১৪. জানি না বলতে শেখা

 

ধরা যাক, আনুমানিক এক হাজার খ্রিস্টাব্দের কোন এক রাতে একজন কৃষক ঘুমিয়ে পড়লেন এবং তার ঘুম ভাঙল প্রায় পাঁচশ বছর পর এক হট্টগোলে। কলম্বাসের সহযোগী নাবিকরা যখন নিনা, পিন্টা এবং সান্তা মারিয়া নামে তিনটি জাহাজ ছাড়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করলেন, তখনই এই হট্টগোলের সূত্রপাত। ঘুম থেকে উঠে তিনি পৃথিবীর যে রূপ দেখতেন, সেটা তার কাছে কিন্তু খুব বেশি অচেনা বলে মনে হতো না। এই সময়ের মাঝে প্রযুক্তি, মানুষের আচার-আচরণ এবং রাজনৈতিক সীমারেখার বেশ কিছু পরিবর্তন হলেও আমাদের মধ্যযুগীয় কুম্ভকর্ণটির কাছে সেই পৃথিবীকে নিজের চেনা পৃথিবী বলেই মনে হতো। কিন্তু, কলম্বাসের জাহাজের কোন নাবিক যদি এরকম লম্বা ঘুমে তলিয়ে যান এবং প্রায় পাঁচশ বছর পরে একবিংশ শতকের একটি আইফোনের রিংটোন শুনে তার ঘুম ভাঙে, তবে পৃথিবীর যে রূপ তার সামনে উন্মোচিত হবে সেটা তার কাছে শুধু আশ্চর্যজনকই নয়, সেই পৃথিবী তার কাছে কল্পনারও অতীত বলে মনে হবে। তিনি হয়ত নিজেকে নিজেই জিজ্ঞেস করবেন- ‘এটাই কি স্বর্গ? নাকি এরই নাম নরক?’

গত পাঁচশ বছরে পৃথিবী দেখেছে মানুষের শক্তির অভূতপূর্ব এবং বিস্ময়কর বিকাশ। পনেরশ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবী জুড়ে মোট পঞ্চাশ কোটি হোমো সেপিয়েন্স বসবাস করত। আজকের পৃথিবীতে সাতশ কোটিরও বেশি হোমো সেপিয়েন্সের বাস। পনেরশ খ্রিস্টাব্দে দুনিয়ার সব মানুষ মিলে এক বছরে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা উৎপাদন করত, আজকের দিনের ডলারের হিসেবে তার আনুমানিক মূল্যমান হবে পঁচিশ হাজার কোটি ডলার।২ আজকের দুনিয়ায় এক বছরে মানুষের উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মূল্যমান ষাট লাখ কোটি ডলার।৩ সেসময়, সমগ্র মানবজাতি একদিনে তের ট্রিলিয়ন (১ ট্রিলিয়ন= ১,০০,০০০ কোটি) ক্যালরি খাদ্যশক্তি হিসেবে গ্রহণ করত। আজকের পৃথিবীতে মানুষ প্রতিদিন পনেরশ ট্রিলিয়ন ক্যালরি খাদ্যশক্তি হিসেবে গ্রহণ করে।৪ এখন আবার একবার পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকান- এই পাঁচশ বছরে মানুষের সংখ্যা হয়েছে চৌদ্দ গুন, উৎপাদন হয়েছে দুইশ চল্লিশ গুন আর খাদ্যশক্তি গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে একশ পনের গুন।

ধরা যাক, আজকের দিনের একটি আধুনিক যুদ্ধ জাহাজকে কলম্বাসের আমলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাঝে এটি গুঁড়িয়ে দিতে পারবে কলম্বাসের জাহাজ নিনা, পিন্টা এবং সান্তা মারিয়াকে। তারপর নিজের গায়ে এতটুকু আঁচড় না লাগিয়ে একে একে অনায়াসে ডুবিয়ে দিতে পারবে সেকালের পৃথিবীর সকল পরাশক্তির যুদ্ধজাহাজগুলোকে। সেসময় সারা পৃথিবীর বণিকদের সবগুলো মালবাহী জাহাজ যত পণ্য বহন করতে পারত, একালের পাঁচটি আধুনিক মালবাহী জাহাজ তা অনায়াসে বহন করতে পারবে।৫ মধ্যযুগের সবগুলো লাইব্রেরিতে যতগুলো সাংকেতিক বই-পুস্তক এবং কাগজ বা চামড়ায় মোড়ানো পুঁথি ছিল তাতে লিপিবদ্ধ সকল তথ্য ধারণ করতে পারবে আজকের দিনের আধুনিক একটি কম্পিউটার। প্রাক-অাধুনিক যুগে সকল রাজ্যের অর্থ একত্রিত করলে যা দাঁড়াত, আজকের একটি বৃহদায়তন আধুনিক ব্যাংক তার চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করে।৬

পনেরশ সালে, খুব অল্প সংখ্যক শহরেই এক লাখের বেশি জনগণ বসবাস করত। বেশিরভাগ বাড়িঘর তৈরি হত কাদা, কাঠ এবং খড় বা শুকনো ঘাস দিয়ে, সেসময় একটি তিন তলা দালানকেই আকাশচুম্বী ইমারত মনে করা হত। রাস্তাগুলোতে লেগে থাকত গাড়ির চাকার দাগ, গ্রীষ্মকালে রাস্তা থাকত ধুলোয় ভরা আর বর্ষাকালে কাদায় মাখামাখি। সেই রাস্তা ব্যবহার করেই পথচারী, ঘোড়া, ছাগল, মুরগি এবং অল্প কিছু গরুর গাড়ি পথ চলত। শহর এলাকায় শব্দের অত্যাচার বলতে মানুষ এবং পশুপাখির গলার শব্দ এবং মাঝেমধ্যে হাতুড়ি ও করাতের আওয়াজকে বোঝানো হত। সন্ধ্যার পর শহরজুড়ে নেমে আসত অন্ধকার, সেই অন্ধকারে কখনও হয়ত একটি মোমবাতি বা একটি মশালের আলো উজ্জ্বল হয়ে ফুটে থাকত। এরকম একজন শহরের অধিবাসী যদি আজকের দিনের আধুনিক টোকিও, নিউ ইয়র্ক বা মুম্বাই শহর দেখেন, তবে কেমন হবে তার অনুভূতি?

ষোড়শ শতকের আগে, কোনও মানুষই পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেননি। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটল যখন ১৫২২ সালে পর্যটক ম্যাগেলানের জাহাজ বাহাত্তর হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে স্পেনে ফিরে আসলো। এ প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করতে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছিল এবং ম্যাগেলানসহ অভিযানের অধিকাংশ নাবিককেই প্রাণ দিতে হয়েছিল। ১৮৭৩ সালে জুলভার্ন তার কল্পকাহিনীতে ফিলিয়াস ফগ নামে এক ব্রিটিশ অভিযাত্রীর কথা লেখেন, যিনি আশি দিনে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আজকের দিনে মাঝারি উপার্জনের একজন মানুষ মাত্র আটচল্লিশ ঘন্টায় খুব সহজে এবং নিরাপদে পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে আসতে পারেন।

পনেরশ সালে মানুষকে আবদ্ধ থাকতে হয়েছে ভূ-পৃষ্ঠেই। স্থলভাগে তখন তারা টাওয়ার বানাতে পারত, উঠতে পারত পাহাড়ে। কিন্তু, আকাশটা তখনও ছিল পাখি, পরী, দেব-দেবী আর শয়তানের দখলে। ১৯৬৯ সালের বিশ জুলাই মানুষ প্রথম চাঁদের বুকে পা রাখল। এটা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনাই নয়, এটি মানুষের ইতিহাসের একটি বড় বিপ্লব এবং মানুষের এক মহাজাগতিক বিজয়। কারণ, এর আগের চারশ কোটি বছরে জীবজগতের কেউ চাঁদে পা অথবা শুঁড় রাখা তো দূরের কথা, পৃথিবীর পরিমণ্ডলের বাইরেই বের হতে পারেনি।

ইতিহাসের অধিকাংশ সময় জুড়ে, অণুজীবদের সম্পর্কে মানুষের কোন ধারণাই ছিল না। অথচ জীবজগতের ৯৯.৯৯% সদস্যই হল অণুজীব। এই না জানার কারণ এমন নয় যে, তাদের নিয়ে মানুষের কোন মাথাব্যথা ছিল না। প্রতিটি মানুষকেই সবসময় কোটি কোটি এককোষী জীবকে নিজের শরীরে বহন করতে হয়। তারা যে কেবল থাকার জন্য থাকে তা নয়। তাদের কেউ আমাদের সেরা বন্ধু, আবার কেউবা আমাদের বড় শত্রু। কেউ আমাদের খাবার পরিপাক আর অন্ত্র পরিষ্কার রাখার কাজ করে, কেউ আবার আমাদের অসুস্থ করে ফেলে, নিয়ে আসে মহামারী। ১৬৭৪ সালে অান্তন ভন লিউয়েনহুক (Anton van Leeuwenhoek) তার নিজের বাসায় তৈরি অণুবীক্ষণে একটি পানির বিন্দুর মাঝে এরকম লাখ লাখ অণুজীবের এক অদেখা পৃথিবীর সন্ধান পেলেন। আর তারই ফলশ্রুতিতে মানুষ এই প্রথম অণুজীবকে নিজের চোখে দেখতে পেল। পরবর্তী তিনশ বছরে মানুষের সাথে এরকম অনেক ধরনের আণুবীক্ষণিক জীবের পরিচয় হয়েছে। যেসব অণুজীব নানারকম ভয়ংকর সংক্রামক রোগের জন্য দায়ী তাদের অধিকাংশই মানুষের কাছে পরাস্ত হয়েছে। অন্যদিকে মানুষের জন্য উপকারী অণুজীবগুলো লালনপালন করে মানুষ তাদের ব্যবহার করেছে ওষুধ তৈরির কাজে এবং শিল্পকারখানায়। আজকাল আমরা ওষুধ তৈরি, বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং ক্ষতিকর পরজীবী দমনের জন্য দরকারি ব্যাকটেরিয়ার উৎপাদন শিখে গেছি।

কিন্তু, গত পাঁচশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাব বিস্তারকারী মুহূর্তের সূচনা হল ১৯৪৫ সালের ১৬ই জুলাইয়ে, সকাল ৫টা ২৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে। এই সময়েই আমেরিকার বিজ্ঞানীরা নিউ মেক্সিকোর অ্যালামোগরডোতে (Alamogordo) প্রথম আণবিক বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটালেন। ঠিক এই মুহূর্ত থেকেই মানুষ বুঝতে পারল, ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেবার ক্ষমতার মধ্যেই মানুষ আর সীমাবদ্ধ নেই, ইতিহাসের ইতি টানবার শক্তিও তারা অর্জন করেছে।

যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যালামোগরডোতে আণবিক বোমা বিস্ফোরণ এবং মানুষের চাঁদে যাওয়া সম্ভব হল তার নাম বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। এই সময়টাতে মানুষ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ করার মাধ্যমে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠতে পেরেছে। এটাকে আমরা বিপ্লব বলছি কারণ ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের আগ পর্যন্তও পৃথিবীর মানুষ স্বাস্থ্য, সমর এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার নতুন সম্ভাবনা বা অগ্রগতির ব্যাপারে সন্দিহান ছিল। যদিও এর আগে রাষ্ট্র এবং ধনী পৃষ্ঠপোষকেরা শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং বৃত্তির ব্যবস্থা করতেন, তবে নতুন নতুন উদ্ভাবনের পরিবর্তে অর্জিত জ্ঞানকে ধরে রাখাই ছিল এসবের মূল উদ্দেশ্য। প্রাক-আধুনিক যুগের একজন গড়পড়তা শাসক সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং আইন-কানুনের বৈধতা প্রমাণের জন্য ধর্মযাজক, দার্শনিক এবং কবিদের পেছনে অর্থ ব্যয় করতেন। তারা নতুন ওষুধ, যুদ্ধের নিত্যনতুন অস্ত্র বা অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করবেন এরকম আশা শাসকের থাকত না।

বিগত পাঁচশ বছরে মানুষ ক্রমাগত: বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা তাদের সামর্থ্যকে আরও বাড়াতে পারবে। এই বিশ্বাস কেবল অন্ধ ধারণার উপর গড়ে ওঠেনি বরং ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার এই ধারণার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। বিজ্ঞানের ক্ষমতার প্রমাণ যতই বাড়তে লাগল, সরকার এবং ধনকুবেররা ততই এই ব্যাপারে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেন। এইসব বিনিয়োগ ছাড়া আমরা কখনই হয়ত চাঁদে বিচরণ করতে, অণুজীব গবেষণা করতে বা পরমাণুকে আরও ক্ষুদ্রতম অংশে ভাগ করতে পারতাম না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমেরিকান সরকার গত কয়েক দশকে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার জন্য কোটি কোটি ডলার বরাদ্দ করেছেন। এইসব গবেষণায় অর্জিত জ্ঞানের ফলেই সম্ভব হয়েছে আমেরিকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ যা আমেরিকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্প খরচে বিদ্যুতের যোগান দিচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারকে দিচ্ছে কর, সেই করের একটি অংশই আবার বিনিয়োগ করা হচ্ছে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে আরও গবেষণা করার জন্য।

বিজ্ঞানভিত্তিক বিপ্লবের চক্র। শুধু গবেষণা দিয়ে বিজ্ঞান এগিয়ে যেতে পারে না। এর জন্য দরকার হয় বিজ্ঞান, রাজনীতি আর অর্থনীতির সম্মিলিত উদ্যোগ। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যোগান দেয় বিজ্ঞানের এগিয়ে চলার রসদ যা ছাড়া বৈজ্ঞানিক গবেষণা এগিয়ে নেয়া মোটামুটি অসম্ভব। বিনিময়ে বিজ্ঞান দেয় নতুন ক্ষমতা আর শক্তি যা ব্যবহৃত হয় নতুন সম্পদ তৈরিতে। এরই কিছু অংশ আবার বিনিয়োগ করা হয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে।

গবেষণার মাধ্যমে যে আরও ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যায়- এই বিশ্বাস মানুষ পেল কোথা থেকে? কীভাবে বিজ্ঞান, রাজনীতি আর অর্থনীতি বাঁধা পড়ল এক সুতোয়? এই অধ্যায়ে আমরা বিজ্ঞানের ভূমিকাটুকু দেখব, তবে সেটা হবে এই প্রশ্নের আংশিক জবাব। পরের দুটো অধ্যায়ে আমরা এই ত্রিমুখী সম্পর্কটাকে দেখব আরও দুটো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে- ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদী অর্থনীতি।

জানতাম না তো!

সেই বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের সময় থেকেই মানুষ এই মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করে আসছে। পৃথিবী কোন কোন প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন তা জানার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষেরা অনেক সময় ও শ্রম দিয়েছে। কিন্তু প্রাচীনকালের জ্ঞান অর্জনের এই প্রচেষ্টার থেকে আধুনিক বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জনের এই প্রক্রিয়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে ভিন্ন-

ক) অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নেওয়ার প্রবণতা। আধুনিক বিজ্ঞান ল্যাটিন শব্দ ‘ignoramus’ এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত যার অর্থ- ‘আমরা জানি না’। আধুনিক বিজ্ঞান ধরেই নেয় আমরা সবকিছু জানিনা। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে বলা যায়, আধুনিক বিজ্ঞান এটাও স্বীকার করে আমরা আজকে যা জানি বলে মনে করছি কাল আরও বেশি জ্ঞান অর্জনের ফলে আজকের জানা ভুল প্রমাণিত হতে পারে। কোন ধারণা, মতবাদ বা তত্ত্ব ঈশ্বরপ্রদত্ত নয় এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।

খ) পর্যবেক্ষণ এবং গাণিতিক বিশ্লেষণকে জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা। যেহেতু আধুনিক বিজ্ঞান অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নেয় তাই তার লক্ষ্য থাকে অজানাকে জানার। জ্ঞান অর্জনের জন্য বিজ্ঞান তার চারপাশকে পর্যবেক্ষণ করে, তথ্য সংগ্রহ করে এবং গাণিতিক পদ্ধতির সাহায্যে এই পর্যবেক্ষণকে তত্ত্বে রূপ দেবার চেষ্টা করে।

গ) নতুন নতুন সক্ষমতা অর্জনের প্রবণতা। আধুনিক বিজ্ঞান কেবল তত্ত্ব তৈরি করেই সন্তুষ্ট থাকে না। এই তত্ত্বগুলোকে সে ব্যবহার করে নতুন নতুন ক্ষমতা অর্জনের কাজে এবং বিশেষভাবে বললে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজে।

বিজ্ঞানভিত্তিক বিপ্লব জ্ঞান অর্জনের বিপ্লব নয়। বরঞ্চ এককথায় একে বলা যায় অজ্ঞানতার আবিষ্কারের বিপ্লব। যে অভূতপূর্ব আবিষ্কারটি বিজ্ঞানভিত্তিক বিপ্লবের সূচনা করেছিল সেটি হল- আমরা মানুষেরা আমাদের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরই জানি না।

অপরদিকে ইসলাম ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম এবং কনফুসিয়ানিজমের মত জ্ঞানের প্রাক-আধুনিক ধারাগুলো ধরে নেয় যে, পৃথিবী সম্পর্কে যা কিছু জানা গুরুত্বপূর্ণ ইতোমধ্যেই তা জানা হয়ে গেছে। অসংখ্য শক্তিধর দেবতা বা এক ও অদ্বিতীয় মহাশক্তিধর স্রষ্টা বা অতীতের জ্ঞানী ব্যক্তিদের লিখিত পুঁথি বা মুখে মুখে চলে আসা গাথার মাঝেই নিহিত আছে সমস্ত জ্ঞানভাণ্ডার। সাধারণ মরণশীল মানুষের কাজ কেবল এসব পবিত্র পুরাতন পুঁথি পড়ে, বুঝে এবং বহুকাল ধরে চলে আসা নিয়মকানুন মেনে জ্ঞান অর্জন করা। বাইবেল, কোরান কিংবা বেদে বলা নেই এমন কোনও গূঢ় তত্ত্বজ্ঞান কোনও রক্ত-মাংসের মানুষের পক্ষেও যে আবিষ্কার করা সম্ভব- এ কথা কোনও ধর্মই মানতে চায় না।

জ্ঞানের প্রাচীন ধারাগুলো কেবলমাত্র দুই ধরনের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করেছে। এক, একজন ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় না জানা সম্পর্কিত অজ্ঞতা। এই অজ্ঞতা দূর করার জন্য তাকে অপেক্ষাকৃত জ্ঞানী কোন মানুষের সহায়তা নিতে হত। কেউই যা এখন পর্যন্ত জানে না এমন কোন কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টাই অর্থহীন। উদাহরণস্বরূপ, বিশ শতকের ইয়র্কশায়ারের একজন কৃষকের মনে যখন মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে প্রশ্ন জাগত, সে নিশ্চিতভাবেই ধরে নিত কেবল খ্রিস্টধর্মের মাঝেই আছে এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর। আর সেই উত্তর জানার জন্য সে শরণাপন্ন হত স্থানীয় ধর্মযাজকের।

দুই, একটা পুরো গোষ্ঠীর কোনও অপ্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞতা। শক্তিশালী দেবতারা বা অতীতের প্রাজ্ঞ মানুষেরা যেসব বিষয় সম্পর্কে এতকাল কিছুই বলেননি সেগুলো নিতান্তই গুরুত্বহীন বিষয়। উদাহরণস্বরূপ, ইয়র্কশায়ারের সেই কৃষক যদি জানতে চাইত মাকড়সা কীভাবে তার জাল বোনে, সে সম্পর্কে ধর্মযাজককে জিজ্ঞেস করা ছিল নিতান্তই অর্থহীন। কারণ, খ্রিস্টধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলিতে এ সংক্রান্ত কোন নির্দেশনা নেই। এর মানে এই নয় যে, খ্রিস্টধর্মের মাঝে জ্ঞানের কোন ঘাটতি আছে। বরং তাদের বিশ্বাস ছিল, মাকড়সার জাল বোনার কৌশল গুরুত্বহীন বলেই তা ধর্মগ্রন্থে নেই। ঈশ্বর নিশ্চয়ই ভালোভাবেই জানেন মাকড়সা কীভাবে জাল বোনে। এই তথ্য যদি মানুষের উন্নতি বা মানবজাতিকে রক্ষার জন্য জরুরী হত, শক্তিমান ঈশ্বর অবশ্যই এ সংক্রান্ত বোধগম্য একটি ব্যাখ্যা বাইবেলে যুক্ত করতেন।

খ্রিস্টধর্মে মাকড়সা সংক্রান্ত পড়াশোনার ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু মাকড়সা বিশেষজ্ঞ নামে যদি কিছু মধ্যযুগীয় ইউরোপে থেকেও থাকে, সমাজের প্রান্তজন হয়েই তাকে থাকতে হয়েছে এবং তার গবেষণা এবং আবিষ্কার খ্রিস্টধর্মের চিরকালীন রীতিনীতির সাথে সম্পর্কহীন হিসেবেই থেকে গেছে। একজন বিশেষজ্ঞ মাকড়সা, প্রজাপতি বা গ্যালাপাগোস দ্বীপের পাখিদের সম্পর্কে যে তথ্যই আবিষ্কার করুক, তা ছিল সেকালের মানুষের দৃষ্টিতে নগণ্য জ্ঞান, সমাজের মূল স্রোত, রাজনীতি এবং অর্থনীতির সাথে একেবারেই সম্পর্কহীন।

সত্যি কথা বলতে, সেকালে ব্যাপারগুলো উপরের বর্ণনার মত এত সহজ ছিল না। প্রত্যেক যুগেই, এমনকি ধর্ম এবং রক্ষণশীলতার বাড়াবাড়ির যুগেও এমন কিছু লোক ছিলেন যারা দাবি করতেন এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে যেসবের ব্যাপারে সমাজের সকল মানুষই অজ্ঞ। এই ধরনের লোকগুলোকে হয় একঘরে করা হত অথবা হত্যা করা হত। কিংবা এরা নিজেরাই একটি নতুন মতবাদের প্রতিষ্ঠা করতেন এবং দাবি করা শুরু করতেন এই নতুন মতবাদেই মানুষের সকল জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়া যাবে। যেমন ইসলাম ধর্মমতে, আরবের মানুষেরা যখন অপরিসীম অজ্ঞতায় নিমজ্জিত ছিল, তেমন একটি সময়ে নবী মুহাম্মদ (সা) এর আগমন হয়। তিনি যখন বললেন তিনি পরিপূর্ণ সত্যের সন্ধান পেয়েছেন, তার পর থেকে তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ‘সর্বশেষ নবী’ হিসেবে মেনে নেয়। সুতরাং তাঁর বক্তব্যের বাইরে নতুন করে সত্যের সন্ধান করার আর কী দরকার?।

বর্তমান কালে জ্ঞানের ব্যাপারে বিজ্ঞানের ধারণা অনেকটাই ভিন্ন। বিজ্ঞান আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে আমাদের সামষ্টিক অজ্ঞতার কথা স্বীকার করে নেয়। জীববিজ্ঞানী ডারউইন কখনও নিজেকে ‘সর্বশেষ জীববিজ্ঞানী’ বলে দাবি করেননি এবং ঘোষণা করেননি যে তিনি জীবজগতের সকল রহস্যের চূড়ান্ত এবং চিরকালীন সমাধান করতে পেরেছেন। একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিস্তর বৈজ্ঞানিক গবেষণা সত্ত্বেও, জীববিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন যে মস্তিষ্ক কীভাবে চেতনার জন্ম দেয় সে ব্যাপারে কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এখনও তাদের হাতে নেই। পদার্থবিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন যে, তাঁরা জানেন না কী কারণে মহাবিস্ফোরণ (Big Bang) হয়েছিল বা কীভাবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের সাথে একীভূত করা যাবে।

এমনকি প্রায়ই এটা দেখা যায় যে, উদ্ভাবিত নতুন নতুন তথ্যের ভিত্তিতে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আরেকটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে নাকচ করে দিচ্ছে বা অকার্যকর প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে কীভাবে একটি দেশের অর্থনীতি পরিচালনা করতে হবে সে সংক্রান্ত তত্ত্ব নিয়ে মতবিরোধ। যদিও প্রত্যেক অর্থনীতিবিদই দাবি করেন তার মতবাদই সেরা, প্রত্যেক অর্থনৈতিক মন্দা, শেয়ার বাজারের ভরাডুবির পর তাদের এই অহংকার টলে ওঠে। এবং আজকের দিনে সাধারণভাবে একথা স্বীকার করে নেয়া হয় যে, অর্থনীতির তত্ত্বে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

এমনও অনেক উদাহরণ দেখা যায়, যেখানে একটি বিশেষ তত্ত্ব বিদ্যমান তথ্যগুলো দ্বারা এতটাই সমর্থিত যে, ওই বিষয়ের বিকল্প তত্ত্বগুলো হালে পানিই পায় না। সেক্ষেত্রে এই ধরনের তত্ত্বগুলোকে সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারপরও এই ব্যাপারে সবাই একমত থাকেন যে, ভবিষ্যতে যদি এ বিষয়ে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায় যা বর্তমান তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক তাহলে এই সত্য বলে মেনে নেয়া তত্ত্বকে তৎক্ষণাৎ ভুল বলে স্বীকার করা হবে অথবা এর ত্রুটিগুলোকে শুধরে নেয়া হবে। এই সংক্রান্ত সবচেয়ে দুটি ভাল উদাহরণ হতে পারে টেকটোনিক প্লেট তত্ত্ব এবং বিবর্তন তত্ত্ব।

অজ্ঞতা স্বীকার করে নেয়ার এই সদিচ্ছা বিজ্ঞানকে জ্ঞানের অন্যান্য শাখার চেয়ে গতিশীল, নমনীয় এবং কৌতূহলী করে গড়ে তুলেছে। পৃথিবীকে চেনা এবং নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের ক্ষেত্রে খুলে দিয়েছে এক নতুন দিগন্ত। কিন্তু অজ্ঞতার আবিষ্কার একটি ভয়ঙ্কর সমস্যারও উদ্ভব ঘটিয়েছে, আমাদের পূর্বপুরুষদের যেটি নিয়ে ভাবনায় পড়তে হয়নি। বিজ্ঞানের সভ্যতা আমাদের শিখিয়েছে আমরা সবকিছু জানি না এবং আমরা যা জানি বলে মনে করি সেগুলোও আংশিক জানা। যেসব সামষ্টিক মিথ অসংখ্য অচেনা মানুষকে একত্রিত করে আমাদেরকে বিশাল আকারের সমাজ, রাষ্ট্র, গোষ্ঠী গঠনে সহায়তা করেছে সেইসব মিথও এই ধারণার অন্তর্ভুক্ত। যদি কখনও প্রমাণিত হয় যে, এইসব মিথের সত্যতাও প্রশ্নের সম্মুখীন কিংবা ভুল, তখন আমরা কী করে আমাদের সমাজকে একসাথে ধরে রাখব? আমাদের রাষ্ট্র, দেশ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাগুলোও কি তখন হুমকির মুখে পড়বে না?

সমাজ ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ধরে রাখার সকল আধুনিক প্রচেষ্টাকে তাই বাধ্য হয়েই দুইটি অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির একটিকে অনুসরণ করতে হচ্ছে-

ক) বিজ্ঞানের সভ্যতার মূল কথা ‘ভুলের সম্ভাবনা’কে অস্বীকার করে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে চূড়ান্ত এবং পরম সত্য রূপে ঘোষণা করুন। এই পদ্ধতি অনুসরণ করছিল নাৎসি বাহিনী (যারা দাবি করেছিল যে জাতিতে জাতিতে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যের ব্যাপারটি জীববিজ্ঞানেরই অনুসিদ্ধান্ত) এবং কম্যুনিস্টরা (যারা দাবি করেছিল মার্ক্স এবং লেলিন সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর চূড়ান্ত সন্ধান পেয়েছেন যার বিরুদ্ধে কোন তর্কেরই অবকাশ নেই)।

খ) বিজ্ঞানকে একেবারেই দূরে সরিয়ে রাখুন এবং কোন অবৈজ্ঞানিক চূড়ান্ত সত্যকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে জীবনযাপন করুন। এই পদ্ধতি অনুযায়ী চলছে উদার মানবতাবাদ, যার ভিত্তিটি কাল্পনিক- প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব ব্যক্তিগত সামর্থ্য ও অধিকার। দুঃখজনকভাবে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে চেনা মানবজাতির পরিচয়ের সাথে এই ধারণার মিল খুবই সামান্য।

কিন্তু এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিজ্ঞানকেও কিন্তু তার গবেষণার পেছনের অর্থ বরাদ্দকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণের জন্য ধর্মীয় এবং মতাদর্শগত বিশ্বাসের উপর নির্ভর করতে হয়!

অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নেওয়ার ব্যাপারে বর্তমান বিশ্বের সংস্কৃতি অন্য যে কোন সময়ের সংস্কৃতির চেয়ে বেশি উদার। আজকের বৃহদাকার মানব সমাজব্যবস্থা যে একসাথে টিকে আছে তার একটা অন্যতম প্রধান কারণ হল প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার সফলতায় পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের প্রায় ধর্মসদৃশ বিশ্বাস যা পরম সত্য বা পরম ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের জায়গাকে কিছুটা হলেও প্রতিস্থাপিত করেছে।

বিজ্ঞানের মন্ত্র, বিজ্ঞানের বিধান

আধুনিক বিজ্ঞান অন্ধ বিশ্বাস বা গোঁড়ামির প্রভাব মুক্ত। কিন্তু তাকেও কিছু সাধারণ গবেষণা পদ্ধতির অধীনে চলতে হয়। এসবের মূলে রয়েছে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্য সংগ্রহ এবং গাণিতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে সবের মাঝে সমন্বয় সাধন করা।

ইতিহাসের পুরোটা সময় জুড়েই মানুষ প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করলেও সেসব তথ্যের গুরুত্ব ছিল সীমাবদ্ধ। আপনার কাছে যদি সব প্রশ্নের উত্তরই থেকে থাকে তাহলে অযথা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের জন্য আপনি বাড়তি খরচ কেন করবেন? কিন্তু আধুনিক মানুষ যেহেতু স্বীকার করে নিল গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ই তারা জানে না, তাদের জন্য নতুন জ্ঞানের সন্ধান করাটা প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিল। ফলশ্রুতিতে, পুরনো জ্ঞানের অপূর্ণতাকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেওয়াটা আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার পদ্ধতির একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়াল। পুরনো ঐতিহ্যকে জানা ও তার চর্চার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ল পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যখন বর্তমানের পর্যবেক্ষণ পূর্বের প্রচলিত জ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায় আমরা সেক্ষেত্রে বর্তমানের পর্যবেক্ষণকে প্রাধান্য দেই। অবশ্যই পদার্থবিজ্ঞানীর দূরবর্তী গ্যালাক্সির বর্ণালী বিশ্লেষণ, নৃতাত্ত্বিকের ব্রোঞ্জ যুগের বিলুপ্ত কোন নগরের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে গবেষণা, সমাজবিজ্ঞানীর পুঁজিবাদের উদ্ভব নিয়ে পড়াশোনা অতীতের জ্ঞানের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে না। এসব গবেষণার শুরুই হয় পূর্বতন পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কী বলে এবং লিপিবদ্ধ করে গেছেন তা জানার মাধ্যমে। কিন্তু কলেজের প্রথম বছর থেকেই উঠতি পদার্থবিদ, নৃতত্ত্ববিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীকে শেখানো হয় যে তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে আইনস্টাইন, হেইনরিখ শিলম্যান এবং ম্যাক্স ওয়েবারের জানার পরিধিকে ছাড়িয়ে যাওয়া।

যদিও বেশি পর্যবেক্ষণ মানেই বেশি জ্ঞান নয়। এই মহাবিশ্বকে বোঝার জন্য আমাদের পর্যবেক্ষণগুলিকে পরস্পরের সাথে যুক্ত করে বোধগম্য তত্ত্বে রূপান্তর করতে হবে। পূর্বে জ্ঞানের শাখাগুলো কাল্পনিক গল্পের উপর ভিত্তি করে তাদের তত্ত্ব দাঁড় করাতো। আধুনিক বিজ্ঞান সাহায্য নেয় গণিতের।

বাইবেল, কোরান বা বেদ বা কনফুসিয়াসের বাণী ঘাঁটলে খুব সামান্যই সমীকরণ, লেখচিত্র বা গাণিতিক হিসাব-নিকাশের সন্ধান পাওয়া যাবে। প্রাচীন পুরাণ এবং ধর্মগ্রন্থগুলো সমীকরণ নয় বরং বর্ণনার মাধ্যমেই পৃথিবী সংক্রান্ত সাধারণ নিয়মগুলো লিপিবদ্ধ করেছিল। একারণে আমরা দেখতে পাই, প্রাচীন ম্যানিকিয়ান ধর্মে বলা হচ্ছে, পৃথিবী হল সুন্দর আর শয়তানের লড়াইয়ের এক যুদ্ধক্ষেত্র। শয়তানের শক্তি সৃষ্টি করেছে শরীরের আর সুন্দরের শক্তি সৃষ্টি করেছে আত্মা। মানুষ এই দুই শক্তির প্রভাবের মায়াজালে বন্দী এবং তার উচিত শয়তানের শক্তিকে অস্বীকার করে সুন্দরের শক্তির অনুসারী হওয়া। এতকিছু বলার পরেও এ ধর্মের ধর্মগুরু মানি (Mani) এমন কোন গাণিতিক সূত্র দেননি যার মাধ্যমে মানুষ হিসাব করে দেখতে পারে সে কত শতাংশ শয়তানকে অনুসরণ করছে আর কত শতাংশ সুন্দরকে অনুসরণ করছে। তিনি কখনও এরকম হিসাব বলেননি যে, ‘মানুষের উপর ক্রিয়ারত বলের পরিমাণ তার আত্মার ত্বরণ এবং তার শরীরের ভরের ভাগফলের সমান’।

অপরদিকে বিজ্ঞানীরা কিন্তু ঠিক এই কাজটিই করার চেষ্টা করেন। ১৬৮৭ সালে স্যার আইজ্যাক নিউটন তাঁর ‘ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপাল অব ন্যাচারাল ফিলোসফি’ বইটি প্রকাশ করেন। অনেকের মতেই এটি আধুনিককালের ইতিহাসে প্রকাশিত হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই। নিউটনের তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি ছিল এটি মাত্র তিনটি গাণিতিক নিয়মের সাহায্যে গাছ থেকে পড়ন্ত আপেল থেকে শুরু করে আকাশ থেকে খসে পড়া তারা সহ মহাবিশ্বের সকল বস্তুর গতিকে ব্যাখ্যা এবং অনুমান করতে পারত-

  • প্রথম সূত্র: বাহ্যিক কোন বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু স্থির এবং গতিশীল বস্তু সুষম গতিতে সরল পথে চলতে থাকে।
  • দ্বিতীয় সূত্র: কোন বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক এবং বল যে দিকে ক্রিয়া করে বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তন সেদিকেই ঘটে।
  • তৃতীয় সূত্র: প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে৷

এই সূত্রগুলো জানার পর থেকে একটি কামানের গোলা বা একটি গ্রহের গতিপথ হিসেব করতে মানুষকে কেবল বস্তুটির ভর, দিক, ত্বরণ এবং এর উপর ক্রিয়াশীল বলের পরিমাণ হিসেব করতে হয়েছে। এরপর নিউটনের সমীকরণে এই রাশিগুলোর মান বসিয়ে সহজেই বস্তুটির ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হল। নিউটনের সূত্র কাজ করল জাদুর মত। উনবিংশ শতকের শেষদিকে কিছু পদার্থবিজ্ঞানী যখন এমন কিছু বস্তুর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করলেন যা নিউটনের সূত্র মেনে চলে না তখনই সূচনা হল নিউটনের সূত্রকে ছাপিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের পরবর্তী বিপ্লবের, উদ্ভব হল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার।

নিউটন দেখালেন যে, প্রকৃতির নিয়মকে গণিতের ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব। তার বইয়ের কিছু কিছু অধ্যায়ের মূল লক্ষ্যই ছিল সুস্পষ্ট গাণিতিক সমীকরণ প্রতিপাদন করা। কিন্তু এরপর বিজ্ঞানীরা যখন জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং মনোবিজ্ঞানের বিষয়গুলোকে নিউটনের মত সমীকরণ আকারে প্রকাশ করতে গেলেন, তখন তারা খেয়াল করলেন যে এই বিষয়গুলোতে কিছু বাড়তি জটিলতা আছে যার কারণে এগুলোকে ঠিক পদার্থবিজ্ঞানের মত গাণিতিক সূত্র আকারে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এর মানে এই নয় যে, তারা গণিতের উপর আস্থা হারিয়ে ফেললেন। গত দুইশ বছরে গণিতের একটি নতুন শাখারই উদ্ভব হয়েছে যেটি বাস্তবতার আরও জটিল কিছু দিককে গাণিতিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য ব্যবহৃত হয়। গণিতের এই শাখার নাম হল- পরিসংখ্যান।

১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে যাজকদের মৃত্যুর পর তাদের স্ত্রী এবং সন্তানদের ভাতা প্রদান করার লক্ষ্যে আলেকজান্ডার ওয়েবস্টার এবং রবার্ট ওয়ালেস নামে স্কটল্যান্ডের প্রেসবিটেরিয়ান চার্চের দুজন যাজক একটি জীবন বীমা তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। তারা প্রস্তাব করেন, চার্চের যাজকগণ তাদের রোজগারের একটি অংশ একটি তহবিল গঠনের জন্য দান করবেন। কোনও যাজকের মৃত্যুর পর তার পরিবার নিয়মিত এই তহবিল থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ পাবেন। এটি তাদেরকে তাদের বাকি জীবন স্বাচ্ছন্দে কাটাতে সাহায্য করবে। কিন্তু, যাজকেরা কী পরিমাণ অর্থ জমা রাখলে তাদের মৃত্যুর পর তাদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ তহবিল থেকে বরাদ্দ করা সম্ভব হবে তা জানার জন্য ওয়েবস্টার এবং ওয়ালেসের প্রতিবছর গড়ে কতজন যাজক মারা যান, গড়ে তাদের পরিবারের মোট কতজন সদস্য তারা রেখে যান এবং স্বামীর মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা গড়ে কত বছর বেঁচে থাকে এসব ব্যাপারে একটা সুস্পষ্ট অনুমান করা জরুরী হয়ে পড়ল।

এখানে একটা ব্যাপার গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য করুন। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এই যাজকদ্বয় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা শুরু করেননি। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মশাস্ত্রের পূর্বতন বিশেষজ্ঞদের লিখে রাখা বাণীর মাঝেও তারা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাননি। এমনকি তারা আশ্রয় নেননি কোন জটিল দার্শনিক তর্কের। সেসময়ের স্কটল্যান্ডের অধিবাসী হওয়ার দরুন তারা ছিলেন বাস্তববাদী। সুতরাং, এ সমস্যা সমাধানের জন্য তারা আমন্ত্রণ জানালেন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক কলিন ম্যাকলরিনকে। তারা তিনজন মিলে মানুষের মৃত্যুর বয়স সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করলেন এবং এই তথ্য ব্যবহার করে তারা অনুমান করার চেষ্টা করলেন প্রতিবছর গড়ে কতজন যাজক মারা যেতে পারেন।

তাদের এই কাজ আজকের দিনের পরিসংখ্যান এবং সম্ভাবনা তত্ত্বের বেশ কিছু বৈপ্লবিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে একটি হল জ্যাকব বার্নোলির ‘ল অফ লার্জ নাম্বারস’। বার্নোলি গণিতের ভাষায় দেখিয়েছেন যে, একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার সম্ভাব্যতা অনুমান করা কঠিন, তবে একই রকম অনেকগুলো ঘটনার গড় সম্ভাব্যতার অনুমান বেশ নিপুণভাবেই করা সম্ভব। অর্থাৎ আগামী বছর ওয়েবস্টার বা ওয়ালেস মারা যাবেন কীনা এটা ম্যাকলরিনের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয় কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য থাকলে ম্যাকলরিন মোটামুটি নিঁখুতভাবে আগামী বছর স্কটল্যান্ডে মোট কতজন প্রেসবিটেরিয়ান যাজক মারা যেতে পারেন তা ওয়েবস্টার বা ওয়ালেসকে জানাতে পারবেন। সুখের বিষয় হল, এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকেই সংগ্রহ করা ছিল। পঞ্চাশ বছর আগে এডমন্ড হ্যালির প্রকাশ করা জীবন-মৃত্যুর খতিয়ান (Actuary Table) এ কাজে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। হ্যালি তার প্রকাশিত হিসাবে জার্মানির ব্রেসলাউ শহরের ১,২৩৮ জনের জন্ম ও ১,১৭৪ জনের মৃত্যুর খতিয়ান প্রকাশ করেন। হ্যালির টেবিলের সাহায্যেই জানা সম্ভব হয়েছিল যে, একটি নির্দিষ্ট বছরে ২০ বছর বয়স্ক একজন মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা ১/১০০, অন্যদিকে ৫০ বছর বয়স্ক একজন মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা ১/৩৯।

এইসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ওয়েবস্টার এবং ওয়ালেস এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, গড়পড়তা যে কোনও বছরে জীবিত স্কটিশ প্রেসবিটেরিয়ান যাজকের সংখ্যা হবে ৯৩০ এবং গড়ে প্রতিবছর ২৭ জন যাজকের মারা যাবার সম্ভাবনা আছে যাদের মাঝে ১৮ জনের বিধবা স্ত্রী রেখে যাবার সম্ভাবনা। এদের মধ্যে গড়ে পাঁচ জনের বিধবা স্ত্রী থাকবে না কিন্তু এতিম সন্তান থাকবে এবং বিধবা স্ত্রীদের মাঝে গড়ে দুইজনের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকবে যাদের বয়স এখনও ষোল বছরের সীমা অতিক্রম করেনি। তারা এটাও হিসাব করে দেখলেন যে, বিধবা নারীরা স্বামীর মৃত্যুর পর কতবছর আরও বাঁচতে পারেন অথবা নতুন করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে তাদের আনুমানিক কত সময় লাগতে পারে (এই দুই ক্ষেত্রেই তারা ভাতা প্রাপ্তির আওতামুক্ত হবেন)। যেসব যাজকেরা তাদের প্রিয়জনের সুরক্ষার জন্য তহবিল গঠন করতে চান তাদেরকে কী পরিমাণ অর্থ জমা রাখতে হবে, সেটা নির্ধারণ করতে এসব তথ্য ওয়েবস্টার এবং ওয়ালেসকে সাহায্য করল। যাজকেরা যদি প্রতি বছর ২ পাউন্ড, ১২ শিলিং, ২ পেনি করে জমা রাখেন তাহলে তিনি মোটামুটি নিশ্চিন্ত যে তার মৃত্যুর পর তার বিধবা পত্নী বছরে কমপক্ষে ১০ পাউন্ড করে পাবেন। তখনকার দিনের দশ পাউন্ড মানে অনেক টাকা। কোন যাজক যদি মনে করেন এই অর্থ তার স্ত্রীর ভবিষ্যত ভরণপোষণেরর জন্য যথেষ্ট নয় তিনি বছরে সর্বোচ্চ ৬ পাউন্ড, ১১ শিলিং, ৩ পেনি করে জমা রাখতে পারেন যা নিশ্চিত করবে তার মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী বছরে ২৫ পাউন্ডের মত একটা বড়সড় ভাতা পাবেন।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, ১৭৬৫ সাল নাগাদ বিধবা এবং নাবালক সন্তানদের আর্থিক সাহায্যের জন্য গঠন করা এই তহবিলের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৫৮ হাজার তিনশ আটচল্লিশ পাউন্ড এ। তাদের এই গাণিতিক হিসাব বাস্তবের সঞ্চয়ের পরিমাণের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে গিয়েছিল। ১৭৬৫ সালে এসে দেখা গেল তাদের তহবিলের প্রকৃত সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার তিনশ সাতচল্লিশ পাউন্ডে। অর্থাৎ, অনুমিত সঞ্চয়ের পরিমাণের সাথে মাত্র এক পাউন্ডের হেরফের! এই হিসাব অতীতের হাবাক্কুক, জেরেমি বা সেন্ট জনের করা ভবিষ্যতবাণীর থেকে অনেক বেশি সঠিক ছিল। বর্তমানে, ‘স্কটিশ উইডোজ’ নামে পরিচিত ওয়েবস্টার এবং ওয়ালেসের তহবিল দুনিয়ার অন্যতম সেরা অবসর ভাতা এবং বীমা কোম্পানী।৭

পরবর্তীতে দুইজন যাজকের সম্ভাবনা তত্ত্ব নিয়ে এইসব হিসাবনিকাশ কেবলমাত্র অ্যাকচুয়ারিয়াল (actuarial) বিদ্যার ভিত্তি স্থাপনের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে অবসর ভাতা, বীমা ব্যবসা এবং জনসংখ্যাতত্ত্বের (আরেকজন উচ্চপদস্থ অ্যাংলো যাজক রবার্ট ম্যালথাস এই বিদ্যার প্রবক্তা) মূল প্রেরণা। একসময় আবার জনসংখ্যাতত্ত্বই হয়ে ওঠে সেই ভিত্তি, যার উপর দাঁড়িয়ে চার্লস ডারউইন (যিনি একটি অ্যাংলো গির্জার যাজক প্রায় হয়েই গিয়েছিলেন) নির্মাণ করেন তাঁর বিখ্যাত ‘বিবর্তন তত্ত্ব’। একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে জীবের জিনে রূপান্তরের (Mutation) মাধ্যমে কোন কোন প্রজাতির উদ্ভব ঘটবে তা অনুমানের জন্য যদিও কোন গাণিতিক সমীকরণ নেই, কিন্তু জিনবিজ্ঞানীরা সম্ভাবনা তত্ত্ব ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে একটি নির্দিষ্ট জিনগত রূপান্তর ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু তা হিসাব করতে পারেন। সম্ভাবনা তত্ত্বের এইসব ধারণা অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অন্যান্য সামাজিক এবং প্রকৃতি বিদ্যার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এমনকি পদার্থবিজ্ঞানও নিউটনের পদার্থবিজ্ঞানের পুরনো সূত্রগুলোকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় ব্যবহৃত সম্ভাবনা তত্ত্বের প্রয়োগ দ্বারা আরও সুসংগত, অধিকতর সম্পূ্র্ণরূপে প্রকাশ করেছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসের খুব গভীরে না গেলেও একথা আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, নতুন এই গাণিতিক পদ্ধতির চর্চা আমাদের অগ্রগতিতে কতটা ভূমিকা পালন করেছে। ইতিহাসের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই গণিত ছিল জটিল, উচ্চস্তরের জ্ঞান যা কিনা শিক্ষিত লোকেদের পক্ষেও বোঝা অনেকসময় সম্ভব হত না। মধ্যযুগের ইউরোপে যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ এবং অলঙ্কারশাস্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল শিক্ষাব্যবস্থার ভিত যেখানে সাধারণ হিসাব-নিকাশ আর জ্যামিতি ছাড়া গণিতের অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষাদানের সুযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। পরিসংখ্যান তখন সবার কাছেই অচেনা। সুতরাং, সেকালে জ্ঞানের সকল শাখার প্রভু হিসেবে রাজত্ব করত ধর্মতত্ত্ব।

আজকের দিনে খুব কম ছাত্রই অলংকারশাস্ত্র অধ্যয়ন করে, যুক্তিবিদ্যা হয়ে পড়েছে কেবলমাত্র দর্শনের ছাত্রদের পাঠ্য বিষয় আর ধর্মতত্ত্ব হয়ে পড়েছে সভা-সমিতির মঞ্চে বক্তৃতার বিষয়বস্তু। অন্যদিকে দিন দিন আরও বেশি সংখ্যক ছাত্র গণিতের অধ্যয়নের ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছে বা আরও বেশি সংখ্যক ছাত্রকে বাধ্য করা হচ্ছে গণিত অধ্যয়নের ব্যাপারে। বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের চর্চার ব্যাপারে তৈরি হয়েছে অপরিসীম আগ্রহ। বিশুদ্ধ বিজ্ঞান বলতে এখানে গাণিতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা বিজ্ঞানের শাখাসমূহের কথা বলা হচ্ছে। এমনকি ভাষাতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞানের মত জ্ঞানের শাখাগুলো যাদেরকে একসময় মানবিক জ্ঞানের অংশ হিসেবে ধরা হত, তাদেরও ক্রমাগত গণিতের উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে এবং তারা নিজেদেরকে বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টায় ব্যস্ত। পরিসংখ্যানের কোর্স এখন কেবল পদার্থবিজ্ঞান আর জীববিজ্ঞানের জন্যই নয় বরং মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের জন্যও বাধ্যতামূলক।

আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই সেখানকার মনোবিজ্ঞান বিভাগের সিলেবাসের প্রথম বাধ্যতামূলক কোর্সের নাম হল- ‘মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় পরিসংখ্যান ও পদ্ধতিগত মনোবিজ্ঞানের সূচনা’। দ্বিতীয় বর্ষের মনোবিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য আবশ্যিক কোর্স হল- ‘মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত পরিসংখ্যান পদ্ধতি’। মানুষের মনকে পরিপূর্ণরূপে বোঝার জন্য এবং তার মানসিক সুস্থতা বিধানের জন্য পরিসংখ্যান অধ্যয়ন জরুরী- কনফুসিয়াস, বুদ্ধ, যিশু বা মোহাম্মদকে এ ধরনের কোন কথা বলা হলে তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতেন।

জ্ঞানই শক্তি

বিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষা আমরা সহজে বুঝতে পারি না এবং অনেকসময় এর মূল বক্তব্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে সাংঘর্ষিক বলে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই আধুনিক বিজ্ঞান বেশ দুর্বোধ্য। পৃথিবীর প্রায় সাতশ কোটি মানুষের মাঝে কজনই বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, কোষীয় জীববিজ্ঞান বা ম্যাক্রো-অর্থনীতি বোঝেন? কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজ্ঞানের প্রতি সাধারণ মানুষের যে অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস তার প্রধান কারণ বিজ্ঞান আমাদেরকে দিয়েছে অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, নতুন সম্ভাবনার সন্ধান। একটি দেশের প্রেসিডেন্ট এবং সামরিক কর্মকর্তা হয়ত নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কে জানেন না, তবে নিউক্লিয়ার বোমার আগ্রাসী ভূমিকা কত ভয়ঙ্কর হতে পারে সে সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট ধারণা রাখেন।

১৬২০ সালে ফ্রান্সিস বেকন ‘দি নিউ ইন্সট্রুমেন্ট’ নামে এক বৈজ্ঞানিক ইশতেহার প্রকাশ করেন। এই ইশতেহারে তিনি বলেন- ‘জ্ঞানই শক্তি’। কোন জ্ঞান আমাদের নতুন শক্তিতে বলীয়ান করতে পারে কিনা সেটাই জ্ঞানের প্রধান পরীক্ষা, জ্ঞানের বিষয়টি কতটুকু সত্য সেটা তার পরীক্ষার বিষয় নয়। বিজ্ঞানীরা সাধারণত ধরেই নেন যে, কোন তত্ত্বই শতভাগ সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, সত্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হওয়া জ্ঞানের জন্য তেমন জরুরী কোন বিষয় নয়। সবচেয়ে জরুরী বিষয় হল তার উপযোগিতা। যে তত্ত্ব আমাদের নতুন কিছু করবার সক্ষমতা দান করে সেটাই প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।

বিগত কয়েক শতকে, বিজ্ঞান আমাদেরকে অনেক নতুন সক্ষমতা দান করেছে। এর মাঝে মৃত্যুর হার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার অনুমান করার মত বিষয়গুলো মানসিক সক্ষমতা। বিজ্ঞানের সুবাদে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে আমরা এর চেয়েও বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছি। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সম্পর্ক এতটাই দৃঢ় যে অনেকসময় এদেরকে আলাদা করে চেনাই মুশকিল হয়ে পড়ে। এমনকি বর্তমানে আমরা অনেক সময় এভাবে ভাবি যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন সম্ভব নয়। যে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে নতুন কোনো প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয় না, সে বৈজ্ঞানিক গবেষণার তেমন কোন মূল্য নেই।

আসলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মধ্যকার এই সম্পর্কের ব্যাপারটি কিন্তু বেশ নতুন। ১৫০০ সালের পূর্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ক্ষেত্র। সপ্তদশ শতকের শুরুতে ফ্রান্সিস বেকন যখন এই দুটি ক্ষেত্রকে একত্রিত করলেন, তখন তা ছিল একটি বৈপ্লবিক ঘটনা। সপ্তদশ শতক এবং অষ্টাদশ শতকে এই বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মধ্যকার এই সম্পর্ক প্রকৃত পূর্ণতা পায় উনবিংশ শতকে। আঠারশ সালেও কোন শাসক একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠনের জন্য কিংবা একজন ধনকুবের ব্যবসায় সফলতা অর্জনের জন্য পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান বা অর্থনীতিতে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন না।

অবশ্য এ নিয়মের যে ব্যতিক্রম ছিল না এমন দাবি আমি করছি না। একজন মাঝারি মানের ঐতিহাসিক অতীতের ঘটনাগুলোর আপাতঃ কারণ অনুসন্ধান করতে পারেন। কিন্তু, সত্যিকারের ভালো একজন ঐতিহাসিক এই আপাত কারণগুলোর আড়ালে লুকানো মূল কারণটাও দেখতে পান। মোটাদাগে দেখলে বেশিরভাগ প্রাক-আধুনিক যুগের শাসক এবং ব্যবসায়ীরা নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে মহাবিশ্বের প্রকৃতি জানার জন্য সম্পদ বিনিয়োগ করেননি এবং সে সময়ের চিন্তাবিদ বা গবেষকরাও তাদের চিন্তা বা গবেষণাকে কোন যন্ত্রের প্রযুক্তিতে পরিণত করার জন্য উদগ্রীব ছিলেন না। সেকালের শাসকেরা সেইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পেছনে বিনিয়োগ করতেন যাদের লক্ষ্য ছিল আবহমানকাল ধরে চলে আসা জ্ঞানকে লালন করা, ছড়িয়ে দেয়া এবং রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা পালন করা।

সে সময়েও নানা জায়গায় মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। তবে সেসবের বেশিরভাগই ছিল অশিক্ষিত, দক্ষ কারিগরের অসংখ্যবার চেষ্টার ফসল, কোন উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিতের পদ্ধতিগত বৈজ্ঞানিক গবেষণার অর্জন নয়। যারা গরুর গাড়ি বানাতেন তারা বছরের পর বছর ধরে একই পদ্ধতিতে, একই উপাদান ব্যবহার করে গরুর গাড়ি বানাতেন। গরুর গাড়ির নতুন মডেল উদ্ভাবনের জন্য তাদের বার্ষিক লাভের একটা অংশ তারা গবেষণা কাজে বরাদ্দ করতেন না। মাঝে মাঝে গাড়ির নকশায় পরিবর্তন আসত কিন্তু এসবের মূলে ছিল স্থানীয় কারিগরদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা যাদের ইউনিভার্সিটির ডিগ্রী থাকা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রেই তারা ছিলেন অক্ষরজ্ঞানহীন।

সরকারী এবং বেসরকারি সকল খাতের জন্যই এই একই নিয়ম প্রযোজ্য ছিল। আধুনিক রাষ্ট্র তার রাষ্ট্র নীতি, জ্বালানী খাত, স্বাস্থ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সকল ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নেবার আগে বিজ্ঞানীদের শরণাপন্ন হন। প্রাচীন রাষ্ট্রগুলোতে এমনটা হত না। এই দুই সময়ের মধ্যকার পার্থক্যটা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় যুদ্ধাস্ত্রের দিকে নজর দিলে। যখন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডুয়াইট আইসেনহাওয়ার ১৯৬১ সালে শিল্প ও সেনাবাহিনীর ক্রমবর্ধমান শক্তির ব্যাপারে সকলকে সতর্ক করেন তখন আসলে একটি ব্যাপার তিনি তার কথায় উহ্য রেখে যান। তার উচিত ছিল সকলকে শিল্প, সেনাবাহিনী ও বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান শক্তির ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া। কারণ, বর্তমানের যুদ্ধগুলো বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফসল। সারা পৃথিবীর সকল বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত গবেষণার অধিকাংশই পরিচালনা ও অর্থায়ন করে কোনো না কোনো সেনাবাহিনী।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন দুপক্ষের অন্তহীন ধ্বংস আর হত্যার ক্ষেত্রে পরিণত হল, তখন দুপক্ষই এ অচলাবস্থা নিরসন করে নিজেদের দেশকে বাঁচানোর জন্য বিজ্ঞানীদের শরণাপন্ন হলেন। এই ডাকে সাড়া দিলেন বিজ্ঞানী নামের সাদা পোশাকের মানুষগুলি আর তাদের ল্যাবরেটরি থেকে একের পর এক বেরোতে লাগল চমকে দেয়ার মত অগণিত অস্ত্র- যুদ্ধবাজ বিমান, বিষাক্ত গ্যাস, ট্যাঙ্ক, ডুবোজাহাজ, তাক লাগানো মেশিনগান, কামান, রাইফেল, বোমা আরও কত কী!

_59374584_v2rocket1944getty.jpg

৩৩। উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত জার্মান ভি-২ রকেট। এটা শত্রুশিবিরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়নি সত্যি, কিন্তু এটা জার্মানদের একটা প্রযুক্তির জাদুর আশায় বাঁচিয়ে রেখেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজ্ঞানের প্রভাব ছিল আরও ব্যাপক। ১৯৪৪ সালের শেষ দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পতন একরকম নিশ্চিত হয়ে পড়ে। এর এক বছর আগেই ইতালিতে জার্মানদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রনায়ক মুসোলিনির পতন ঘটে এবং তারা মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। মিত্রবাহিনীর ব্রিটিশ, আমেরিকান এবং সোভিয়েত সৈন্যরা যখন জার্মানিকে একরকম কোণঠাসা করে ফেলেছে, তখনও জার্মান সেনারা আত্মসমর্পণ না করে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জার্মান সৈন্য এবং সাধারণ নাগরিকদের এই বিশ্বাস ছিল যে সবকিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি, শেষ মুহূর্তে হলেও তাদের বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীরা ভি-২ রকেট বা জেটচালিত যুদ্ধবিমানের মত এমন কিছু মারাত্মক অস্ত্র তৈরি করে ফেলবে যা পাশার দান পুরোপুরি উল্টে দেবে এবং শেষমেশ জার্মানরাই যুদ্ধে জয়ী হবে।

এদিকে জার্মান বিজ্ঞানীরা যখন রকেট আর যুদ্ধবিমান তৈরিতে ব্যস্ত, ততক্ষণে আমেরিকা ম্যানহাটন প্রকল্পের আওতায় বানাতে শুরু করেছে আণবিক বোমা। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসের শুরুর দিকে যখন ম্যানহাটন প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হল, ততদিনে জার্মানরা মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসর্মপণ করে ফেলেছে। বিরূদ্ধশক্তিগুলোর মাঝে একমাত্র জাপানই তখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকান সেনাবাহিনী জাপান অধিকৃত কিছু ভূখন্ড দখলের সিদ্ধান্ত নিল। জাপানিরা প্রাণ দিয়ে হলেও এই আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করলেন। জাপানিদের গৃহীত পদক্ষেপ, আত্মঘাতী বোমা হামলা (Kamikaze) সবার সামনে তাদের এই সংকল্পের দৃঢ়তা তুলে ধরল। আমেরিকার সেনাপ্রধানরা তাদের রাষ্ট্রপতি হ্যারি এস ট্রুম্যানকে জানালেন- এভাবে চললে জাপান দখলের এই অভিযানে লক্ষ লক্ষ আমেরিকান সৈন্যকে প্রাণ দিতে হতে পারে এবং এই প্রক্রিয়া হয়তো সমস্ত যুদ্ধটাকেই ১৯৪৬ সাল অব্দি দীর্ঘায়িত করবে। ট্রুম্যান এই সমস্যা সমাধানে তাদের নতুন উদ্ভাবিত বোমা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলেন। দুই সপ্তাহে জাপানে মাত্র দুটো আণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হল, আত্মসমর্পণে বাধ্য হল প্রতিরোধে দৃঢ়সংকল্প জাপান। আর সাথে সাথেই যুদ্ধেরও ঘটল ইতি।

অবশ্য বিজ্ঞান কেবল আক্রমণের হাতিয়ারই তৈরি করে না, আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে অনেক আমেরিকানই মনে করেন যে, সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত সমাধান আছে তথ্য-প্রযুক্তির কাছে, রাজনীতির পথে নয়। তাদের বিশ্বাস, ন্যানোটেকনোলজির পেছনে আরও কয়েক লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা গেলেই তাদের তৈরি ক্ষুদে বায়োনিক গোয়েন্দা উড়ে যাবে আফগানদের গুহায়, ইয়েমেনের ইহুদিদের ধ্বংসাবশেষে বা উত্তর আফ্রিকার যাযাবরদের তাঁবুতে। আর সেটা করা গেলে ওসামা বিন লাদেনের উত্তরসূরীদের এক কাপ চা বানানোর খবর পর্যন্ত ল্যাংলিতে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার সদর দপ্তরে তৎক্ষণাৎ পৌঁছে দেবে সেসব মাছিসদৃশ ক্ষুদে গোয়েন্দার দল। কিংবা মস্তিষ্কের গবেষণার পেছনে আরও লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করুন, প্রতি বিমানবন্দরে থাকবে সব মানুষের মস্তিষ্ক স্ক্যান করার এফ এম আর আই (FMRI) যন্ত্র যা নিমিষেই বলে দেবে কোন মানুষটি তার মাথার ভেতর ধ্বংসাত্মক কোন পরিকল্পনা আঁটছে বা কোন মানুষটি রেগে আছে। তাদের এইসব বিশ্বাস বা ধারণাগুলো কি আদৌ সমাধান করতে পারবে মানুষের সমস্যার? কে জানে! উড়ন্ত বায়োনিক গোয়েন্দামাছি বা মস্তিষ্কের চিন্তা পড়তে পারা যন্ত্র আবিষ্কার করা কি আদতে মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে? মনে হয় না। কিন্তু এসব মনে হওয়া বা না হওয়ায় আসলেই কিছু যায় আসে না, কারণ আপনি যখন এই লাইনগুলো পড়ছেন, তখনই হয়তো আমেরিকার নিরাপত্তা অধিদপ্তর ন্যানোটেকনোলজি এবং মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করার ল্যাবরেটরীতে এসব ধারণা এবং আরও নতুন অনেক ধারণা নিয়ে কাজ করার জন্য কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন।

আশ্চর্য ব্যাপার হল, ট্যাংক থেকে শুরু করে আণবিক বোমা কিংবা বায়োনিক ক্ষুদে গোয়েন্দা, সামরিক কাজে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের এই প্রবণতা কিন্তু খুব বেশিদিনের পুরনো নয়। উনবিংশ শতকের আগে পর্যন্তও বেশিরভাগ সামরিক বিপ্লবগুলোরই কারণ ছিল গোষ্ঠী সম্পর্কের পরিবর্তন, নতুন প্রযু্ক্তির উন্মেষ নয়। সে সময়, যখন দুটো অচেনা সভ্যতার মানুষ প্রথমবারের মত একে অপরের সাক্ষাৎ পেত, তখন তাদের মাঝে প্রযুক্তিগত তারতম্য মাঝে মধ্যে কিছু পার্থক্য গড়ে দিত। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রেও খুব কম সংখ্যক মানুষই প্রযুক্তিগত তারতম্য বাড়ানো বা কমানো নিয়ে সচেতনভাবে চিন্তা করেছে। সেকালের অধিকাংশ সাম্রাজ্যাই কোন জাদুকরী প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি, শাসকেরাও তাই প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাতেন না। উন্নত তীর বা তরবারির কল্যাণে আরবরা সাসানিড সাম্রাজ্য জয় করেনি, সেলজুকরা (Seljuk) কোন অর্থেই প্রযুক্তিগতভাবে বাইজেনটাইনদের (Byzantine) থেকে এগিয়ে ছিল না এবং মোঙ্গলরা কোনও শক্তিশালী নতুন অস্ত্রের জোরে চীনা সাম্রাজ্য অধিকার করেনি। বরঞ্চ এ সব ক্ষেত্রেই বিজয়ী দলের থেকে বিজিতরাই সমর এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রযুক্তিতে এগিয়ে ছিল।

এক্ষেত্রে রোমান সেনাবাহিনী একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। সে সময়ে রোমান সেনাবাহিনী প্রযুক্তিগত দিক থেকে কার্থেজ, মেসেডোনিয়া বা সেলুসিড সাম্রাজ্যের চেয়ে কোন অংশে উন্নত না হলেও তারাই ছিল পৃথিবী সেরা। দক্ষ সাংগঠনিক শক্তি, ইস্পাতদৃঢ় নিয়মনিষ্ঠা এবং বিশাল জনশক্তিই ছিল তাদের সেরা হয়ে উঠবার প্রধান নিয়ামক। প্রযুক্তির উন্নতির জন্য রোমান সেনাবাহিনী কখনও গবেষণা এবং উদ্ভাবন অধিদপ্তর গড়ে তোলেনি। শেষের প্রায় একশ’ বছর জুড়ে তাদের ব্যবহৃত হাতিয়ারের প্রকৃতি মোটামুটি একই রকম ছিল। সেনানায়ক সিপিও আমিলিনাস, যার নেতৃত্বাধীন বাহিনী খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে কার্থেজ সাম্রাজ্যকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল এবং পরাজিত করেছিলন নুমানশিয়ানদের (Numantian), তিনি যদি কোন জাদুমন্ত্রবলে ৫০০ বছর পর কনস্টানটিন দি গ্রেট এর রাজত্বে এসে উদয় হন, তবে তার বাহিনীর একটা ভাল রকম সম্ভাবনা থাকবে কনস্টানটিনের বাহিনীকে পরাজিত করার। এখন চিন্তা করে দেখুন মাত্র কয়েক শতাব্দী আগের নেপোলিয়ানের মত একজন বিখ্যাত সেনানায়ক যদি হুট করে আজকের দুনিয়ায় এসে আবির্ভূত হন এবং তার সংঘবদ্ধ বাহিনী নিয়ে এ যুগের কোন রাষ্ট্রের বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, তবে তার ফলাফল কী হতে পারে। নেপোলিয়ানের রণকৌশল অসাধারণ এবং তার সেনাবাহিনীর সবাই নিখুঁত, পেশাদার যোদ্ধা, কিন্তু আজকের দিনের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের কাছে তাদের রণকৌশল হয়ে পড়বে নিতান্তই অর্থহীন এবং অকেজো।

প্রাচীন রোমের কথাই বলুন, অথবা সেকালের চীনের কথা- বেশিরভাগ সমরনায়ক এবং দার্শনিকের কেউই নতুন নতুন অস্ত্রের উদ্ভাবনকে তাদের অবশ্যকর্তব্য বলে মনে করতেন না। চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক আবিষ্কার ছিল বারুদ। ডাওইস্ট (Daoist) আলকেমিস্ট যারা মানুষের অমরত্বের সমাধান নিয়ে কাজ করতেন, এই আবিষ্কার ছিল তাদের এক আকস্মিক দুর্ঘটনার ফসল। কেউ ভাবতেই পারেন, বারুদ আবিষ্কারই চীনকে দুনিয়ার উপর প্রভুত্ব স্থাপনে সহায়তা করেছে। কিন্তু মজার কথা হল, চাইনিজরা মূলত আতশবাজি বানানোর কাজেই তাদের উদ্ভাবিত এই বারুদ ব্যবহার করত। এমনকি চীনের বিখ্যাত সং সাম্রাজ্য যখন মোঙ্গলদের আক্রমণের মুখে পড়ল, তখনও চীনের সম্রাট কোন বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির লক্ষ্যে ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’ এর আদলে কোন মধ্যযুগীয় প্রকল্প শুরু করেননি। বারুদ আবিষ্কারের প্রায় ৬০০ বছর পর, পঞ্চদশ শতকে এসে আফ্রো-এশিয়ান যুদ্ধক্ষেত্রে বারুদ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক হিসাবে আবির্ভূত হল। বারুদের এই ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে উপলব্ধি করতে মানুষের এত সময় লাগল কেন? কারণ, তখনকার রাজা, পণ্ডিত বা ব্যবসায়ীদের কেউই ভাবতেন না যে নতুন সামরিক প্রযুক্তি তাদের নিরাপত্তার কাজে লাগতে পারে বা তাদেরকে আরও ধন সম্পদের অধিকারী করে তুলতে পারে।

পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতকের দিকে এসে এ অবস্থায় পরিবর্তন শুরু হলেও নতুন নতুন অস্ত্র তৈরির গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য অর্থ বিনিয়োগের ব্যাপারে উৎসাহী হতে শাসকদের আরও দুই শতাব্দী লেগে গেছে। ততদিন পর্যন্ত প্রযুক্তির চেয়ে সৈন্য এবং মালামাল সরবরাহের প্রক্রিয়া এবং রণকৌশলই যুদ্ধ জয়ের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। নেপোলিয়ানের যে দক্ষ সেনাবাহিনী অস্টারলিৎজ (১৮০৫) এ ইউরোপীয় শক্তিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল তাদের অস্ত্র ছিল মোটামুটি ষোড়শ লুইয়ের সেনাবাহিনীর সমমানের। নেপোলিয়ান নিজে একজন যুদ্ধবাজ সমরনায়ক হলেও, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকেরা উড়ন্ত যান, সাবমেরিন বা রকেট তৈরির ব্যাপারে বিনিয়োগ করতে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তাতে তিনি এ ব্যাপারে তেমন উৎসাহ দেখাননি।

পুঁজিবাদী সমাজের উদ্ভব এবং শিল্প বিপ্লবের পরেই কেবল বিজ্ঞান, শিল্প এবং সামরিক প্রযুক্তি একসাথে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে শুরু করেছে। তাদের সবার এক রাস্তায় চলার এই সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে পৃথিবীর প্রচলিত রূপ।

একটা নতুন কিছু করো

বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের আগ পর্যন্ত মানুষের বেশিরভাগ সংস্কৃতি পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিল না। তারা ভাবত, অতীত সবচেয়ে ঐশ্বর্যমণ্ডিত, বর্তমান অতীতেরই প্রতিচ্ছবি অথবা বর্তমান অতীতের ক্ষয়িষ্ণু রূপ। যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিয়মগুলোকে কঠোরভাবে অনুসরণের মাধ্যমেই অতীতের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনা সম্ভব এবং মানুষের বুদ্ধির কাজ হলো দৈনন্দিন জীবনে এই ধারণাটির গুরুত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন করা। এটা ধরেই নেওয়া হত যে, পৃথিবীর মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান জানা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। মোহাম্মদ, যিশু, বুদ্ধ বা কনফুসিয়াসের মত সর্বজ্ঞ মহাপুরুষরাই যখন দুর্ভিক্ষ, মহামারী, দারিদ্র্য এবং যুদ্ধ দূর করতে পারেননি, তখন আমাদের মত সাধারণ মানুষের সে চেষ্টা করা ধৃষ্টতা ছাড়া আর কী হতে পারে!

অনেক ধর্মই এমন বিশ্বাস করত যে, একদিন কোন মহাপুরুষ আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীর বুক থেকে সকল যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এমনকি সকল জরা-মৃত্যু দূর করবেন। মানুষ নিজেই নতুন জ্ঞান এবং আবিষ্কারের দ্বারা এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে পারে এরকম ধারণা কেবল হাস্যকর নির্বুদ্ধিতাই নয় বরং অর্বাচীন আত্মাভিমানের নামান্তর। বাবেলের টাওয়ার, ইকারাসের গল্প, গোলেম এর কাহিনী এবং আরও অসংখ্য পৌরাণিক কাহিনী মানুষকে এই শিক্ষা দিয়েছিল যে, কোন ব্যাপারেই সীমা লঙ্ঘন করার চেষ্টা পরিণামে মানুষের জন্য ব্যর্থতা আর দুর্ভোগই ডেকে আনে।

আধুনিক যুগের সংস্কৃতি ‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিসই আমরা এখনও জানি না’ এ কথা যখন স্বীকার করে নিল এবং এই স্বীকারোক্তির সাথে যখন যুক্ত হলো ‘বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানুষকে নতুন নতুন শক্তির সন্ধান দিতে পারে’ এই ধারণা, তখন মানুষ ক্রমাগত পরিবর্তন ও অগ্রগতির ধারণায় আস্থা স্থাপন করল। বিজ্ঞান যখন একের পর এক নানা অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান করতে শুরু করল, মানুষের মনে এমন ধারণা জন্মাল যে নতুন জ্ঞান আহরণের মাধ্যমেই মানবজাতির যে কোনও সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। দারিদ্র্য, রোগ-ব্যাধি, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বার্ধক্য এমনকি মৃত্যুও মানুষের অপরিহার্য নিয়তি নয়। সেগুলো মানুষের অজ্ঞানতারই ফসলমাত্র।

13385006224_6021af3407_o.jpg

৩৪। দেবতার হাত থেকে বজ্র কেড়ে নিচ্ছেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

এ ব্যাপারে বজ্রপাত সংক্রান্ত উদাহরণটি বেশ জনপ্রিয়। অনেক সভ্যতাই বিশ্বাস করত বজ্রপাত হল পাপী লোকেদের শায়েস্তা করার জন্য আকাশ থেকে নেমে আসা দেবতার হাতুড়ি। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকা পরীক্ষাটি করলেন। আকাশের বজ্রপাতের মাঝে ঘুড়ি উড়িয়ে প্রমাণ করলেন আকাশের বজ্রপাতে বিদ্যুৎ ছাড়া আর কিছুই নেই। বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কলিনের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, বিদ্যুৎ শক্তি সম্পর্কে তার জ্ঞান তাকে সাহায্য করল আকাশের বিদ্যুৎকে মাটিতে নামিয়ে আনতে, দেবতার হাত থেকে তার শাস্তির হাতুড়ি কেড়ে নিতে।

এ প্রসঙ্গে দারিদ্র্যের কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। অনেক সভ্যতাই দারিদ্র্যকে তাদের ভুল-ত্রুটি ভরা সমাজের একটি অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবেই বিবেচনা করে এসেছে। নিউ টেস্টামেন্ট যিশুকে ক্রশবিদ্ধ করার কিছুক্ষণ আগে একজন নারী তাকে ৩০০ দিনেরিয়াস সমমূল্যের দামী তেল মালিশ করে দিচ্ছিলেন। এই দৃশ্য দেখে যীশুর অনুসারীরা আর্তনাদ করে তাকে এত দামী তেল মালিশ যীশুর গায়ে মালিশ না করে এই পরিমাণ অর্থ গরীব দু:খীদের মাঝে বিতরণ করে দিতে বললেন। যীশু তার অনুসারীদের শান্ত করলেন এবং রমণীকে বললেন ‘তুমি সাহায্য করার জন্য গরিবদের সবসময়ই তোমার আশেপাশে পাবে কিন্তু আমার সেবা করার এই তোমার শেষ সুযোগ’ (মার্ক ১৪:৭)। আজকের দিনে, যিশুর এই বক্তব্যের সাথে সহমত প্রকাশ করবে এমন লোকের সংখ্যা ক্রমশই কমে আসছে। দারিদ্র্যকে বর্তমানে একটি কৌশলগত সমস্যা হিসাবেই বিবেচনা করা হয় যার সমাধান অসম্ভব নয়। বর্তমানকালের সবারই সাধারণ বিশ্বাস হল কৃষি, অর্থনীতি, চিকিৎসা এবং সমাজবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক উদ্ভাবনগুলোকে কাজে লাগিয়ে একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা গেলে অবশ্যই দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

এমনকি, পৃথিবীর অনেক অংশই বর্তমানে দারিদ্র্যের চূড়ান্ত অমানবিক রূপ থেকে মুক্তি পেয়েছে। মানুষের ইতিহাসে আমরা সমাজে দুই ধরনের দারিদ্র্য দেখতে পাই। একটি সামাজিক দারিদ্র্য, যেখানে কিছু ব্যক্তি অন্য সকল ব্যক্তিকে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখে। দুই, জৈবিক দারিদ্র্য, যেখানে পরিমিত খাদ্য আর বাসস্থানের অভাবে কিছু মানুষ মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকে। সামাজিক দারিদ্র্য দূর করা সম্ভবত কখনই সম্ভব হবে না, তবে পৃথিবীর অনেক দেশেই জৈবিক দারিদ্র্যের বিষয়টি এখন ইতিহাস।

অথচ নিকট অতীতের ইতিহাস দেখলে আমরা বুঝতে পারব বেশিরভাগ মানুষই তখন দারিদ্র্যসীমার খুব কাছাকাছি বাস করত। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করলে একজন মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালরির সংস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই, হিসেবের একটু গরমিল বা কোন প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্ভোগ মানুষকে ঠেলে দিত অনিবার্য অনাহারের দিকে। এসব দুর্যোগ তাই প্রায়ই জনপদজুড়ে জন্ম দিত দুর্ভিক্ষের, যার পরিণাম লাখ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু। আজকের দিনে দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষেরই বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা আছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষ বীমা করার মাধ্যমে তার অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ-আপদ মোকাবেলা করতে পারে, সরকারী এবং অসংখ্য বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। কোনও অঞ্চলে দুর্যোগ দেখা দিলে সারা পৃথিবীর মানুষ সেই দুর্যোগ সৃষ্ট মানবেতর পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবীজুড়ে মানুষ আজও নানারকম প্রতিকূলতা, বঞ্চনা আর দারিদ্র্যজনিত অসুস্থতার শিকার হয়, তবে পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকাতেই মানুষ আজ অনাহারে মারা যায় না। এমনকি, পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে মানুষ আজ খাদ্যের অভাবের কারণে নয় বরং মাত্রাতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

গিলগামেশ প্রকল্প

এখন পর্যন্ত যে সমস্যাগুলোর সমাধান মানুষের সাধ্যের অতীতই থেকে গেছে, সেগুলোর মাঝে হতাশা, কৌতূহল আর গুরুত্বের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে যে সমস্যাটি, সেটি হলো ‘মৃত্যু’। আধুনিক যুগের শেষভাগের আগ পর্যন্ত বেশিরভাগ ধর্ম এবং মতবাদ ‘মৃত্যু’কে মানবজীবনের এক অনিবার্য নিয়তি হিসেবেই বিবেচনা করেছে। এমনকি, অনেক ধর্মবিশ্বাস মৃত্যুকেই একটি অর্থপূর্ণ জীবনের প্রধানতম উপাদান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। অমর মানুষের একটি সমাজে ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম বা প্রাচীন মিশরীয় ধর্মের অস্তিত্বের কথা একবার ভেবে দেখুন। এই ধর্মবিশ্বাসগুলো মানুষকে শিখিয়েছে মৃত্যুকে অস্বীকার করার চেষ্টা না করে বা চিরকাল পৃথিবীতে বসবাসের স্বপ্ন না দেখে মানুষের উচিত সঠিক কাজের মাধ্যমে নিজেকে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত করা। সেসময়কার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতেরা মৃত্যুকে অর্থপূর্ণ আর মহিমান্বিত করে তোলার চেষ্টায় মগ্ন ছিলেন, মৃত্যুকে ফাঁকি দেয়ার কথা তারা ভাবতেও পারেননি।

মৃত্যু সংক্রান্ত পৌরাণিক কাহিনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হলে প্রাচীন সুমেরের গিলগামেশের কাহিনী। এই কাহিনীর নায়ক ছিলেন উরুক রাজ্যের রাজা গিলগামেশ (King Gilgamesh of Uruk)। গিলগামেশ ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সামর্থ্যবান পুরুষ যিনি যুদ্ধে যে কাউকে অনায়াসে পরাস্ত করতে পারতেন। একদিন গিলগামেশের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু ইনকিদু মারা গেলেন। শোকে স্তব্ধ হয়ে গিলগামেশ অনেকদিন ইনকিদুর লাশের পাশে বসে থাকলেন। একদিন ইনকিদুর লাশের নাসারন্ধ্র দিয়ে কিলবিল করে একটি পোকা বের হয়ে এল। এই দৃশ্য দেখে গিলগামেশ প্রচন্ড ভয় আর হতাশায় কুঁকড়ে গেলেন এবং ঠিক করলেন তিনি মৃত্যুকে জয় করবেন। অনন্তজীবন লাভ করার জন্য তিনি যে করেই হোক একটা উপায় বের করবেন। এই লক্ষ্যে গিলগামেশ যাত্রা শুরু করলেন- চষে ফেললেন সমস্ত পৃথিবী, শিকার করলেন সিংহ, লড়াই করলেন ভয়ঙ্কর কাঁকড়াবিছে-মানব এর সাথে, পৌছে গেলেন পাতালপুরীতে। সেখানে গিয়ে তিনি পাথর দৈত্য উরশানবি আর মৃত্যু নদী পারাপারের মাঝির সাথে লড়াই করে তাদের চূর্ণ-বিচুর্ণ করলেন এবং খোঁজ পেলেন প্রাচীনতম বন্যার শেষ উত্তরজীবী উটনাপিশটিমের। কিন্তু, এতকিছু করেও শেষমেষ গিলগামেশের চেষ্টা ব্যর্থ হল। তিনি শূণ্য হাতে, আগের মতই মরণশীল বাড়ি ফিরে আসলেন। কিন্তু এতদিনে তিনি নতুন একটি বিষয় জেনেছেন- ঈশ্বর যখন মানুষকে সৃষ্টি করেন, তখন মৃত্যুকে তার জীবনের অনিবার্য নিয়তি হিসেবেই নির্দিষ্ট করে দেন, মানুষের উচিত এই অনিবার্য নিয়তির কথা মাথায় রেখেই সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে শেখা।

পরিবর্তনের পথের অনুসারীরা এরকম হার মেনে নেয়া দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত পোষণ করতে নারাজ। বিজ্ঞানের অনুসারীদের কাছে, মৃত্যু কোন অনিবার্য পরিণতি নয় বরং একটি কৌশলগত সমস্যা। বিধাতা মৃত্যুকে নিয়তি হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন বলেই মানুষ মরে না, বরং মানুষ মরে হৃদরোগ, ক্যানসার, জীবাণু সংক্রমনের মত নানারকম শারীরিক কৌশলগত সমস্যার কারণে। আর প্রতিটি কৌশলগত সমস্যারই একটি কৌশলগত সমাধান সম্ভব। যদি হৃদযন্ত্র সঠিকভাবে তার ক্রিয়াকর্ম না করতে পারে তবে পেসমেকার দিয়ে তার উদ্দীপনা বাড়ানো যেতে পারে বা হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। যদি শরীরে ক্যান্সার-আক্রান্ত কোষ ছড়িয়ে পড়ে তবে ওষুধ প্রয়োগে বা তেজস্ক্রিয়তার দ্বারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বেড়ে গেলে, অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তাদের সাথে মোকাবেলা করা যেতে পারে। একথা সত্যি, আমরা এখনও মৃত্যুর সবরকম কৌশলগত সমস্যার সমাধান জানি না। কিন্তু আমরা ক্রমাগত সেসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের সেরা মেধাবীরা মৃত্যুকে মহিমান্বিত করে তোলার কাজে ব্যস্ত নয়। বরং তারা রোগ-ব্যাধি এবং বাধর্ক্যের শারীরিক, হরমোনগত এবং জিনগত কারণ অনুসন্ধানে নিয়োজিত। প্রতিনিয়ত তারা আবিষ্কার করে চলেছেন নতুন নতুন ওষুধ, বৈপ্লবিক চিকিৎসা পদ্ধতি এবং প্রতিস্থাপনযোগ্য কৃত্রিম অঙ্গ যা আমাদের আয়ু বাড়াতে সহায়তা করছে। হয়ত, এই নিরলস প্রচেষ্টাই একদিন মানুষকে ‘মৃত্যু’ রূপী এই দৈত্যকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম করবে।

কিছুদিন আগেও আপনি বিজ্ঞানী বা অন্য কাউকে এ ব্যাপারে এরকম স্পষ্ট করে বলতে শোনেননি- ‘মৃত্যুকে জয় করা? বললেই হল! সে এখনও অ-নে-ক দূরের পথ! আমরা সবেমাত্র ক্যান্সার, যক্ষা আর আলঝেইমার রোগের চিকিৎসা করার চেষ্টা করছি’। আজকে মানুষ মৃত্যুকে জয় করার বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চায় না এ কারণে যে, লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাদের এখনও অনেক দেরি। অনর্থক প্রত্যাশার চাপ তৈরি করে কী লাভ? আমরা এখন এমন একটা অবস্থায় আছি যখন মৃত্যু নিয়ে আমরা স্পষ্টভাবে মন্তব্য করতে পারি। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সেরা প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য হলাে মানুষকে অনন্তজীবনের সন্ধান দেয়া। যদিও মৃত্যুকে জয় করা এখনও অনেক অনেক দূরের পথ, কিন্তু স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আমরা এমন কিছু উন্নতি করেছি, কয়েক শতক আগেও যা ছিল কল্পনার অতীত। ১১৯৯ সালে ইংল্যান্ডের সিংহ-হৃদয় রাজা রিচার্ড (King Richard the Lionheart) একটি তীর দ্বারা তার কাধে আঘাত পান। এটি এখনকার ঘটনা হলে আমরা বলতাম উনি কাঁধে সামান্য চোট পেয়েছেন। কিন্তু সেই ১১৯৯ সালে অ্যান্টিবায়োটিকসের উদ্ভাবন না হওয়ায় এবং ক্ষতস্থান জীবাণুমুক্ত রাখার কোন কার্যকর পদ্ধতি না থাকায় রাজার কাঁধের এই সামান্য চোটে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটল এবং বাসা বাঁধলো গ্র্যাংগ্রিন। বিশ-শতকের ইউরোপে শরীরে গ্র্যাংগ্রিনের বিস্তার এড়ানোর একটাই কার্যকর উপায় ছিল, সেটা হল- আক্রান্ত স্থান কেটে শরীর থেকে বাদ দেয়া। এক্ষেত্রে সংক্রমণটা যেহেতু কাঁধে, তাই আক্রান্ত অঙ্গ কেটে বাদ দেয়ার কোন উপায় থাকলো না। রাজার সারা শরীরে গ্যাংগ্রিন ছড়িয়ে পড়ল এবং কেউ তাকে কোন সাহায্য করতে পারল না। দুই সপ্তাহ পর নিদারুণ যন্ত্রণা নিয়ে রাজার মৃত্যু হল।

এমনকি ঊনবিংশ শতাব্দীতেও বিশ্বের সেরা চিকিৎসকরা আক্রান্ত কোষ-কলার পচন প্রতিরোধ বা পচন বন্ধ করার কোন কার্যকর উপায় জানতেন না। যুদ্ধে সৈন্যরা হাতে বা পায়ে সামান্য আঘাত পেলেই গ্যাংগ্রিনের আশঙ্কায় ডাক্তাররা নিয়মিতই আক্রান্ত পা বা হাত কেটে ফেলতেন। এই অঙ্গছেদন এবং দাঁত তুলে ফেলার মত সেকালের প্রচলিত অন্যান্য চিকিৎসা প্রক্রিয়াগুলো করা হত কোনোরকম চেতনানাশক ছাড়াই। ইথার, ক্লোরোফর্ম এবং মরফিনের মত প্রথম দিককার চেতনানাশকগুলো পশ্চিমা চিকিৎসা শাস্ত্রে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে। ক্লোরোফর্ম আবিষ্কারের আগে আক্রান্ত সেনার অঙ্গছেদনের সময় চারজন সৈন্যকে তার হাত-পা শক্ত করে ধরে রাখতে হত। ওয়াটারলু যুদ্ধের (১৮১৫) পরদিন সকালে যুদ্ধাহত সেনাদের সেবা দেয়া হাসপাতালগুলোর আশেপাশে আক্রান্ত সৈন্যদের কেটে ফেলা হাত ও পায়ের স্তুপ দেখা গেছে। সেকালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া কাঠমিস্ত্রী বা কসাইদেরকে প্রায়ই সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য সেবা শাখায় পাঠানো হতো। কারণ, তখন ছুরি এবং করাতের ব্যবহার জানাই ছিল অস্ত্রোপচার করার মূল যোগ্যতা।

ওয়াটারলু যুদ্ধের মাত্র দুশ বছরের মাঝেই এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। যেসব অসুখ এবং জখম আগে আমাদের অবধারিত মৃত্যু ডেকে আনত, আজ ওষুধ, ইনজেকশন আর সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সহজেই আমরা এসব থেকে আরোগ্য লাভ করতে পারি। এগুলো আমাদেরকে প্রতিদিনের নানারকম ব্যাথা-বেদনা এবং অসুস্থতা থেকেও রক্ষা করে যেগুলোকে আগে মানুষ তাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবেই মেনে নিত। পুরো বিশ্বে গড় আয়ু ২৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০ বছর, বর্তমানে বিশ্বের মানুষের গড় আয়ু ৬৭ বছর। উন্নত দেশে এই গড় আয়ুর মান প্রায় ৮০ বছর।৮

সবচেয়ে বেশি কমেছে শিশু মৃত্যুর হার। বিশ শতক পর্যন্ত, কৃষিপ্রধান সমাজগুলোতে এক-চতুর্থাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ শিশু পূর্ণবয়স্ক হবার আগেই মৃত্যুবরণ করত। ডিপথেরিয়া, হাম এবং গুটিবসন্ত ছিল শিশুদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী রোগ। সপ্তদশ শতকের ইংল্যান্ডে প্রতি হাজার জন সদ্য জন্ম নেয়া শিশুদের মাঝে ১৫০ জনই তাদের বয়স ১ বছর পূরণ হবার আগেই মারা যেত, বয়স ১৫ পূরণ হবার আগেই মারা যেত এক-তৃতীয়াংশ শিশু।৯ আজকের দিনে হাজার জন শিশুর মাঝে মাত্র ৫ জন শিশু ১ বছর বয়সের আগেই মারা যায়, ১৫ বয়স পূর্ণ হবার আগে মারা যায় হাজারজনে মাত্র ৭ জন।১০

এসব সংখ্যা আর পরিসংখ্যান সরিয়ে আমরা যদি কিছু গল্প বলি তাহলে পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে আরেকটু স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। এ প্রসঙ্গে রাজা প্রথম এডওয়ার্ড (১২৩৭-১৩০৭) এবং তার স্ত্রী রাণী ইলিনরের (১২৪১-৯০) পরিবার একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। মধ্যযুগের ইউরোপে একজন শিশু যতটা যত্ন আর পরিচর্যা পেতে পারে তাদের সন্তানরা তার সবই পেয়েছে। তারা বাস করত প্রাসাদে, তাদের ছিল খাদ্যের প্রাচুর্য, পর্যাপ্ত শীতপোশাক, ঘর গরম রাখবার ফায়ারপ্লেস, পরিষ্কার পানীয় জলের যোগান এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত ছিল এক গাদা দাস-দাসী এবং চিকিৎসক। নিচে আমরা রাণী ইলিনরের ১২৫৫ থেকে ১২৮৪ সাল পর্যন্ত জন্ম দেয়া ১৬ জন সন্তানের ব্যাপারে জানব-

১। নামহীন কন্যা সন্তান, ১২৫৫ সালে জন্ম, জন্মের সময়ই মারা যান।

২। কন্যা ক্যাথরিন, সম্ভবত: এক বছর বা তিন বছর বয়সে মারা যান।

৩। কন্যা জোয়ান, ছয় মাস বয়সে মারা যান।

৪। পুত্র জন, পাঁচ বছর বয়সে মারা যান।

৫। পুত্র হেনরি, ছয় বছর বয়সে মারা যান।

৬। কন্যা ইলিনর, উনত্রিশ বছরে মারা যান।

৭। নামহীন কন্যা, পাঁচ মাস বয়সেই মারা যান।

৮। কন্যা জোয়ান, পয়ত্রিশ বছর বয়সে মারা যান।

৯। পুত্র আলফনসো, দশ বছর বয়সে মারা যান।

১০। কন্যা মার্গারেট, আটান্ন বছর বয়সে মারা যান।

১১। কন্যা বারেঞ্জেরিয়া, দুই বছর বয়সে মারা যান।

১২। নামহীন কন্যা, জন্মের পরপরই মারা যান।

১৩। কন্যা ম্যারি, তেপান্ন বছর বয়সে মারা যান।

১৪। নামহীন পুত্র, জন্মের পরপরই মারা যান।

১৫। কন্যা এলিজাবেথ, চৌত্রিশ বছর বয়সে মারা যান।

১৬। পুত্র এডওয়ার্ড।

পুত্র সন্তানদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এ্ডওয়ার্ডই কেবল শৈশবের ভয়ঙ্কর বছরগুলো পার হয়ে আসতে পেরেছেন এবং পিতার মৃত্যুর পর তিনিই দ্বিতীয় রাজা এডওয়ার্ড হিসাবে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, ব্রিটেনের রাণী হিসেবে এলিনরের প্রধান কর্তব্য ছিল রাজার পুরুষ উত্তরাধিকারীর জন্ম দেওয়া, আর সেই কর্তব্য ঠিকমতো পালন করতে তাকে চেষ্টা করতে হয়েছে ষোল বার।। রাজা দ্বিতীয় এ্ডওয়ার্ডের মা নিঃসন্দেহে একজন অসাধারণ ধৈর্যশীল এবং সহিষ্ণু রমণী ছিলেন। এডওয়ার্ডের স্ত্রী ফ্রান্সের ইসাবেলা অতটা ধৈর্য্ প্রদর্শন করতে পারেননি। ৪৩ বছর বয়সী রাজাকে তিনি হত্যা করেন।১১

যতদূর জানা যায়, ইলিনর এবং প্রথম এডওয়ার্ড স্বাস্থ্যবান দম্পতি ছিলেন এবং তাদের বংশধরদের মাঝে কোন জন্মগত অসুস্থতা ছিল না। তা সত্ত্বেও, ষোল জন সন্তানের মাঝে দশ জনই, অর্থাৎ প্রায় বাষট্টি শতাংশেরই মৃত্যু ঘটে শৈশবে। মাত্র ছয় জন এগার বছরের বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিল এবং এদের মাঝে মাত্র তিন জন, অর্থাৎ কেবল আঠার শতাংশের বয়স চল্লিশের কোঠা অতিক্রম করতে পেরেছে। জন্ম দেয়া এই সন্তানগুলো বাদেও সম্ভবত: ইলিনর আরও কয়েকবার গর্ভবতী হয়েছিলেন, গর্ভেই সেসব সন্তানের মৃত্যু হয়। গড়ে এ্ডওয়ার্ড এবং ইলিনর প্রতি তিন বছর পর পর একে একে তাদের দশজন সন্তানকে হারিয়েছেন। আজকের দিনের একজন দম্পতির পক্ষে সন্তানদের এরকম মৃত্যুর স্রোত কল্পনা করাও কঠিন।

এখন প্রশ্ন, গিলগামেশের অভিযান, অর্থাৎ অমরত্বের পথে মানুষের যাত্রা সফল হতে আর কত দেরি? একশ বছর? পাঁচশ বছর? হাজার বছর? যদি আমরা খতিয়ে দেখি ১৯০০ সালে আমরা মানবদেহ সম্পর্কে কত কম জানতাম, আর মাত্র এক শতকে আমরা মানব দেহ সম্পর্কে কত নতুন কিছু জানতে পেরেছি, সেটা হয়তো আমাদের অমরত্বের ব্যাপারে কিছুটা হলেও আশাবাদী করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিককালে জিনবিজ্ঞানীরা সিনরহাবডিটিস এলিগেনস (Caenorhabditis elegans) নামক কেঁচোজাতীয় পোকার কাঙ্ক্ষিত আয়ু প্রায় দ্বিগুণ করতে সক্ষম হয়েছেন।১২ মানুষের ক্ষেত্রেও কি তারা তেমনটা করতে সক্ষম হবেন? ন্যানোপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা লক্ষ লক্ষ ক্ষুদে রোবটের সমন্বয়ে একটি বায়োনিক রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা তৈরি নিয়ে কাজ করছেন, যেই রোবটগুলো আমাদের শরীরে বসবাস করবে, বন্ধ হয়ে যাওয়া রক্তনালীগুলোকে সচল করবে, ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার সাথে লড়াই করবে, ক্যানসার কোষ ধ্বংস করবে, এমনকি বুড়িয়ে যাওয়ার পদ্ধতিকেও উল্টো পথে চালিত করবে।১৩ কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ কিছু মানুষ ‘অজর’ হতে পারবে (‘অমর’ নয়, কারণ তারা দুর্ঘটনায় মারা যেতেই পারে, কোনও জরা ব্যাধি তাদের আক্রান্ত করবে না, কোনও দুর্ঘটনা না ঘটলে তারা অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবেন)।

গিলগামেশের অমরত্বের এই অভিযাত্রা সফল হোক আর নাই হোক, ঐতিহাসিক দিক থেকে একটা চমৎকার পরিবর্তনের সূচনা কিন্তু হয়ে গেছে। অধিকাংশ উত্তর-আধুনিক ধর্ম এবং ধ্যান-ধারণা মৃত্যু এবং মৃত্যুর পরের জীবনের হিসেব-নিকেশ ছাড়াই গড়ে উঠেছে। অষ্টাদশ শতকের আগ পর্যন্ত ধর্ম এবং দর্শন, মৃত্যু এবং তার পরের ঘটনাকেই অর্থপূর্ণ জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, সমাজতন্ত্র, নারীবাদের মত অষ্টাদশ শতক থেকে শুরু হওয়া ধর্ম এবং দর্শনগুলো পরজন্মের প্রতি কোন আগ্রহ না দেখিয়েই বেড়ে উঠেছে। মৃত্যুর পর একজন কম্যুনিস্টের জীবনে কী ঘটে? কী ঘটে একজন পুঁজিবাদীর জীবনে? একজন নারীবাদীর পরজন্মই বা কেমন? মার্ক্স, অ্যাডাম স্মিথ বা সিমন দ্য বুভেয়ারের গ্রন্থে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন। আধুনিক দর্শনগুলোর মধ্যে একমাত্র জাতীয়তাবাদই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। জাতির অসহায় এবং কাব্যময় মুহূর্তগুলোতে জাতীয়তাবাদ প্রতিশ্রুতি দেয় জাতির সম্মান রক্ষায় যে প্রাণ উৎসর্গ করবে, সমগ্র জাতির স্মৃতিতে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু মৃত্যুকেন্দ্রিক হলেও এই প্রতিশ্রুতি এতটাই ঠুনকো যে অনেকসময় অনেক কট্টর জাতীয়তাবাদীও ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না, মৃত্যুর পর জাতির সমস্ত মানুষের স্মৃতিতে ঠাঁই করে নিয়ে তার লাভটা কোথায়।

বিজ্ঞানের রক্ষক পিতা

আমরা এখন যন্ত্রের যুগে বাস করছি। অনেকেই বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির মাঝেই নিহিত আছে মানুষের সব প্রশ্নের উত্তর। আমরা কেবল বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেব এবং তারা নিয়ে আসবে ধুলোকাদার পৃথিবীতে স্বর্গের সুষমা। কিন্তু বিজ্ঞান নামক প্রতিষ্ঠানটি মানুষের চেয়ে বড় কোন নৈতিক বা আধ্যাত্মিক সত্ত্বার উপর ভর করে গড়ে ওঠেনি। সংস্কৃতির অন্যান্য উপাদানগুলোর মতই, সমাজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় পরিস্থিতিগুলোই এর প্রকৃতি গড়ে তুলেছে।

বিজ্ঞানের সাথে জড়িয়ে থাকে বড় অঙ্কের খরচ। মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বুঝতে চান যে বিজ্ঞানী তার নিদেনপক্ষে দরকার একটি গবেষণাগার, টেস্টটিউব, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র। এছাড়া গবেষণা সহকারী, বিদ্যুতের মিস্ত্রী, জলের পাইপের মিস্ত্রী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এসব তো আছেই। একজন অর্থনীতিবিদ যিনি একটি বাজারের ঋণের প্রকৃতি অনুধাবন করতে চান তার অবশ্যই দরকার কম্পিউটার, বাজার সম্পর্কিত অনেক তথ্য এবং দরকার জটিল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রোগ্রাম। একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ যিনি প্রাচীনকালের শিকারী-সংগ্রাহকের জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে চান তাকে বহু দূরে যাত্রা করতে হবে, খনন করতে হবে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এবং পুরনো জীবাশ্ম ও জিনিসপত্রের বয়স নির্ধারণ করতে হবে। এসব কিছুর জন্যই অর্থের প্রয়োজন।

গত ৫০০ বছরে বিজ্ঞান যে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করতে পেরেছে তার মূল কারণ হলো বিভিন্ন দেশের সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও দাতা সংস্থার বিজ্ঞানের গবেষণায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের সদিচ্ছা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানতে, পৃথিবীর মানচিত্র নির্মাণে এবং প্রাণীজগতের সুনির্দিষ্ট বিন্যাস করার ব্যাপারে যে কৃতিত্ব দেখিয়েছে, গ্যালিলিও গ্যালিলি, ক্রিস্টোফার কলম্বাস এবং চার্লস ডারউইন ততটা কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। কোনও একজন বিশেষ প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর যদি জন্ম নাও হত, অন্য সময়ে, পৃথিবীর অন্য কোথাও তার সমকক্ষ মেধার একজন কেউ হয়ত জন্ম নিতেন। কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ অর্থের যোগান না দিলে, কোনও মেধাবীই সেটার অভাব পূরণ করতে পারতেন না। উদাহরণস্বরূপ, যদি ডারউইনের জন্ম না হত, তাহলে বিবর্তনবাদ আবিষ্কারক হিসাবে আমরা হয়ত আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসকে কৃতিত্ব দিতাম। কারণ, তিনি ডারউইনের বিবর্তনবাদ আবিষ্কারের কয়েক বছর পর নিজে স্বাধীনভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো যদি ভূগোল, প্রাণীবিজ্ঞান এবং উদ্ভিদবিজ্ঞানের গবেষণার জন্য যথেষ্ট অর্থের বরাদ্দ না করত, তাহলে ডারউইন বা ওয়ালেস বিবর্তনের তত্ত্ব দাঁড়া করানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পরীক্ষণলব্ধ তথ্য পেতেন না। খুব সম্ভবত, এসব তথ্য না থাকলে বিবর্তন সংক্রান্ত কোন তত্ত্ব আবিষ্কারের কোন চেষ্টা করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না।

এই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কী উদ্দেশ্যে সরকারের কোষাগার আর ব্যবসার তহবিল থেকে গবেষণাগার আর বিশ্ববিদ্যালয়ে উড়ে যায়? প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জগতে, অনেকেই বোকার মত শুদ্ধ বিজ্ঞানের চর্চায় বিশ্বাস করে থাকেন। তাদের বিশ্বাস, সরকার এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোন স্বার্থ ছাড়াই মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে এই অর্থ বরাদ্দ করেন যাতে বিজ্ঞানীরা তাদের স্বাধীন ইচ্ছা অনুসারে গবেষণা করতে পারেন। কিন্তু, বিজ্ঞানের অর্থায়নের প্রকৃত উদ্দেশ্য এই ধ্যান ধারণার সাথে ভীষণ রকম সাংঘর্ষিক।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অথবা ধর্মীয় লক্ষ্য পূরণ করবে এই আশায় বেশিরভাগ গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ষোড়শ শতকে রাজা এবং ব্যাংকারগণ নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের অভিযানে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বিনিয়োগ করেছে কিন্তু মনোবিজ্ঞানের গবেষণার পেছনে একটা পয়সাও খরচ করেনি। কারণ, রাজা এবং ব্যাংকারদের ধারণা ছিল ভূগোল সংক্রান্ত নতুন জ্ঞান তাদের নতুন ভূখণ্ড দখল এবং নতুন ব্যবসায়িক কেন্দ্র স্থাপনে সহায়তা করবে, অন্যদিকে একটি শিশুর মনস্তত্ত্ব আবিষ্কারের পেছনে তারা কোন মুনাফার সম্ভাবনা দেখতে পায়নি।

১৯৪০ এর দশকে আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকার জলজ প্রত্নতত্ত্বের চেয়ে নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যা গবেষণায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলেন। কারণ তাদের ধারণা ছিল যে, নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যা নিয়ে বেশি বেশি গবেষণা হলে তা তাদেরকে নতুন নিউক্লিয়ার অস্ত্র, বোমা বানাতে সহায়তা করবে, কিন্তু পানির নিচের প্রত্নতত্ত্ব তাদের যুদ্ধ জয়ের ক্ষেত্রে তেমন সাহায্য করবে না। বিজ্ঞানীরা অনেক সময়েই অর্থের জোগানদাতাদের এইসব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন না; অনেক বিজ্ঞানীই বিজ্ঞানের প্রতি বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতুহল থেকেই বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে যান। বিজ্ঞানের লক্ষ্য কী হবে, তা খুব কম ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করার সুযোগ পান।

যদি আমরা কোন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অথবা ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছাড়া বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ করতেও চাইতাম, তা বাস্তবে করা সম্ভবপর হত না। তার প্রধান কারণ, আমাদের সম্পদের পরিমাণ সীমিত। একজন সংসদ সদস্যকে জাতীয় বিজ্ঞান সমিতির প্রাথমিক গবেষণা কাজের জন্য কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিন, তিনি সঙ্গতকারণেই জিজ্ঞেস করবেন, এর চেয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে বা একটি ডুবতে বসা কারখানার কর রেয়াতের কাজে এই অর্থ ব্যয় করলে তা কি বেশি কার্যকর হবে না? সীমিত সম্পদের বন্টনের জন্য সবসময় আমাদের যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হয় তা হল- ‘কোন কাজটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?’ এবং ‘কোন কাজটি কল্যাণকর?’। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিজ্ঞানের আলোচনার বিষয় নয়। বিজ্ঞান দুনিয়াতে কী কী আছে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়, কোন জিনিসটি কীভাবে কাজ করে তা জানায় এবং ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে আমাদের একটা ধারণা দেয়। সংজ্ঞানুযায়ীই, ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হওয়া উচিত এই প্রশ্নটি বিজ্ঞানের আওতার বাইরে। ধর্ম এবং দর্শনগুলোই কেবল এই ধরনের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করে।

এখন, ধরা যাক- একই রকম পেশাদারী যোগ্যতাসম্পন্ন, একই বিভাগের জীববিজ্ঞানের দুইজন অধ্যাপক তাদের বর্তমান গবেষণা বাবদ এক কোটি টাকা বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছেন। অধ্যাপক স্লাগহর্ণ চান গরুর একটি অসুখ নিয়ে গবেষণা করতে যে অসুখের কারণে গরুর দুধ উৎপাদনের পরিমাণ দশ শতাংশ কমে যাচ্ছে। অপরদিকে অধ্যাপক স্প্রাউট বাছুরকে মা গরুর থেকে আলাদা করা হলে মা গরু মানসিক অবসাদে ভোগে কী না তা নিয়ে গবেষণা করতে চান। অর্থের পরিমাণ যদি সীমিত হয় এবং দু’টো প্রকল্পে অর্থায়ন করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ না থাকে, তাহলে কোন প্রকল্পে অর্থায়ন করা উচিত?

এই প্রশ্নের কোন বৈজ্ঞানিক উত্তর নেই। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ প্রশ্নের নানারকম উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে। আজকের দুনিয়ার অবস্থা চিন্তা করলে প্রফেসর স্লাগহর্ণের প্রকল্পে অর্থায়ন হওয়ার সুযোগ বেশি। এই কারণে নয় যে, শারীরিক অসুখ নিয়ে গবেষণা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণার চেয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে বেশি কৌতূহলোদ্দীপক, বরং একারণে যে, প্রথম গবেষণা থেকে দুগ্ধ শিল্পের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবার সম্ভাবনা দ্বিতীয় গবেষণা থেকে বেশি।

আবার ঘটনাটি যদি একটি হিন্দু সমাজে হয়, যেখানে গরু একটি পবিত্র প্রাণী বা এমন কোন সমাজে যেখানকার মানুষজন প্রাণীদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার, সেখানে অধ্যাপক স্প্রাউটের প্রজেক্টে অর্থায়ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু যখন তিনি এমন এক সমাজে বাস করছেন যেখানে গরুর দুধের ব্যবসায়িক মূল্য এবং মানুষের স্বাস্থ্যের গুরুত্ব অন্য কোন প্রাণীর মানসিক স্বাস্থ্যের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন তাকে এসব কথা মাথায় রেখেই তার গবেষণার প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি তার প্রস্তাবনায় লিখতে পারেন- ‘মানসিক হতাশা গাভীর দুধ উৎপাদনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। আমরা যদি গাভীর মানসিক অবস্থা বুঝতে পারি, তাহলে আমরা হয়ত এমন কিছু ওষুধ তৈরি করতে পারব যা তাদেরকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করবে এবং ফলস্বরূপ ১০ শতাংশ পর্যন্ত দুধের উৎপাদন বাড়বে। আমার ধারণা, পৃথিবীতে গাভীর মানসিক ওষুধের বাৎসরিক চাহিদা ২৫০ মিলিয়ন ডলার।’

বিজ্ঞান তার নিজের জন্য প্রয়োজনীয় বা গুরুত্বপূর্ণ কী তা নির্ধারণে অক্ষম। বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে কোন কাজে লাগানো হবে তার কোনও ধারণাও বিজ্ঞানের পক্ষে করা সম্ভব নয়। যেমন- বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এটা নির্ণয় করা কঠিন যে, জিন বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান জ্ঞান মানুষের কোন কাজে লাগতে পারে। এই জ্ঞান কি আমরা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহার করব, নাকি এই জ্ঞান প্রয়োগ করে বিশাল ক্ষমতাসম্পন্ন সুপারম্যানের জাতি তৈরি করব নাকি এই জ্ঞান কাজে লাগাব বড় ওলান বিশিষ্ট গাভী উৎপাদনে? একথা স্পষ্ট যে একটি গণতান্ত্রিক সরকার, সমাজতান্ত্রিক সরকার, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার বা একটি পুঁজিবাদী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই একই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে বিভিন্নভাবে তাদের নিজেদের সুবিধার অনুকূলে ব্যবহার করবে। এর কোন ব্যবহারকেই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যটির চেয়ে ভাল বা খারাপ বলা যায় না।

সংক্ষেপে বলা যায়, কোন ধর্মীয় বা দর্শনের সহায়তাতেই কেবল বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণার বিকাশ ঘটে। একটি নির্দিষ্ট মতবাদই কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাথে জড়িত অর্থায়নের ন্যায্যতা প্রমাণ করে। বিনিময়ে, সেই মতাদর্শ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের গতিপথকে প্রভাবিত করে এবং সেই আবিষ্কার কী কাজে লাগবে তা নির্ধারণ করে দেয়। সুতরাং, মানুষ অন্য কোন জায়গায় না গিয়ে কেন অ্যালামোগরডো বা চাঁদে গেলো তা সঠিকভাবে বুঝতে গেলে কেবল পদার্থবিদ, জীববিজ্ঞানী আর সমাজবিজ্ঞানীদের অর্জনের কথা জানলেই চলবে না। জানতে হবে সেসব মতাদর্শ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি সম্পর্কে যারা পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা এবং সমাজবিজ্ঞানকে গড়েছে, নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তাদের চলার পথ।

এই শক্তিগুলোর মধ্যে দুটো শক্তির দিকে বিশেষভাবে নজর দেয়া দরকার- সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদ। অনেকের মতে, বিজ্ঞান, সাম্রাজ্য এবং পুঁজির চক্রই গত ৫০০ বছর ধরে ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করব। প্রথমে আমরা দেখব বিজ্ঞান ও সাম্রাজ্য এই দুই শক্তি কীভাবে এক মোহনায় এসে মিলিত হল, তারপর আমরা জানব এই দুইজন কীভাবে পুঁজির অর্থের বিশাল বড়শিতে আটকে গেল।


1 David Christian, Maps of Time: An Introduction to Big History (Berkeley: University of California Press, 2004), 344–5; Angus Maddison, The World Economy, vol. 2 (Paris: Development Centre of the Organization of Economic Co-operation and Development, 2001), 636; ‘Historical Estimates of World Population’, US Census Bureau, accessed 10 December 2010, http://www.census.gov/ipc/www/worldhis.html.

2 Maddison, The World Economy, vol. 1, 261.

3 ‘Gross Domestic Product 2009’, the World Bank, Data and Statistics, accessed 10 December 2010, http://siteresources.worldbank.org/DATASTATISTICS/Resources/GDP.pdf.

4 Christian, Maps of Time, 141.

5 The largest contemporary cargo ship can carry about 100,000 tons. In 1470 all the world’s fleets could together carry no more than 320,000 tons. By 1570 total global tonnage was up to 730,000 tons (Maddison, The World Economy, vol. 1, 97).

6 The world’s largest bank – the Royal Bank of Scotland – has reported in 2007 deposits worth $1.3 trillion. That’s five times the annual global production in 1500. See ‘Annual Report and Accounts 2008’, the Royal Bank of Scotland, 35, accessed 10 December 2010, http://files.shareholder.com/downloads/RBS/626570033}0}278481/eb7a003a-5c9b-41ef-bad3–81fb98a6c823/RBS_GRA_2008_09_03_09.pdf.

7 Ferguson, Ascent of Money, 185–98.

8 Maddison, The World Economy, vol. 1, 31; Wrigley, English Population History, 295; Christian, Maps of Time, 450, 452; ‘World Health Statistic Report 2009’, 35–45, World Health Organization, accessed 10 December 2010 http://www.who.int/whosis/whostat/EN_WHS09_Full.pdf.

9 Wrigley, English Population History, 296.

10 ‘England, Interim Life Tables, 1980–82 to 2007–09’, Office for National Statistics, accessed 22 March 2012 http://www.ons.gov.uk/ons/publications/re-reference-tables.html?edition=tcm%3A77–61850.

11 Michael Prestwich, Edward I (Berkeley: University of California Press, 1988), 125–6.

12 Jennie B. Dorman et al., ‘The age-1 and daf-2 Genes Function in a Common Pathway to Control the Lifespan of Caenorhabditis elegans’, Genetics 141:4 (1995), 1,399–406; Koen Houthoofd et al., ‘Life Extension via Dietary Restriction is Independent of the Ins/IGF-1 Signalling Pathway in Caenorhabditis elegans’, Experimental Gerontology 38:9 (2003), 947–54.

13 Shawn M. Douglas, Ido Bachelet and George M. Church, ‘A Logic-Gated Nanorobot for Targeted Transport of Molecular Payloads’, Science 335:6070 (2012): 831–4; Dan Peer et al., ‘Nanocarriers As An Emerging Platform for Cancer Therapy’, Nature Nanotechnology 2 (2007): 751–60; Dan Peer et al., ‘Systemic Leukocyte-Directed siRNA Delivery Revealing Cyclin Di as an Anti-Inflammatory Target’, Science 319:5863 (2008): 627–30.

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s