাতায় তার নামের পাশে যোগ হল দশ লাখ ডলার।

এখন বেকারি তৈরি করে দেওয়ার জন্য ম্যাকডোনাট গিয়ে ধরলেন ঠিকাদার স্টোনকে। এই কাজ বাবদ স্টোন চাইলেন দশ লক্ষ ডলার।

ম্যাকডোনাট স্টোনকে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে দশ লাখ ডলারের একটা চেক ধরিয়ে দিলেন। স্টোন সেটা জমা করলেন নিজের অ্যাকাউন্টে।

তাহলে ব্যাঙ্কে স্টোনের অ্যাকাউন্টে এখন কত আছে? ঠিক ধরেছেন, বিশ লাখ ডলার।

কিন্তু ব্যাঙ্কের সিন্দুকে নগদ ডলার আছে কত? দশ লাখ!

এখানেই শেষ নয়। দুমাস পর স্টোন ম্যাকডোনাটকে জানালেন, এদিক-সেদিক দিয়ে খরচ বেড়ে গিয়ে এখন আর দশ লাখ ডলারে বেকারিটা তৈরি করা যাচ্ছে না, পুরোটা শেষ করতে মোট খরচ বিশ লাখ ডলারে দাঁড়াবে। ম্যাকডোনাট এতে খুশি না হলেও, কাজ তো আর মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া যায় না, তাই তিনি আবার গেলেন ব্যাঙ্কে, গিয়ে গ্রিডিকে বুঝিয়ে আরও দশ লাখ ডলার ধার করে আনলেন নিজের অ্যাকাউন্টে। তারপর সেটা পাঠিয়ে দিলেন স্টোনের অ্যাকাউন্টে।

তাহলে এখন স্টোনের অ্যাকাউন্টে কত জমল? ত্রিশ লাখ।

কিন্তু ব্যাঙ্কে আছে কত? ব্যাঙ্ক কিন্তু সেই শুরু থেকেই মাত্র দশ লাখ ডলার নিয়ে বসে আছে।

আমেরিকার বর্তমান আইন অনুযায়ী ব্যাঙ্কটা এই কাজ আরও সাতবার করতে পারে, অর্থাৎ স্টোনের অ্যাকাউন্টের অঙ্কটা ১ কোটিতে গিয়েও ঠেকতে পারে, যদিও ব্যাঙ্কের সিন্দুকে সেই দশ লাখই সম্বল। একটা ব্যাঙ্ক তার কাছে থাকা প্রতি ডলারের বিপরীতে দশ ডলার পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। তার মানে হল এখনকার দিনে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে যত টাকা দেখা যায় তার ৯০ শতাংশই আসলে কাগজের নোট কিংবা ধাতব মুদ্রার আকারে নেই।২ আজ যে কোনো একটা বড় ব্যাঙ্কের সব গ্রাহক যদি একই সাথে যার যার অ্যাকাউন্টের সব টাকা তুলে নিতে চায়, সেই ব্যাঙ্ক কিছুক্ষণের মধ্যেই পথে বসবে (যদি না সরকারি সাহায্য মেলে)।

পুরো ব্যাপারটাকে কি একটা বিরাট ধোঁকাবাজি মনে হচ্ছে? তাই যদি হয়, তাহলে বর্তমান পৃথিবীর সম্পূর্ণ অর্থনীতিই একটা বিশাল ধোঁকা ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু আসলে এটা ধোঁকাবাজি নয়, বরং মানুষের কল্পনাশক্তির একটা চরম নিদর্শন। আমরা অনাগত ভবিষ্যতের উপর ভরসা রাখি, আর সেই ভরসার ভিত্তিতেই ব্যাঙ্কগুলো টিকে থাকে, অর্থনীতি এগিয়ে যায়। পৃথিবীর প্রায় সবটুকু টাকাপয়সার গোড়ায় আছে এই বিশ্বাস।

উপরের গল্পে স্টোনের অ্যাকাউন্টের টাকা আর ব্যাঙ্কের সম্পদের পার্থক্যটাই হল ম্যাকডোনাটের টাকা। এই টাকাটা গ্রিডি পুঁজি হিসেবে খাটিয়েছেন আরও টাকা তৈরির আশায়। বেকারি থেকে একটা রুটিও তৈরি হয়নি এখনও, অথচ গ্রিডি আর ম্যাকডোনাট দুজনেই আশা করছেন যে বছর খানেকের মধ্যেই এই বেকারি থেকে অনেক রুটি, কেক আর বিস্কুট তৈরি হবে, সেগুলো বিক্রি করে আসবে লাভের টাকা। সেই টাকা দিয়ে ম্যাকডোনাট তার ঋণ সুদসহ শোধ করে দিতে পারবেন। তখন যদি স্টোন তার অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা তুলে নিতে চান, গ্রিডিও সেটা দিতে পারবেন। তার মানে সবকিছুই হচ্ছে একটা কাল্পনিক ভবিষ্যতের উপর বিশ্বাস রেখে। ব্যাঙ্ক মালিক আর বেকারি মালিক বিশ্বাস করে একদিন বেকারিটা ঠিকমতো চলবে, আর ঠিকাদার বিশ্বাস করে একদিন ব্যাঙ্কে টাকা আসবে।

আমরা আগেই দেখেছি, টাকার যেকোনো কিছুতে পরিণত হওয়ার একটা বিস্ময়কর ক্ষমতা আছে, আবার যেকোনো কিছুকে অন্য যেকোনো কিছুতে পরিণত করার ক্ষমতাও আছে। তবে আগে এই ক্ষমতাও সীমিত ছিল। তখন টাকা আর টাকার বিনিময়ে পাওয়া সবকিছু ‘বর্তমানেই’ আটকে ছিল। তাই নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করাটা খুব সহজ হতো না, আর অর্থনীতির বৃদ্ধির গতিও ছিল অনেক ধীর।

বেকারির কথাটাই ভাবুন। ম্যাকডোনাট কি নিজের টাকায়, বা নিজের কোনো সম্পদ দিয়ে বেকারিটা তৈরি করতে পারতেন? পারতেন না। বর্তমানে তার বেকারি তৈরির স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করার মতো টাকা নেই। রুটি আর কেক বিক্রি করতে না পারলে তার হাতে টাকা আসবেও না। টাকা না থাকলে কোনো ঠিকাদার তাকে বেকারি তৈরি করেও দেবে না।

কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ এই চক্রে আটকা পড়ে ছিল। তাই অর্থনীতিও এগোচ্ছিল ধীরে। এখান থেকে বেরোবার পথ মানুষ আবিষ্কার করেছে এই আধুনিক যুগে এসে, ভবিষ্যতে বিশ্বাস রেখে কাজ করার এই নতুন পদ্ধতি তৈরি করে। এখন মানুষ কাল্পনিক পণ্যে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ যে জিনিসটা বর্তমানে নেই, সেটাও তারা ‘ক্রেডিট’ নামক ধার করা টাকা দিয়ে কেনে। ক্রেডিটের মাধ্যমে মানুষ ভবিষ্যৎ বিক্রি করে বর্তমানকে সাজায়। এর গোড়ায় আছে একটাই বিশ্বাস- ভবিষ্যতে আমরা যে সম্পদের মালিক হব সেটা আমাদের বর্তমান সম্পদের চেয়ে ঢের বেশি। সেই ভবিষ্যতে অর্জিত সম্পদ খরচ করে বর্তমানের পণ্য কেনার এই সুযোগটাই দারুণ সব সম্ভাবনা তৈরি করল।

তাহলে ক্রেডিটের মতো এই চমৎকার জিনিসের কথা মানুষ আরও আগে ভাবেনি কেন? ভেবেছে তো বটেই। ক্রেডিটের কাছাকাছি কিছু না কিছু সেই প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে আমাদের জানা প্রায় সব সভ্যতাতেই ছিল। কিন্তু তখনকার মানুষ সেটাকে কাজে লাগাতে পারেনি। কারণ ভবিষ্যৎ যে বর্তমানের চেয়ে ভালো হবে- এই বিশ্বাসটা তাদের মধ্যে এত জোরালো ছিল না। সাধারণত তারা ভাবত অতীতের দিনগুলোই ভালো ছিল, আর ভবিষ্যৎ বর্তমানের চেয়ে খুব একটা ভালো হবে না। অর্থনীতির ভাষায় বলতে গেলে, তারা ভাবত তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ নির্দিষ্ট, সেটা কমলেও কমতে পারে, কিন্তু বেড়ে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। তাই দশ বছর পরে তাদের ব্যক্তিগত, রাষ্ট্রীয়, এমনকি পৃথিবীর মোট সম্পদের উৎপাদন যে আরও বাড়তে পারে, এটা তারা চিন্তাই করতে পারত না। ব্যবসা বাণিজ্যের সব যোগ-বিয়োগের ফল হতো শূন্য। হ্যাঁ, একটা বেকারি হয়তো অনেক লাভ করতে পারে, কিন্তু সেজন্য পাশের বেকারিটাকেই হয়তো লোকসান গুনতে হবে। ভেনিস শহরের উন্নতি করতে গেলে দেখা যাবে জেনোয়া পথে বসে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের সম্পদ বাড়াতে গেলে হয়তো ফ্রান্স থেকেই লুট করে আনতে হবে। একটা কেককে যেভাবেই কাটা হোক না কেন, সেই টুকরোগুলো জোড়া দিলে কি আর সেটা ঐ কেকটার চেয়ে বড় হতে পারে?

এই কারণেই অনেক সমাজে বেশি টাকার মালিক হওয়াটাকে পাপের কাজ হিসেবে দেখা হতো। যিশুখ্রিস্ট তো বলেছেনই, “ধনী মানুষের ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করার চেয়ে সুঁইয়ের ছিদ্রের ভিতর দিয়ে উটের চলে যাওয়া সহজ।” (ম্যাথিউ ১৯ঃ২৪)। একটা কেক কেটে কেউ যদি বড় টুকরোটা নিয়ে যায়, তাহলে নিশ্চয়ই সে অন্য কারও ভাগেরটুকুও নিয়ে যাচ্ছে। এইজন্যই ধনী মানুষেরা তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ দান করে পাপক্ষালন করত।

উদ্যোক্তার দোটানা

কেকটার আকার যদি না বাড়ে, তাহলে আসলে ক্রেডিটের ব্যাপারটাই আর থাকে না। আজকের কেকের আকার আর আগামীকালের কেকের আকারের পার্থক্যটাই হল ক্রেডিট। কেকের আকার যদি না বাড়ে, তাহলে ক্রেডিট আসবে কোত্থেকে? সেক্ষেত্রে অন্য কারো ভাগেরটা দখল করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সেখানে ঝুঁকি আছে। এজন্যই আগেকার দিনে টাকা ধার নেওয়াটা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। ধার নিতে পারলেও সেই টাকার অঙ্কটা হতো অনেক কম, পাওয়া যেত অল্প সময়ের জন্য, আর ফেরত দেওয়ার সময় দিতে হতো চড়া সুদ। তাই নতুন ব্যবসা শুরু করাটা তখন এত সহজ ছিল না। রাজারাও নতুন একটা প্রাসাদ বানানোর আগে, কিংবা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রজাদের উপর কর বাড়িয়ে দিয়ে টাকা জোগাড় করতেন।

আধুনিক অর্থনীতির জাদুচক্র

রাজাদের জন্য এটা তেমন কোনো সমস্যাই ছিল না (যদি প্রজারা ক্ষেপে না যায়), কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য এটা ছিল অনেক বড় বাধা। যার চোখে একটা নতুন বেকারি তৈরির স্বপ্ন ছিল, তাকে হয়তো টাকার জন্য অন্য কারও রান্নাঘরের মেঝে পরিষ্কার করতে হতো।

এই পরিস্থিতিটা সবার জন্যই খারাপ। ক্রেডিট সীমিত বলে মানুষ নতুন ব্যবসা শুরু করতে পারছে না। তাই অর্থনীতির উন্নতিও থেমে যাচ্ছে। আবার অর্থনীতির উন্নতি হচ্ছে না বলে মানুষ আশা হারাচ্ছে, যারা পুঁজির মালিক তারাও ক্রেডিট বাড়াচ্ছে না। সমস্যাগুলো নিজেরাই নিজেদের জিইয়ে রাখে।

কেকটা বড় হচ্ছে

এরকম একটা সময়ে বিজ্ঞানের জগতে ঘটল বিপ্লব, শুরু হল প্রগতির যুগ। এই প্রগতির ধারণার মূলে যে চিন্তা ছিল সেটা এরকম, যদি আমরা আজ আমাদের অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নিই আর আমাদের সম্পদ গবেষণার কাজে লাগাই, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ বর্তমানের চেয়ে আরও ভালো হবে। খুব দ্রুতই এর অর্থনীতিতে এর প্রভাব দেখা গেল। যারা এই প্রগতির ধারণায় বিশ্বাস করে, দেখা গেল তারা এটাও বিশ্বাস করে যে বিভিন্ন ভৌগোলিক আবিষ্কার, প্রযুক্তির উদ্ভাবন আর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন আমাদের উৎপাদন ও সম্পদ বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। ভারত মহাসাগরের ব্যবসা পুরোপুরি চালু রেখেই পাশাপাশি এবার আটলান্টিক মহাসাগরেও নতুন নতুন ব্যবসার পথ তৈরি হল। আগের সব সম্পদের উৎপাদন ঠিক রেখেই নতুন সম্পদের উৎপাদন শুরু হল। এই যেমন কোনো বেকারি কেক তৈরি শুরু করলে তাতে অন্য কোনো বেকারির রুটি তৈরিতে ভাটা পড়ল না। বরং তাতে মানুষের খাবারে বৈচিত্র্য এল, মানুষ আরও বেশি খেতে শুরু করল। কারও সম্পদ কেড়ে না নিয়েও যে কেউ আরও ধনী হতে পারে, সেটা এবার দেখা গেল। একটু আগে যে কেক ভাগাভাগির কথা হচ্ছিল, সেই কেকটা এবার দিনে দিনে আরও বড় হতে লাগল। তাই অন্য কারও ভাগ থেকে না নিয়েও আরও বড় টুকরো পাওয়া সম্ভব হল।

গত ৫০০ বছরে এই প্রগতির কারণেই মানুষের ভবিষ্যতের উপর আস্থা আরও বেড়েছে। এই আস্থার কারণে বেড়েছে ক্রেডিটের পরিমাণ, তার ফলে এসেছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আর সেই অগ্রগতিই ভবিষ্যতের উপর আস্থা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে আরও ক্রেডিট তৈরি হচ্ছে। এটা একদিনে হয়নি। শুরুতে অনেক উঁচুনিচু পথ পেরিয়ে এলেও এখন সেটা অনেকটাই মসৃণ হয়ে গেছে। সারা পৃথিবীতে আজ ক্রেডিটের ছড়াছড়ি। তাই এখন সরকার, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি সাধারণ মানুষেরাও অল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে পারে।

সংক্ষেপে পৃথিবীর অর্থনীতির ইতিহাস

সম্পদের পরিমাণ যে দিনে দিনে বাড়ছে- এই ধারণাটাই অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। ১৭৭৬ সালে স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ “The Wealth of Nations” নামে একটা যুগান্তকারী বই লেখেন। পৃথিবীর ইতিহাসে অর্থনীতিতে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই সম্ভবত আর লেখা হয়নি। সে বইয়ের প্রথম খণ্ডের অষ্টাদশ অধ্যায়ে স্মিথ একেবারে নতুন কিছু যুক্তি হাজির করেন। তিনি বলেন, যখন একজন জমিদার, অথবা কোনো তাঁতি, কিংবা মুচি তার নিজের পরিবারের চাহিদার চেয়েও বেশি টাকা আয় করে, তখন সে ঐ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সহকারী নিয়োগ করে আরও বেশি টাকা আয় করতে পারে। যত বেশি টাকা আয় হবে, তত বেশি সহকারী ঐ কাজে নিযুক্ত হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, কোনো পেশাজীবীর ব্যক্তিগত লাভ যত বেশি হবে, সমাজের মোট সম্পদ ও উন্নয়নও ততই বাড়বে।

আমাদের কাছে এই জিনিসটা খুবই সাদামাটা মনে হবে, ‘যুগান্তকারী’ তো কোনোভাবেই না। এর কারণ হলো, আমরা বাস করি একটা পুঁজিবাদী পৃথিবীতে, যেটা কিনা ইতোমধ্যেই স্মিথের কথা অনুযায়ী চলছে। স্মিথের এই কথাগুলোই ঘুরেফিরে নানাভাবে আমরা প্রতিদিন চোখের সামনে দেখতে পাই, তাই এটাকে আর বিশেষ কিছু বলে মনে হয় না। অথচ ‘ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজ করে, ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়িয়ে সমাজের সমন্বিত সমৃদ্ধি অর্জন করা’ – এই ধারণাটা শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানুষের নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও একটা ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। স্মিথ বলেন যে, লোভ জিনিসটা আসলে খারাপ নয়। আমি ধনী হলে আসলে আমার একার নয়, সবারই কোনো না কোনোভাবে উপকার হয়। অর্থাৎ স্বার্থপরতার মধ্যেই আছে পরার্থপরতা।

স্মিথ মানুষকে শেখালেন এক নতুন অর্থনীতি, যেখানে সবারই লাভ হয়, ঠকে না কেউই। আমার লাভ মানে তোমারও লাভ। মানে শুধু আমি যে কেকের বড় টুকরোটা পাব তা-ই নয়, আমি বেশি পেলে তোমার টুকরোটাও বড় হবে। আমি অভাবে থাকলে তোমার অভাবও যাবে না, কারণ তোমার তৈরি জিনিসটা তখন আমি কিনতে পারব না। আমি ধনী হলেই কেবল তোমার তৈরি জিনিস আমার কাছে বেচে তুমিও ধনী হতে পারবে। সম্পদ আর নৈতিকতার মধ্যেকার দ্বন্দ্বটাকে স্মিথ একেবারে উড়িয়ে দিলেন। বলা যায় স্বর্গের যে দরজাটা ধনীদের জন্য এতদিন বন্ধ ছিল, স্মিথ সেটা খুলে দিলেন। এখন ধনী হওয়াটাই নৈতিক। স্মিথের ভাষ্যমতে, মানুষ অন্যের সম্পদ কেড়ে নিয়ে ধনী হয় না, বরং নিজে ধনী হতে গিয়ে সবার মোট সম্পদের পরিমাণটাই আরও বাড়িয়ে দেয়। তাতে সবারই লাভ। তাই এখন ধনীরা আর পাপী নয়, বরং তারাই সমাজের সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী, কারণ তারাই অর্থনীতিকে সচল রেখে সবার উপকার করে।

অবশ্য এর সবটাই নির্ভর করে ধনীদের কাজের উপর। সম্পদের মালিকেরা যদি তাদের লাভের টাকা ফেলে না রেখে সেটা নতুন কিছু তৈরি করতে বা আরও শ্রমিক নিয়োগ করতে কাজে লাগায়, তাহলেই শুধু এটা সম্ভব। বেশি লাভ হলে সেই অতিরিক্ত টাকা সিন্দুকে ফেলে রাখলে কদিন পরপর সেটা গুনে দেখা ছাড়া আর কোনও কাজেই আসবে না। বরং সেই টাকাকে আরও বেশি উৎপাদনের জন্য খরচ করতে হবে। এটাই স্মিথের প্রস্তাবিত অর্থনীতির মূলমন্ত্র। আধুনিক পুঁজিবাদের মূল কথা এটাই- লাভের টাকা উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে, তাতে আরও বেশি লাভ হবে, সেই টাকাও আবার বিনিয়োগ করতে হবে, তাতে আরও লাভ আসবে- এভাবে চলতেই থাকবে, থেমে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিনিয়োগ নানাভাবে করা যায়। কারখানাটাকে আরও একটু বড় করা যায়, গবেষণা করা যায়, নতুন কোনো পণ্যও বানানো যায়। এই সবকিছুই বিনিয়োগ, কোনো না কোনোভাবে উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। তাই পুঁজিবাদের প্রথম ও প্রধান নীতিই হল- লাভের টাকাকে আরো বেশি উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে।

এই কারণেই পুঁজিবাদকে ‘পুঁজিবাদ’ বলা হয়, কারণ এখানে ‘পুঁজি’ আর ‘সম্পদ’- এ দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। পুঁজি হল টাকা, মালামাল বা যেকোনো সম্পদ যা উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করা হয়। অন্যদিকে সম্পদ হল মাটির নিচে পুঁতে রাখা টাকার বান্ডিল, যা কোনো কিছু উৎপাদনের কাজে লাগে না। যে ফারাও অনেক টাকা খরচ করে একটা বিশাল পিরামিড বানিয়েছে সে পুঁজিবাদী নয়। যে জলদস্যু স্প্যানিশ নৌবহর লুট করে পাওয়া কাঁড়ি কাঁড়ি সোনার মোহর কোনো ক্যারিবিয়ান দ্বীপের বালিতে পুঁতে রেখেছে, সেও পুঁজিবাদী নয়। পুঁজিবাদী হল সেই শ্রমিক, যে তার প্রতি মাসের যৎসামান্য বেতন থেকে কিছু টাকা শেয়ার বাজারে খাটায়।

‘লাভের টাকা উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে হবে’ এই ধারণাটা আমাদের কাছে খুব সাধারণ মনে হলেও একসময় মানুষের কাছে এটা অস্বাভাবিক ছিল। এই আধুনিক যুগ শুরু হওয়ার আগেও মানুষ মনে করত মোট উৎপাদনের পরিমাণ কমবেশি একই রকম। কাজেই উৎপাদন যদি আর না-ই বাড়ে, তবে আরও বেশি বিনিয়োগ করে কী হবে? তাই মধ্যযুগের অভিজাত শ্রেণীর মানুষের মধ্যে দান আর ভোগ- এ দুটো ব্যাপার খুব বেশি দেখা যেত। তাদের লাভের টাকা খরচ হতো নানারকম প্রতিযোগিতায়, যুদ্ধে, পান-ভোজনে আর ভোগ-বিলাসে, নয়তো খরচ হতো গরিবকে কিংবা ধর্মীয় কাজে দান করে। খুব কম মানুষই লাভের টাকা দিয়ে চাষবাস বা নতুন কোনো ব্যবসার কথা ভাবত।

অথচ বর্তমানে সেই অভিজাতদের জায়গাটা নিয়েছে পুঁজিপতিরা। এই পুঁজিবাদী সমাজে আগেকার সেই সামন্ত কিংবা জমিদারদের গুরুত্ব নেই, গুরুত্ব আছে ব্যবসায়ী আর শিল্পপতিদের। আজকের পুঁজিপতিরা মধ্যযুগের সেই অভিজাতদের চেয়ে অনেক বেশি ধনী, কিন্তু তারা ভোগ করে অনেক কম। এইসব মানুষ তাদের আয়ের খুব অল্প অংশই অনুৎপাদনশীল কাজে খরচ করে।

মধ্যযুগে অভিজাত মানুষেরা সোনা আর রেশমের সুতোয় বোনা কাপড় পরত, বড় বড় ভোজসভা, উৎসব আর প্রতিযোগিতায় অনেকটা সময় দিত। অথচ আজকের দিনের কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাকেও দেখা যায় স্যুট নামের ইউনিফর্ম পরতে, আর কাজের বাইরে দেওয়ার মতো সময় তাদের নেই বললেই চলে। একজন পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীর সারা দিন কাটে মিটিঙে মিটিঙে, আর কীভাবে নতুন নতুন জায়গায় বিনিয়োগ করা যায়, শেয়ারের দাম বাড়ল না কমল সেই চিন্তা করে করে। হ্যাঁ, তার স্যুটটা অনেক দামি কাপড়ের হতে পারে, তার চলাচলের জন্য নিজের একটা বিমানও থাকতে পারে- কিন্তু তার পরেও, তার বিনিয়োগের তুলনায় ভোগের পরিমাণটা নগণ্য।

শুধু যে দামী স্যুট পরা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই বিনিয়োগ করে তা নয়। সাধারণ মানুষ অথবা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও একই রকম চিন্তা করে। এজন্যই খাবার টেবিলের আড্ডাতেও প্রায়ই উঠে আসে জমানো টাকা দিয়ে শেয়ার কিনলে ভালো হবে নাকি জমি কিনলে, এই ধরনের বিষয়। সরকারও করের টাকা এমনভাবে খরচ করতে চায় যেন ভবিষ্যতে আরও বেশি কর আদায় করা যায়। এই যেমন, সরকার যদি নতুন একটা সমুদ্র বন্দর বানায়, তাহলে সেটা দিয়ে আরও বেশি পণ্য রপ্তানি হবে, তাতে পণ্য উৎপাদনকারীর আয় বাড়বে, সেখান থেকে সরকার আরও বেশি আয়কর পাবে। আবার কোনো সরকার হয়তো শিক্ষাখাতে বেশি বিনিয়োগ করে, যাতে শিক্ষিত মানুষেরা আরও ভালো ভালো কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে আর সেখান থেকে আরও বেশি কর পাওয়া যায়।

পুঁজিবাদের শুরুটা হয়েছিল বইয়ের পাতা থেকে। টাকা জিনিসটা কীভাবে কাজ করে আর লাভের টাকা বিনিয়োগ করলে অর্থনীতি কীভাবে দ্রুত এগোয়- সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিল এই তত্ত্ব। কিন্তু পুঁজিবাদ শেষ পর্যন্ত স্রেফ একটা তত্ত্ব হয়ে বইয়ের পাতায় আটকে থাকেনি। এটা এখন আমাদের জীবনধারায় মিশে গেছে। মানুষের আচরণ কেমন হবে, শিশুদের কী শেখাতে হবে, কীভাবে চিন্তা করতে হবে- সবকিছুতেই পুঁজিবাদের ছায়া। পুঁজিবাদের মূল কথা হল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই হল আসল সমৃদ্ধি। এমনকি সুবিচার, স্বাধীনতা, এমনকি মানুষের সুখে থাকাও নির্ভর করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উপর। একজন ঘোর পুঁজিবাদী মানুষের কাছে যদি জানতে চাওয়া হয় জিম্বাবুয়ে কিংবা আফগানিস্তানে ন্যায়বিচার আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে কী করা দরকার, তাহলে সম্ভবত তার কাছে থেকে “একটা স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ” সম্পর্কে একটা ছোটখাটো বক্তৃতা শুনে আসতে হবে।

আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির পিছনেও এই পুঁজিবাদ নামক ‘ধর্মের’ অনেকটা প্রভাব আছে। সাধারণত বৈজ্ঞানিক গবেষণার পিছনে টাকা ঢালে সরকার অথবা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যখন কোনো পুঁজিবাদী সরকার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোনো একটা গবেষণা প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে যায়, তখন তাদের মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটা আসে সেটা হল, “এখানে বিনিয়োগ করে কি উৎপাদন বাড়বে? কোনও লাভ হবে? এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি কতটুকু হবে?” এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে সে গবেষণা আর এগোয় না। তাই আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে কোনোভাবেই পুঁজিবাদকে বাদ দেওয়া যায় না।

আবার উল্টোটাও সত্যি। বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে পুঁজিবাদের ইতিহাস লেখাও অসম্ভব। পুঁজিবাদ বিশ্বাস করে যে অর্থনীতির বৃদ্ধি চলতেই থাকবে, থামবে না কখনো। কিন্তু এই বিশ্বাস ধরে রাখতে হলে তো সামনে কি আছে সেটা জানতে হবে। একটা নেকড়ের পাল যদি মনে করে ভেড়ার সংখ্যা সবসময় বাড়তেই থাকবে- তাহলে সেটা হবে স্রেফ বোকামি। মানবসমাজের অর্থনীতি অনেক বছর ধরে দুর্বার গতিতে বেড়ে চলেছে এবং এখনও বেড়ে চলছে- এর পিছনে একচেটিয়া কৃতিত্ব বিজ্ঞানীদের ও তাঁদের সব আবিষ্কারের। আমেরিকা আবিষ্কার, অন্তর্দহন (internal combustion) ইঞ্জিন আবিষ্কার কিংবা উন্নত প্রজাতির গবাদিপশু আবিষ্কার- এসব নিত্যনতুন আবিষ্কারই অর্থনীতির বিকাশের পিছনে ভূমিকা রেখে চলেছে। সরকার আর ব্যাংক কাগজে টাকা ছাপে বটে, কিন্তু সেই টাকাকে মূল্যবান করে তোলে বিজ্ঞানীরাই।

বেশ কয়েক বছর ধরেই সরকার আর ব্যাংকগুলো টাকা ছেপে কূল পাচ্ছে না। বর্তমান সঙ্কটময় অবস্থায় অর্থনীতির অগ্রগতি থেমে যেতে পারে, এই ভয়ে ক্রেডিটের নামে তৈরি হচ্ছে কোটি কোটি ডলার, ইউরো আর ইয়েন। অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠছে একটা বিরাট বুদবুদের মতো, যেটা যেকোনো সময় ফেটে যেতে পারে জেনেও মানুষেরা সেটাকে আরও ফুলিয়ে তুলছে। তারপরেও মানুষ আশা করছে যে পৃথিবীর বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ আর প্রকৌশলীরা আরও নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে বৃদ্ধিটা অব্যাহত রাখবে, অর্থনীতির বুদবুদটাকে ফেটে যেতে দেবে না। এখন বৈজ্ঞানিক গবেষণাই সবার ভরসা। জৈবপ্রকৌশল বা ন্যানোপ্রকৌশলের মতো বিষয়ে এখনও নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠতে পারে। সেটা সম্ভব হলে ২০০৮ থেকে আগাম তৈরি হওয়া কোটি কোটি টাকা সার্থক হবে। আর যদি সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে ধরে নেওয়া যায় সামনের দিনগুলো হবে অনেক কঠিন।

কলম্বাসের টাকা চাই

পুঁজিবাদ শুধু বিজ্ঞানের বিকাশেই নয়, ইউরোপের সাম্রাজ্যবিস্তারের পিছনেও একটা বিরাট ভূমিকা রেখেছে। পুঁজিবাদে ক্রেডিটের ধারণাটাও এসেছে তখন থেকেই। না, ক্রেডিট জিনিসটা আধুনিক ইউরোপের আবিষ্কার নয়। প্রায় সব কৃষিভিত্তিক সমাজেই ক্রেডিটের ধারণা ছিল আরও আগে থেকেই, আর এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে ইউরোপীয় পুঁজিবাদের সম্পর্কটাও বেশ ঘনিষ্ঠ। এখানে মনে রাখা দরকার, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিক পর্যন্তও এশিয়া ছিল পৃথিবীর অর্থনৈতিক কেন্দ্র। চীন, মধ্যপ্রাচ্য বা ভারতের তুলনায় ইউরোপের পুঁজির পরিমাণ ছিল খুবই কম।

তবে চীন, ভারত আর মুসলিম বিশ্বের তখনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থায় ক্রেডিট জিনিসটা খুব বেশি গুরুত্ববহন করত না। ইস্তাম্বুল, ইস্পাহান, দিল্লী আর বেইজিঙের ব্যবসায়ী ও ব্যাংক-মালিকদের মধ্যে পুঁজিবাদী চিন্তা কিছুটা থাকলেও রাজা আর সেনাপতিরা সেটা পছন্দ করত না। ইউরোপের বাইরে বেশিরভাগ সাম্রাজ্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হয় নুরহাচি বা নাদির শাহের মতো দখলদার মানুষের হাতে অথবা চিং আর অটোমান সাম্রাজ্যের মতো রাজা-রাজড়াদের হাতে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে টাকাপয়সা দরকার হতো সেটা আদায় করা হতো খাজনা আদায় করে অথবা লুট করে (যদিও এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য ছিল সামান্যই)। যেহেতু নগদেই সব কাজ হতো, তাই ক্রেডিট, ঋণ, সুদ, বিনিয়োগ- এসব নিয়ে কারও তেমন মাথাব্যথা ছিল না।

অন্যদিকে ইউরোপের অবস্থা ছিল ঠিক এর বিপরীত। ব্যবসায়ী আর ব্যাংকাররা ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসার আগে থেকেই সেখানকার রাজা আর সেনাপতিদের চিন্তাধারা ছিল ব্যবসায়ীদের মতো। ইউরোপীয়দের বিশ্বজোড়া অভিযানের খরচ যোগানোর ক্ষেত্রে প্রজাদের খাজনার চেয়ে ক্রেডিটের ভূমিকাই বেশি ছিল। পুঁজিবাদী মানুষেরা বেশি লাভের আশায় ক্রমে এসব অভিযানে আগ্রহী হয়েছে। এই হ্যাট-কোট পরা ব্যবসায়ীদের তৈরি সাম্রাজ্যই কিন্তু একদিন রেশমি রাজপোশাক আর ধাতব বর্মধারী মানুষের সাম্রাজ্য দখল করে নিয়েছে। অভিযানের পিছনে টাকা ঢালার ব্যাপারে ইউরোপীয়রা অনেক বেশি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। খাজনা কেউই দিতে চায় না, অথচ বিনিয়োগে আপত্তি নেই কারও।

১৪৮৪ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস ইউরোপ থেকে পশ্চিম দিক দিয়ে পূর্ব এশিয়ায় যাওয়ার নতুন পথ খুঁজতে যাবেন বলে আর্থিক সাহায্য চাইলেন পর্তুগালের রাজার কাছে। সে তো যেমন তেমন অভিযান নয়, জাহাজ বানাতে হবে, অনেক দিনের রসদ নিতে হবে, নাবিক আর সৈনিকদের বেতন দিতে হবে- অনেক টাকার ব্যাপার। আবার এতগুলো টাকার বিনিময়ে যে অভিযানটা সফল হবে, তার বিন্দুমাত্র নিশ্চয়তা নেই। কাজেই রাজা সোজা না করে দিলেন।

আজকের দিনে নতুন উদ্যোক্তারা যা করে, কলম্বাস ঠিক তাই করলেন। তিনি একে একে আবেদন জানালেন ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড আর পর্তুগালের ধনী লোকদের কাছে। কেউই রাজি হল না। শেষমেশ তিনি গেলেন স্পেনের নতুন রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইসাবেলার কাছে। একা গেলেন না, গেলেন তদবির করার জন্য কয়েকজন ঝানু লোককে সাথে নিয়ে। তাদের সাহায্যেই শেষ পর্যন্ত রানি ইসাবেলার কাছ থেকে সাহায্যের আশ্বাস মিলল। আজ তো সবাই জানে, ইসাবেলা কী দারুণ বিনিয়োগটা করেছিলেন সে সময়। কলম্বাসের অভিযানের পর স্প্যানিয়ার্ডরা আমেরিকা দখল করে নেয়। সেখানে তারা সোনা আর রুপার খনি খুঁজে পেল, পাশাপাশি চিনি আর তামাকের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করল। আর তাতেই স্পেনের রাজা, ব্যাংকার আর ব্যবসায়ীদের সম্পদ ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করল।

এর শ খানেক বছর পর ইউরোপের ব্যাংকার আর রাজবংশীয়রা এসব অভিযানে বিনিয়োগ করা আরও বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকা থেকে আনা সম্পদ তো তাদের কাছে ছিলই। শুধু টাকাপয়সাই নয়, এই ধরনের অভিযানের উপর তাদের আস্থাও বেড়েছিল অনেকখানি। এইভাবেই শুরু হল সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদের লাভের চক্র- টাকা দিয়ে নতুন নতুন অভিযান শুরু হচ্ছে, তাতে নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কৃত হচ্ছে, সেসব জায়গায় উপনিবেশ তৈরি হচ্ছে, উপনিবেশ থেকে আরও টাকা আসছে, তাতে মানুষের ভরসা বাড়ছে, তাই বিনিয়োগও বাড়ছে। নুরহাচি (Nurhaci) আর নাদির শাহের (Nader Shah) অভিযান কয়েক হাজার কিলোমিটার গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল, অথচ এসব পুঁজিবাদী অভিযান দিনে দিনে আরও গতি পেয়েছে।

তারপরেও, এসব অভিযানে অনেক রকম ঝুঁকিও ছিল, তাই বিনিয়োগও অনেকটা সীমিত ছিল। এরকম অনেক অভিযান খালি হাতে ফিরে এসেছে। ইংরেজরা উত্তর-পশ্চিম দিকে মেরু অঞ্চলের মধ্য দিয়ে এশিয়ায় যাওয়ার পথ খুঁজতে অনেক টাকা নষ্ট করেছে। এর মধ্যে অনেক অভিযান আর ফেরেইনি। হিমশৈলের ধাক্কায়, সামুদ্রিক ঝড়ে অথবা জলদস্যুদের হাতে অনেক জাহাজ হারিয়েছে তারা। বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়াতে আর ঝুঁকির পরিমাণ কমাতে তখন ইউরোপীয়রা যৌথ-মূলধনী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (limited liability joint-stock company) তৈরি করে। এর পরের অভিযানগুলোতে একজন মানুষের পরিবর্তে এরকম প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করতে শুরু করে। তাতে অনেকজন মানুষ মিলে টাকা দেয়, তাই জনপ্রতি ঝুঁকির পরিমাণ অনেক কমে যায়। তবে ঝুঁকি সীমিত হলেও লাভ কিন্তু সীমিত নয়। অনেক সময় সামান্য বিনিয়োগে শুরু হওয়া অভিযান থেকেই আসত লক্ষ লক্ষ টাকা।

এভাবে কয়েক দশকের মধ্যেই পশ্চিম ইউরোপে বেশ মজবুত একটা অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড়িয়ে গেল। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই বিনিয়োগের জন্য অনেক টাকা জোগাড় করার ব্যবস্থা হলো। সেই টাকা সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যেত। অভিযান পরিচালনার জন্য রাজ্যের চেয়ে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান অনেক বেশি সফলতার পরিচয় দিয়েছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ষোড়শ শতকে স্পেন আর নেদারল্যান্ডের রেষারেষির মধ্যে। স্পেন তখন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ, তার এলাকাও বিশাল। ইউরোপের অনেকখানি, উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকার বিরাট এলাকা, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ আর এশিয়া ও আফ্রিকার উপকূলের অনেক জায়গা স্পেনের দখলে। প্রতি বছর আমেরিকা আর এশিয়ার প্রচুর সম্পদ নিয়ে সেভিয়া (Seville) আর কাদিজ (Cadiz) বন্দরে ফিরত স্প্যানিশ নৌবহর। নেদারল্যান্ড তখন স্পেনের এক কোনায় পড়ে থাকা একটা সম্পদহীন ছোট জলা এলাকা।

ডাচদের বেশিরভাগই ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট। ১৫৬৮ সালে তারা স্প্যানিশ ক্যাথলিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। ডন কুইক্সোট (Don Quixote) যেমন উইন্ডমিলের সাথে লড়তে গেছিলেন, শুরুতে ডাচ বিদ্রোহীদের অবস্থা ছিল ঠিক তেমনি। অথচ আশি বছরের মধ্যে তারা স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা তো আদায় করেছেই, তার উপর সমুদ্রে স্প্যানিশ ও তাদের মিত্র পর্তুগিজদের চেয়েও বেশি অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। নিজেদের একটা সাম্রাজ্য তৈরি করে তারা ইউরোপের সবচেয়ে ধনী রাজ্যে পরিণত হয়।

ডাচদের এই সাফল্যের মূলে আছে সেই ক্রেডিট। ডাচদের মধ্যে যারা সাধারণ নাগরিক, যুদ্ধে যাদের কোনো আগ্রহই নেই, তারাই স্প্যানিশদের সাথে লড়াই করার জন্য ভাড়াটে সৈনিক জোগাড় করল। ওদিকে সমুদ্রেও তারা নামিয়ে দিল বড় বড় সব যুদ্ধজাহাজ। ভাড়াটে সৈন্য আর যুদ্ধজাহাজের পিছনে অনেক টাকা খরচ হল, কিন্তু সেটা জোগাড় করতে তাদের কোনো সমস্যাই হয়নি। কারণ সে সময়ে স্পেনের রাজার চেয়ে দেশের অর্থব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা বেশি ছিল। বিনিয়োগকারীরা ডাচদের সৈন্য সংগ্রহ ও জাহাজ তৈরিতে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। ডাচদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাণিজ্যপথগুলো থেকে লাভ হচ্ছিল ভালোই। সেই লাভের টাকা দিয়ে ডাচরা তাদের ঋণ শোধ করে দিল, ফলে বিনিয়োগকারীরাও আরও বিনিয়োগ করার ভরসা পেল। আমস্টারডাম ইউরোপের অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর তো বটেই, তার সাথে ইউরোপের অর্থনৈতিক কেন্দ্রেও পরিণত হল।

এখন প্রশ্ন হল, ডাচরা কীভাবে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আস্থা অর্জন করল? প্রথমত, তারা সময়মতো সম্পূর্ণ ঋণ শোধ করতে কখনও ভুল করত না। তাই বিনিয়োগকারীরাও আরও টাকা দিতে দ্বিধা করত না। দ্বিতীয় কারণ হল, সে দেশের বিচারব্যবস্থা ছিল স্বাধীন, আর সেটা ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সম্পদ রক্ষার নিশ্চয়তাও দিত। এই নিশ্চয়তা না থাকলে ব্যবসা করতে গিয়ে পুঁজি হারানোর ঝুঁকি থাকে। তাই দেশের আইনও বিনিয়োগের জন্য সহায়ক ছিল।

ধরুন জার্মানির এক বিরাট পুঁজিপতি ব্যবসায়ীর দুই ছেলে। তিনি ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তাঁর ব্যবসার শাখা খোলার একটা দারুণ সম্ভাবনা দেখলেন। তিনি তাঁর দুই ছেলেকেই মূলধন হিসেবে দশ হাজারটা করে সোনার মোহর দিয়ে বড় ছেলেকে পাঠালেন আমস্টারডামে, আর ছোটটিকে পাঠিয়ে দিলেন মাদ্রিদে। সে সময়ে স্পেনের সাথে ফ্রান্সের যুদ্ধ চলছে, ছোট ছেলে গিয়েই স্পেনের রাজাকে সৈন্য জোগাড় করার জন্য তার সব টাকা ধার দিয়ে দিল। আর বড় ছেলে তার টাকাগুলো ধার দিল এক ডাচ ব্যবসায়ীকে। সেই ব্যবসায়ী ম্যানহাটন নামের একটা ঝোপেঝাড়ে ঢাকা দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে কিছু জমি কিনতে চান, কারণ হাডসন নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হলেই ওই দ্বীপে জমির দাম হুহু করে বেড়ে যাবে। দুই ভাইই আশা করছে এক বছরের মধ্যে ধার দেওয়া টাকা ফেরত পাবে।

বছর গেল। ডাচ ব্যবসায়ী তাঁর কেনা জমি বেচে দিয়ে প্রচুর লাভ করলেন। কথামতো ধারও শোধ করলেন, সুদসহ। বড় ছেলের সাফল্যে বাবাও খুশি হলেন। এদিকে ছোট ছেলে পড়ল বিপদে। ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে স্পেনের রাজা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানেই আছেন, কিন্তু এর মধ্যে তিনি আবার নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়েছেন তুর্কিদের সাথে। এই মুহূর্তে ধার শোধ করার চেয়ে নতুন যুদ্ধ সামাল দেওয়া বেশি দরকার। ছোট ছেলে রাজাকে চিঠি দিচ্ছে, দরবারের একে ওকে দিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু রাজার সেদিকে ভ্রূক্ষেপও নেই। কাজেই ধার দেওয়া টাকার সুদ তো দূরের কথা, ছোট ছেলে এখন আসলটাও হারিয়ে বসে আছে। স্বাভাবিকভাবেই বাবাও অসন্তুষ্ট।

এদিকে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে স্পেনের রাজা আবারও ছোট ছেলের কাছে একই অঙ্কের টাকা দাবি করে বসলেন। তার কাছে তখন একটা টাকাও নেই। উপায় নেই, তাই সে অনেক বুঝিয়ে টাকা চেয়ে বাবাকে একটা চিঠি দিল। হাজার হলেও ছোট ছেলের আবদার, বাবাও ফেলতে পারলেন না। কাজেই আরও দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা স্পেনের রাজকোষের ভিতরে কোথায় যে হারিয়ে গেল, তার হদিস আর পাওয়া গেল না। ওদিকে আমস্টারডামের অবস্থা পুরো উলটো। বড় ছেলে সেখানে একের পর এক ব্যবসায়ীদের টাকা ধার দিচ্ছে আর সময়মতো ফেরতও পাচ্ছে পুরোপুরি। তবে সুসময় তো আর চিরদিন থাকে না, তাই একবার ঘটল অঘটন। এক ফরাসি ব্যবসায়ী ভাবল কাঠের জুতো সামনে খুব চলবে, তাই সে বড় ছেলের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে প্যারিসে একটা জুতোর দোকান দিল। কিন্তু কপাল খারাপ, তার দোকানের জুতো বিক্রিই হল না। কাজেই সে জানিয়ে দিল তার পক্ষে ধার শোধ করা সম্ভব নয়।

সব শুনে বাবা এবার ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। দুই ছেলেকেই পরামর্শ দিলেন আইনের আশ্রয় নিতে। তারপর ছোট ছেলে মাদ্রিদে মামলা করল স্পেনের রাজার বিরুদ্ধে, আর বড় ছেলে আমস্টারডামে মামলা করল প্যারিসের জুতোওয়ালার বিরুদ্ধে। স্পেনের আদালত আবার রাজার কথায়ই ওঠে-বসে। কিন্তু নেদারল্যান্ডের আদালত দেশের সরকারেরই আলাদা শাখা, সেখানে রাজপরিবারের জন্য কোনও বাড়তি খাতির নেই। কাজেই ছোট ছেলের মামলা মাদ্রিদের আদালতে পাত্তাই পেল না, ওদিকে আমস্টারডামের আদালত ধার শোধ করার জন্য জুতোওয়ালার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ফেলল। সবকিছু দেখে ছেলেদের বাবাও বুঝলেন, ব্যবসা করতে হলে সেটা ব্যবসায়ীদের সাথেই করা উচিত, রাজাদের সাথে নয়। আর করলেও সেটা মাদ্রিদের চেয়ে আমস্টারডামে করাটাই সঙ্গত।

ছোট ছেলের বিপদ শুধু বাড়ছেই। স্পেনের রাজার আরও টাকা দরকার, আর কোথায় টাকা পাওয়া যাবে সেটাও এতদিনে বুঝে ফেলেছেন। এবার তিনি গুপ্তচরবৃত্তির সাজানো অভিযোগ চাপিয়ে দিলেন ছোট ছেলের উপর, সাথে এটাও জানিয়ে দিলেন যে খুব তাড়াতাড়ি বিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা এনে দিতে না পারলে বাকি জীবনটা তাকে কারাগারেই কাটাতে হবে।

বাবারও শিক্ষা হয়ে গেছে। তিনি টাকা দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনলেন, আর প্রতিজ্ঞা করলেন, স্পেনে আর না। এরপর তিনি মাদ্রিদের ব্যবসা গুটিয়ে ছোট ছেলেকে পাঠালেন রটারডামে। হল্যান্ডেই দুই জায়গায় ব্যবসা করার বুদ্ধিটা খারাপ না। শোনা যাচ্ছে স্পেনের ব্যবসায়ীরাও নাকি তাদের টাকা স্পেনের বাইরে পাচার করে দিচ্ছে। তারাও বুঝে গেছে কোথায় ব্যবসা করা লাভজনক আর নিরাপদ।

এভাবেই একসময় স্পেনের রাজা বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারালেন, আর ডাচ ব্যবসায়ীরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। ডাচদের সাম্রাজ্য তৈরি করে দিয়েছে এই ব্যবসায়ীরাই। স্পেনের রাজা যখন ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে অন্যায্যভাবে খাজনা আদায় করে প্রজাদের বিরাগভাজন হচ্ছেন, তখন ডাচ ব্যবসায়ীরা টাকা ধার নিয়ে আর ব্যবসার লভ্যাংশ বিক্রি করে সাম্রাজ্যবিস্তারে সাহায্য করছে। স্পেনের সরকারকে টাকা দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না, যেসব সতর্ক ব্যবসায়ী ডাচ সরকারকে টাকা দেওয়ার আগেও দুবার ভাবত, তারাও ডাচ ব্যবসায়ীদের টাকা দিয়েছে নির্দ্বিধায়।

যৌথ মূলধনী ব্যবসার শুরু তখন থেকেই। কোনো কোম্পানির সামনে বেশি লাভ করার সুযোগ দেখা গেলে মানুষ সেই কোম্পানির শেয়ার কিনতে শুরু করে, একটু বেশি দামে হলেও। আবার কোম্পানির লোকসানের সম্ভাবনা দেখা গেলে কম দামে শেয়ার বিক্রিও করে দেয়। এই শেয়ার কেনাবেচার সুবিধার্থে ইউরোপের বেশিরভাগ বড় শহরে স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়।

সবচেয়ে বিখ্যাত ডাচ যৌথ-মূলধনী কোম্পানি Vereenigde Oostindische Compagnie, সংক্ষেপে ভিওসি (VOC) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬০২ সালে, ঠিক যখন ডাচরা একটু একটু করে স্প্যানিশ শাসন থেকে বেরিয়ে আসছে। ভিওসি শেয়ার বিক্রির টাকায় জাহাজ বানিয়ে এশিয়ায় পাঠাত আর চীন, ভারত আর ইন্দোনেশিয়া থেকে মালামাল আনত। প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি বা জলদস্যুদের মোকাবেলা করার জন্যও তারা টাকা দিত। এমনকি ইন্দোনেশিয়া জয় করার অভিযানের খরচও দিয়েছে এই কোম্পানি।

ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপপুঞ্জ। এর হাজার হাজার দ্বীপ সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই শতশত রাজা, সুলতান আর দলের শাসন দেখে এসেছে। ১৬০৩ সালে যখন ভিওসির ব্যবসায়ীরা প্রথমবার ওখানে যায়, তখন তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধুই ব্যবসা। কিন্তু দিনে দিনে ব্যবসা ও ব্যবসার অংশীদারদের স্বার্থেই তাদের নানারকম সংঘাতে জড়াতে হয়েছে। স্থানীয় ক্ষমতাবানদের বাড়তি কর আদায়ের বিরুদ্ধে কিংবা অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে নানাভাবে লড়তে হয়েছে ভিওসিকে। এসব বিরোধের জন্যই একদিন ভিওসির বাণিজ্যিক জাহাজে দেখা গেল কামান। তারা ইউরোপ, জাপান, ভারত আর ইন্দোনেশিয়া থেকে সৈনিক জোগাড় করল, নানা জায়গায় দুর্গ বানাল, এমনকি রীতিমতো সামনাসামনি যুদ্ধও করতে শুরু করল। একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মকাণ্ড দেখে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু সে সময়ে বেসরকারি কোম্পানির যুদ্ধের আয়োজন করাটা বেশ স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। একটা বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান একটা আস্ত সাম্রাজ্য তৈরি করে ফেলছে- এটা সারা পৃথিবীতেই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।

ভিওসির সৈন্যরা একটার পর একটা দ্বীপ দখল করতে করতে ইন্দোনেশিয়ার একটা বড় অংশকেই নিজেদের উপনিবেশ বানিয়ে ফেলে। প্রায় দুইশ বছর ধরে তারা ইন্দোনেশিয়া শাসন করেছে। ১৮০০ সালে ডাচরা ইন্দোনেশিয়া দখল করে পরের দেড়শ বছর ধরে শাসন করে। এই একবিংশ শতাব্দীতে কর্পোরেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠছে- এমন কথা আমরা প্রায়ই শুনি। অথচ স্বার্থের জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যে কতদূর যেতে পারে তার নমুনা এর আগের শতাব্দীগুলোতে খুব ভালোভাবেই দেখা গেছে।

ভিওসি যখন ভারত মহাসাগরে তাদের ‘বাণিজ্য’ চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে আটলান্টিকে একই কাজ করছিল ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোম্পানি বা ডব্লিউআইসি। হাডসন নদীতে নিজেদের দখল ধরে রাখার জন্য তারা ঐ নদীর মুখেই একটা দ্বীপে ‘নিউ আমস্টারডাম’ নামের উপনিবেশ তৈরি করে। ইন্ডিয়ানরা মাঝেমধ্যেই সেখানে আক্রমণ করত। আর ব্রিটিশদের আক্রমণ ছিল নিয়মিত ঘটনা। ১৬৬৪ সালে ব্রিটিশরা জায়গাটা দখল করে নিয়ে তার নাম দেয় ‘নিউ ইয়র্ক’। আক্রমণ ঠেকাতে ডব্লিউআইসির লোকেরা যে দেয়াল তুলেছিল, আজ তার উপর দিয়ে তৈরি রাস্তাকে সবাই ‘ওয়াল স্ট্রিট’ নামে চেনে।

নিজেদের আধিপত্যের আত্মপ্রসাদে আর এইসব যুদ্ধ চালাতে গিয়েই একসময় ডাচরা নিউ ইয়র্কের দখল হারায়, হারায় ইউরোপের অর্থনৈতিক কেন্দ্রের জায়গাটাও। সেই শূন্যস্থান পূরণ করার প্রতিযোগিতায় নামে ফ্রান্স আর ব্রিটেন। শুরুতে ফ্রান্সই এগিয়ে ছিল। ফ্রান্স দেশটা আকারে ব্রিটেনের চেয়ে বড়, তার মানুষ আর সম্পদও ছিল বেশি। সেনাবাহিনীও ছিল দক্ষ। তারপরেও ইউরোপের অর্থনীতিতে ফ্রান্সের চেয়ে ব্রিটেনই এগিয়ে ছিল। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় যে অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দেয় সেটা মিসিসিপি বাবল (Mississippi Bubble) নামে পরিচিত। সেই সময়ে ফ্রান্সের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। আর তখনই ব্রিটেনের অর্থনীতি মানুষের আস্থা অর্জন করে। ঠিক তখনই একটা যৌথ মূলধনী কোম্পানির হাতে তৈরি হচ্ছে একটা সাম্রাজ্য।

১৭১৭ সালে ফ্রান্সের মিসিসিপি কোম্পানি মিসিসিপির অববাহিকায় উপনিবেশ তৈরির জন্য যাত্রা করে। নিউ অর্লিয়ন্স শহরটা সে সময়েই তৈরি হয়। এই বিরাট পরিকল্পনা সফল করতে প্রচুর টাকা দরকার। ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের দরবারে মিসিসিপি কোম্পানির ভালো জানাশোনা ছিল। তারা তখন প্যারিস স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করে। কোম্পানির পরিচালক জন ল ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। রাজা তাঁকে অর্থায়ন-নিয়ন্ত্রকের পদও দেন (যেটা আজকের দিনের অর্থমন্ত্রীর পদের সমতুল্য)। ১৭১৭ সালে মিসিসিপির আশেপাশে কুমির ভরা জলা জায়গা ছাড়া আর কিছু ছিল না। কিন্তু তা নিয়ে মিসিসিপি কোম্পানি মানুষকে অঢেল সম্পদ-সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখায়। সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে ফ্রান্সের ব্যবসায়ী, পুঁজিপতি আর অভিজাতরা প্রচুর বিনিয়োগ করে। মিসিসিপি কোম্পানির শেয়ারের দাম অনেক বেড়ে যায়। শুরুতে এক একটা শেয়ারের দাম ছিল ৫০০ লিভ্রা (পাউন্ড)। ১৭১৯ এর অগাস্টের ১ তারিখে এর দাম ছিল ২৭৫০ লিভ্রা, আর ৩০ তারিখে সেটাই হয়ে গেল ৪১০০ লিভ্রা। সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে এর দাম ৫০০০ আর ডিসেম্বরের ২ তারিখে ১০০০০ ছাড়িয়ে গেল। সারা প্যারিসে সাড়া পড়ে গেল। মানুষেরা তাদের সবকিছু বিক্রি করে না হয় ধার নিয়ে ছুটল মিসিসিপির শেয়ার কিনতে। রাতারাতি ধনী হওয়ার নেশায় পেল সবাইকে।

1660-new-amsterdam.jpg

৩৯। ম্যানহাটন দ্বীপের শেষপ্রান্তে নিউ আমস্টারডাম, ১৬৬০ সাল। এখানকার প্রতিরক্ষা দেওয়ালের উপরেই তৈরি হয়েছে আজকের ওয়াল স্ট্রিট।

কিছুদিনের মধ্যেই নেশা কেটে গিয়ে এল আতঙ্ক। অনেকেই টের পেল, শেয়ারের এই উচ্চমূল্য আসলে অস্থায়ী আর অবাস্তব। তারা বুঝতে পারল দাম বেশি থাকতে থাকতেই শেয়ার বেচে দেওয়া উচিত। সবাই শেয়ার বিক্রি শুরু করতেই বাজারে শেয়ারের যোগান বাড়ার কারণে দাম কমে গেল। দাম পড়ে যেতে দেখে বাকিরাও যার যার শেয়ার তাড়াতাড়ি বেচে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কাজেই শেয়ারের দামে ধস নামে। শেয়ারের দাম স্থিতিশীল করতে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক- বলা বাহুল্য, গভর্নর জন লয়ের নির্দেশে- মিসিসিপির শেয়ার কিনে নিতে থাকে। কিন্তু সব শেয়ার তো আর কিনে ফেলা সম্ভব নয়, ব্যাংকের টাকাও তো ফুরিয়ে যাবে। এই অবস্থায় দেশের অর্থায়ন-নিয়ন্ত্রক, অর্থাৎ সেই জন ল, বাকি শেয়ার কেনার জন্য নতুন টাকা ছাপানোর নির্দেশ দিলেন। এর ফলে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা হয়ে গেল একটা বুদবুদের মতো। সবাই মিলে আগেপিছে না ভেবে ফুঁ দিয়ে (টাকা ঢেলে) সেটাকে ফুলিয়ে তুলেছে, কিন্তু ফুলতে ফুলতে বুদবুদটা যখন ফেটেই গেল, তখন সবাই নিঃস্ব, কারও আর কিছু করার নেই। নতুন টাকা ছেপেও শেষরক্ষা হল না। মিসিসিপি শেয়ারের দাম ১০০০০ থেকে ১০০০ হয়ে গেল, তারপর আরও কমতে কমতে একেবারে শূন্যে এসে ঠেকল। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর রাষ্ট্রীয় কোষাগার ভরা কেবল মিসিসিপির শেয়ারে, একটা টাকাও নেই। বড় বড় ব্যবসায়ীদের গায়ে আঁচড়ও লাগল না, তারা পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে তাদের শেয়ার বেচে দিয়েছে আগেই। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সর্বনাশ হয়ে গেল। অনেকে আত্মহত্যাও করেছিল তখন।

এই মিসিসিপি বাবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধসগুলোর মধ্যে একটা। ফ্রান্স এই সঙ্কট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি আর কখনোই। মিসিসিপি কোম্পানি শেয়ারের দাম বাড়ানো আর মানুষের মধ্যে শেয়ার কেনার উন্মাদনা সৃষ্টি করতে যেভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছিল তাতে দেশের মানুষ ফরাসি ব্যাংক ব্যবস্থা আর রাজার অর্থনৈতিক জ্ঞানের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। ফলে পঞ্চদশ লুইয়ের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশদের কাছে ফরাসিদের পিছিয়ে পড়ার কারণ এটাই। ব্রিটিশরা খুব সহজে আর অল্প সুদে টাকা ধার নিতে পারত। ওদিকে ফ্রান্সে ঋণ নেওয়া আরও কঠিন হয়ে গেল, আর সুদের হারও বেড়ে গেল। সারা দেশের টাকার সঙ্কট ঠেকাতে ফ্রান্সের রাজাকে চড়া সুদে অনেক টাকা ধার নিতে হল। ১৭৮০ সালে নতুন রাজা ষোড়শ লুই সিংহাসনে বসেই দেখলেন দেশের বাজেটের অর্ধেক টাকা চলে যাচ্ছে শুধু ধার নেওয়া টাকার সুদ দিতে। রাজকোষ দেউলিয়া হতে বেশি বাকি নেই। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই ১৭৮৯ সালে রাজা অনিচ্ছাসত্ত্বেও দেড়শ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আইনসভার সম্মেলন ডাকলেন। ফরাসি বিপ্লবের শুরুটা সেখান থেকেই হয়।

এভাবেই পৃথিবীতে যখন ফরাসি সাম্রাজ্যের পতন হচ্ছে, ঠিক তখনই দুর্বার গতিতে বিস্তৃত হচ্ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। ডাচ সাম্রাজ্যের মতোই তাদের সাম্রাজ্যও তৈরি হয়েছে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন যৌথ-মূলধনী কোম্পানির হাতে। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে উত্তর আমেরিকায় তাদের প্রথম উপনিবেশ তৈরি করেছিল লন্ডন কোম্পানি, প্লিমাউথ কোম্পানি, ডরচেস্টার কোম্পানি আর ম্যাসাচুসেটস কোম্পানির মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

ব্রিটিশ রাজ্য কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশ দখল করেনি, করেছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী। তাদের সাফল্য ভিওসির চেয়েও বেশি। লন্ডনের লিডেনহল স্ট্রিটের প্রধান কার্যালয় থেকে তারা একশ বছর ধরে এই বিরাট সাম্রাজ্য শাসন করেছে। ভারতে তাদের সেনাবাহিনীতে সাড়ে তিন লাখ সৈন্য ছিল, এত সৈন্য খোদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেরও ছিল না। ১৮৫৮ সালে কোম্পানির সৈন্যসমেত এই বিপুল ভূখণ্ড ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন হয়। নেপোলিয়ন ব্রিটিশদের ‘দোকানদারের জাত’ বলে ঠাট্টা করতেন। অথচ এই দোকানদারের জাত নেপোলিয়নকে তো পরাজিত করেছেই, আর পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যের মালিকও ছিল কিন্তু এই ব্রিটিশরাই।

পুঁজির নামে

এই যে ইন্দোনেশিয়ার ডাচ সাম্রাজ্যের বা ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়া- এখানেই কিন্তু শেষ নয়, বরং এর পর থেকে সাম্রাজ্য ও পুঁজিবাদের সম্পর্কটা আরও দৃঢ় হয়েছে। উনিশ শতকে দেখা গেল, যৌথ-মূলধনী কোম্পানিগুলোর আর দেশ দখল করে শাসন করার দরকার নেই, বরং কোম্পানির ম্যানেজার আর শেয়ারমালিকরাই লন্ডন, আমস্টারডাম আর প্যারিসে বসে ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ছে। আর সাম্রাজ্যই তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য কাজ করছে। এজন্যই মার্ক্সের মতো লোকেরা বলে গেছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার আস্তে আস্তে একটা পুঁজিবাদী ট্রেড ইউনিয়ন হয়ে যাচ্ছে।

সরকার কীভাবে টাকার পিছনে ছোটে তার সবচেয়ে বিশ্রী উদাহরণ হল ১৮৪০ থেকে ১৮৪২ সালের মধ্যে হওয়া ব্রিটেন ও চীনের প্রথম আফিমের যুদ্ধ। উনিশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছাড়াও অনেক ব্রিটিশ লোক চীনে আফিমসহ বিভিন্ন রকম মাদক পাচার করে প্রচুর টাকা কামিয়েছিল। এতে চীনের লাখ লাখ লোক আফিমে আসক্ত হয়ে গোটা দেশটাকেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ১৮৩০ এর দশকের শেষে চীনের সরকার আইন করে মাদক পাচার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ব্রিটিশরা সে আইন না মেনে তাদের কাজ চালিয়ে যায়। তখন চীনা কর্তৃপক্ষ এসব মাদকের চালান বাজেয়াপ্ত করে নষ্ট করে ফেলতে শুরু করে। মাদক ব্যবসায়ীদের আবার ব্রিটেনের মন্ত্রী আর সংসদ সদস্যদের সাথে ভালো জানাশোনা ছিল। তাদের অনেকে আবার নিজেরাও এসব ব্যবসায়ীদের মাদক মজুদ করে রাখতেন, কাজেই তারা সহজেই এই ব্যাপারে সরকারি হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা করে ফেললেন।

১৮৪০ সালে ব্রিটেন ‘মুক্ত বাণিজ্যের’ নামে চীনের সাথে যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধটা ছিল পুরোপুরি একতরফা। অতি-আত্মবিশ্বাসী চীনা সেনাবাহিনী ব্রিটিশদের রণতরী, ভারী কামান, রকেট আর রাইফেলের সামনে দাঁড়াতেই পারল না। শেষে তারা ব্রিটিশ মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় বাধা দেবে না আর চীনা পুলিশের হাতে নষ্ট হওয়া মালামালের ক্ষতিপূরণ দেবে- এই শর্তে শান্তিচুক্তি করে। শুধু তাই না, ব্রিটিশরা এরপর হংকং-এও মাদক ব্যবসার সুযোগ দাবি করে এবং তা আদায়ও করে। এই হংকং মাদক চোরাচালানের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত হংকং ব্রিটিশদের হাতে ছিল। উনিশ শতকের শেষদিকে চীনের প্রায় চার কোটি মানুষ (মোট জনশংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগ) আফিমে আসক্ত ছিল।৩

মিশরও এই ব্রিটিশ পুঁজিবাদকে সমীহ করে চলেছে। উনিশ শতকে ফরাসি ও ব্রিটিশ বিয়োগকারীরা মিশরের শাসকদের অনেক বড় অঙ্কের টাকা ঋণ দিতেন- প্রথমত সুয়েজ খাল খননের খরচ যোগাতে, আর এর পরে সেখানে অল্প লাভজনক শিল্পের প্রসারের জন্য। এতে মিশরের ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেল। কাজেই ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা মিশরের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে শুরু করল। শেষে অতিষ্ঠ হয়ে ১৮৮১ সালে মিশরের জাতীয়তাবাদী মানুষ প্রতিবাদ শুরু করে। তারা সবরকম বৈদেশিক ঋণ বাতিলের ঘোষণা দেয়। রাণী ভিক্টোরিয়া অবশ্য এতে খুশি হতে পারেননি। বছর খানেক পরেই তিনি মিশরে স্থল ও নৌসেনা মোতায়েন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত মিশর ব্রিটিশদের দখলেই ছিল।

পুঁজিপতিদের স্বার্থে সংঘটিত যুদ্ধের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। আসলে এখানে যুদ্ধও আফিমের মতোই একটি পণ্য। ১৮২১ সালে গ্রিকরা অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ব্রিটেনের রোমান্টিক ও স্বাধীনচেতা মানুষদের কাছ থেকে এই বিপ্লব প্রচুর সমর্থন পায়। ব্রিটিশ কবি লর্ড বায়রন তো নিজেই গ্রিসে চলে গিয়েছিলেন লড়াইয়ে যোগ দিতে। পুঁজিপতিরাও এখানে একটা মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যায়। তারা বিদ্রোহী নেতাদের অনুরোধ করে লন্ডনের স্টক এক্সচেঞ্জে নিজেদের বন্ড চালু করতে। শর্ত ছিল গ্রিকরা স্বাধীন হলে এসব বন্ডের দাম সুদসহ শোধ করবে। বিনিয়োগকারীরা লাভের আশায় অথবা গ্রিকদের সমর্থন দিতে এসব বন্ড কিনত। এসব বন্ডের দাম আবার যুদ্ধে গ্রিকদের অবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে উঠত-নামত। শেষে তুর্কিরা যখন যুদ্ধে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেল, তখন বন্ডমালিকদের চোয়াল ঝুলে পড়তে লাগল। যেহেতু ব্যবসায়ীদের স্বার্থই ব্রিটিশদের জাতীয় স্বার্থ, কাজেই ১৮২৭ সালে ব্রিটিশদের একটি নৌবহর নাভারিনোর যুদ্ধে (Battle of Navarino) অটোমানদের একটা নৌবহর ডুবিয়ে দিল। অনেক শতাব্দী ধরে পরাধীন থাকার পর অবশেষে গ্রিস স্বাধীন হল। কিন্তু স্বাধীনতার সাথে সাথে তার মাথায় এমনই এক বিরাট ঋণের বোঝা চাপল যে সেটা শোধ করার আর কোনো উপায় রইল না। এরপর দশকের পর দশক ধরে গ্রিসের অর্থনীতি ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের হাতে জিম্মি হয়ে রইল।

পুঁজিবাদ আর রাজনীতির এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে পুঁজিবাজারে। কোথাও নতুন তেলের খনি পাওয়া গেছে, অথবা কেউ নতুন কোনো যন্ত্র আবিষ্কার করেছে- এ ধরণের অর্থনৈতিক প্রভাবক যেমন আছে, তেমনি কোথাও সরকার পরিবর্তন হচ্ছে কিংবা কোনো দেশ নতুন বৈদেশিক নীতি তৈরি করছে- এ ধরনের রাজনৈতিক বিষয়গুলোও পুঁজিবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। নাভারিনোর যুদ্ধের পর অনেক ব্রিটিশ পুঁজিপতিই বিদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। কারণ তারা এখন জানে, কেউ যদি টাকা ধার নিয়ে ঠিকমতো শোধ না করে, তবে তাকে শায়েস্তা করার জন্য রাণীর সৈন্যবাহিনী তো আছেই!

এই জন্যই আজকের দিনে একটা দেশের সম্পদের পরিমাণের চেয়ে তার ক্রেডিট রেটিং অর্থনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেডিট রেটিং হল টাকা ধার নিলে সেটা শোধ করার সম্ভাবনার পরিমাপ। কোনো দেশের ক্রেডিট রেটিং নির্ধারণ করার জন্য বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্তের পাশাপাশি সে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এমনকি সাংস্কৃতিক অবস্থাও আমলে নেওয়া হয়। একটা দেশে যদি স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় থাকে, সবসময় যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকে আর বিচার ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সে দেশ তেলের উপরে ভাসলেও তার ক্রেডিট রেটিং কম হবে। এর ফলে সে দেশ ঐ তেল ব্যবহার করে পুঁজি তৈরি করতে পারবে না, সেটা দরিদ্র দেশ হয়েই থাকবে। অন্যদিকে যে দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ নেই কিন্তু শান্তি আছে, সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা আর উন্মুক্ত সরকার ব্যবস্থা (যেখানে সরকারের ক্ষমতা আইন, শাসন ও বিচার ব্যবস্থার মধ্যে বিভক্ত থাকে) আছে, সে দেশের ক্রেডিট রেটিং বেশি হবে। ক্রেডিট রেটিং বেশি হওয়ার কারণে সেখানে বেশি বিনিয়োগ হবে, ফলে সহজে আরও বেশি পুঁজি তৈরি হবে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে সেখানে শিক্ষা ও শিল্পের উন্নতিও বেশি হবে।

মুক্তবাজারের ভূত

পুঁজিবাদ আর রাজনীতি এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এই দুটোর সম্পর্ক নিয়ে অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ আর আমজনতা- কারও মধ্যেই বিতর্কের শেষ নেই। ঘোর পুঁজিবাদীরা বলেন পুঁজিবাদ রাজনীতিকে প্রভাবিত করতেই পারে, তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু রাজনীতি যেন পুঁজিবাজারে প্রভাব না ফেলে। কারণ সরকার যখন বাজারে হস্তক্ষেপ করে, তখন রাজনৈতিক প্রভাবে মানুষ বিনিয়োগে ভুল করে আর তাতে অর্থনীতির অগ্রগতি ব্যাহত হয়। ধরুন সরকার ভোট বাড়ানোর জন্য শিল্পপতিদের উপর বেশি কর চাপিয়ে দিয়ে বেকারদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিল। তাতে পুঁজিপতিরা নাখোশ হবে। কারণ তাদের মতে, শিল্পপতিদের যদি কর একটু কম দিতে হয় তাহলে তারা আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে, ফলে আরও বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

এদিক থেকে দেখলে সর্বোত্তম অর্থনৈতিক কাঠামোতে রাজনীতিকে অর্থনীতি থেকে দূরে রাখা উচিত, কর কমিয়ে দেওয়া উচিত, সরকারের নিয়ন্ত্রণ যথাসম্ভব কমানো উচিত আর বাজারকে নিজ গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত না হয়ে সর্বোচ্চ লাভের খাতে তাদের টাকা বিনিয়োগ করবে। ফলে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে। তাতে মালিক ও শ্রমিক সবারই সুবিধা। অর্থাৎ অর্থনীতিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ যত কম হয় তত ভালো। এই মুক্তবাজার নীতিই আজকের দিনে পুঁজিবাদের সবচেয়ে চেনা রূপ। মুক্তবাজার সমর্থকরা দেশের বাইরে সামরিক অভিযান আর দেশের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড- এ দুটোকেই একই রকম অপছন্দ করে। সরকারের প্রতি তাদের পরামর্শ অনেকটা বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের মতোই- “কিচ্ছু করার দরকার নেই, সব যেভাবে চলছে চলতে দাও”।

তবে একটু তলিয়ে দেখলে মুক্তবাজারে বিশ্বাস করা অনেকটা সান্তা ক্লজে বিশ্বাস করার মতোই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। আসলে কোনো বাজারের পক্ষেই রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। আজকের অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হল ভবিষ্যতের উপর মানুষের আস্থা। এই সম্পদও কিন্তু চুরি কিংবা জালিয়াতির ঊর্ধ্বে নয়। বাজার কখনও জালিয়াতি, চুরি বা সন্ত্রাসের হাত থেকে সম্পদ বাঁচানোর দায়িত্ব নেয় না। সেটা কিন্তু রাজনৈতিক কাঠামোর কাজের মধ্যেই পড়ে। সম্পদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করাটা সরকারেরই দায়িত্ব। সরকার এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, এর ফলে পুঁজি আর বিনিয়োগ কমে যায় আর অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। ১৭১৯ সালের মিসিসিপি বাবল থেকে পাওয়া মূল শিক্ষা কিন্তু এটাই। এই শিক্ষা যে নিতে পারেনি তার জন্য আছে ২০০৭ সালের যুক্তরাষ্ট্রের হাউজিং বাবল (US housing bubble)।

পুঁজিবাদের নরক

নিয়ন্ত্রণহীন মুক্তবাজারকে ভয় পাওয়ার আরও কারণ আছে। অ্যাডাম স্মিথ বলেছিলেন লাভের উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে আরও শ্রমিক নিয়োগ করা যায়, আর লোভ জিনিসটা সবার জন্যই ভালো- এতে উৎপাদন আর কর্মসংস্থান দুই-ই বাড়ে।

এখন একজন শিল্পপতি যদি শ্রমিকদের বেতন কম দিয়ে আর অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে উৎপাদন বাড়াতে চায়? এক্ষেত্রে মুক্তবাজার অর্থনীতিই শ্রমিকদের রক্ষা করবে। শ্রমিকরা যদি অরিরিক্ত কাজ করেও কম বেতন পায়, তাহলে ভালো শ্রমিকরা আস্তে আস্তে সেখান থেকে সরে যাবে, প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পপতিদের কারখানায় কাজ খুঁজে নেবে। ফলে স্বেচ্ছাচারী শিল্পপতি দক্ষ শ্রমিক হারাবে। কাজেই তাকে হয় নিজের আচরণ ঠিক করতে হবে নয়তো কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। এভাবে তার নিজের লোভই তাকে শ্রমিকদের সাথে ভালো আচরণ করতে বাধ্য করবে।

তত্ত্ব হিসাবে এসব শুনতে ভালোই লাগে, কিন্তু বাস্তব অন্যরকম। যে বাজার পুরোপুরি মুক্ত, অর্থাৎ যেখানে কোনো রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে একজন অসৎ শিল্পপতি একচেটিয়া ব্যবসা কিংবা শ্রমিকদের শোষণ করতেই পারে। কোনো একটা প্রতিষ্ঠান যদি দেশের কোনো শিল্পের সব কারখানা দখল করে নেয়, অথবা যদি সব কারখানা মালিকরা চক্রান্ত করে একসাথে শ্রমিকদের বেতন কমিয়ে দেয়, তাহলে শ্রমিকদেরও আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকবে না।

শুধু তাই নয়, একজন লোভী মালিক তার শ্রমিকদের বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতেও বাধ্য করতে পারে। মধ্যযুগের শেষদিকে ক্রীতদাস প্রথা কী তা খ্রিস্টান অধ্যুষিত ইউরোপের লোকে জানতই না। আর আধুনিক যুগের শুরুতে ইউরোপীয় পুঁজিবাদের সাথে সাথেই উঠে এসেছে আটলান্টিক সাগরের দাস ব্যবসা। এর জন্য কিন্তু কোনো স্বৈরাচারী শাসক বা বর্ণবিদ্বেষ দায়ী নয়, দায়ী অনিয়ন্ত্রিত বাজার।

আমেরিকা জয় করার পর ইউরোপীয়রা সোনা ও রূপার খনির সন্ধান পায়, আর চিনি, তামাক ও তুলার খামার তৈরি করে। এগুলো ছিল তাদের উৎপাদন ও রপ্তানির প্রধান ক্ষেত্র। চিনির কারখানাগুলো ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগে ইউরোপে চিনি ছিল এক দুর্লভ বস্তু। মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রচুর দামে চিনি আমদানি করা হতো। বিভিন্ন মহার্ঘ্য খাবারে কিংবা সাপের তেলের ওষুধে ‘গোপন উপকরণ’ হিসেবেই সেটা ব্যবহার করা হতো। আমেরিকায় চিনিকল তৈরির পর থেকে ইউরোপে চিনির সরবরাহ বাড়তে থাকে। ফলে চিনির দাম দ্রুত কমতে শুরু করে আর ইউরোপের মানুষের মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণও বাড়তে থাকে। রাঁধুনিরাও নানা রকম মিষ্টি খাবার ও পানীয় তৈরি করতে শুরু করে। সপ্তদশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের একজন মানুষের বার্ষিক চিনির চাহিদা ছিল শূন্যের কাছাকাছি। অথচ ঊনবিংশ শতকের শুরুতে সেটা হয়ে গেল আট কেজির কাছাকাছি।

আখের চাষ ও তা থেকে চিনি তৈরি করাটা খুবই শ্রমসাধ্য কাজ। আমেরিকার ক্রান্তীয় এলাকার গরম আবহাওয়ায় ম্যালেরিয়া হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে কেউই চাইত না। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের হাতে তৈরি জিনিস জনসাধারণের হাতে কম দামে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিন্তু বাজারে চাহিদা প্রচুর। সবকিছু দেখে, লাভের আশায় আর অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য লোভী মালিকেরা চিনি উৎপাদনের কাজে ক্রীতদাস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল।

ষোড়শ থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আফ্রিকা থেকে প্রায় এক কোটি ক্রীতদাস আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের ৭০ শতাংশই কাজ করত চিনিকলে। সেখানে ক্রীতদাসদের জীবন ছিল অত্যন্ত দুর্বিষহ। তারা বেশি দিন বাঁচতও না। আফ্রিকার ভিতর থেকে আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত যাওয়ার পথে নানা যুদ্ধবিগ্রহে মারাও পড়ত অনেকে। ইউরোপের মানুষের চায়ে চিনির যোগান দিতে আর চিনিকল মালিকদের পকেটে টাকা আনতে এভাবেই শেষ হয়ে গেছে অসংখ্য ক্রীতদাসের জীবন।

এই ক্রীতদাস ব্যবসা কিন্তু কোনো দেশ বা সরকার চালায়নি। এর কারণ সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক। চাহিদা ও যোগানের সব সূত্র মেনে মুক্তবাজারের নীতিতে এই বাণিজ্য চলেছে। দাস-ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো আমস্টারডাম, লন্ডন আর প্যারিসের স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার বিক্রি করত। ইউরোপের মধ্যবিত্তরা এসব শেয়ার কিনত। শেয়ার বিক্রি করে পাওয়া টাকায় দাস ব্যবসায়ীরা জাহাজ কিনত, নাবিক ও সৈনিক জোগাড় করে যেত আফ্রিকায় আর সেখান থেকে দাস কিনে আমেরিকায় পাঠাত। আমেরিকার নানান ক্ষেতখামারে সেই দাসদের বিক্রি করে তারা কিনে নিয়ে আসত চিনি, কোকো, কফি, তামাক, তুলা ও রাম। সেসব নিয়ে ইউরোপে ফিরে ভালো দামে চিনি আর তুলা বিক্রি করে আবার চলে যেত আফ্রিকায়, আরেক দফা ব্যবসার জন্য। এই ব্যবস্থায় শেয়ারমালিকরাও খুশি। পুরো অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে বছরে প্রায় ৬ শতাংশ লাভে চলেছে এই দাস ব্যবসা। আজকের দিনেও যেকোনো বাণিজ্য-বিশেষজ্ঞ একে অত্যন্ত লাভজনক বলে স্বীকার করে নেবেন নির্দ্বিধায়।

এটাই হল মুক্তবাজার অর্থনীতির সমস্যা। ব্যবসায় সৎ পথে লাভ হচ্ছে কি না বা লাভের টাকা সুষমভাবে সবার মধ্যে বণ্টিত হচ্ছে কি না- তার কোনো নিশ্চয়তা কেউ দেয় না। বরং উল্টোটাই হয়- আরও বেশি উৎপাদন ও লাভের নেশা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, কোনো বাধা-বিপত্তি সে আর মানতে চায় না। অগ্রগতির পথ থেকে যখন নৈতিক বাধাটুকু সরে যায়, তখন বিপর্যয় ঘটতে আর দেরি হয় না। কোনো কোনো ধর্ম, যেমন খ্রিস্টধর্ম বা নাৎসিবাদ কেবল ঘৃণার কারণে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। আর পুঁজিবাদ লাখ লাখ মানুষ মেরেছে লোভ আর নির্লিপ্ততা দিয়ে। আটলান্টিকের দাস ব্যবসার পিছনে কোনো বর্ণবিদ্বেষ নেই। যেসব মানুষ এই ব্যবসার শেয়ার কিনেছে, যারা বিক্রি করেছে, আর যারা এই ব্যবসা চালিয়েছে- আফ্রিকার মানুষদের নিয়ে তাদের কেউ কখনও ভাবেইনি। ভাবেনি চিনিকলের মালিকরাও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কারখানা থেকে দূরে থাকত, সেখান থেকে লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখেই তারা খুশি।

ক্রীতদাস ব্যবসা ছাড়াও আরও উদাহরণ আছে। আগের অধ্যায়ে যে বাংলার দুর্ভিক্ষের কথা বলা হয়েছে, তার কারণটাও এমনই। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এক কোটি বাঙালির জীবনের চেয়ে ব্যবসায়িক লাভটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওদিকে ইন্দোনেশিয়ায় ভিওসির অভিযানের জন্য টাকা দিয়েছে যারা, তারাও সাংসারিক মানুষই ছিল- তাদের পরিবার ছিল, সন্তান ছিল, তারা দান-খয়রাত করত, গান শুনত, শিল্পের কদর বুঝত। অথচ জাভা, সুমাত্রা ও মালাক্কার নিপীড়িত মানুষদের জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতি তাদের ছিল না। বর্তমান অর্থনীতির এই অগ্রগতির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে পৃথিবী জুড়ে অগণিত অপরাধ ও শোষণের ইতিহাস।

উনিশ শতকের পুঁজিবাদও তেমন কোনো মানবিকতার পরিচয় দেয়নি। ইউরোপজুড়ে শিল্পবিপ্লবের সময়ে ব্যাংকার আর শিল্পপতিদের পকেট ফুলেফেঁপে উঠেছে, কিন্তু লাখ লাখ শ্রমিকের জীবনে এনে দিয়েছে অন্তহীন ভোগান্তি। ইউরোপের উপনিবেশগুলোর অবস্থা ছিল আরও খারাপ। ১৮৭৬ সালে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড একটা বেসরকারি মানবকল্যাণ সংস্থা তৈরি করেন। সেই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল মধ্য আফ্রিকা আবিষ্কার ও কঙ্গো নদীপথে দাস ব্যবসা প্রতিরোধ। অন্যান্য উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল সেখানে রাস্তাঘাট, বিদ্যালয় আর হাসপাতাল বানিয়ে ওখানকার মানুষের জীবনমান উন্নত করা। ১৮৮৫ সালে ইউরোপের কিছু দেশ ঐ সংগঠনকে কঙ্গো নদীর অববাহিকায় ২৩ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা দান করে। আকারে সেই এলাকাটা বেলজিয়ামের প্রায় ৭৫ গুণ। তখন থেকে সেই এলাকাটাকেই আমরা কঙ্গো নামক দেশ হিসেবে জানি। তবে এত বড় একটা পরিবর্তনের আগে কেউ সেখানকার ২-৩ কোটি অধিবাসীর মতামত জানতে চায়নি একবারও।

এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই মানবকল্যাণ সংস্থাটা একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যার উদ্দেশ্য যথারীতি প্রবৃদ্ধি আর মুনাফা অর্জন। স্কুল আর হাসপাতাল মাথায় উঠল, কঙ্গো নদীর দুই তীর ভরে গেল খনি আর খামারে। সেসবের মালিকেরা অবশ্যই বেলজিয়ামের লোক। তারা স্থানীয় মানুষদের শোষণের কোনো কমতি রাখেনি। এসবের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল ওখানকার রাবার শিল্প। তখন রাবারের প্রয়োজনীয়তা হু হু করে বাড়ছে, আর কঙ্গোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল রাবার রপ্তানি। রাবারচাষীদের কাছে অনেক বেশি রাবার দাবি করা হতো। সে দাবি পূরণ করতে না পারলে এই ‘অলসতার’ জন্য তাদের দেওয়া হতো নির্মম শাস্তি। তাদের হাত কেটে ফেলা হতো। অনেক সময় পুরো একটা গ্রামের সব মানুষকে হত্যা করা হতো। ধারণা করা হয়, ১৮৮৫ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে কম করে হলেও ৬০ লক্ষ মানুষের প্রাণ গেছে শুধু এই রাবারের জন্য, যা কিনা কঙ্গোর মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ)। কোনো কোনো সমীক্ষা অনুযায়ী এই সংখ্যাটা এক কোটিও হতে পারে।৪

১৯০৮ সালের পর, বিশেষ করে ১৯৪৫ এর পরে পুঁজিবাদের লোভ একটু সংযত হল, এর পেছনে অবশ্য কম্যুনিজমের অবদান কম নয়। তাই বলে সাম্য কিন্তু আসেনি। ১৫০০ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে পৃথিবীর সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। কিন্তু এখনও সেটা এত অসমভাবে বণ্টিত যে আফ্রিকার কৃষক আর ইন্দোনেশিয়ার শ্রমিকেরা আজও দিনশেষে তাদের ৫০০ বছর আগের পূর্বসূরীদের চেয়েও কম মজুরি নিয়ে ঘরে ফেরে। কৃষিবিপ্লব যেমন মানবজাতির জন্য একটা বিরাট ধোঁকা ছিল, এই অর্থনৈতিক উন্নয়নও ঠিক তাই। পৃথিবীতে মানুষ বাড়ছে, সাথে প্রসারিত হচ্ছে অর্থনীতিও, কিন্তু তার মাঝেও অসংখ্য মানুষের জীবন চাপা পড়ে আছে অভাব ও ক্ষুধার কালো ছায়ায়।

এই অভিযোগের বিপরীতে পুঁজিবাদ দুটো যুক্তি দেখাতে পারে। প্রথমটা হল, একটা পুঁজিবাদী পৃথিবী শাসন করতে পারবে কেবল পুঁজিবাদী মানুষই। এর বিপরীত ধারা কম্যুনিজমের ব্যর্থতার পরিমাণ এত বেশি যে সেদিকে যাওয়ার চেষ্টা মনে হয় কেউই করবে না। ৮৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মানুষেরা যদি কৃষিবিপ্লবের বিপক্ষে অবস্থান নিত, তা হলেও যেমন আর ফেরার পথ ছিল না, ঠিক তেমনি হাজারটা দোষ নিয়েও আজ পুঁজিবাদ টিকে থাকবে, কারণ এখানেও ফেরার পথ বন্ধ।

আর দ্বিতীয় যুক্তিটা হল, পুঁজিবাদের সুফল পেতে হলে আমাদের আরও ধৈর্য ধরতে হবে। পুঁজিবাদ যে স্বর্গের স্বপ্ন দেখায়, সেখানে পৌঁছাতে আমাদের আর একটু বাকি। হ্যাঁ, ভুল অনেক হয়েছে। কিন্তু ভুল থেকে তো শিক্ষাও হয়েছে। এভাবেই আমাদের সম্পদ আরেকটু বাড়বে, সবাই আরও বেশি সম্পদের মালিক হবে। বৈষম্যটুকু হয়তো পুরোপুরি দূর হবে না, কিন্তু তাতেও মানুষ তার চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট পাবে- এমনকি কঙ্গোর মানুষও।

আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি এখনও। কিছু কিছু বিষয়, যেমন গড় আয়ু, শিশু মৃত্যুহার, খাবারের সরবরাহ- এসব দিয়ে বিচার করলে ২০১৪ সালের গড়পড়তা একজন মানুষের জীবনের মান ১৯১৪ সালের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। সারা পৃথিবীতে জনসংখ্যার বিস্ফোরণের পরেও।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এভাবে কি অনন্তকাল চলতেই থাকবে? সম্পদ বৃদ্ধি করতে হলে কাঁচামাল ও শক্তি লাগে- কিন্তু দুটোই তো সীমিত। আজ হোক বা একশ বছর পরেই হোক, একদিন কি এ দুটোই শেষ হয়ে যাবে না? তখন কী করবে মানুষ?


1 Maddison, World Economy, vol. 1, 261, 264; ‘Gross National Income Per Capita 2009, Atlas Method and PPP’, the World Bank, accessed 10 December 2010, http://siteresources.worldbank.org/DATASTATISTICS/Resources/GNIPC.pdf.

2 The mathematics of my bakery example are not as accurate as they could be. Since banks are allowed to loan $10 for every dollar they keep in their possession, of every million dollars deposited in the bank, the bank can loan out to entrepreneurs only about $909,000 while keeping $91,000 in its vaults. But to make life easier for the readers I preferred to work with round numbers. Besides, banks do not always follow the rules.

3 Carl Trocki, Opium, Empire and the Global Political Economy (New York: Routledge, 1999), 91.

4 Georges Nzongola-Ntalaja, The Congo from Leopold to Kabila: A People’s History (London: Zed Books, 2002), 22.

 

১৫. বিজ্ঞান আর সাম্রাজ্যবাদের গাঁটছড়া

 

পৃথিবী থেকে সূর্য কত দূরে? অনেক জ্যোতির্বিদকে গলদঘর্ম করে ছেড়েছে এই প্রশ্নটা। বিশেষ করে কোপার্নিকাস যখন বললেন পৃথিবী নয়, সূর্যই মহাবিশ্বের কেন্দ্র, তখন থেকে আরও বেশি করে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে সবাই। অনেক জ্যোতির্বিদ আর গণিতবিদ বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই দূরত্ব মাপার চেষ্টা করেছেন, আর তাঁদের উত্তরও এসেছে বিভিন্ন রকম। শেষমেশ আঠারো শতকের মাঝামাঝির দিকে একটা নির্ভরযোগ্য উপায় পাওয়া গেল। কয়েক বছর পরপর শুক্রগ্রহ পৃথিবী আর সূর্যের মাঝের জায়গাটা অতিক্রম করে। এই পথটুকু পার হতে শুক্রগ্রহের কতটুকু সময় লাগে সেটা পৃথিবীর এক এক জায়গায় বসে মাপলে এক এক রকম হয়। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণের কারণেই এই ভিন্নতা। এই সময়টুকুই যদি দু-তিনটা মহাদেশ থেকে মাপা যায় তাহলেই একটু ত্রিকোণমিতি কাজে লাগিয়ে পৃথিবী আর সূর্যের দূরত্বটা নির্ভুলভাবে জানা যায়।

জ্যোতির্বিদরা আগে থেকেই জানতেন যে শুক্রগ্রহ ১৭৬১ আর ১৭৬৯ সালে পৃথিবী আর সূর্যের মাঝখান দিয়ে যাবে। তাই আগেভাগেই ইউরোপ থেকে চারদিকে পর্যবেক্ষণ দল পাঠিয়ে দেওয়া হল। ১৭৬১ সালে সাইবেরিয়া, উত্তর আমেরিকা, মাদাগাস্কার আর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ঘটনাটা দেখা গেল। এরপর ১৭৬৯ সালে ইউরোপের বিজ্ঞানী সমাজ এই পরীক্ষার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন। এবার লোক পাঠানো হল কানাডার উত্তরে আর ক্যালিফোর্নিয়ায় (তখন সেখানে ঘন জঙ্গল)। তবে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির (The Royal Society of London for the Improvement of Natural Knowledge) কাছে সেটা যথেষ্ট মনে হলো না। তাঁরা বললেন, একেবারে নির্ভুল ফলাফল পেতে হলে দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে কাউকে যেতেই হবে।

রয়্যাল সোসাইটি সিদ্ধান্ত নিল তখনকার ডাকসাইটে জ্যোতির্বিদ চার্লস গ্রিনকে তাহিতি দ্বীপে পাঠানোর। প্রচুর অর্থ ও শ্রমসাপেক্ষ অভিযান। রয়্যাল সোসাইটি ভাবল, কেবল একটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য এত কষ্ট, এত খরচ? তার চেয়ে একই অভিযানে আরও কিছু কাজ সেরে ফেলা যাক। ফলে চার্লস গ্রিনের সঙ্গে যুক্ত হল বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার আরও আটজন বৈজ্ঞানিক। দলের নেতা হিসেবে ছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোসেফ ব্যাঙ্কস আর ড্যানিয়েল সোল্যান্ডার। সাথে গেল নতুন জায়গা, মানুষ আর পশুপাখির ছবি আঁকার জন্য শিল্পীরা। আর এই পুরো অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ নাবিক ও ভূগোলবিদ ক্যাপ্টেন জেমস কুক।

এই নৌবহর ইংল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করে ১৭৬৮ সালে। তারপর ১৭৬৯ সালে তাহিতিতে শুক্রগ্রহ পর্যবেক্ষণের পর প্রশান্ত মহাসাগরের আরও কয়েকটা দ্বীপ ঘুরে, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ঘুরে আবার ইংল্যান্ডে ফেরে ১৭৭১ সালে। সাথে নিয়ে আসে জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা ও নৃতত্ত্বের প্রচুর নতুন জ্ঞান। এই নতুন জ্ঞানই বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। সাথে সাথে একদিকে সেটা প্রশান্ত মহাসাগর নিয়ে মানুষের কল্পনায় আরেকটু রঙ চড়ায়, আবার অন্যদিকে পরের প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের দেয় নতুন অনুপ্রেরণা।

ক্যাপ্টেন কুকের অভিযানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটা বড় উপকার হয়। তখনকার দিনে প্রায় অর্ধেক মানুষই বেঁচে ফিরতে পারবে না- এমনটা জেনেই এসব দূরপাল্লার অভিযান শুরু হতো। না, কোনো দ্বীপের হিংস্র মানুষ, শত্রুদের যুদ্ধজাহাজ বা ঘরের টান- এসব কিছুই না, নাবিকদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল স্কার্ভি (Scurvy) নামক এক রহস্যময় রোগ। এ রোগে আক্রান্ত মানুষ কেমন যেন হতাশ আর বিষণ্ণ হয়ে পড়ে, দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। এরপর আস্তে আস্তে দাঁত পড়ে যায়, শরীরের নানা জায়গায় ঘা হতে থাকে, তারপর জ্বরাক্রান্ত ফ্যাকাশে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে হারাতে রোগী মারা যায়। ধারণা করা হয়, ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রায় ২০ লক্ষ নাবিকের প্রাণ গেছে এই স্কার্ভিতে। এই রোগের কারণ কেউ জানতো না, প্রতিকার তো নয়ই। অবশেষে আশার আলো দেখা যায় ১৭৪৭ সালে। সেবছর ব্রিটিশ চিকিৎসক জেমস লিন্ড স্কার্ভি-আক্রান্ত নাবিকদের উপর একটা পরীক্ষা চালান। সে পরীক্ষায় রোগীদের কয়েকটা দলে ভাগ করে এক এক দলের উপর এক এক রকমের ওষুধের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত যে দলের রোগীরা টিকে গেল, দেখা গেল তাদের খাওয়ানো হয়েছে লেবু জাতীয় ফল। স্কার্ভির ওষুধ হিসেবে লেবুর কার্যকারিতার কথা লোকমুখে শোনা যেত। সেই লেবু-খাওয়া রোগীরা বেশ দ্রুতই সেরে ওঠে। লিন্ড জানতেন না লেবুর ঠিক কোন উপাদানটা স্কার্ভি সারায়, যদিও আমরা এখন জানি জিনিসটা হল ভিটামিন সি। তখনকার দিনে দীর্ঘ যাত্রায় জাহাজে খাবার হিসেবে নেওয়া হতো বিস্কুট আর শুকনো মাংস। ফল আর সবজি বলতে কিছুই নেওয়া হতো না জাহাজে, যার ফলে নাবিকদের শরীরে দেখা যেত ভিটামিন সি এর অভাব।

ব্রিটিশ নৌবাহিনী লিন্ডের পর্যবেক্ষণ না মানলেও জেমস কুক মেনেছিলেন ঠিকই। লিন্ডের পর্যবেক্ষণ ঠিক কি না সেটা প্রমাণের দায়িত্ব তুলে নেন তিনি। তাঁর নৌবহরে তিনি খাবার হিসেবে প্রচুর পরিমাণে সয়ারক্রট (Sauerkraut – গাঁজানো বাঁধাকপি কুচি, অনেকটা আচারের মতো) নিয়ে যান। আর নাবিকদের নির্দেশ দিয়ে রাখেন কখনও ডাঙায় নামলেই বেশি করে ফল আর সবজি খেয়ে নিতে। সেই অভিযানে একজন নাবিকও স্কার্ভিতে মারা যায়নি। এরপর থেকে সব জাহাজে খাবারের ধরন পালটে যায়। অন্যান্য নাবিকেরা ক্যাপ্টেন কুকের পথ অনুসরণ করায় বেঁচে যায় অগণিত নাবিক ও যাত্রীর প্রাণ।১

তবে এটাই সব নয়, ক্যাপ্টেন কুকের এই অভিযানের একটা অন্ধকার দিকও আছে। কুক শুধু একজন দক্ষ নাবিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তাও। রয়্যাল সোসাইটি এই অভিযানে টাকা দিলেও জাহাজ কিন্তু দিয়েছিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীই। সেই অভিযানে নাবিক ও বিজ্ঞানীদের সাথে ছিল ৮৫ জন সশস্ত্র নৌসেনা, আর জাহাজে ছিল প্রচুর কামান-বন্দুক আর গোলাবারুদ। এই অভিযানে পাওয়া ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক তথ্যের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব যতটা ছিল, রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব তার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। স্কার্ভির কার্যকর চিকিৎসা আবিষ্কার হওয়াতে ওই সব দূর সাগরে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হল। এরপর তারা আরও দূরে, একেবারে পৃথিবীর উল্টোদিকেও সেনাবাহিনী পাঠাতে শুরু করল। কুক নিজেই তাঁর ‘আবিষ্কৃত’ অনেকগুলো দ্বীপ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে এনেছেন, এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল অস্ট্রেলিয়া। কুকের অভিযানের মাধ্যমেই অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর তাসমানিয়ার দখল প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর আস্তে আস্তে ইউরোপের মানুষ সেখানে উপনিবেশ তৈরি করে আর সেখানকার আদি অধিবাসী ও তাদের সংস্কৃতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়।২

এই অভিযানের একশ বছরের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের প্রায় সবটুকু চাষযোগ্য মাটি দখলদার ইউরোপীয় মানুষদের হাতে চলে যায়। সেখানকার আদিবাসীদের ৯০ শতাংশই প্রাণ হারায়, আর বাকিরা সেই বর্ণবিদ্বেষী সমাজে কোনোমতে টিকে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠী আর নিউজিল্যান্ডের মাওরিদের যে ক্ষতি সে সময় হয়েছে, সেটা তারা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

তবে তাসমানিয়ার আদিবাসীদের পরিণতি হয় সবচেয়ে করুণ। ওই বিচ্ছিন্ন দ্বীপটাতে ১০ হাজার বছর ধরে যারা টিকে ছিল, কুকের অভিযানের মাত্র একশ বছরের মধ্যে তাদের একেবারে শেষ মানুষটাও মারা যায়। ইউরোপীয় দখলদাররা প্রথমে দ্বীপের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অংশটা দখল করে সেখান থেকে আদিবাসীদের তাড়িয়ে দেয়। আদিবাসীদেরকে পশুর মতোই শিকার করত তারা। তারপর শেষ কিছু মানুষকে কোণঠাসা করে আটকে রাখা হয় বন্দীশিবিরে। সেখানে তাদেরকে ‘সভ্য মানুষ’ বানানোর চেষ্টা করা হয়। সেখানে ধর্মপ্রচারকেরা তাদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দেয়, তাদেরকে লেখাপড়া শেখানো হয়, সেলাই করা আর চাষবাসের মতো ‘কাজের কাজ’ শেখানোরও চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তারা সে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। ধীরে ধীরে সেই শেষ কজন আদিবাসী বিষণ্ণ মানুষ জীবনের প্রতি সবরকম আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, এমনকি সন্তান নেওয়াও বন্ধ করে দেয়। এই সভ্য জগতের বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ আর প্রগতির হাত থেকে বাঁচতে একমাত্র খোলা পথটাই তারা বেছে নেয়- মৃত্যু।

বিজ্ঞানের অগ্রগতি এই মানুষগুলোকে মৃত্যুর পরেও শান্তি দেয়নি। তাসমানিয়ার সর্বশেষ আদিবাসীদের মৃতদেহগুলোও চলে যায় নৃতাত্ত্বিক আর জাদুঘরের লোকেদের কাছে। সেসব দেহ কাটাছেঁড়া করে, দৈর্ঘ্যপ্রস্থ আর ওজন মেপে সেসব তথ্য দিয়ে ভারী ভারী বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লেখা হয়। তারপর তাদের কঙ্কালগুলোর জায়গা হয় বিভিন্ন জাদুঘরে আর প্রদর্শনীতে। শেষমেশ ১৯৭৬ সালে তাসমানিয়ার জাদুঘর সর্বশেষ জীবিত আদিবাসী ট্রুগানিনির (Truganini) কঙ্কাল মৃত্যুর একশ বছর পর সমাহিত করে। তার চামড়া ও চুলের কিছু নমুনা ব্রিটেনের শৈল্য চিকিৎসা কলেজে (The English Royal College of Surgeons) ২০০২ সাল পর্যন্ত ছিল।

কুকের অভিযানকে আসলে কী বলা যায়? সেনা-প্রতিরক্ষা বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক অভিযান? নাকি কয়েকজন বিজ্ঞানীকে সাথে নিয়ে সামরিক অভিযান? প্রশ্নটা আধাগ্লাস পানি দেখিয়ে গ্লাসটা অর্ধেক ভরা না অর্ধেক খালি জানতে চাওয়ার মতোই। দুটোই ঠিক। বিজ্ঞানের অগ্রগতি আর সাম্রাজ্যবাদের বিকাশ- এ দুটো আসলে অবিচ্ছেদ্য। একটা থেকে অন্যটাকে আলাদা করা যায় না। ক্যাপ্টেন জেমস কুক কিংবা উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোসেফ ব্যাঙ্কস- দুজনের কেউই পারেননি। ট্রুগানিনিও না।

কেন ইউরোপ?

এই যে উত্তর আটলান্টিকের একটা দ্বীপের কিছু মানুষ গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণের একটা বড় দ্বীপ দখল করে নিল- এটা মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাগুলোর একটা। কুকের অভিযানের খুব বেশি আগের কথা না, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ আর পশ্চিম ইউরোপ ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে দূরের একটা বৈশিষ্ট্যহীন এলাকা। আর ইউরোপের ইতিহাসের শুরুর দিককার যে পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্যের কথা আমরা বলি, সে সাম্রাজ্যও নিজের সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল না। রোমান সাম্রাজ্যের প্রায় সব সম্পদই ছিল উত্তর আফ্রিকা, বলকান আর মধ্যপ্রাচ্য থেকে লুট করে আনা। রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশের অবস্থা ছিল খুবই করুণ- অনেকটা আমরা যে বুনো পশ্চিমের কথা বলি, তেমন। কিছু খনি আর দাস ছাড়া সে অঞ্চল আর কিছুই দিতে পারেনি রোমান সভ্যতাকে। আর উত্তর ইউরোপ ছিল একটা বিরানভূমি, জয় করে নেওয়ার মতো কিছুই ছিল না সেখানে।

C04A2CFB5A2E4631842DF1AB65ACB5AB.ashx

৩৫। তাসমানিয়ার সর্বশেষ আদিবাসী মানুষ ট্রুগানিনি।

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে এসে ইউরোপ সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সাংস্কৃতিক দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। ১৫০০ থেকে ১৭৫০ সালের মধ্যকার সময়টাতে ইউরোপ বলতে গেলে বাইরের পৃথিবীর মালিক বনে গেল। দুই আমেরিকা মহাদেশ আর মহাসাগরগুলোর উপর তখন তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। তারপরেও, শক্তির তুলনায় ইউরোপ এশিয়ার ধারেকাছেও ছিল না। ইউরোপ দুই আমেরিকা আর সাগরগুলো দখল করতে পেরেছিল কারণ এশিয়ার মানুষ ওগুলো দখল করার কোনো চেষ্টাই করেনি। আধুনিক যুগের শুরুর দিকে ভূমধ্যসাগরে অটোমান সাম্রাজ্য, পারস্যে সাফাভিদ সাম্রাজ্য, ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য আর চীনে মিং আর চিং সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ চলছিল। এদের প্রত্যেকটাই যার যার সীমানা বাড়িয়ে যাচ্ছিল। ১৭৭৫ সালে সারা পৃথিবীর সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শতকরা ৮০ ভাগই হতো এশিয়ায়। শুধু ভারত আর চীনে যে পরিমাণ সম্পদের উৎপাদন হতো সেটাই ছিল পুরো পৃথিবীর তিন ভাগের দুভাগ। এর তুলনায় ইউরোপের অর্থনীতি ছিল নস্যি।৩

অথচ ১৭৫০ থেকে ১৮৫০- এই একশ বছরের মধ্যেই পৃথিবীর ক্ষমতার কেন্দ্র সরে গেল ইউরোপে। এই সময়ে ইউরোপের মানুষ একের পর এক যুদ্ধে এশিয়ার পরাশক্তিগুলোকে শোচনীয়ভাবে পরাভূত করেছে। এশিয়ার অনেকখানি এলাকা চলে গেল ইউরোপের দখলে। ১৯০০ সালের মধ্যেই ইউরোপ পৃথিবীর অধিকাংশ ভূমি আর অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৫০ এর মধ্যে দেখা গেল, পশ্চিম ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্র মিলে পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ উৎপাদন করছে। ওদিকে চীনের উৎপাদন কমতে কমতে ৫ শতাংশে এসে ঠেকল।৪ ইউরোপের অধীনে পৃথিবীর ক্ষমতার বণ্টন আর সংস্কৃতি আমূল বদলে গেল। আজকের পৃথিবীতেই তো আমরা দেখতে পাই, প্রায় সব মানুষই ইউরোপীয়দের মতো পোশাক পরে, তাদের মতো চিন্তা করে। আজকের যে মানুষদের কথায় প্রবল ইউরোপ-বিদ্বেশ প্রকাশ পায়, দেখা যায় তারাও পৃথিবীটাকে ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখে। রাজনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সামরিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে বর্তমান অবস্থায় এনেছে ইউরোপ। নানা দেশের সঙ্গীতে ইউরোপীয় সুরের প্রভাব লক্ষণীয়। আর আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে যে সব ভাষা এখন চলছে তার সবই তো ইউরোপের। এই যে চীনের অর্থনীতি আজ বিরাট আকার নিচ্ছে, হয়তো আগামী দিনের পৃথিবীটা তাদেরই হবে, কিন্তু সে অর্থনীতির উৎপাদন থেকে অর্থায়ন- সবকিছু গড়ে উঠেছে ইউরোপীয় মডেলেই।

ইউরেশিয়া অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্বল অংশটার মানুষ কীভাবে পুরো পৃথিবীর দখল নিয়ে নিল? এর জন্য সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিতে হবে ইউরোপের বিজ্ঞানীদেরকেই। স্বীকার না করে উপায় নেই, ১৮৫০ এর পর থেকে ইউরোপের এই ক্ষমতাবৃদ্ধির পিছনে আছে তাদের সামরিক দক্ষতা, শিল্প ও বিজ্ঞানের বিকাশ এবং অবশ্যই তাদের প্রযুক্তির উন্নয়ন। আজকের যুগে সব দেশই প্রযুক্তির উন্নতির জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মনোযোগ দিচ্ছে। এসব গবেষণার প্রায় সবটাই চলছে নতুন অস্ত্র তৈরি করতে, নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে কিংবা সাম্রাজ্যবাদের হাতকে আরও শক্তিশালী করার নতুন কোনো কৌশল সৃষ্টি করতে। আফ্রিকার মানুষের সাথে যখন ইউরোপের মানুষের যুদ্ধ চলছিল, তখন তারা একটা কথা প্রায়ই বলত, “শত্রু যেদিক থেকেই আসুক, আমাদের আছে মেশিনগান, ওদের তো সেটা নেই”। বেসামরিক প্রযুক্তির উন্নতিও তখন কম হয়নি। সৈন্যদের খাওয়ানোর জন্য খাবার টিনে ভরা শুরু হল, সৈন্যদের যাতায়াতের জন্য রেললাইন বসল, বড় বড় জাহাজ ভাসল সাগরে, আহত সৈন্যদের জন্য উন্নত চিকিৎসা আর ওষুধ আবিষ্কার হল। আফ্রিকা দখল করার পেছনে এসবের অবদান কিন্তু মেশিনগানের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।

১৮৫০ সালের আগে যুদ্ধ-শিল্প-বিজ্ঞান এই তিন দিকের কোনোটাতেই মানুষ খুব একটা উন্নতি করতে পারেনি। উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা মানুষ তখনও নিতে পারেনি, তাই ইউরোপ, আফ্রিকা আর এশিয়ার মধ্যে শক্তির পার্থক্য খুব বেশি ছিল না। আবার ১৭৭০ সালের কথা চিন্তা করলে দেখা যায়, ক্যাপ্টের কুক সামরিক শক্তিতে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু একই রকম শক্তি নিয়েও তখনকার চীন সাম্রাজ্যের ক্যাপ্টেন ওয়ান ঝেংসি কিংবা অটোমান সাম্রাজ্যের ক্যাপ্টেন হুসেন পাশা কেন অস্ট্রেলিয়া দখল করেনি? তার চেয়ে বড় কথা হল, ১৭৭০ সালে যে ইউরোপ প্রযুক্তির দিক থেকে মুসলিম, ভারতীয় বা চৈনিক সভ্যতার কাছাকাছি ছিল, পরের একশ বছরের মধ্যেই তারা এতটা এগোল কীভাবে?

যুদ্ধ-শিল্প-বিজ্ঞানের এই যৌথ বিকাশ ভারতে না হয়ে ইউরোপেই কেন হল? ব্রিটেন এগিয়ে যাবার পরপরই ফ্রান্স, জার্মানি আর যুক্তরাষ্ট্রও এগোতে শুরু করল, চীন পিছিয়ে থাকল কেন? যখন রাশিয়া, ইতালি আর অস্ট্রিয়া শক্তির পার্থক্যটা কমিয়ে আনছিল, তখন ইরান, মিশর আর অটোমান সাম্রাজ্য কোথায় ছিল? শিল্প বিপ্লবের প্রথম ধাপে যেসব প্রযুক্তি এসেছিল সেগুলো তো খুব জটিল ছিল না, তাহলে চৈনিক বা অটোমান প্রকৌশলীরা বাষ্প ইঞ্জিন, মেশিনগান আর রেলগাড়ির মতো কিছু আবিষ্কার করতে পারল না কেন?

বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক রেলপথ চালু হয় ব্রিটেনে, ১৮৩০ সালে। ১৮৫০ সালের মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলো প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার রেললাইনে ছেয়ে গেল, অথচ এশিয়া, আফ্রিকা আর ল্যাটিন আমেরিকার মোট রেললাইনের দৈর্ঘ্য ছিল বড়জোর ৪ হাজার কিলোমিটার। ১৮৮০ নাগাদ পশ্চিমের মোট রেললাইন হল সাড়ে ৩ লাখ কিলোমিটার, আর বাকি পৃথিবীতে ৩৫ হাজার কিলোমিটার। এর বেশিরভাগই ছিল ভারতে, আর সেটাও ব্রিটিশদেরই তৈরি।৫ চীনে প্রথম রেললাইন বসে ১৮৭৬ সালে। মাত্র ২৫ কিলোমিটার লম্বা, এবং ইউরোপীয়দের দ্বারাই তৈরি। অবশ্য পরের বছরই চীন সরকার সেটা নষ্ট করে ফেলে। ১৮৮০ সালে চীনে রেলপথ বলতে কিছু ছিলই না। ইরানের প্রথম রেলপথ তৈরি হয় তেহরান আর সেখান থেকে কিলোমিটার দশেক দূরের একটা শহরের মধ্যে। সেটা ১৮৮৮ সালের কথা। এটাও তৈরি করেছিল বেলজিয়ামের একটা প্রতিষ্ঠান। ১৯৫০ সালে ব্রিটেনের চেয়ে আকারে সাতগুণ বড় দেশ ইরানের মোট রেলপথের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র আড়াই হাজার কিলোমিটার।

চীন আর ইরানের মানুষের বাষ্প ইঞ্জিন তৈরি করার মতো প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছিল না, তা কিন্তু নয়। অন্তত ব্রিটিশদেরটা দেখে তৈরি করা যেত, অথবা তাদের কাছ থেকে কিনেও তো আনা যেত। কিন্তু এভাবে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার জন্য ব্রিটিশ সমাজের যেসব মূল্যবোধ, মিথ, বিচারব্যবস্থা বা সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভূমিকা রেখেছে, চীন বা ইরানে তখন সেগুলো ছিল না। এগুলো তো আর অন্যেরটা দেখে তৈরি করা যায় না। ফ্রান্স আর যুক্তরাষ্ট্র তাল মিলিয়ে এগোতে পেরেছে, কারণ তাদের সমাজ কাঠামো ব্রিটিশদের সাথে অনেকটাই মিলে যায়। চীন আর ইরান সেটা পারেনি, কারণ তাদের সমাজের বিকাশ হয়েছে অন্যরকমভাবে।

এই কারণ দেখিয়ে ১৫০০ থেকে ১৮৫০ পর্যন্ত সময়টাকে অনেকটা বোঝা যায়। এই সাড়ে তিনশ বছরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক বা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে ইউরোপ এশিয়ার চেয়ে খুব বেশি এগিয়ে না থাকলেও সম্ভাবনাটা তৈরি হয়েছে তখনই। এর ফলাফলটা হঠাৎ করে দেখা গেছে ১৮৫০ এর পরে। ১৭৫০ সালের ইউরোপ, চীন আর মুসলিম বিশ্বকে সমশক্তিসম্পন্ন মনে হলেও আসলে তা নয়। ধরুন, দুজন মিস্ত্রি দুটো টাওয়ার বানাচ্ছে। একজন বানাচ্ছে কাঠ আর মাটি দিয়ে, অন্যজন ইস্পাত আর কংক্রিট দিয়ে। শুরুতে দেখা যাবে দুজনেরই কাজ সমানভাবে এগোচ্ছে। কিন্তু একটা সময়ে এসে প্রথম মিস্ত্রি কাজ থামাতে বাধ্য হবে, কারণ বড় টাওয়ার তৈরির ক্ষমতা মাটি আর কাঠের নেই। অথচ দ্বিতীয় মিস্ত্রির কাজ এগিয়ে যাবে তরতর করে।

কিসের জোরে ইউরোপ একেবারে শুরুতেই বাকি পৃথিবীর দখল নিয়ে নিল? যে সম্ভাবনাটা প্রথমে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, সেটা কী ছিল? এই প্রশ্নের দুরকম উত্তর পাওয়া যায়- একটা হল আধুনিক বিজ্ঞান, অন্যটা পুঁজিবাদ। ইউরোপীয়দের চিন্তা আর আচরণে বিজ্ঞানমনস্কতার ছাপ পড়েছে এই অগ্রগতি শুরু হওয়ার অনেক আগে। তাই যখন তাদের হাতে নতুন নতুন প্রযুক্তি আসা শুরু হল, সেগুলোকে কাজে লাগাতে তাদের সময় লেগেছে অনেক কম। ইউরোপীয় সাম্রাজ্য যে একুশ শতকের পৃথিবীর বিজ্ঞান আর পুঁজিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেটা মোটেই কাকতালীয় ব্যাপার নয়। সেই দুনিয়াজোড়া ইউরোপীয় সাম্রাজ্য আজ নেই, কিন্তু বিজ্ঞান আর পুঁজিবাদের বিস্তার কিন্তু থেমে নেই। পুঁজিবাদের ব্যাপারে পরের অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে, আপাতত ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ আর আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যেকার নিবিড় সম্পর্কটা আরেকটু ভালোভাবে দেখা যাক।

জয়ের তাড়না

আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশ হয়েছে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের হাত ধরেই। হ্যাঁ, এর মধ্যে গ্রিস, চীন, ভারত আর মুসলিমদের প্রচুর অবদান আছে বটে, কিন্তু বিজ্ঞান তার বর্তমান অবস্থায় এসেছে স্পেন, পর্তুগাল, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া আর নেদারল্যান্ডের সাম্রাজ্যবিস্তারের মাধ্যমেই। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের শুরুর দিকে চৈনিক, ভারতীয়, মুসলিম, আমেরিকান আর পলিনেশীয়দের সবাই অনেক কাজ করেছে। অ্যাডাম স্মিথ আর কার্ল মার্ক্স- দুজনেই মুসলিম অর্থনীতিবিদদের লেখা পড়েছেন। আমেরিকার আদিবাসী চিকিৎসকদের চিকিৎসা পদ্ধতি অনেক ইংরেজি বইয়ে জায়গা করে নিয়েছিল। পলিনেশীয়দের সংগৃহীত অনেক তথ্য পশ্চিমা নৃতত্ত্বের বইয়ে পাওয়া যায়। এতদিন ধরে যারা সারা পৃথিবীর সংগৃহীত জ্ঞান নিয়ে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখা তৈরি করল তারাই বিংশ শতকের মাঝামাঝির দিকে পুরো পৃথিবী শাসন করতে লাগল। বড় বড় বিজ্ঞানীরাও বেরিয়ে এলেন তাদের মধ্য থেকেই। প্রাচ্যে আর মুসলিম বিশ্বেও জ্ঞানী মানুষের আবির্ভাব হয়েছে, কিন্তু ১৫০০ থেকে ১৯৫০ এর মধ্যে এসব এলাকা থেকে এমন কিছু আবিষ্কার হয়নি যা পদার্থবিজ্ঞানে নিউটনের কিংবা জীববিজ্ঞানে ডারউইনের অবদানের ধারে কাছে যেতে পারে।

এখান থেকে কেউ যেন না ভাবে যে ইউরোপীয়রা জন্মগতভাবেই বিজ্ঞানমনস্ক বা তাদের জিনের ভিতরেই এটা আছে। আবার এমনও নয় যে তারাই চিরকাল বিজ্ঞানের হাল ধরে থাকবে। ইসলাম ধর্ম যেমন শুরু হয়েছিল আরবদের মধ্যে কিন্তু পরে তুর্কি আর পারসিকদের হাতে চলে গেছে, ঠিক তেমনি বিজ্ঞানের শুরুটা ইউরোপে জোরেশোরে হলেও আজ সেটা সব জাতির মধ্যেই ছড়িয়ে গেছে।

আধুনিক বিজ্ঞান আর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বন্ধনটা তৈরি হল কীভাবে? ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে প্রযুক্তি যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আধুনিক যুগের শুরুতে ততটা ছিল না। কিন্তু নতুন নতুন গাছপালা খুঁজে বেড়ানো একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী আর নতুন নতুন দেশ খুঁজে বেড়ানো একজন নাবিকের চিন্তাধারা ছিল একই রকম। “ওখানে কী আছে আমি এখনও জানি না”- এই কথাটায় তারা দুজনেই যার যার জায়গা থেকে একমত। তাই নতুন একটা জায়গায় যাওয়ার তাড়নাটা কারও মধ্যে কম ছিল না। নতুন কিছু জানার এই আগ্রহই আস্তে আস্তে পুরো পৃথিবীটাকে তাদের অধীনে এনে দিল।

ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদ ইতিহাসের অন্য সব সাম্রাজ্যবাদ থেকে আলাদা। এর আগে যারা সাম্রাজ্যবিস্তার করেছে তারা ধরেই নিত তারা পৃথিবীটাকে পুরো জেনে ফেলেছে। তারা কেবল নিজেদের মতাদর্শ অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে। আরবরা কিন্তু অজানাকে জানার আশায় মিশর, স্পেন বা ভারত জয় করেনি। রোমান, মোঙ্গল আর অ্যাজটেকরা নতুন জায়গা জয় করেছে শুধু ক্ষমতা আর সম্পদের জন্য। কিন্তু ইউরোপের মানুষ দূর দূরান্তে যাত্রা করেছে শুধু নতুন জায়গা খুঁজতে নয়, অজানাকে জানার জন্যও।

এমন চিন্তাধারা শুধু জেমস কুকের একারই নয়, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর স্পেনীয় আর পর্তুগিজ নাবিকদের মধ্যেও ছিল। পর্তুগিজ রাজপুত্র হেনরি (Prince Henry the Navigator) আর নাবিক ভাস্কো দা গামা আফ্রিকার তীর ধরে যাত্রায় অনেক দ্বীপ আর উপকূল জয় করেছেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা ‘আবিষ্কার’ করার পরপরই সেখানে স্পেনের রাজার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান নতুন একটা পথ আবিষ্কার করে ফিলিপিন্সে পৌঁছে সেখানে স্পেনীয় উপনিবেশ তৈরি করেন।

এরপর যত দিন গেল, ততই জ্ঞানার্জনের অভিযান আর জয়ের অভিযান আরও বেশি পরস্পরের সাথে জড়িয়ে গেল। অষ্টাদশ আর ঊনবিংশ শতকে ইউরোপ থেকে যতগুলো সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে তার প্রায় প্রতিটাতেই বিজ্ঞানীদের সাথে নেওয়া হতো। যুদ্ধ করার জন্য নয়, নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য। ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন যখন মিশর আক্রমণ করেন, তখন তাঁর সাথে ১৬৫ জন পণ্ডিতও ছিলেন। সেই পণ্ডিতদের হাত ধরেই শুরু হল ‘মিশরবিদ্যা’ (Egyptology) নামক জ্ঞানের এক নতুন ধারা। ধর্ম, ভাষাবিজ্ঞান আর উদ্ভিদবিদ্যায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন তাঁরা।

১৮৩১ সালে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল, ফকল্যান্ড ও গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের মানচিত্র তৈরি করতে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজ এইচএমএস বিগল রওনা হয়। যুদ্ধের আগাম প্রস্তুতির জন্য ওখানে কোথায় কী আছে জানা দরকার ছিল। সে জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন শৌখিন বিজ্ঞানী। তিনি সাথে করে একজন ভূগোলবিদকে নিয়ে যেতে চাইলেন, নতুন যেসব ভূখণ্ড সামনে আসতে পারে সেগুলো খুঁটিয়ে দেখার জন্য। কয়েকজন ভূগোলবিদ তাঁর আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার পর তিনি গিয়ে ধরলেন কেমব্রিজ থেকে পাস করা এক বাইশ বছরের যুবককে। যুবকের নাম চার্লস ডারউইন। ডারউইন গির্জার পাদ্রি হওয়ার জন্য পড়াশোনা করলেও বাইবেলের চেয়ে ভূতত্ত্বেই তাঁর আগ্রহ বেশি ছিল। ক্যাপ্টেনের আমন্ত্রণে রাজি হলেন ডারউইন, এর পরেরটুকু তো ইতিহাস। জাহাজের ক্যাপ্টেন যখন সমুদ্রের মানচিত্র তৈরি করছিলেন, তখন ডারউইন তাঁর নিজের জোগাড় করা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে নতুন তত্ত্ব দাঁড় করাচ্ছিলেন, পরবর্তীতে যা বিবর্তনতত্ত্ব নামে পরিচিত হয়।

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই নিল আর্মস্ট্রং আর বাজ অলড্রিন চাঁদের মাটিতে পা রাখেন। এই চন্দ্রাভিযানের কয়েক মাস আগে থেকেই অ্যাপোলো ১১ এর যাত্রীরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমের এক মরুভূমিতে। সেখানে তখন কিছু আদিবাসীর বসবাস ছিল। ওখানকার এক বাসিন্দার সাথে নভোচারীদের কিছু কথাবার্তা হয়েছিল বলে শোনা যায়।

একদিন প্রশিক্ষণের সময় নভোচারীদের সাথে এক আদিবাসী বৃদ্ধের দেখা হয়। বৃদ্ধ নভোচারীদের কাছে জানতে চাইলেন তাঁরা ওখানে কী করছেন। উত্তরে তাঁরা বললেন কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা চাঁদে যাবেন। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তাঁদেরকে একটা কাজ করে দিতে অনুরোধ করলেন।

“কী কাজ?”, জানতে চাইলেন নভোচারীরা।

“আমাদের গোত্রের লোকেরা বিশ্বাস করে দেবতারা চাঁদে থাকেন। তাই ভাবছি আপনাদের দিয়ে তাঁদের কাছে একটা বার্তা পাঠানো যায় কি না।”

“বলুন, কী আপনার বার্তা?”

বৃদ্ধ তাঁর নিজের ভাষায় কিছু একটা বলে সেটা নভোচারীদের দিয়ে কয়েকবার বলিয়ে নিশ্চিত করলেন যে তাঁদের সেটা মুখস্থ হয়েছে।

“এর অর্থ কী?”, জানতে চাইলেন একজন।

“সেটা তো বলা যাবে না। এটা আমাদের গোপন ভাষা, শুধু আমরা জানি আর দেবতারা জানেন।”

নভোচারীরা ক্যাম্পে ফিরে ওই অনেক খুঁজে ওই ভাষা বুঝতে পারে এমন একজনকে খুঁজে বের করলেন। তাকে বৃদ্ধের শিখিয়ে দেওয়া কথাটা অনুবাদ করে দিতে বললে লোকটা হাসতে শুরু করে। হাসি থামলে লোকটা তাঁদের কথাটা বুঝিয়ে দেয়। এত কষ্ট করে তাঁরা যে কথাটা মুখস্থ করে এসেছেন, তার অর্থ হল, “এরা যা বলছে তার একটা কথাও বিশ্বাস কোরো না, এরা আসলে তোমাদের দেশ দখল করতে এসেছে।”

ফাঁকা মানচিত্র

পৃথিবীর বিভিন্ন সময়ে আঁকা মানচিত্র দেখলে এই ‘আবিষ্কার এবং জয়’ করার ব্যাপারটা ভালোভাবে বোঝা যায়। এই আধুনিক যুগ আসার অনেক আগে থেকেই পৃথিবীর নানা জায়গার মানুষ মানচিত্র এঁকেছে। তবে তাদের কেউই পুরো পৃথিবীর কোথায় কী আছে জানত না। আফ্রো-এশিয়া এলাকার মানুষ আমেরিকার কথা জানত না, আমেরিকার মানুষ আফ্রো-এশিয়া অঞ্চলের কথা জানত না। তাই তাদের মানচিত্রের অজানা অংশটুকু হয় থাকতই না, নয়তো সেখানে কাল্পনিক কোনো কিছুর ছবি আঁকা থাকত। মানচিত্রে কোনো জায়গা ফাঁকা থাকত না। তাই সেটা দেখে মনে হতো পৃথিবীর কোথায় কী আছে সবটাই তাদের জানা।

পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় মানুষেরা যেসব মানচিত্র এঁকেছিল সেগুলোতে অনেক ফাঁকা জায়গা দেখা যেত। এর মধ্যে একদিকে যেমন তাদের বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি তাদের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারাও ফুটে ওঠে। এসব মানচিত্রের ফাঁকা জায়গাগুলো প্রমাণ করে, ইউরোপীয়রা পৃথিবীর সবটুকু তখনও দেখেনি।

১৮৯২ সালে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ক্রিস্টোফার কলম্বাস তখন স্পেন থেকে পূর্ব এশিয়ায় যাওয়ার জন্য পশ্চিম দিকে যাত্রা করলেন। তিনি তখনও পুরনো অসম্পূর্ণ মানচিত্রকেই ঠিক জানতেন। সেই মানচিত্র অনুযায়ী তিনি হিসাব করে বের করলেন, জাপান স্পেন থেকে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার পশ্চিমে। কিন্তু আসলে দূরত্বটা ২০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি, আর মাঝখানে রয়েছে একটা বিরাট ভূখণ্ড যেটার কথা তখনও কেউ জানত না। ১৪৯২ এর ১২ অক্টোবর দুপুর দুটোর দিকে কলম্বাসের নৌবহর সেই ভূখণ্ডে পৌঁছায়। বহরের ‘পিন্টা’ নামের জাহাজের মাস্তুল থেকে নাবিক হুয়ান রদ্রিগেজ বার্মেজো একটা দ্বীপ দেখে “ডাঙা! ডাঙা!” বলে চেঁচিয়ে ওঠে। সেই দ্বীপটাকে আজ আমরা বাহামা নামে জানি।

কলম্বাসের ধারণা ছিল ওটা পূর্ব এশিয়ার কোনো দ্বীপ। তিনি ঐ দ্বীপের মানুষদের বললেন ‘ইন্ডিয়ান’, কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল জায়গাটা হচ্ছে ‘ইন্ডিজ’- যাকে আমরা এখন ইস্ট ইন্ডিজ বা ইন্দোনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জ বলি। কলম্বাস তাঁর বাকি জীবন এই ভুলের মধ্যেই কাটিয়েছেন। তিনি যে একেবারে নতুন একটা মহাদেশ খুঁজে পেয়েছেন সেটা তাঁর বা তাঁর সময়ের লোকেদের মাথাতেই আসেনি। হাজার হাজার বছর ধরে চিন্তাবিদ, পণ্ডিত, এমনকি ধর্মগ্রন্থগুলোও শুধু ইউরোপ, এশিয়া আর আফ্রিকার কথাই বলে এসেছে। বাইবেল কি আর অর্ধেকটা পৃথিবীর কথা বেমালুম বাদ দিয়ে দিতে পারে? ধরুন ১৯৬৯ সালে চাঁদের দিকে পাঠানো অ্যাপোলো ১১ গিয়ে নামল পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরে চলা অন্য একটা উপগ্রহে যেটা কেউ এতদিন দেখেইনি। তারা কি বুঝতে পারত যে ওটা চাঁদ নয়? মধ্যযুগের মানুষ কলম্বাসের ধারণা ছিল পৃথিবীর সবটাই তাঁর চেনা, যদিও তিনি নিজেই একটা আস্ত অজানা মহাদেশ আবিষ্কার করে বসে আছেন!

CH4sjxTWcAAhUTm.jpg

৩৬। ১৪৫৯ সালে ইউরোপীয়দের আঁকা পৃথিবীর মানচিত্র (উপরে বামদিকে ইউরোপ)। মানচিত্রে কোথাও ফাঁকা জায়গা নেই, এমনকি যেসব জায়গার কথা তারা জানতই না, সেসবও (যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা)।

ইতালির নাবিক আমেরিগো ভেসপুচি (Amerigo Vespucci) ১৪৯৯ থেকে ১৫০৪ সালের মধ্যে বেশ কয়েকবার আমেরিকা অভিযানে যান। ১৫০২ আর ১৫০৪ সালে এসব অভিযান নিয়ে ইউরোপে প্রকাশিত দুটি লেখায় ভেসপুচির কথা বলা হয়। সেখানে বলা হয়, কলম্বাস যে নতুন দেশটা আবিষ্কার করেছেন সেটা পূর্ব এশিয়া তো নয়ই, বরং সেটা নতুন একটা মহাদেশ যার কথা তখনকার কোনো ভূগোলবিদ জানতেন না, কোনো ধর্মগ্রন্থেও নেই। এই লেখায় প্রভাবিত হয়ে ১৫০৭ সালে প্রসিদ্ধ মানচিত্র-আঁকিয়ে মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলার (Martin Waldseemüller) পৃথিবীর একটা নতুন মানচিত্র আঁকেন। ইউরোপ থেকে পশ্চিমে গেলে মানুষ যেখানে পৌঁছায়, ওয়াল্ডসিমুলারের মানচিত্রে প্রথমবারের মতো সেটাকে একটা আলাদা মহাদেশ হিসেবে দেখানো হয়। এখন মানচিত্রে যেহেতু জায়গাটা দেখানো হয়েছে, তখন তার একটা নাম তো দেওয়া লাগে। ওয়াল্ডসিমুলার জানতেন যে জায়গাটা আমেরিগো ভেসপুচির আবিষ্কার, তাই তিনি জায়গাটার নাম দিয়ে দিলেন ‘আমেরিকা’। তাঁর সেই মানচিত্র সারা পৃথিবীতে অনেক জনপ্রিয়তা পায়, অন্যান্য মানচিত্র-আঁকিয়েরা সেটা থেকেই আরও মানচিত্র আঁকে। তাই নতুন মহাদেশের আমেরিকা নামটাই টিকে গেল। পৃথিবীর ভূখণ্ডের প্রায় চারভাগের একভাগ, সাত মহাদেশের মধ্যে দুটোর নামকরণ হল এমন একজন স্বল্প-পরিচিত ইতালীয় নাবিকের নামে, যার মধ্যে ‘জানি না’ বলার মতো সাহসটুকু ছিল।

আমেরিকা আবিষ্কার বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এর মাধ্যমে একদিকে ইউরোপীয়রা বুঝতে পারল পুরনো জ্ঞানের চেয়ে নতুন পর্যবেক্ষণ বেশি জরুরি, অন্যদিকে এই নতুন দেশটাকে ভালো করে জানার প্রবল ইচ্ছা জাগল তাদের মধ্যে। নতুন পাওয়া এই জায়গাটাকে যদি দখলে রাখতে হয়, তাহলে সেই জায়গাটার সম্পর্কে যত বেশি সম্ভব তথ্য জোগাড় করা দরকার। সেখানকার ভূতত্ত্ব, জলবায়ু, গাছপালা, জীবজন্তু, সেখানকার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস- সব। খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থ, ভূগোলের পুরনো বই আর মানুষের মুখে মুখে শোনা গল্প- সব সেখানে অচল।

এরপর থেকে ইউরোপে শুধু ভূগোলবিদ নয়, বিজ্ঞানের সকল শাখার মানুষই তাদের আঁকা মানচিত্রের অজানা অংশটা ফাঁকা রাখতে শুরু করে। তাদের জ্ঞান যে সম্পূর্ণ নয়, তাদের জানার বাইরেও যে আরও কিছু থাকতে পারে- সেটা তারা স্বীকার করে নিতে শুরু করল।

সেই সময় থেকেই মানচিত্রের ফাঁকা জায়গাগুলো ইউরোপের মানুষকে চুম্বকের মতো টানতে থাকে। এই ফাঁকা মানচিত্র পূরণ করার জন্য ইউরোপ থেকে নৌবহর গেল আফ্রিকায়, প্রশান্ত মহাসাগর পার হয়ে ভারত মহাসাগরে, আর সারা পৃথিবীতে নিজেদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করল। তারাই প্রথম সারা বিশ্ব জুড়ে সাম্রাজ্য তৈরি করে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে শুরু করে। ইউরোপীয় মানুষের এইসব সাম্রাজ্যবাদী অভিযানের ফলেই সারা পৃথিবীর নানা জায়গার বিচ্ছিন্ন মানবগোষ্ঠীগুলো মিলে একটা মানবজাতিতে পরিণত হলো, আর সেখান থেকেই বদলে গেল পৃথিবীর ইতিহাস।

image054.jpg

৩৭। ১৫২৫ সালের সালভিয়াতির বিশ্ব মানচিত্র। ১৮৫৯ সালের মানচিত্রেও অনেক দেশ আর দ্বীপের তথ্য ছিল, কিন্তু এখানে বেশিরভাগ জায়গাই ফাঁকা। আমেরিকার উপকূল ধরে দক্ষিণে একটু এগোলেই আর কিছু নেই। এই মানচিত্র দেখে সামান্যতম কৌতূহলী মানুষটাও জানতে চাইবে, “ওখানে কী আছে?”, কিন্তু তার কোনো উত্তর নেই। জানার একটাই উপায়- নিজে গিয়ে দেখে আসা।

ইউরোপীয়দের এই নতুন জায়গা আবিষ্কার করতে গিয়ে সেটা দখল করে আসার পদ্ধতিটা আমাদের এত পরিচিত যে সেটাকে আমাদের অস্বাভাবিক বলে মনেই হয় না। কিন্তু এরকম ঘটনা এর আগে কখনোই ঘটেনি। এত দূরে দূরে গিয়ে দেশ দখল করাটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। আসলে ইতিহাসের শুরু থেকেই মানুষ নিজের এলাকার যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে দূরের দেশ জয় করার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি। বেশিরভাগ বড় সাম্রাজ্যই কেবল তাদের আশপাশের এলাকাগুলো দখল করে করে বড় হয়েছে। এইজন্য রোমানরা রোমকে রক্ষা করার জন্য ইত্রুরিয়া (Etruria) দখল করে (খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০-৩০০), তারপর ইত্রুরিয়াকে বাঁচাতে দখল করে পো উপত্যকা (খ্রিস্টপূর্ব ২০০), তারপর সেটাকে বাঁচানোর জন্য প্রোভেন্স (খ্রিস্টপূর্ব ১২০), প্রোভেন্সকে বাঁচাতে গল (খ্রিস্টপূর্ব ৫০) আর গলকে রক্ষা করতে তারা ব্রিটেন দখল করে (৫০ খ্রিস্টাব্দ)। এভাবে রোম থেকে লন্ডন পর্যন্ত সাম্রাজ্যবিস্তার করতে তাদের সময় লাগে চারশ বছর। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ সালে কোনো রোমান ভাবেনি যে জাহাজে করে সোজা ব্রিটেন গিয়ে জায়গাটা দখল করে ফেলা যায়।

অনেক সময় অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী সম্রাট দূরের দেশ জয় করতে যেতেন, কিন্তু তার উদ্দেশ্য হতো পুরোপুরি বাণিজ্যিক কিংবা শুধুই জায়গা দখল করা। সম্রাট মহান আলেকজান্ডার কিন্তু নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেননি, জোরপূর্বক পারস্যের শাসনক্ষমতা দখল করেছেন কেবল। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের পূর্বসূরী প্রাচীন অ্যাথেন্স ও কার্থেজ (Athens and Carthage), কিংবা মধ্যযুগের ইন্দোনেশিয়া এলাকার মাজাপাহিতের (Majapahit) ইতিহাসে দেখা যায়, এই তিনটা সমুদ্রভিত্তিক সাম্রাজ্যের মানুষেরা কখনও অচেনা সমুদ্রের দিকে যেত না। তারা আশেপাশের এলাকায় যেটুকু অভিযান চালিয়েছে সেটা পরবর্তী সময়ে ইউরোপ যা করেছে তার তুলনায় কিছুই না।

অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, চীনের মিং সাম্রাজ্য থেকে অ্যাডমিরাল ঝেং হে (Zheng He) যেসব অভিযান চালিয়েছিলেন সেগুলো ইউরোপীয়দের অভিযানগুলোকেও ম্লান করে দিতে পারে। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ সালের মধ্যে ঝেং সাতটা বিশাল নৌবহর নিয়ে ভারত মহাসাগরের অনেক দূর পর্যন্ত যান। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বহরে প্রায় তিনশ জাহাজ ছিল, আর তাতে মানুষ ছিল ৩০ হাজারের মতো।৭ অনেক জায়গা ঘুরেছিল সেসব জাহাজ- ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত, পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর আর পূর্ব আফ্রিকা। সেসব জাহাজ নোঙর ফেলেছিল হেজাজ (Hejaz) বন্দরের প্রধান প্রবেশপথ জেদ্দায় (Jedda) আর কেনিয়ার উপকূলের মালিন্দিতে (Malindi)। এদিকে কলম্বাসের ১৪৯২ সালের অভিযানে ছিল তিনটা ছোট জাহাজ আর তাতে ১২০ জন মানুষ। ঝেং এর বহরের তুলনায় সেটা অনেকটা একদল ড্রাগনের সামনে তিনটা মশার মতো।৮

কিন্তু এর চেয়েও বড় একটা পার্থক্য ছিল। ঝেং কেবল সমুদ্রে সমুদ্রে ঘুরেছেন, দেশ দখল করার কোনও চেষ্টাই করেননি। তাছাড়া তাঁর অভিযানের পিছনে কোনও রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কারণও ছিল না। অভিযান চলাকালে ১৪৩০ এ যখন চীনের শাসক বদলায়, তখন নতুন রাজা এসেই ঝেং এর অভিযান বাতিল করে দেন। অভিযান ভেস্তে গেলে মানুষেরা নানা দিকে চলে যায়, আর তাদের জোগাড় করা বিপুল পরিমাণ তথ্যও হারিয়ে যায়। অত বড় নৌবহর চীনের কোনো বন্দর থেকে আর কখনও বের হয়নি। এর পরে যত রাজা বসেছেন চীনের সিংহাসনে, তাঁদের কেউই আর এসব নিয়ে মাথা ঘামাননি।

ঝেং হের অভিযান দেখে বোঝা যায়, তাক লাগানোর মতো প্রযুক্তি কেবল ইউরোপীয়দের একারই ছিল না। কিন্তু তাদের নতুন জায়গা আবিষ্কার আর জয় করার যে অদম্য স্পৃহা ছিল সেটাই তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। রোমানদের ক্ষমতা ছিল, কিন্তু তারা কখনও ভারত কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়া দখল করতে যায়নি। পারস্যের মানুষও যায়নি স্পেন বা মাদাগাস্কার দখল করতে। চীনের শাসকেরা সবচেয়ে কাছের দেশ জাপানের দিকেও হাত বাড়ায়নি। কিন্তু সেটা তো অস্বাভাবিক কিছু না। অস্বাভাবিক এটাই যে ইউরোপের মানুষকে দূরের অজানা সব দেশে যাওয়ার নেশায় পেয়ে বসেছিল। তাই তারা সম্পূর্ণ অজানা কোনো দেশে, অচেনা মানুষ আর রীতিনীতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় বলত, “আজ থেকে এটা আমার রাজার দেশ!”

image055.jpg

৩৮। ঝেং হে আর কলম্বাসের জাহাজ।

বাইরের আক্রমণ

১৫১৭ সালের দিকে ক্যারিবিয়ান সাগরে একটা কানাঘুষা শুরু হল- মেক্সিকোর মাঝামাঝি জায়গায় নাকি একটা শক্তিশালী রাজ্য আছে। ক্যারিবিয়ান সাগরে বিচরণরত স্প্যানিশ দখলদারদের কানেও গেল কথাটা। এর বছর চারেকের মধ্যেই দেখা গেল, অ্যাজটেকদের (Aztec) রাজধানীটা একটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। অ্যাজটেক সাম্রাজ্য হয়ে গেল অতীতের কথা, সেই জায়গায় হার্নান কর্টেজের (Hernán Cortés) প্রতিষ্ঠিত স্প্যানিশ রাজ্যটাই হয়ে গেল বর্তমান।

রাজ্যটা জয় করে স্প্যানিশরা নিজেরদের পিঠটা একটু চাপড়ে দিতেও সময় নষ্ট করেনি। এখান থেকেই তারা সব দিকে ‘আবিষ্কার ও জয়ের’ অভিযান শুরু করে। মধ্য আমেরিকায় এতদিন যারা ছিল, অর্থাৎ অ্যাজটেক, টোলটেক (Toltecs) বা মায়ারা (Maya) – তারা কেউ জানতোই না যে তাদের দক্ষিণ দিকে দক্ষিণ আমেরিকা বলে কিছু একটা আছে, সেদিকে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। দুই হাজার বছর ধরে ওই জায়গাতে তাদের বাস, অথচ তাদের কেউ দক্ষিণ দিকে পা বাড়ায়নি। এদিকে স্প্যানিশদের মেক্সিকো জয়ের মাত্র দশ বছরের মধ্যেই ফ্রান্সিসকো পিজারো (Francisco Pizarro) ইনকা সভ্যতা (Inca Empire) আবিষ্কার করে ফেলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ইনকা সভ্যতা ১৫৩২ সালের মধ্যে বিলুপ্ত হয়।

এই অ্যাজটেক আর ইনকারা যদি নিজেদের দেশ ছেড়ে একটু বাইরে বের হতো, যদি জানতে পারত স্প্যানিশরা তাদের উত্তরের এলাকাটা কীভাবে গ্রাস করে নিচ্ছে, তাহলে হয়ত আজ ইতিহাস অন্যরকম হতো। হয়ত তারা স্প্যানিশদের আক্রমণটা ঠেকিয়েও দিতে পারত। কলম্বাস প্রথম আমেরিকা যান ১৪৯২ সালে। আর হার্নান কর্টেজ মেক্সিকো যান ১৫১৯ এ। এই সময়ের মধ্যে স্প্যানিশরা ক্যারিবীয় সাগরের অধিকাংশ দ্বীপ দখল করে নেয়। ওইসব দ্বীপে থাকা আদিবাসীদের জন্য জীবনটা নরক হয়ে উঠেছিল। দখলদার লোভী মানুষেরা তাদের জোর করে খনি আর ক্ষেতখামারে কাজ করতে বাধ্য করে। কেউ সামান্যতম প্রতিবাদ করলেই তাকে খুন করে ফেলা হতো। এই প্রচণ্ড পরিশ্রম, অত্যাচার আর বাইরের নাবিকদের সাথে আসা নানা রকম রোগের কারণে সেসব জায়গার অধিকাংশ আদিবাসী মানুষই মারা যায়। বিশ বছরের মধ্যে ওখানকার আদিবাসী মানুষেরা একেবারে শেষ হয়ে যায়। তাদের শুন্যস্থান পূরণ করতে স্প্যানিশরা আফ্রিকা থেকে দাস আনতে শুরু করে।

এই গণহত্যা কিন্তু চলছিল অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের একেবারে দোরগোড়ায়। অথচ কর্টেজ অ্যাজটেক রাজ্যের পূর্ব উপকূলে হাজির হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা সেটা টেরই পায়নি। আজকাল মাঝেমধ্যে যেসব ভিনগ্রহের প্রাণীর আগমনের গল্প শোনা যায়, অ্যাজটেকদের কাছে স্প্যানিশদের আগমনটা ছিল অনেকটা সেরকম। অ্যাজটেকরা বিশ্বাস করত তারা পুরো পৃথিবীটা দেখে ফেলেছে, আর তাদের রাজ্যটাই হল সম্পূর্ণ পৃথিবী, এর বাইরে আর কিছু নেই। আজ আমরা যে জায়গাটাকে ভেরা ক্রুজ (Vera Cruz) বলি, কর্টেজ সেইখানে এসে হাজির হলে অ্যাজটেকরা প্রথম বাইরের মানুষ দেখে।

কী করতে হবে এটাই অ্যাজটেকরা প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি। এই নতুন আসা মানুষগুলো তাদের ভীষণ বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। এরা সবাই মানুষের মতোই দেখতে, অথচ এদের গায়ের রঙ সাদা। সবার মুখে প্রচুর গোঁফদাড়ি। কারো কারো চুলের রঙ আবার সোনালি। আর প্রত্যেকের গায়ে ভয়াবহ দুর্গন্ধ। তখন স্প্যানিশদের চেয়ে অ্যাজটেকদের অবস্থা অনেক স্বাস্থ্যকর ছিল। প্রথম প্রথম স্প্যানিশরা যেখানেই যেত, আদিবাসীরা তাদের সাথে ধূপ জ্বালিয়ে নিয়ে যেত। সেটা দেখে স্প্যানিশরা ভাবত তাদের দেবতা ভেবে সম্মান দেখানো হচ্ছে। কিন্তু পরে অ্যাজটেকদের কিছু লেখা থেকে জানা যায়, তারা আসলে এটা করত দুর্গন্ধের হাত থেকে বাঁচার জন্য।

main-qimg-3e7b809a16440d2428fae95613faa312-c

ম্যাপ ৭। স্প্যানিশ জয়যত্রার সময়ে অ্যাজটেক আর ইনকা সাম্রাজ্য

এই বহিরাগতদের ব্যবহার্য সামগ্রী ছিল আরও বিচিত্র। তারা যেসব জাহাজে চড়ে এসেছিল, অ্যাজটেকরা অত বড় জাহাজ দেখেইনি কোনোদিন। তারা বড় বড় দ্রুতগামী জন্তুর পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়াত। তাদের হাতের ধাতব লাঠিগুলো থেকে বজ্র বের হত। তাদের হাতে ছিল লম্বা লম্বা তরবারি আর গায়ে ছিল কঠিন সব বর্ম। আজটেকদের কাঠের তলোয়ার আর পাথরের বর্শা তাতে আঁচড়ও কাটতে পারত না।

অ্যাজটেকদের কেউ কেউ ভাবত এরা বোধহয় দেবতা। আবার কেউ বলত দেবতা নয়, এরা শয়তান, ভূত কিংবা জাদুকর। স্প্যানিশদের নির্মূল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ না করে তারা বরং আপোষে যাওয়ার চেষ্টা করল। তারা ভেবেছিল, কর্টেজের দলে আছে বড়জোর সাড়ে পাঁচশ লোক। এই লাখ লাখ মানুষের দেশে এরা আর কীই বা এমন করবে?

কর্টেজও অ্যাজটেকদের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না, কিন্তু তাঁর দল অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। অ্যাজটেকরা এইসব বাইরে থেকে আসা অদ্ভুতদর্শন দুর্গন্ধময় মানুষদের দেখে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। কিন্তু স্প্যানিশরা ঠিকই জানত যে সারা পৃথিবীতে আরও নানা জাতের মানুষ আছে। আর নতুন জায়গায় গিয়ে সেখানকার মানুষকে মেরেকেটে জায়গাটা দখল করে নেওয়ার অভিজ্ঞতায় তো তাদের ধারেকাছেও কেউ ছিল না। বিজ্ঞানীদের মতো এইসব হানাদার বাহিনীও নতুন কোনো জায়গায় যেতে একটুও ভয় পেত না।

কর্টেজ যখন ১৫১৯ সালের জুলাইয়ে মেক্সিকো যান, কর্তব্যস্থির করতে তাঁর সময় লাগেনি একটুও। আজকালকার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে যেমন দেখা যায়, বিচিত্র কোনো নভোযান থেকে ভিনগ্রহবাসীরা নেমে এসে বলে, “আমরা কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। আমাদেরকে তোমাদের নেতার কাছে নিয়ে চল।”, কর্টেজের আগমনও ছিল ঠিক তেমন। তিনি ওখানকার লোকদের বললেন, তিনি স্পেনের রাজার দূত, সম্রাট দ্বিতীয় মন্টেজুমার (Montezuma II) সাথে দেখা করতে চান। (একেবারে নির্লজ্জ মিথ্যে কথা। কর্টেজের অভিযান কোনো রাজার নির্দেশে ছিল না। স্পেনের তখনকার রাজা অ্যাজটেকদের তো দূরের কথা, কর্টেজকেও চিনতেন না।) এরপর কর্টেজকে পথপ্রদর্শক, খাবার আর সৈন্যপ্রহরা- সবই দেওয়া হল। তিনি নিশ্চিন্তে চলে গেলেন অ্যাজটেকদের রাজধানী টেনোকটিটলানে (Tenochtitlan)।

অ্যাজটেকরা এই নবাগতদের যথাযোগ্য মর্যাদাসহকারে রাজধানী পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে সম্রাট মন্টেজুমার সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিল। সেই সাক্ষাতের এক পর্যায়ে কর্টেজের ইশারায় তার সহযোগীরা সম্রাটের দেহরক্ষীদের হত্যা করে। তাদের ইস্পাতের অস্ত্রের সামনে কাঠ আর পাথরের অস্ত্রধারী সৈনিকেরা কিছুই করতে পারেনি। ফলে খুব সহজেই অতিথি জিম্মি করে ফেলল গৃহকর্তাকে।

অবশ্য কর্টেজের অবস্থাও তখন বেশ নাজুক। সম্রাটকে তিনি জিম্মি করেছেন বটে, কিন্তু চারদিক থেকে তাঁকে ঘিরে আছে হাজার হাজার শত্রুসৈন্য আর লাখ লাখ বিক্ষুব্ধ জনতা। আর এই অজানা অচেনা দেশে তাঁর সম্বল মাত্র কয়েকশ মানুষ। সবচেয়ে কাছের স্প্যানিশ উপনিবেশও কিউবাতে, দেড় হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে।

কর্টেজ মন্টেজুমাকে তাঁর প্রাসাদেই বন্দী করে রাখেন, দেখে মনে হয় সম্রাট সম্রাটের মতোই আছেন, আর এই ‘স্প্যানিশ দূত’ আছেন তাঁর অতিথি হয়ে। অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের সব ক্ষমতার মূলে ছিলেন সম্রাট, এই পরিস্থিতিতে সেটা বেশ নড়বড়ে হয়ে গেল। মন্টেজুমা সম্রাটের মতোই কাজ করতে লাগলেন, আর সমাজের অভিজাত লোকেরাও তাঁর অনুগত হয়েই রইল। এর অর্থ হল, তাদের আনুগত্যটা আসলে কর্টেজের প্রতিও ছিল। এই অবস্থা চলল কয়েক মাস। এই সময়ে কর্টেজ মন্টেজুমা আর তাঁর কর্মচারীদের জেরা করে অনেক কিছু জানলেন, কয়েকজনকে অ্যাজটেকদের ভাষা শিখিয়ে দোভাষী বানিয়ে ফেললেন আর অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের কোথায় কী আছে সেটা আরও ভালো করে জানতে চারদিকে লোক পাঠালেন।

একসময় অ্যাজটেকদের অভিজাত সমাজ বিদ্রোহ করে, মন্টেজুমা আর কর্টেজ দুজনের বিরুদ্ধেই। তারা একজন নতুন সম্রাট নির্বাচন করে, আর স্প্যানিশদের টেনোকটিটলান থেকে হটিয়ে দেয়। কিন্তু ততদিনে শাসনব্যবস্থায় ফাটল ধরে গেছে। কর্টেজ সেটারই সুযোগ নিলেন। তিনি অ্যাজটেকদের ভিতরে বিভেদ তৈরি করতে থাকেন। তিনি রাজ্যের অনেক প্রজাকেই দলে ভিড়িয়ে ফেলেন। এখানেই তারা একটা বড় ভুল করে বসে। প্রজাদের অনেকেই শাসকদের অপছন্দ করত, কিন্তু ক্যারিবীয় দ্বীপগুলোতে স্প্যানিশরা এর আগে কী করে এসেছে সেই খবর তো তারা রাখত না। তাই তাদের অনেকেই ভাবল, স্প্যানিশদের সাহায্য নিয়ে এবার তারা অ্যাজটেক শাসন থেকে মুক্তি পাবে। ফাঁকতালে স্প্যানিশরাও যে দেশটা দখল করে ফেলতে পারে- এটা তাদের মাথায়ই আসেনি। তারা ভেবেছিল কর্টেজের তো লোকজন বেশি নেই, তারা যদি পরে উল্টোপাল্টা কিছু করেও বসে, তাহলেও তাদের সহজেই শায়েস্তা করে ফেলা যাবে। এই বিদ্রোহী জনতাকে সাথে নিয়ে কর্টেজ পেয়ে গেলেন একটা বিরাট সেনাবাহিনী। সেই বাহিনীকে সাথে নিয়ে কর্টেজ টেনোকটিটলান শহরটা দখল করে নিলেন।

এর মধ্যে প্রচুর স্প্যানিশ সৈন্য আর দখলদার মানুষ মেক্সিকোতে এসে পড়ে- কেউ কিউবা থেকে, আবার কেউ সেই স্পেন থেকেই। লোকজন যখন ব্যাপারটা ধরতে পারল, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেই কর্টেজের ভেরা ক্রুজে আগমনের দিন থেকে একশ বছরের মধ্যেই সেখানকার আদি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশই শেষ হয়ে গেল। এর প্রধান কারণ ছিল স্প্যানিশদের সাথে আসা নতুন কিছু রোগব্যাধি। আর যারা টিকে ছিল, তাদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। এর চেয়ে অ্যাজটেক শাসনের সময়েই তারা আরও ভালোভাবে বেঁচে ছিল।

কর্টেজের মেক্সিকো যাওয়ার দশ বছর পর পিজারো ইনকা সাম্রাজ্যে পৌঁছান। তাঁর সৈন্যসংখ্যা ছিল কর্টেজের চেয়েও কম- মাত্র ১৬৮ জন। কিন্তু তাতে কী, পিজারোর সাথে ছিল আগের সব অভিযানের অর্জিত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা। ওদিকে ইনকারা অ্যাজটেকদের পরিণতির কথা কিছুই জানত না। পিজারো পুরোপুরি কর্টেজের দেখানো পথেই চললেন। প্রথমে নিজের পরিচয় দিলেন স্পেনের দূত হিসেবে, সম্রাট আটাহুয়ালপাকে (Atahualpa) আমন্ত্রণ জানালেন, তারপর তাঁকে আটকে রাখলেন। তারপর পিজারো সেই ভঙ্গুর সাম্রাজ্যের কিছু মানুষকে দলে ভেড়ালেন, তারপর পুরো দেশটাই দখল করে নিলেন। অথচ ইনকারা যদি একটুও অ্যাজটেকদের খবর রাখত, তাহলে কিছুতেই তারা নিজেদের ভাগ্য পিজারোর হাতে সঁপে দিত না।

শুধু নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকার মনোভাবের জন্যই আমেরিকার আদি বাসিন্দাদের এই চড়া মূল্য দিতে হল। এশিয়ার যত বড় বড় সাম্রাজ্য ছিল- অটোমান, সাফাভিদ, মুঘল আর চীন- সবাই দ্রুতই জানতে পারে যে ইউরোপের মানুষ অনেক বড় বড় আবিষ্কার করে ফেলছে। তারপরেও তারা সেসবে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। তখনও তারা ভাবত এশিয়াই পৃথিবীর সবকিছু। আমেরিকা মহাদেশ বা প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের দখল নিতে তারা ইউরোপের সাথে পাল্লা দিতে যায়নি। ইউরোপের পুঁচকে দেশ স্কটল্যান্ড আর ডেনমার্কের মানুষও আমেরিকায় দুয়েকটা অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু এশিয়ার বড় বড় তিনটা সাম্রাজ্যের একটাও ওদিকে যায়নি- আবিষ্কার করতেও না, দখল করতেও না। ইউরোপের বাইরে আমেরিকায় প্রথম সামরিক অভিযানটা শুরু করে জাপান। ১৯৪২ সালের জুনে জাপানের একটা নৌবহর আলাস্কার উপকূলের দুটো ছোট ছোট দ্বীপ কিস্কা আর আতু (Kiska and Attu) দখল করে। সে অভিযানে তারা বন্দী করে দশজন আমেরিকান সেনা আর একটা কুকুরকে। ওখানেই শেষ- আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের দিকে জাপান আর এগোয়নি।

অটোমান আর চীন যে অনেক দূরবর্তী রাজ্য ছিল, কিংবা প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক আর সামরিক দিকে থেকে তারা পিছিয়ে ছিল- এমন কিন্তু নয়। ১৪২০ এর দিকে ঝেং হে যে পরিমাণ সম্পদ নিয়ে চীন থেকে আফ্রিকায় গেছিলেন সেটা দিয়ে আমেরিকায়ও পৌঁছানো যেত। কিন্তু সেই ইচ্ছাটুকুই তাদের ছিল না। ১৬০২ সালের আগে চীনের মানচিত্রগুলোতে আমেরিকার নামগন্ধও ছিল না। আর প্রথম যে চীনা মানচিত্রে আমেরিকা দেখা যায়, সেটাও এঁকেছিল ওখানকার ইউরোপীয় মিশনারিরা।

তিনশ বছর ধরে ইউরোপের মানুষ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে আর প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরে নির্বিঘ্নে রাজত্ব করে গেছে। সেখানে বলার মতো যেসব রেষারেষি হতো, সেগুলো হতো ইউরোপের দুটো দেশের মধ্যেই। এতদিন ধরে ইউরোপ যে পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তার ভরসাতেই তারা এরপর এশিয়ার সাম্রাজ্যগুলোকে একে একে জয় করে নিজেরা ভাগাভাগি করে নেয়। অটোমান, পারস্য, ভারত আর চীন সাম্রাজ্যের মানুষ সেদিকে ভালোভাবে মনোযোগ দিতে গিয়ে বুঝতে পারে, অনেক দেরি হয়ে গেছে।

বিংশ শতাব্দীর দিকে এসে ইউরোপের বাইরের মানুষ পুরো পৃথিবী সম্পর্কে জানতে শুরু করে। পৃথিবীব্যাপী ইউরোপের আধিপত্য খর্ব হওয়ার এটা অন্যতম প্রধান কারণ। এর ফলেই আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে (১৯৫৪-১৯৬২) আলজেরিয়ার গেরিলারা সংখ্যায়, প্রযুক্তিতে আর অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে থাকার কারণে ফরাসী সৈন্যদের হারিয়ে দেয়। তাদের জয়ের কারণ ছিল অন্যান্য উপনিবেশবিরোধীদের সমর্থন আর গণমাধ্যমে নিজেদেরকে তুলে ধরা। এমনকি ফ্রান্সের মানুষও তাদের সমর্থন দেয়। উত্তর ভিয়েতনামের মতো ছোট একটা দেশেও বিরাট দেশ আমেরিকার পরাজয়ের কারণও ছিল এটাই- নিজেদের দেশের সংগ্রামটাকে পুরো পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা। সম্রাট মন্টেজুমাও যদি স্পেনের মানুষকে তাঁদের কথা জানাতে পারতেন আর ফ্রান্স, পর্তুগাল কিংবা অটোমান সাম্রাজ্যের সমর্থন আদায় করতে পারতেন, ইতিহাস হয়তো আজ অন্যভাবে লেখা হতো।

বিরল মাকড়সা, হারানো লিপি

আধুনিক বিজ্ঞান আর আধুনিক সাম্রাজ্য- দুটোর পেছনেই আছে একই রকম চিন্তাধারা, জানার সীমানার বাইরে কোথায় কী আছে সেটা জানার অদম্য তাড়না। তাই এ দুটোর সম্পর্ক এত গভীর। শুধু তাড়নাটুকুই নয়, দুটোর কাজের পদ্ধতিও একই রকম। আধুনিক ইউরোপীয়দের জন্য সাম্রাজ্য তৈরি করাটা অনেকটা বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের মতো, আবার বৈজ্ঞানিক গবেষণাও এক একটা রাষ্ট্রীয় প্রকল্প।

মুসলিমরা যখন ভারত দখল করে, তাদের সাথে কোনো পুরাতত্ত্ববিদ এসে ভারতের ইতিহাস জানতে চায়নি, কোনো নৃতত্ত্ববিদ এসে সেখানকার সংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা করেনি, নতুন জায়গার মাটির গুণাগুণ দেখতে আসেনি কোনো ভূতত্ত্ববিদ, কিংবা ভারতের জীবজন্তুগুলো কাছে থেকে দেখার জন্য কোনো প্রাণিবিজ্ঞানীও আসেনি। অথচ ব্রিটিশরা যখন ভারত দখল করে, তখন তাদের সাথে এদের প্রত্যেকেই এসেছিল। ১৮০২ সালের ২ এপ্রিলে সারা ভারতব্যাপী জরিপ শুরু হয়। এই জরিপ চলেছিল ৬০ বছর ধরে। হাজার হাজার দেশী শ্রমিক আর বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে তারা সমগ্র ভারতের নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করে। এমনকি এভারেস্টসহ হিমালয়ের প্রত্যেকটা পর্বতের উচ্চতাও তারা নির্ণয় করে ফেলে। ব্রিটিশরা ভারতের সামরিক শক্তি আর সোনার খনির খোঁজে যে আগ্রহ নিয়ে সারা ভারত চষে বেড়িয়েছে, ঠিক সমান আগ্রহ নিয়ে তারা খুঁজে বেড়িয়েছে বিরল প্রজাতির মাকড়সার খবর জানতে, প্রজাপতির তালিকা বানাতে, ভারতের বিলুপ্ত হওয়া ভাষাগুলোর মূল খুঁজতে আর মাটি খুঁড়ে প্রাচীন সভ্যতার হারানো নিদর্শন বের করতে।

গাঙ্গেয় উপত্যকার মানবসভ্যতার অন্যতম প্রধান শহর ছিল মহেঞ্জোদারো (Mohenjo-daro)। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তৈরি হওয়া এই শহর ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ধ্বংস হয়ে যায়। ব্রিটিশদের আগে যারা ভারত শাসন করেছে- মৌর্য, গুপ্ত, দিল্লীর সুলতান, এমনকি পরাক্রমশালী মুঘল- কেউই সেসব ধ্বংসস্তূপের দিকে ফিরেও তাকায়নি। ওদিকে ১৯২২ সালের এক জরিপে ব্রিটিশরা সেটা খুঁজে পায়, তারপর ব্রিটিশদেরই একটা দল মাটি খুঁড়ে বের করে আনে ভারতীয় সভ্যতার এই প্রাচীনতম নিদর্শনটি। অথচ ভারতীয়রাই এ কাজে কোনোরকম আগ্রহ দেখায়নি।

বৈজ্ঞানিক বিষয়ে ব্রিটিশদের কৌতূহলের আরেকটা উদাহরণ হল তাদের কুনিফর্ম (Cuneiform) লিপির অর্থোদ্ধার। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৩ হাজার বছর ধরে এই লিখন-পদ্ধতি চলেছে, কিন্তু এই ভাষা পড়তে পারার মতো সর্বশেষ মানুষটিও মারা যায় খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে। এরপর থেকে ওই এলাকার মানুষেরা নানান জায়গায় এই লেখা দেখেছে- বড় বড় সৌধে, প্রস্তরফলকে কিংবা ভাঙা কোনো মাটির পাত্রের গায়ে। কিন্তু এইসব বিচিত্র চিহ্নের মধ্য দিয়ে তাদের পূর্বপুরুষেরা যে কী বলতে চেয়েছে, তা তাদের কেউ পড়তে পারেনি, বা বলা ভালো পড়ে দেখার চেষ্টাই করেনি। ১৬১৮ সালে এইসব লেখা ব্রিটিশদের নজরে আসে। পারস্যে থাকা স্প্যানিশ দূত যখন পার্সিপোলিসের (Persepolis) প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে যান, তখন এই চিহ্নগুলো তাঁর চোখে পড়ে। এগুলোর অর্থ কী, সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার মতো কাউকে পেলেন না তিনি। এই খবর ইউরোপীয় পণ্ডিতদের কানে গেলে তাঁরা কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। তাঁরা ১৬৫৭ সালে পার্সিপোলিসের কুনিফর্ম লিপির একটা লেখা প্রকাশ করেন। এরপর আরও অনেক লেখাই প্রকাশিত হয়, কিন্তু দুইশ বছর ধরে পশ্চিমা পণ্ডিতেরা অনেক চেষ্টা করেও সেগুলোর অর্থ বের করতে ব্যর্থ হন।

১৮৩০ এর দশকে পারস্যের শাহকে তাঁর সৈন্যদের ইউরোপীয় কায়দায় প্রশিক্ষণ দিতে হেনরি রলিনসন (Henry Rawlinson) নামক এক ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা আসেন। অবসর সময়ে তিনি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতেন। একদিন তিনি কয়েকজন গাইডকে সাথে নিয়ে জাগরোস (Zagros) পর্বতশ্রেণী দেখতে যান। সেখানেই তিনি দেখেন বেহিস্তুনের বিরাট শিলালিপি (Behistun Inscription)। পনের মিটার লম্বা আর পঁচিশ মিটার চওড়া এই প্রস্তরফলকটি ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে রাজা প্রথম দারিউসের (Darius I) নির্দেশে এক উঁচু পাহাড়ের একপাশে খোদাই করা হয়। ওটাতে কুনিফর্ম লিপিতে তিন ভাষার লেখা ছিল- প্রাচীন পারসিক ভাষা, এলামাইট (Elamite) আর ব্যাবিলনীয় ভাষা। ওখানকার সব মানুষই ওটার কথা জানত, কিন্তু কেউই ওটা পড়তে পারত না। রলিনসন বুঝলেন, ওই লেখাটার পাঠোদ্ধার করতে পারলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যত লেখা আবিষ্কৃত হয়েছে, তার সবগুলোই বোঝা যাবে। একটা হারানো জগতের দরজা খুলে দিতে পারে এই লেখাটা।

কাজের প্রথম ধাপ ছিল ওই লেখাটার হুবহু অনুলিপি তৈরি করে ইউরোপে পাঠানো। রলিনসন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সেই খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে কাজটা করেন। এ কাজে স্থানীয় কয়েকজন লোকও তাঁকে সাহায্য করে। একটা কুর্দি ছেলে সবচেয়ে উপরের সবচেয়ে দুর্গম জায়গার লেখাটা লিখে নিয়ে আসে। ১৮৪৭ সালে এই কাজ শেষ হয়। পুরো লেখাটার একটা নিখুঁত অনুলিপি পাঠানো হয় ইউরোপে।

এটুকু করেই রলিনসন কিন্তু বসে থাকেননি। সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর সামরিক ও রাজনৈতিক কর্তব্য তো ছিলই, কিন্তু তার মধ্যেও তিনি এই লেখার জন্য নিয়মিত সময় দিতেন। বিভিন্নভাবে তিনি এই লেখার অর্থ বের করার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রাচীন পারসিক লিপির অর্থ বের করতে সমর্থ হন। প্রাচীন পারসিক লিপি আধুনিক লিপির খুব কাছাকাছি, রলিনসনও সেটা জানতেন, তাই এই পদ্ধতিটাই ছিল সবচেয়ে সহজ। লেখার একটা অংশের অর্থ জেনে যাওয়ার কারণে এলামাইট আর ব্যাবিলিনীয় লিপির অর্থ বের করার উপায় পেয়ে গেলেন তিনি। সেই হারানো জগতের দরজা শেষমেশ খুলল। সে দরজার ওপাশ থেকে সুমেরীয় বাজারের হাঁকডাক, রাজা-রাজড়াদের আদেশ-নির্দেশ, রাজকর্মচারীদের তর্কবিতর্ক- সব এক এক করে সামনে এসে হাজির হল। রলিনসন কিন্তু বিজ্ঞানী ছিলেন না, ছিলেন রাজকর্মচারী। অথচ তাঁরই কৌতূহল ও চেষ্টার কারণে প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অজানা তথ্য পৃথিবীর মানুষের কাছে উন্মুক্ত হয়ে গেল।

এরকম আরেক রাজকর্মচারী পণ্ডিত ছিলেন উইলিয়াম জোনস (William Jones)। ১৭৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে আসার পর থেকে তিনি বাংলার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভারত তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে আসার ছয় মাসের মধ্যে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি (Asiatic Society) প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থাটির কাজ ছিল এশিয়ার, বিশেষ করে ভারতের সংস্কৃতি, ইতিহাস আর সমাজব্যবস্থা নিয়ে পড়াশোনা করা। মাত্র দুই বছরের মধ্যে জোনস সংস্কৃত ভাষার উপর তাঁর পর্যবেক্ষণগুলো প্রকাশ করেন। এটাকেই তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের (Comparative Linguistics) এর সূচনা বলা যায়।

জোনস তাঁর লেখায় প্রাচীন ভারতের পবিত্র ভাষা সংস্কৃতের সাথে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষার কিছু বিস্ময়কর মিল তুলে ধরেন। সংস্কৃতে ‘মা’কে বলা হয় ‘মাতা’, ল্যাটিন ভাষায় সেটা ‘মাতের’ (mater) আর প্রাচীন কেল্টিক ভাষায় ‘মাথির’ (mathir)। এসব মিল খেকে জোনস ধারণা করেন যে পৃথিবীতে প্রচলিত সবগুলো ভাষারই উদ্ভব হয়েছে অধুনালুপ্ত একটা ভাষা থেকে। পরবর্তীতে এই ভাষাগুলোকে একসাথে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমষ্টি নাম দেওয়া হয়।

জোনস যে এরকম একটা বড়সড় ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন, এটাই কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান নয়। বরং দুটো ভাষার তুলনা করতে তিনি যে পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতেন, সেগুলো পরবর্তীতে ভাষা গবেষণায় সারা পৃথিবীর ভাষাবিদদের অনেক সাহায্য করেছে।

সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ সাহায্যে বিকাশ লাভ করেছে ভাষাবিজ্ঞান। ইউরোপীয়রা বিশ্বাস করত যে ঠিকমতো সাম্রাজ্য চালাতে হলে প্রজাদের ভাষা ও সংস্কৃতি খুব ভালোভাবে জানতে হবে। ভারতে আসা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের কলকাতা কলেজে তিন বছর ধরে পড়াশোনা করতে হতো। সেখানে তাঁরা ইংরেজ আইনের পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলিম আইন শিখতেন, গ্রিক আর ল্যাটিন ভাষার সাথে সাথে সংস্কৃত, উর্দু আর ফারসি শিখতেন, গণিত, অর্থনীতি আর ভূগোলের সাথে শিখতেন তামিল, বাংলা আর ভারতীয় রীতিনীতি। ভারতীয় ভাষাগুলোর ব্যাকরণ শেখার জন্যও এই ভাষাশিক্ষা অনেক কাজে লাগত।

এই উইলিয়াম জোনস আর হেনরি রলিনসনের মতো মানুষদের কাজের জন্যই ইউরোপের শাসকেরা তাদের বিস্তৃত সাম্রাজ্যকে খুব ভালোভাবে জানতে পেরেছিল। অনেক ব্যাপারে তারা আগের শাসক, এমনকি স্থানীয় মানুষের থেকেও বেশি জানত। জ্ঞানের প্রত্যক্ষ সুফল তারা পেয়েছিল। এই জ্ঞান না থাকলে অল্প কিছু ব্রিটিশের পক্ষে কোটি কোটি মানুষের ভারতকে দুইশ বছর ধরে শাসন করা কিছুতেই সম্ভব হতো না। ঊনবিংশ শতকের পুরোটা আর বিংশ শতকের শুরুর দিক জুড়ে এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ৫ হাজারেরও কম। সৈন্য ছিল ৪০ থেকে ৭০ হাজার, আর ব্যবসায়ী, পরিদর্শক আর তাদের স্ত্রী ও সন্তান মিলে ছিল এক লাখের মতো। আর এই মানুষগুলোই শাসন করেছে ভারতের প্রায় ৩০ কোটি মানুষকে।৯

ইউরোপীয় সাম্রাজ্য যে শুধু শাসনের সুবিধার জন্যই ভাষাবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, ভূগোল আর ইতিহাস গবেষণায় টাকা ঢেলেছে- তা কিন্তু নয়। বরং এইসব বৈজ্ঞানিক গবেষণা তাদের সাম্রাজ্যবিস্তারের পেছনে আদর্শগত সমর্থন দিত। আধুনিক ইউরোপীয়রা বিশ্বাস করত, নতুন জ্ঞান অর্জন করাটা সবসময়ই ভালো কাজ। এই সাম্রাজ্য থেকে যে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জ্ঞান আসছে, এটাই ছিল তাদের প্রগতিশীলতার পরিচায়ক। আজও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ইতিহাসে দেখা যায়, বিজ্ঞানের অগ্রগতির পেছনে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের পরোক্ষ হলেও অবদান আছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের করুণ পরিণতির কথা নেই, কিন্তু জেমস কুক আর জোসেফ ব্যাঙ্কসের প্রশস্তি আছে ঠিকই।

এ ছাড়াও, সবসময় বাস্তবে না হলেও অন্তত কাগজে কলমে দেখানো যায়, সাম্রাজ্যবিস্তারের সাথে আসা নতুন জ্ঞান নতুন প্রজাদের মধ্যে ‘প্রগতি’ সঞ্চার করেছিল। এই প্রজারা পেয়েছে উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা, দেশে রেললাইন বসেছে, খাল খনন করা হয়েছে, সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সাম্রাজ্যবাদী মানুষেরা অনেক সময় এটাও দাবি করে যে, তাদের এই সাম্রাজ্যবিস্তার শুধু দখল করা আর নিজেদের লাভের জন্য নয়, বরং ইউরোপের বাইরের মানুষকে অগ্রগতি এনে দেওয়ার এক নিঃস্বার্থ অভিযান। এ নিয়ে রাডইয়ার্ড কিপলিংএর (Rudyard Kipling) একটা কবিতা আছে ‘সাদা মানুষের বোঝা’ (The White Man’s burden) নামে-

Take up the White Man’s burden –

Send forth the best ye breed –

Go bind your sons to exile

To serve your captives’ need;

To wait in heavy harness,

On fluttered folk and wild –

Your new-caught, sullen peoples,

Half-devil and half-child.

বাস্তবতা কিন্তু অন্য কথা বলে। ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ ছিল বাংলা। ১৭৬৪ সালে ব্রিটিশরা বাংলা দখল করে। বাংলার এই নতুন শাসকেরা লুটপাট ছাড়া আর তেমন কোনো দিকেই মনোযোগ দেয়নি। তারা এমন একটা অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করে যার ফলে কয়েক বছরের মধ্যে এখানে দুর্ভিক্ষ লেগে যায় (The Great Bengal Famine)। ১৭৬৯ এ শুরু হওয়া এই দুর্ভিক্ষ ১৭৭০ এ চরমে পৌঁছায়, চলতে থাকে ১৭৭৩ পর্যন্ত। এই কয়েক বছরে বাংলার প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যায়, যা ছিল বাংলার সম্পূর্ণ জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ।১০

এই ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের সাথে শোষণ ও অত্যাচার কিংবা মহিমান্বিত ‘সাদা মানুষের বোঝা’- যেটাই বলা হোক, কোনোটাই পুরোপুরি মেলে না। আসলে ইউরোপের মানুষ এত বেশি জায়গা দখল করেছে যে তাদের সম্পর্কে যে যাই বলুক তা কিছুটা হলেও খাটে। কেউ যদি বলতে চায় এই সাম্রাজ্যবাদ সারা পৃথিবীতে কেবল অত্যাচার, অবিচার আর মৃত্যুই ছড়িয়ে দিয়েছে, তাহলে তাদের সমস্ত অপরাধের বিবরণ দিয়ে মোটা মোটা বইয়ের পাতা ভরিয়ে ফেলা যাবে। আবার কেউ যদি বলে এই সাম্রাজ্যবিস্তারের কারণেই তাদের প্রজারা উন্নত চিকিৎসা, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আর নিরাপদ জীবন পেয়েছে, তাহলে সেটা নিয়েও অনেক অনেক বই লিখে ফেলা যায়। বিজ্ঞানকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগাতে পেরে ইউরোপীয় সাম্রাজ্য অপরিমেয় ক্ষমতার অধিকারী হয়। এই ক্ষমতা দিয়ে তারা পৃথিবীকে এতটাই বদলে দিয়েছে যে তাদেরকে সরাসরি ভালো কিংবা খারাপ কোনোটাই বলার উপায় নেই। আজকের পৃথিবীকে আমরা যেভাবে জানি আর যেসব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তার বিচার করি- তার সবকিছু এই সাম্রাজ্য অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছে।

কিন্তু বিজ্ঞানকে যে সবসময় ভালো কাজেই ব্যবহার করা হয়েছে তা কিন্তু নয়। অনেক জীববিজ্ঞানী, নৃতত্ত্ববিদ, এমনকি ভাষাবিদও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন, ইউরোপীয়রাই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জাতের মানুষ, তাই তারা যদি বাকি পৃথিবী শাসন করে তাহলে সেটা ভুল কিছু নয়। উইলিয়াম জোনস যখন বললেন সব ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষারই উৎপত্তি হয়েছে কোনো একটা প্রাচীন ভাষা থেকে, তখন এ বিষয়ের অনেক বিজ্ঞানীই সেই ভাষাভাষী মানুষের ব্যাপারে উৎসাহী হন। তাঁরা দেখলেন প্রাচীন সংস্কৃতে কথা বলা মানুষেরা মধ্য এশিয়া থেকে এসে তিন হাজার বছরেরও বেশি আগে ভারত আক্রমণ করে। এই মানুষেরা নিজেদেরকে বলত ‘আর্য’ (Arya)। আবার প্রাচীন ফারসি ভাষাভাষী লোকেরাও নিজেদের বলত ‘আইরিয়া’ (Airiia)। এসব দেখে ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা ধারণা করলেন, যে প্রাথমিক ভাষা থেকে এই দুটো প্রাচীন ভাষার (এবং সাথে গ্রিক, ল্যাটিন, গথিক আর কেল্টিক ভাষারও) উৎপত্তি হয়েছে, সেই ভাষায় যারা কথা বলত, তারাই নিশ্চয়ই আর্য। এমন কি হতে পারে, যে সেই আর্যদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছে ভারতীয়, পারস্য, গ্রিক আর রোমান সভ্যতা?

এরপর ব্রিটিশ, ফরাসি ও জার্মান বিশেষজ্ঞরা এই ভাষাতত্ত্বের সাথে ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বকে মিলিয়ে নতুন একটা তত্ত্ব দিলেন। তাঁরা বললেন, আর্যরা শুধু একটা বিশেষ ভাষায় কথা বলা জনগোষ্ঠী নয়, আর্য হল সম্পূর্ণ আলাদা একটা জাতি। তাও যে সে জাতি নয়, মানুষের মধ্যে সেরা জাতি। এই লম্বা, হালকা রঙের চুল ও নীল চোখের পরিশ্রমী ও যুক্তিবাদী মানুষেরা পৃথিবীর উত্তর দিক থেকে এসে সারা পৃথিবীতে সভ্যতার সূচনা করে দিয়েছে। তবে দুঃখের বিষয় হল, ভারত আর পারস্যে যে আর্যরা গিয়েছিল, তারা সেখানকার মানুষের সাথে মিলে মিশে যায় আর তাদের সাথেই সন্তানের জন্ম দেয়। তাই পরবর্তী প্রজন্মের মানুষদের মধ্য থেকে আর্যদের ফর্সা গায়ের রঙ, সোনালি চুল, যুক্তিবাদী ও পরিশ্রমী স্বভাব- সবই হারিয়ে যায়। তাই ভারত ও পারস্যের সভ্যতাও বেশি এগোতে পারেনি। অন্যদিকে ইউরোপে আর্যরা তাদের জাতিগত বিশুদ্ধতা ধরে রাখতে পেরেছিল বলেই তারা একদিন পুরো পৃথিবী করায়ত্ব করতে পেরেছে। তারাই এই পৃথিবীর যোগ্য শাসক, আর অন্যান্য নিচু জাতের মানুষের সাথে না মিশলে তারা এই শ্রেষ্ঠত্ব ধরেও রাখতে পারবে।

এই ধরনের জাতিবিদ্বেষী তত্ত্ব কয়েক দশক ধরে অনেক প্রতাপের সাথে টিকে ছিল। বিজ্ঞানী আর রাজনীতিবিদ- উভয়েই এই তত্ত্বকে সাদরে গ্রহণ করে। তবে এর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম চলতেই থাকে। তবে এর মধ্যেই এই শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিটা ‘জাতি’ থেকে সরে যায় ‘সংস্কৃতি’র দিকে। আজকের দিনে দেখা যায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্যের আলোচনায় শারীরিক পার্থক্যের চেয়ে সাংস্কৃতিক পার্থক্যটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। এখন আর কেউ বলে না, ‘এটা ওদের রক্তে মিশে আছে’, বরং বলে ‘ওদের সংস্কৃতিই এরকম’।

এসব কারণেই ইউরোপের যে ডানপন্থী দলগুলো মুসলিমদের অনুপ্রবেশের বিরোধিতা করে, তারাও তাদের কথায় জাতিবিদ্বেষের সুর যেন না থাকে সেই চেষ্টা করে। ফরাসি রাজনীতিবিদ মেরিন লা পেনকে (Marine le Pen) যদি কখনও টেলিভিশন বক্তৃতায় বলতে শোনা যায়, “আমরা চাইনা আরব বিশ্বের এসব নিচু জাতের মানুষ এখানে এসে আমাদের আর্য রক্তকে কলুষিত করুক”, তাহলে তাঁর বক্তৃতালেখকদের তাড়িয়ে দিতে একটুও সময় লাগবে না। তাই ইউরোপের রাজনৈতিক দলগুলো বলে, ইউরোপে বিকশিত হওয়া পশ্চিমা সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হল গণতান্ত্রিক চেতনা, পরমতসহিষ্ণুতা ও লিঙ্গবৈষম্যহীনতা। ওদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতে আছে একদলীয় শাসন, ধর্মীয় উগ্রতা আর নারীদের অবমাননা। তাই তাদের সংস্কৃতি ইউরোপের সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। তাছাড়া মুসলিম প্রবাসীরা ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতেও অনিচ্ছুক কিংবা অনেক ক্ষেত্রে অপারগ। তাই ইউরোপের গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার্থে এবং অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা কমাতে মুসলিমদের ইউরোপে প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত না।

এই যুক্তির সমর্থনে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের অনেক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় বিভিন্ন সভ্যতার বিরোধ ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য তুলে ধরা হয়। সব ইতিহাসবিদ ও নৃতাত্ত্বিক অবশ্য এই যুক্তিগুলো মানেন না। কিন্তু জীববিজ্ঞানীরা যত সহজে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে শারীরিক পার্থক্যকে নগণ্য বলে জাতিবিদ্বেষকে উড়িয়ে দিতে পারেন, সাংস্কৃতিক পার্থক্যের বেলায় সমাজবিজ্ঞানীরা কিন্তু এত সহজে সেটা পারেন না। সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে পার্থক্য যদি সামান্যই হতো, তাহলে যুগ যুগ ধরে ইতিহাসবিদ আর নৃতাত্ত্বিকেরা সেটা নিয়ে এত পড়াশোনাই বা করছে কেন?

ইউরোপের সাম্রাজ্যবিস্তারে বিজ্ঞানীরা বাস্তব জ্ঞান, আদর্শগত ন্যায্যতা আর প্রযুক্তিগত উপকরণ সরবরাহ করেছেন। তাঁদের সাহায্য ছাড়া ইউরোপ পৃথিবী দখল করতে পারত কি না সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। আর এই দিগ্বিজয়ী সাম্রাজ্যও তাঁদেরকে দিয়েছে তথ্য, নিরাপত্তা, নতুন নতুন জ্ঞানের ভাণ্ডার আর পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা। সাম্রাজ্যের সাহায্য ছাড়া আজকের বিজ্ঞানও এই অবস্থায় কোনোভাবেই আসতে পারত না। বিজ্ঞানের খুব কম শাখাই আছে যা এই সাম্রাজ্যবাদের ছায়ায় বেড়ে ওঠেনি।

তবে এটুকুই সব নয়। বিজ্ঞান তার বিকাশের জন্য সাম্রাজ্য ছাড়াও আরও অনেক জায়গা থেকেই সাহায্য পেয়েছে। আর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের উত্থান আর প্রসারের পেছনে বিজ্ঞান ছাড়াও আরও অনেক বিষয়ই ছিল। বিজ্ঞান ও সাম্রাজ্যবাদের এই হঠাৎ বেড়ে ওঠার পেছনে আরও একটা শক্তি কাজ করেছে। সেটা হল পুঁজিবাদ। ব্যবসায়ীরা যদি টাকার পেছনে না ছুটত, তাহলে কলম্বাসও আমেরিকায় পৌঁছাতেন না, জেমস কুকও অস্ট্রেলিয়ায় যেতেন না, আর নিল আর্মস্ট্রংয়েরও কখনও চাঁদের মাটিতে পা রাখা হতো না।


1 Stephen R. Bown, Scurvy: How a Surgeon, a Mariner and a Gentleman Solved the Greatest Medical Mystery of the Age of Sail (New York: Thomas Dunne Books, St. Martin’s Press, 2004); Kenneth John Carpenter, The History of Scurvy and Vitamin C (Cambridge: Cambridge University Press, 1986).

2 James Cook, The Explorations of Captain James Cook in the Pacific, as Told by Selections of his Own Journals 1768–1779, ed. Archibald Grenfell Price (New York: Dover Publications, 1971), 16–17; Gananath Obeyesekere, The Apotheosis of Captain Cook: European Mythmaking in the Pacific (Princeton: Princeton University Press, 1992), 5; J. C. Beaglehole, ed., The Journals of Captain James Cook on His Voyages of Discovery, vol. 1 (Cambridge: Cambridge University Press, 1968), 588.

3 Mark, Origins of the Modern World, 81.

4 Christian, Maps of Time, 436.

5 John Darwin, After Tamerlane: The Global History of Empire Since 1405 (London: Allen Lane, 2007), 239.

6 Soli Shahvar, ‘Railroads i. The First Railroad Built and Operated in Persia’, in the Online Edition of Encyclopaedia Iranica, last modified 7 April 2008, http://www.iranicaonline.org/articles/railroads-i; Charles Issawi, ‘The Iranian Economy 1925–1975: Fifty Years of Economic Development’, in Iran under the Pahlavis, ed. George Lenczowski (Stanford: Hoover Institution Press, 1978), 156.

7 Mark, Origins of the Modern World, 46.

8 Kirkpatrick Sale, Christopher Columbus and the Conquest of Paradise (London: Tauris Parke Paperbacks, 2006), 7–13.

9 Edward M. Spiers, The Army and Society: 1819–1914 (London: Longman, 1980), 121; Robin Moore, ‘Imperial India, 1858–1914’, in The Oxford History of the British Empire: The Nineteenth Century, vol. 3, ed. Andrew Porter (New York: Oxford University Press, 1999), 442.

10 Vinita Damodaran, ‘Famine in Bengal: A Comparison of the 1770 Famine in Bengal and the 1897 Famine in Chotanagpur’, The Medieval History Journal 10:1–2 (2007), 151.