১৬. পুঁজিবাদের দর্শন

 

সাম্রাজ্য তৈরি আর বিজ্ঞানের বিকাশের পিছনে টাকার বড় রকমের ভূমিকা ছিল ঠিকই। কিন্তু টাকাই কি এই দুটো কাজের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল?

ইতিহাসে অর্থনীতির আসল ভূমিকাটা চট করে বুঝে ওঠা যায় না। টাকা যুগে যুগে সাম্রাজ্য তৈরি আর ধ্বংস করেছে, নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, শিল্পকারখানার চাকা ঘুরিয়েছে, আবার লাখ লাখ মানুষকে বানিয়েছে দাস, শত শত প্রাণী আর উদ্ভিদকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে এই টাকাই। সেসব নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বই লিখে ফেলা যায়। অথচ মাত্র একটা শব্দে এর পুরোটা বুঝিয়ে দেওয়া যায়- ‘বৃদ্ধি’। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর অবস্থা ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন, অর্থনীতির বৃদ্ধি কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। সে সামনে যা পায় সেটাই গ্রাস করে, আর সাথে সাথেই আরও বড় হয়ে যায় চোখের পলকে।

ইতিহাসের শুরুর বেশিরভাগ সময় জুড়েই অর্থনীতি মোটামুটি স্থবির ছিল। হ্যাঁ, পৃথিবীর মোট উৎপাদন বেড়েছে বটে, কিন্তু সেটা হয়েছে মানুষের নতুন নতুন জায়গায় যাওয়া আর নতুন নতুন দেশ আবিষ্কারের জন্য। মাথাপিছু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়েনি। কিন্তু এই আধুনিক যুগে এসেই পরিস্থিতি পালটে গেল। ১৫০০ সালে পৃথিবীর সব পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট উৎপাদন ছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি ডলারের মতো। আর আজকে সেটা প্রায় ৬০ লক্ষ কোটি ডলার! তার চেয়ে বড় কথা, ১৫০০ সালে মাথাপিছু উৎপাদনের মূল্য ছিল বছরে গড়ে ৫৫০ ডলার, আর আজকের দিনে সকল নারী-পুরুষ-শিশু মিলে গড় বার্ষিক মাথাপিছু উৎপাদন ৮৮০০ ডলার হয়ে গেছে!১ এই বিপুল বৃদ্ধির কারণটা কী?

অর্থনীতি বেশ বাজে রকমের জটিল বিষয়। তার মধ্যেও আসুন একটা সহজ উদাহরণ দেখি।

ধরুন, ক্যালিফোর্নিয়ার এল ডোরাডোর তুখোড় পুঁজিপতি স্যামুয়েল গ্রিডি একদিন একটা ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করলেন।

একই শহরের উঠতি ঠিকাদার এ এ স্টোন তার প্রথম বড় কাজটা শেষ করে হাতে পেলেন নগদ লাখ দশেক ডলার। সেটা নিয়ে তিনি সোজা চলে গেলেন গ্রিডির ব্যাঙ্কে জমা করে দিতে। এখন ব্যাঙ্কের পুঁজির পরিমাণ হয়ে গেল দশ লাখ ডলার।

এদিকে শহরের একজন ঝানু রাঁধুনি জেন ম্যাকডোনাট খেয়াল করলেন যে, শহরে ভালো কোনো বেকারি নেই, কাজেই এই সুযোগ একটা নতুন ব্যবসা শুরু করার। কিন্তু সেটা করার মতো টাকা তার কাছে নেই। কাজেই তিনিও গেলেন ব্যাঙ্কে, গিয়ে গ্রিডিকে বোঝালেন যে এই বেকারিটা হবে টাকা খাটানোর মোক্ষম জায়গা। বুঝিয়ে সুঝিয়ে তিনি দশ লাখ ডলার ধার নেওয়ার ব্যবস্থাও করে ফেললেন। ব্যাঙ্কের হিসাবের খাতায় তার নামের পাশে যোগ হল দশ লাখ ডলার।

এখন বেকারি তৈরি করে দেওয়ার জন্য ম্যাকডোনাট গিয়ে ধরলেন ঠিকাদার স্টোনকে। এই কাজ বাবদ স্টোন চাইলেন দশ লক্ষ ডলার।

ম্যাকডোনাট স্টোনকে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে দশ লাখ ডলারের একটা চেক ধরিয়ে দিলেন। স্টোন সেটা জমা করলেন নিজের অ্যাকাউন্টে।

তাহলে ব্যাঙ্কে স্টোনের অ্যাকাউন্টে এখন কত আছে? ঠিক ধরেছেন, বিশ লাখ ডলার।

কিন্তু ব্যাঙ্কের সিন্দুকে নগদ ডলার আছে কত? দশ লাখ!

এখানেই শেষ নয়। দুমাস পর স্টোন ম্যাকডোনাটকে জানালেন, এদিক-সেদিক দিয়ে খরচ বেড়ে গিয়ে এখন আর দশ লাখ ডলারে বেকারিটা তৈরি করা যাচ্ছে না, পুরোটা শেষ করতে মোট খরচ বিশ লাখ ডলারে দাঁড়াবে। ম্যাকডোনাট এতে খুশি না হলেও, কাজ তো আর মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া যায় না, তাই তিনি আবার গেলেন ব্যাঙ্কে, গিয়ে গ্রিডিকে বুঝিয়ে আরও দশ লাখ ডলার ধার করে আনলেন নিজের অ্যাকাউন্টে। তারপর সেটা পাঠিয়ে দিলেন স্টোনের অ্যাকাউন্টে।

তাহলে এখন স্টোনের অ্যাকাউন্টে কত জমল? ত্রিশ লাখ।

কিন্তু ব্যাঙ্কে আছে কত? ব্যাঙ্ক কিন্তু সেই শুরু থেকেই মাত্র দশ লাখ ডলার নিয়ে বসে আছে।

আমেরিকার বর্তমান আইন অনুযায়ী ব্যাঙ্কটা এই কাজ আরও সাতবার করতে পারে, অর্থাৎ স্টোনের অ্যাকাউন্টের অঙ্কটা ১ কোটিতে গিয়েও ঠেকতে পারে, যদিও ব্যাঙ্কের সিন্দুকে সেই দশ লাখই সম্বল। একটা ব্যাঙ্ক তার কাছে থাকা প্রতি ডলারের বিপরীতে দশ ডলার পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। তার মানে হল এখনকার দিনে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে যত টাকা দেখা যায় তার ৯০ শতাংশই আসলে কাগজের নোট কিংবা ধাতব মুদ্রার আকারে নেই।২ আজ যে কোনো একটা বড় ব্যাঙ্কের সব গ্রাহক যদি একই সাথে যার যার অ্যাকাউন্টের সব টাকা তুলে নিতে চায়, সেই ব্যাঙ্ক কিছুক্ষণের মধ্যেই পথে বসবে (যদি না সরকারি সাহায্য মেলে)।

পুরো ব্যাপারটাকে কি একটা বিরাট ধোঁকাবাজি মনে হচ্ছে? তাই যদি হয়, তাহলে বর্তমান পৃথিবীর সম্পূর্ণ অর্থনীতিই একটা বিশাল ধোঁকা ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু আসলে এটা ধোঁকাবাজি নয়, বরং মানুষের কল্পনাশক্তির একটা চরম নিদর্শন। আমরা অনাগত ভবিষ্যতের উপর ভরসা রাখি, আর সেই ভরসার ভিত্তিতেই ব্যাঙ্কগুলো টিকে থাকে, অর্থনীতি এগিয়ে যায়। পৃথিবীর প্রায় সবটুকু টাকাপয়সার গোড়ায় আছে এই বিশ্বাস।

উপরের গল্পে স্টোনের অ্যাকাউন্টের টাকা আর ব্যাঙ্কের সম্পদের পার্থক্যটাই হল ম্যাকডোনাটের টাকা। এই টাকাটা গ্রিডি পুঁজি হিসেবে খাটিয়েছেন আরও টাকা তৈরির আশায়। বেকারি থেকে একটা রুটিও তৈরি হয়নি এখনও, অথচ গ্রিডি আর ম্যাকডোনাট দুজনেই আশা করছেন যে বছর খানেকের মধ্যেই এই বেকারি থেকে অনেক রুটি, কেক আর বিস্কুট তৈরি হবে, সেগুলো বিক্রি করে আসবে লাভের টাকা। সেই টাকা দিয়ে ম্যাকডোনাট তার ঋণ সুদসহ শোধ করে দিতে পারবেন। তখন যদি স্টোন তার অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা তুলে নিতে চান, গ্রিডিও সেটা দিতে পারবেন। তার মানে সবকিছুই হচ্ছে একটা কাল্পনিক ভবিষ্যতের উপর বিশ্বাস রেখে। ব্যাঙ্ক মালিক আর বেকারি মালিক বিশ্বাস করে একদিন বেকারিটা ঠিকমতো চলবে, আর ঠিকাদার বিশ্বাস করে একদিন ব্যাঙ্কে টাকা আসবে।

আমরা আগেই দেখেছি, টাকার যেকোনো কিছুতে পরিণত হওয়ার একটা বিস্ময়কর ক্ষমতা আছে, আবার যেকোনো কিছুকে অন্য যেকোনো কিছুতে পরিণত করার ক্ষমতাও আছে। তবে আগে এই ক্ষমতাও সীমিত ছিল। তখন টাকা আর টাকার বিনিময়ে পাওয়া সবকিছু ‘বর্তমানেই’ আটকে ছিল। তাই নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করাটা খুব সহজ হতো না, আর অর্থনীতির বৃদ্ধির গতিও ছিল অনেক ধীর।

বেকারির কথাটাই ভাবুন। ম্যাকডোনাট কি নিজের টাকায়, বা নিজের কোনো সম্পদ দিয়ে বেকারিটা তৈরি করতে পারতেন? পারতেন না। বর্তমানে তার বেকারি তৈরির স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করার মতো টাকা নেই। রুটি আর কেক বিক্রি করতে না পারলে তার হাতে টাকা আসবেও না। টাকা না থাকলে কোনো ঠিকাদার তাকে বেকারি তৈরি করেও দেবে না।

কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ এই চক্রে আটকা পড়ে ছিল। তাই অর্থনীতিও এগোচ্ছিল ধীরে। এখান থেকে বেরোবার পথ মানুষ আবিষ্কার করেছে এই আধুনিক যুগে এসে, ভবিষ্যতে বিশ্বাস রেখে কাজ করার এই নতুন পদ্ধতি তৈরি করে। এখন মানুষ কাল্পনিক পণ্যে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ যে জিনিসটা বর্তমানে নেই, সেটাও তারা ‘ক্রেডিট’ নামক ধার করা টাকা দিয়ে কেনে। ক্রেডিটের মাধ্যমে মানুষ ভবিষ্যৎ বিক্রি করে বর্তমানকে সাজায়। এর গোড়ায় আছে একটাই বিশ্বাস- ভবিষ্যতে আমরা যে সম্পদের মালিক হব সেটা আমাদের বর্তমান সম্পদের চেয়ে ঢের বেশি। সেই ভবিষ্যতে অর্জিত সম্পদ খরচ করে বর্তমানের পণ্য কেনার এই সুযোগটাই দারুণ সব সম্ভাবনা তৈরি করল।

তাহলে ক্রেডিটের মতো এই চমৎকার জিনিসের কথা মানুষ আরও আগে ভাবেনি কেন? ভেবেছে তো বটেই। ক্রেডিটের কাছাকাছি কিছু না কিছু সেই প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে আমাদের জানা প্রায় সব সভ্যতাতেই ছিল। কিন্তু তখনকার মানুষ সেটাকে কাজে লাগাতে পারেনি। কারণ ভবিষ্যৎ যে বর্তমানের চেয়ে ভালো হবে- এই বিশ্বাসটা তাদের মধ্যে এত জোরালো ছিল না। সাধারণত তারা ভাবত অতীতের দিনগুলোই ভালো ছিল, আর ভবিষ্যৎ বর্তমানের চেয়ে খুব একটা ভালো হবে না। অর্থনীতির ভাষায় বলতে গেলে, তারা ভাবত তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ নির্দিষ্ট, সেটা কমলেও কমতে পারে, কিন্তু বেড়ে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। তাই দশ বছর পরে তাদের ব্যক্তিগত, রাষ্ট্রীয়, এমনকি পৃথিবীর মোট সম্পদের উৎপাদন যে আরও বাড়তে পারে, এটা তারা চিন্তাই করতে পারত না। ব্যবসা বাণিজ্যের সব যোগ-বিয়োগের ফল হতো শূন্য। হ্যাঁ, একটা বেকারি হয়তো অনেক লাভ করতে পারে, কিন্তু সেজন্য পাশের বেকারিটাকেই হয়তো লোকসান গুনতে হবে। ভেনিস শহরের উন্নতি করতে গেলে দেখা যাবে জেনোয়া পথে বসে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের সম্পদ বাড়াতে গেলে হয়তো ফ্রান্স থেকেই লুট করে আনতে হবে। একটা কেককে যেভাবেই কাটা হোক না কেন, সেই টুকরোগুলো জোড়া দিলে কি আর সেটা ঐ কেকটার চেয়ে বড় হতে পারে?

এই কারণেই অনেক সমাজে বেশি টাকার মালিক হওয়াটাকে পাপের কাজ হিসেবে দেখা হতো। যিশুখ্রিস্ট তো বলেছেনই, “ধনী মানুষের ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করার চেয়ে সুঁইয়ের ছিদ্রের ভিতর দিয়ে উটের চলে যাওয়া সহজ।” (ম্যাথিউ ১৯ঃ২৪)। একটা কেক কেটে কেউ যদি বড় টুকরোটা নিয়ে যায়, তাহলে নিশ্চয়ই সে অন্য কারও ভাগেরটুকুও নিয়ে যাচ্ছে। এইজন্যই ধনী মানুষেরা তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ দান করে পাপক্ষালন করত।

উদ্যোক্তার দোটানা

কেকটার আকার যদি না বাড়ে, তাহলে আসলে ক্রেডিটের ব্যাপারটাই আর থাকে না। আজকের কেকের আকার আর আগামীকালের কেকের আকারের পার্থক্যটাই হল ক্রেডিট। কেকের আকার যদি না বাড়ে, তাহলে ক্রেডিট আসবে কোত্থেকে? সেক্ষেত্রে অন্য কারো ভাগেরটা দখল করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সেখানে ঝুঁকি আছে। এজন্যই আগেকার দিনে টাকা ধার নেওয়াটা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। ধার নিতে পারলেও সেই টাকার অঙ্কটা হতো অনেক কম, পাওয়া যেত অল্প সময়ের জন্য, আর ফেরত দেওয়ার সময় দিতে হতো চড়া সুদ। তাই নতুন ব্যবসা শুরু করাটা তখন এত সহজ ছিল না। রাজারাও নতুন একটা প্রাসাদ বানানোর আগে, কিংবা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রজাদের উপর কর বাড়িয়ে দিয়ে টাকা জোগাড় করতেন।

আধুনিক অর্থনীতির জাদুচক্র

রাজাদের জন্য এটা তেমন কোনো সমস্যাই ছিল না (যদি প্রজারা ক্ষেপে না যায়), কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য এটা ছিল অনেক বড় বাধা। যার চোখে একটা নতুন বেকারি তৈরির স্বপ্ন ছিল, তাকে হয়তো টাকার জন্য অন্য কারও রান্নাঘরের মেঝে পরিষ্কার করতে হতো।

এই পরিস্থিতিটা সবার জন্যই খারাপ। ক্রেডিট সীমিত বলে মানুষ নতুন ব্যবসা শুরু করতে পারছে না। তাই অর্থনীতির উন্নতিও থেমে যাচ্ছে। আবার অর্থনীতির উন্নতি হচ্ছে না বলে মানুষ আশা হারাচ্ছে, যারা পুঁজির মালিক তারাও ক্রেডিট বাড়াচ্ছে না। সমস্যাগুলো নিজেরাই নিজেদের জিইয়ে রাখে।

কেকটা বড় হচ্ছে

এরকম একটা সময়ে বিজ্ঞানের জগতে ঘটল বিপ্লব, শুরু হল প্রগতির যুগ। এই প্রগতির ধারণার মূলে যে চিন্তা ছিল সেটা এরকম, যদি আমরা আজ আমাদের অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নিই আর আমাদের সম্পদ গবেষণার কাজে লাগাই, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ বর্তমানের চেয়ে আরও ভালো হবে। খুব দ্রুতই এর অর্থনীতিতে এর প্রভাব দেখা গেল। যারা এই প্রগতির ধারণায় বিশ্বাস করে, দেখা গেল তারা এটাও বিশ্বাস করে যে বিভিন্ন ভৌগোলিক আবিষ্কার, প্রযুক্তির উদ্ভাবন আর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন আমাদের উৎপাদন ও সম্পদ বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। ভারত মহাসাগরের ব্যবসা পুরোপুরি চালু রেখেই পাশাপাশি এবার আটলান্টিক মহাসাগরেও নতুন নতুন ব্যবসার পথ তৈরি হল। আগের সব সম্পদের উৎপাদন ঠিক রেখেই নতুন সম্পদের উৎপাদন শুরু হল। এই যেমন কোনো বেকারি কেক তৈরি শুরু করলে তাতে অন্য কোনো বেকারির রুটি তৈরিতে ভাটা পড়ল না। বরং তাতে মানুষের খাবারে বৈচিত্র্য এল, মানুষ আরও বেশি খেতে শুরু করল। কারও সম্পদ কেড়ে না নিয়েও যে কেউ আরও ধনী হতে পারে, সেটা এবার দেখা গেল। একটু আগে যে কেক ভাগাভাগির কথা হচ্ছিল, সেই কেকটা এবার দিনে দিনে আরও বড় হতে লাগল। তাই অন্য কারও ভাগ থেকে না নিয়েও আরও বড় টুকরো পাওয়া সম্ভব হল।

গত ৫০০ বছরে এই প্রগতির কারণেই মানুষের ভবিষ্যতের উপর আস্থা আরও বেড়েছে। এই আস্থার কারণে বেড়েছে ক্রেডিটের পরিমাণ, তার ফলে এসেছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আর সেই অগ্রগতিই ভবিষ্যতের উপর আস্থা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে আরও ক্রেডিট তৈরি হচ্ছে। এটা একদিনে হয়নি। শুরুতে অনেক উঁচুনিচু পথ পেরিয়ে এলেও এখন সেটা অনেকটাই মসৃণ হয়ে গেছে। সারা পৃথিবীতে আজ ক্রেডিটের ছড়াছড়ি। তাই এখন সরকার, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি সাধারণ মানুষেরাও অল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে পারে।

সংক্ষেপে পৃথিবীর অর্থনীতির ইতিহাস

সম্পদের পরিমাণ যে দিনে দিনে বাড়ছে- এই ধারণাটাই অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। ১৭৭৬ সালে স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ “The Wealth of Nations” নামে একটা যুগান্তকারী বই লেখেন। পৃথিবীর ইতিহাসে অর্থনীতিতে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই সম্ভবত আর লেখা হয়নি। সে বইয়ের প্রথম খণ্ডের অষ্টাদশ অধ্যায়ে স্মিথ একেবারে নতুন কিছু যুক্তি হাজির করেন। তিনি বলেন, যখন একজন জমিদার, অথবা কোনো তাঁতি, কিংবা মুচি তার নিজের পরিবারের চাহিদার চেয়েও বেশি টাকা আয় করে, তখন সে ঐ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সহকারী নিয়োগ করে আরও বেশি টাকা আয় করতে পারে। যত বেশি টাকা আয় হবে, তত বেশি সহকারী ঐ কাজে নিযুক্ত হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, কোনো পেশাজীবীর ব্যক্তিগত লাভ যত বেশি হবে, সমাজের মোট সম্পদ ও উন্নয়নও ততই বাড়বে।

আমাদের কাছে এই জিনিসটা খুবই সাদামাটা মনে হবে, ‘যুগান্তকারী’ তো কোনোভাবেই না। এর কারণ হলো, আমরা বাস করি একটা পুঁজিবাদী পৃথিবীতে, যেটা কিনা ইতোমধ্যেই স্মিথের কথা অনুযায়ী চলছে। স্মিথের এই কথাগুলোই ঘুরেফিরে নানাভাবে আমরা প্রতিদিন চোখের সামনে দেখতে পাই, তাই এটাকে আর বিশেষ কিছু বলে মনে হয় না। অথচ ‘ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজ করে, ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়িয়ে সমাজের সমন্বিত সমৃদ্ধি অর্জন করা’ – এই ধারণাটা শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানুষের নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও একটা ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। স্মিথ বলেন যে, লোভ জিনিসটা আসলে খারাপ নয়। আমি ধনী হলে আসলে আমার একার নয়, সবারই কোনো না কোনোভাবে উপকার হয়। অর্থাৎ স্বার্থপরতার মধ্যেই আছে পরার্থপরতা।

স্মিথ মানুষকে শেখালেন এক নতুন অর্থনীতি, যেখানে সবারই লাভ হয়, ঠকে না কেউই। আমার লাভ মানে তোমারও লাভ। মানে শুধু আমি যে কেকের বড় টুকরোটা পাব তা-ই নয়, আমি বেশি পেলে তোমার টুকরোটাও বড় হবে। আমি অভাবে থাকলে তোমার অভাবও যাবে না, কারণ তোমার তৈরি জিনিসটা তখন আমি কিনতে পারব না। আমি ধনী হলেই কেবল তোমার তৈরি জিনিস আমার কাছে বেচে তুমিও ধনী হতে পারবে। সম্পদ আর নৈতিকতার মধ্যেকার দ্বন্দ্বটাকে স্মিথ একেবারে উড়িয়ে দিলেন। বলা যায় স্বর্গের যে দরজাটা ধনীদের জন্য এতদিন বন্ধ ছিল, স্মিথ সেটা খুলে দিলেন। এখন ধনী হওয়াটাই নৈতিক। স্মিথের ভাষ্যমতে, মানুষ অন্যের সম্পদ কেড়ে নিয়ে ধনী হয় না, বরং নিজে ধনী হতে গিয়ে সবার মোট সম্পদের পরিমাণটাই আরও বাড়িয়ে দেয়। তাতে সবারই লাভ। তাই এখন ধনীরা আর পাপী নয়, বরং তারাই সমাজের সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী, কারণ তারাই অর্থনীতিকে সচল রেখে সবার উপকার করে।

অবশ্য এর সবটাই নির্ভর করে ধনীদের কাজের উপর। সম্পদের মালিকেরা যদি তাদের লাভের টাকা ফেলে না রেখে সেটা নতুন কিছু তৈরি করতে বা আরও শ্রমিক নিয়োগ করতে কাজে লাগায়, তাহলেই শুধু এটা সম্ভব। বেশি লাভ হলে সেই অতিরিক্ত টাকা সিন্দুকে ফেলে রাখলে কদিন পরপর সেটা গুনে দেখা ছাড়া আর কোনও কাজেই আসবে না। বরং সেই টাকাকে আরও বেশি উৎপাদনের জন্য খরচ করতে হবে। এটাই স্মিথের প্রস্তাবিত অর্থনীতির মূলমন্ত্র। আধুনিক পুঁজিবাদের মূল কথা এটাই- লাভের টাকা উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে, তাতে আরও বেশি লাভ হবে, সেই টাকাও আবার বিনিয়োগ করতে হবে, তাতে আরও লাভ আসবে- এভাবে চলতেই থাকবে, থেমে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিনিয়োগ নানাভাবে করা যায়। কারখানাটাকে আরও একটু বড় করা যায়, গবেষণা করা যায়, নতুন কোনো পণ্যও বানানো যায়। এই সবকিছুই বিনিয়োগ, কোনো না কোনোভাবে উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। তাই পুঁজিবাদের প্রথম ও প্রধান নীতিই হল- লাভের টাকাকে আরো বেশি উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে।

এই কারণেই পুঁজিবাদকে ‘পুঁজিবাদ’ বলা হয়, কারণ এখানে ‘পুঁজি’ আর ‘সম্পদ’- এ দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। পুঁজি হল টাকা, মালামাল বা যেকোনো সম্পদ যা উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করা হয়। অন্যদিকে সম্পদ হল মাটির নিচে পুঁতে রাখা টাকার বান্ডিল, যা কোনো কিছু উৎপাদনের কাজে লাগে না। যে ফারাও অনেক টাকা খরচ করে একটা বিশাল পিরামিড বানিয়েছে সে পুঁজিবাদী নয়। যে জলদস্যু স্প্যানিশ নৌবহর লুট করে পাওয়া কাঁড়ি কাঁড়ি সোনার মোহর কোনো ক্যারিবিয়ান দ্বীপের বালিতে পুঁতে রেখেছে, সেও পুঁজিবাদী নয়। পুঁজিবাদী হল সেই শ্রমিক, যে তার প্রতি মাসের যৎসামান্য বেতন থেকে কিছু টাকা শেয়ার বাজারে খাটায়।

‘লাভের টাকা উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে হবে’ এই ধারণাটা আমাদের কাছে খুব সাধারণ মনে হলেও একসময় মানুষের কাছে এটা অস্বাভাবিক ছিল। এই আধুনিক যুগ শুরু হওয়ার আগেও মানুষ মনে করত মোট উৎপাদনের পরিমাণ কমবেশি একই রকম। কাজেই উৎপাদন যদি আর না-ই বাড়ে, তবে আরও বেশি বিনিয়োগ করে কী হবে? তাই মধ্যযুগের অভিজাত শ্রেণীর মানুষের মধ্যে দান আর ভোগ- এ দুটো ব্যাপার খুব বেশি দেখা যেত। তাদের লাভের টাকা খরচ হতো নানারকম প্রতিযোগিতায়, যুদ্ধে, পান-ভোজনে আর ভোগ-বিলাসে, নয়তো খরচ হতো গরিবকে কিংবা ধর্মীয় কাজে দান করে। খুব কম মানুষই লাভের টাকা দিয়ে চাষবাস বা নতুন কোনো ব্যবসার কথা ভাবত।

অথচ বর্তমানে সেই অভিজাতদের জায়গাটা নিয়েছে পুঁজিপতিরা। এই পুঁজিবাদী সমাজে আগেকার সেই সামন্ত কিংবা জমিদারদের গুরুত্ব নেই, গুরুত্ব আছে ব্যবসায়ী আর শিল্পপতিদের। আজকের পুঁজিপতিরা মধ্যযুগের সেই অভিজাতদের চেয়ে অনেক বেশি ধনী, কিন্তু তারা ভোগ করে অনেক কম। এইসব মানুষ তাদের আয়ের খুব অল্প অংশই অনুৎপাদনশীল কাজে খরচ করে।

মধ্যযুগে অভিজাত মানুষেরা সোনা আর রেশমের সুতোয় বোনা কাপড় পরত, বড় বড় ভোজসভা, উৎসব আর প্রতিযোগিতায় অনেকটা সময় দিত। অথচ আজকের দিনের কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাকেও দেখা যায় স্যুট নামের ইউনিফর্ম পরতে, আর কাজের বাইরে দেওয়ার মতো সময় তাদের নেই বললেই চলে। একজন পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীর সারা দিন কাটে মিটিঙে মিটিঙে, আর কীভাবে নতুন নতুন জায়গায় বিনিয়োগ করা যায়, শেয়ারের দাম বাড়ল না কমল সেই চিন্তা করে করে। হ্যাঁ, তার স্যুটটা অনেক দামি কাপড়ের হতে পারে, তার চলাচলের জন্য নিজের একটা বিমানও থাকতে পারে- কিন্তু তার পরেও, তার বিনিয়োগের তুলনায় ভোগের পরিমাণটা নগণ্য।

শুধু যে দামী স্যুট পরা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই বিনিয়োগ করে তা নয়। সাধারণ মানুষ অথবা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও একই রকম চিন্তা করে। এজন্যই খাবার টেবিলের আড্ডাতেও প্রায়ই উঠে আসে জমানো টাকা দিয়ে শেয়ার কিনলে ভালো হবে নাকি জমি কিনলে, এই ধরনের বিষয়। সরকারও করের টাকা এমনভাবে খরচ করতে চায় যেন ভবিষ্যতে আরও বেশি কর আদায় করা যায়। এই যেমন, সরকার যদি নতুন একটা সমুদ্র বন্দর বানায়, তাহলে সেটা দিয়ে আরও বেশি পণ্য রপ্তানি হবে, তাতে পণ্য উৎপাদনকারীর আয় বাড়বে, সেখান থেকে সরকার আরও বেশি আয়কর পাবে। আবার কোনো সরকার হয়তো শিক্ষাখাতে বেশি বিনিয়োগ করে, যাতে শিক্ষিত মানুষেরা আরও ভালো ভালো কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে আর সেখান থেকে আরও বেশি কর পাওয়া যায়।

পুঁজিবাদের শুরুটা হয়েছিল বইয়ের পাতা থেকে। টাকা জিনিসটা কীভাবে কাজ করে আর লাভের টাকা বিনিয়োগ করলে অর্থনীতি কীভাবে দ্রুত এগোয়- সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিল এই তত্ত্ব। কিন্তু পুঁজিবাদ শেষ পর্যন্ত স্রেফ একটা তত্ত্ব হয়ে বইয়ের পাতায় আটকে থাকেনি। এটা এখন আমাদের জীবনধারায় মিশে গেছে। মানুষের আচরণ কেমন হবে, শিশুদের কী শেখাতে হবে, কীভাবে চিন্তা করতে হবে- সবকিছুতেই পুঁজিবাদের ছায়া। পুঁজিবাদের মূল কথা হল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই হল আসল সমৃদ্ধি। এমনকি সুবিচার, স্বাধীনতা, এমনকি মানুষের সুখে থাকাও নির্ভর করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উপর। একজন ঘোর পুঁজিবাদী মানুষের কাছে যদি জানতে চাওয়া হয় জিম্বাবুয়ে কিংবা আফগানিস্তানে ন্যায়বিচার আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে কী করা দরকার, তাহলে সম্ভবত তার কাছে থেকে “একটা স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ” সম্পর্কে একটা ছোটখাটো বক্তৃতা শুনে আসতে হবে।

আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির পিছনেও এই পুঁজিবাদ নামক ‘ধর্মের’ অনেকটা প্রভাব আছে। সাধারণত বৈজ্ঞানিক গবেষণার পিছনে টাকা ঢালে সরকার অথবা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যখন কোনো পুঁজিবাদী সরকার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোনো একটা গবেষণা প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে যায়, তখন তাদের মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটা আসে সেটা হল, “এখানে বিনিয়োগ করে কি উৎপাদন বাড়বে? কোনও লাভ হবে? এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি কতটুকু হবে?” এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে সে গবেষণা আর এগোয় না। তাই আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে কোনোভাবেই পুঁজিবাদকে বাদ দেওয়া যায় না।

আবার উল্টোটাও সত্যি। বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে পুঁজিবাদের ইতিহাস লেখাও অসম্ভব। পুঁজিবাদ বিশ্বাস করে যে অর্থনীতির বৃদ্ধি চলতেই থাকবে, থামবে না কখনো। কিন্তু এই বিশ্বাস ধরে রাখতে হলে তো সামনে কি আছে সেটা জানতে হবে। একটা নেকড়ের পাল যদি মনে করে ভেড়ার সংখ্যা সবসময় বাড়তেই থাকবে- তাহলে সেটা হবে স্রেফ বোকামি। মানবসমাজের অর্থনীতি অনেক বছর ধরে দুর্বার গতিতে বেড়ে চলেছে এবং এখনও বেড়ে চলছে- এর পিছনে একচেটিয়া কৃতিত্ব বিজ্ঞানীদের ও তাঁদের সব আবিষ্কারের। আমেরিকা আবিষ্কার, অন্তর্দহন (internal combustion) ইঞ্জিন আবিষ্কার কিংবা উন্নত প্রজাতির গবাদিপশু আবিষ্কার- এসব নিত্যনতুন আবিষ্কারই অর্থনীতির বিকাশের পিছনে ভূমিকা রেখে চলেছে। সরকার আর ব্যাংক কাগজে টাকা ছাপে বটে, কিন্তু সেই টাকাকে মূল্যবান করে তোলে বিজ্ঞানীরাই।

বেশ কয়েক বছর ধরেই সরকার আর ব্যাংকগুলো টাকা ছেপে কূল পাচ্ছে না। বর্তমান সঙ্কটময় অবস্থায় অর্থনীতির অগ্রগতি থেমে যেতে পারে, এই ভয়ে ক্রেডিটের নামে তৈরি হচ্ছে কোটি কোটি ডলার, ইউরো আর ইয়েন। অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠছে একটা বিরাট বুদবুদের মতো, যেটা যেকোনো সময় ফেটে যেতে পারে জেনেও মানুষেরা সেটাকে আরও ফুলিয়ে তুলছে। তারপরেও মানুষ আশা করছে যে পৃথিবীর বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ আর প্রকৌশলীরা আরও নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে বৃদ্ধিটা অব্যাহত রাখবে, অর্থনীতির বুদবুদটাকে ফেটে যেতে দেবে না। এখন বৈজ্ঞানিক গবেষণাই সবার ভরসা। জৈবপ্রকৌশল বা ন্যানোপ্রকৌশলের মতো বিষয়ে এখনও নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠতে পারে। সেটা সম্ভব হলে ২০০৮ থেকে আগাম তৈরি হওয়া কোটি কোটি টাকা সার্থক হবে। আর যদি সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে ধরে নেওয়া যায় সামনের দিনগুলো হবে অনেক কঠিন।

কলম্বাসের টাকা চাই

পুঁজিবাদ শুধু বিজ্ঞানের বিকাশেই নয়, ইউরোপের সাম্রাজ্যবিস্তারের পিছনেও একটা বিরাট ভূমিকা রেখেছে। পুঁজিবাদে ক্রেডিটের ধারণাটাও এসেছে তখন থেকেই। না, ক্রেডিট জিনিসটা আধুনিক ইউরোপের আবিষ্কার নয়। প্রায় সব কৃষিভিত্তিক সমাজেই ক্রেডিটের ধারণা ছিল আরও আগে থেকেই, আর এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে ইউরোপীয় পুঁজিবাদের সম্পর্কটাও বেশ ঘনিষ্ঠ। এখানে মনে রাখা দরকার, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিক পর্যন্তও এশিয়া ছিল পৃথিবীর অর্থনৈতিক কেন্দ্র। চীন, মধ্যপ্রাচ্য বা ভারতের তুলনায় ইউরোপের পুঁজির পরিমাণ ছিল খুবই কম।

তবে চীন, ভারত আর মুসলিম বিশ্বের তখনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থায় ক্রেডিট জিনিসটা খুব বেশি গুরুত্ববহন করত না। ইস্তাম্বুল, ইস্পাহান, দিল্লী আর বেইজিঙের ব্যবসায়ী ও ব্যাংক-মালিকদের মধ্যে পুঁজিবাদী চিন্তা কিছুটা থাকলেও রাজা আর সেনাপতিরা সেটা পছন্দ করত না। ইউরোপের বাইরে বেশিরভাগ সাম্রাজ্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হয় নুরহাচি বা নাদির শাহের মতো দখলদার মানুষের হাতে অথবা চিং আর অটোমান সাম্রাজ্যের মতো রাজা-রাজড়াদের হাতে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে টাকাপয়সা দরকার হতো সেটা আদায় করা হতো খাজনা আদায় করে অথবা লুট করে (যদিও এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য ছিল সামান্যই)। যেহেতু নগদেই সব কাজ হতো, তাই ক্রেডিট, ঋণ, সুদ, বিনিয়োগ- এসব নিয়ে কারও তেমন মাথাব্যথা ছিল না।

অন্যদিকে ইউরোপের অবস্থা ছিল ঠিক এর বিপরীত। ব্যবসায়ী আর ব্যাংকাররা ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসার আগে থেকেই সেখানকার রাজা আর সেনাপতিদের চিন্তাধারা ছিল ব্যবসায়ীদের মতো। ইউরোপীয়দের বিশ্বজোড়া অভিযানের খরচ যোগানোর ক্ষেত্রে প্রজাদের খাজনার চেয়ে ক্রেডিটের ভূমিকাই বেশি ছিল। পুঁজিবাদী মানুষেরা বেশি লাভের আশায় ক্রমে এসব অভিযানে আগ্রহী হয়েছে। এই হ্যাট-কোট পরা ব্যবসায়ীদের তৈরি সাম্রাজ্যই কিন্তু একদিন রেশমি রাজপোশাক আর ধাতব বর্মধারী মানুষের সাম্রাজ্য দখল করে নিয়েছে। অভিযানের পিছনে টাকা ঢালার ব্যাপারে ইউরোপীয়রা অনেক বেশি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। খাজনা কেউই দিতে চায় না, অথচ বিনিয়োগে আপত্তি নেই কারও।

১৪৮৪ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস ইউরোপ থেকে পশ্চিম দিক দিয়ে পূর্ব এশিয়ায় যাওয়ার নতুন পথ খুঁজতে যাবেন বলে আর্থিক সাহায্য চাইলেন পর্তুগালের রাজার কাছে। সে তো যেমন তেমন অভিযান নয়, জাহাজ বানাতে হবে, অনেক দিনের রসদ নিতে হবে, নাবিক আর সৈনিকদের বেতন দিতে হবে- অনেক টাকার ব্যাপার। আবার এতগুলো টাকার বিনিময়ে যে অভিযানটা সফল হবে, তার বিন্দুমাত্র নিশ্চয়তা নেই। কাজেই রাজা সোজা না করে দিলেন।

আজকের দিনে নতুন উদ্যোক্তারা যা করে, কলম্বাস ঠিক তাই করলেন। তিনি একে একে আবেদন জানালেন ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড আর পর্তুগালের ধনী লোকদের কাছে। কেউই রাজি হল না। শেষমেশ তিনি গেলেন স্পেনের নতুন রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইসাবেলার কাছে। একা গেলেন না, গেলেন তদবির করার জন্য কয়েকজন ঝানু লোককে সাথে নিয়ে। তাদের সাহায্যেই শেষ পর্যন্ত রানি ইসাবেলার কাছ থেকে সাহায্যের আশ্বাস মিলল। আজ তো সবাই জানে, ইসাবেলা কী দারুণ বিনিয়োগটা করেছিলেন সে সময়। কলম্বাসের অভিযানের পর স্প্যানিয়ার্ডরা আমেরিকা দখল করে নেয়। সেখানে তারা সোনা আর রুপার খনি খুঁজে পেল, পাশাপাশি চিনি আর তামাকের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করল। আর তাতেই স্পেনের রাজা, ব্যাংকার আর ব্যবসায়ীদের সম্পদ ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করল।

এর শ খানেক বছর পর ইউরোপের ব্যাংকার আর রাজবংশীয়রা এসব অভিযানে বিনিয়োগ করা আরও বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকা থেকে আনা সম্পদ তো তাদের কাছে ছিলই। শুধু টাকাপয়সাই নয়, এই ধরনের অভিযানের উপর তাদের আস্থাও বেড়েছিল অনেকখানি। এইভাবেই শুরু হল সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদের লাভের চক্র- টাকা দিয়ে নতুন নতুন অভিযান শুরু হচ্ছে, তাতে নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কৃত হচ্ছে, সেসব জায়গায় উপনিবেশ তৈরি হচ্ছে, উপনিবেশ থেকে আরও টাকা আসছে, তাতে মানুষের ভরসা বাড়ছে, তাই বিনিয়োগও বাড়ছে। নুরহাচি (Nurhaci) আর নাদির শাহের (Nader Shah) অভিযান কয়েক হাজার কিলোমিটার গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল, অথচ এসব পুঁজিবাদী অভিযান দিনে দিনে আরও গতি পেয়েছে।

তারপরেও, এসব অভিযানে অনেক রকম ঝুঁকিও ছিল, তাই বিনিয়োগও অনেকটা সীমিত ছিল। এরকম অনেক অভিযান খালি হাতে ফিরে এসেছে। ইংরেজরা উত্তর-পশ্চিম দিকে মেরু অঞ্চলের মধ্য দিয়ে এশিয়ায় যাওয়ার পথ খুঁজতে অনেক টাকা নষ্ট করেছে। এর মধ্যে অনেক অভিযান আর ফেরেইনি। হিমশৈলের ধাক্কায়, সামুদ্রিক ঝড়ে অথবা জলদস্যুদের হাতে অনেক জাহাজ হারিয়েছে তারা। বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়াতে আর ঝুঁকির পরিমাণ কমাতে তখন ইউরোপীয়রা যৌথ-মূলধনী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (limited liability joint-stock company) তৈরি করে। এর পরের অভিযানগুলোতে একজন মানুষের পরিবর্তে এরকম প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করতে শুরু করে। তাতে অনেকজন মানুষ মিলে টাকা দেয়, তাই জনপ্রতি ঝুঁকির পরিমাণ অনেক কমে যায়। তবে ঝুঁকি সীমিত হলেও লাভ কিন্তু সীমিত নয়। অনেক সময় সামান্য বিনিয়োগে শুরু হওয়া অভিযান থেকেই আসত লক্ষ লক্ষ টাকা।

এভাবে কয়েক দশকের মধ্যেই পশ্চিম ইউরোপে বেশ মজবুত একটা অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড়িয়ে গেল। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই বিনিয়োগের জন্য অনেক টাকা জোগাড় করার ব্যবস্থা হলো। সেই টাকা সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যেত। অভিযান পরিচালনার জন্য রাজ্যের চেয়ে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান অনেক বেশি সফলতার পরিচয় দিয়েছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ষোড়শ শতকে স্পেন আর নেদারল্যান্ডের রেষারেষির মধ্যে। স্পেন তখন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ, তার এলাকাও বিশাল। ইউরোপের অনেকখানি, উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকার বিরাট এলাকা, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ আর এশিয়া ও আফ্রিকার উপকূলের অনেক জায়গা স্পেনের দখলে। প্রতি বছর আমেরিকা আর এশিয়ার প্রচুর সম্পদ নিয়ে সেভিয়া (Seville) আর কাদিজ (Cadiz) বন্দরে ফিরত স্প্যানিশ নৌবহর। নেদারল্যান্ড তখন স্পেনের এক কোনায় পড়ে থাকা একটা সম্পদহীন ছোট জলা এলাকা।

ডাচদের বেশিরভাগই ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট। ১৫৬৮ সালে তারা স্প্যানিশ ক্যাথলিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। ডন কুইক্সোট (Don Quixote) যেমন উইন্ডমিলের সাথে লড়তে গেছিলেন, শুরুতে ডাচ বিদ্রোহীদের অবস্থা ছিল ঠিক তেমনি। অথচ আশি বছরের মধ্যে তারা স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা তো আদায় করেছেই, তার উপর সমুদ্রে স্প্যানিশ ও তাদের মিত্র পর্তুগিজদের চেয়েও বেশি অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। নিজেদের একটা সাম্রাজ্য তৈরি করে তারা ইউরোপের সবচেয়ে ধনী রাজ্যে পরিণত হয়।

ডাচদের এই সাফল্যের মূলে আছে সেই ক্রেডিট। ডাচদের মধ্যে যারা সাধারণ নাগরিক, যুদ্ধে যাদের কোনো আগ্রহই নেই, তারাই স্প্যানিশদের সাথে লড়াই করার জন্য ভাড়াটে সৈনিক জোগাড় করল। ওদিকে সমুদ্রেও তারা নামিয়ে দিল বড় বড় সব যুদ্ধজাহাজ। ভাড়াটে সৈন্য আর যুদ্ধজাহাজের পিছনে অনেক টাকা খরচ হল, কিন্তু সেটা জোগাড় করতে তাদের কোনো সমস্যাই হয়নি। কারণ সে সময়ে স্পেনের রাজার চেয়ে দেশের অর্থব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা বেশি ছিল। বিনিয়োগকারীরা ডাচদের সৈন্য সংগ্রহ ও জাহাজ তৈরিতে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। ডাচদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাণিজ্যপথগুলো থেকে লাভ হচ্ছিল ভালোই। সেই লাভের টাকা দিয়ে ডাচরা তাদের ঋণ শোধ করে দিল, ফলে বিনিয়োগকারীরাও আরও বিনিয়োগ করার ভরসা পেল। আমস্টারডাম ইউরোপের অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর তো বটেই, তার সাথে ইউরোপের অর্থনৈতিক কেন্দ্রেও পরিণত হল।

এখন প্রশ্ন হল, ডাচরা কীভাবে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আস্থা অর্জন করল? প্রথমত, তারা সময়মতো সম্পূর্ণ ঋণ শোধ করতে কখনও ভুল করত না। তাই বিনিয়োগকারীরাও আরও টাকা দিতে দ্বিধা করত না। দ্বিতীয় কারণ হল, সে দেশের বিচারব্যবস্থা ছিল স্বাধীন, আর সেটা ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সম্পদ রক্ষার নিশ্চয়তাও দিত। এই নিশ্চয়তা না থাকলে ব্যবসা করতে গিয়ে পুঁজি হারানোর ঝুঁকি থাকে। তাই দেশের আইনও বিনিয়োগের জন্য সহায়ক ছিল।

ধরুন জার্মানির এক বিরাট পুঁজিপতি ব্যবসায়ীর দুই ছেলে। তিনি ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তাঁর ব্যবসার শাখা খোলার একটা দারুণ সম্ভাবনা দেখলেন। তিনি তাঁর দুই ছেলেকেই মূলধন হিসেবে দশ হাজারটা করে সোনার মোহর দিয়ে বড় ছেলেকে পাঠালেন আমস্টারডামে, আর ছোটটিকে পাঠিয়ে দিলেন মাদ্রিদে। সে সময়ে স্পেনের সাথে ফ্রান্সের যুদ্ধ চলছে, ছোট ছেলে গিয়েই স্পেনের রাজাকে সৈন্য জোগাড় করার জন্য তার সব টাকা ধার দিয়ে দিল। আর বড় ছেলে তার টাকাগুলো ধার দিল এক ডাচ ব্যবসায়ীকে। সেই ব্যবসায়ী ম্যানহাটন নামের একটা ঝোপেঝাড়ে ঢাকা দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে কিছু জমি কিনতে চান, কারণ হাডসন নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হলেই ওই দ্বীপে জমির দাম হুহু করে বেড়ে যাবে। দুই ভাইই আশা করছে এক বছরের মধ্যে ধার দেওয়া টাকা ফেরত পাবে।

বছর গেল। ডাচ ব্যবসায়ী তাঁর কেনা জমি বেচে দিয়ে প্রচুর লাভ করলেন। কথামতো ধারও শোধ করলেন, সুদসহ। বড় ছেলের সাফল্যে বাবাও খুশি হলেন। এদিকে ছোট ছেলে পড়ল বিপদে। ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে স্পেনের রাজা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানেই আছেন, কিন্তু এর মধ্যে তিনি আবার নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়েছেন তুর্কিদের সাথে। এই মুহূর্তে ধার শোধ করার চেয়ে নতুন যুদ্ধ সামাল দেওয়া বেশি দরকার। ছোট ছেলে রাজাকে চিঠি দিচ্ছে, দরবারের একে ওকে দিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু রাজার সেদিকে ভ্রূক্ষেপও নেই। কাজেই ধার দেওয়া টাকার সুদ তো দূরের কথা, ছোট ছেলে এখন আসলটাও হারিয়ে বসে আছে। স্বাভাবিকভাবেই বাবাও অসন্তুষ্ট।

এদিকে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে স্পেনের রাজা আবারও ছোট ছেলের কাছে একই অঙ্কের টাকা দাবি করে বসলেন। তার কাছে তখন একটা টাকাও নেই। উপায় নেই, তাই সে অনেক বুঝিয়ে টাকা চেয়ে বাবাকে একটা চিঠি দিল। হাজার হলেও ছোট ছেলের আবদার, বাবাও ফেলতে পারলেন না। কাজেই আরও দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা স্পেনের রাজকোষের ভিতরে কোথায় যে হারিয়ে গেল, তার হদিস আর পাওয়া গেল না। ওদিকে আমস্টারডামের অবস্থা পুরো উলটো। বড় ছেলে সেখানে একের পর এক ব্যবসায়ীদের টাকা ধার দিচ্ছে আর সময়মতো ফেরতও পাচ্ছে পুরোপুরি। তবে সুসময় তো আর চিরদিন থাকে না, তাই একবার ঘটল অঘটন। এক ফরাসি ব্যবসায়ী ভাবল কাঠের জুতো সামনে খুব চলবে, তাই সে বড় ছেলের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে প্যারিসে একটা জুতোর দোকান দিল। কিন্তু কপাল খারাপ, তার দোকানের জুতো বিক্রিই হল না। কাজেই সে জানিয়ে দিল তার পক্ষে ধার শোধ করা সম্ভব নয়।

সব শুনে বাবা এবার ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। দুই ছেলেকেই পরামর্শ দিলেন আইনের আশ্রয় নিতে। তারপর ছোট ছেলে মাদ্রিদে মামলা করল স্পেনের রাজার বিরুদ্ধে, আর বড় ছেলে আমস্টারডামে মামলা করল প্যারিসের জুতোওয়ালার বিরুদ্ধে। স্পেনের আদালত আবার রাজার কথায়ই ওঠে-বসে। কিন্তু নেদারল্যান্ডের আদালত দেশের সরকারেরই আলাদা শাখা, সেখানে রাজপরিবারের জন্য কোনও বাড়তি খাতির নেই। কাজেই ছোট ছেলের মামলা মাদ্রিদের আদালতে পাত্তাই পেল না, ওদিকে আমস্টারডামের আদালত ধার শোধ করার জন্য জুতোওয়ালার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ফেলল। সবকিছু দেখে ছেলেদের বাবাও বুঝলেন, ব্যবসা করতে হলে সেটা ব্যবসায়ীদের সাথেই করা উচিত, রাজাদের সাথে নয়। আর করলেও সেটা মাদ্রিদের চেয়ে আমস্টারডামে করাটাই সঙ্গত।

ছোট ছেলের বিপদ শুধু বাড়ছেই। স্পেনের রাজার আরও টাকা দরকার, আর কোথায় টাকা পাওয়া যাবে সেটাও এতদিনে বুঝে ফেলেছেন। এবার তিনি গুপ্তচরবৃত্তির সাজানো অভিযোগ চাপিয়ে দিলেন ছোট ছেলের উপর, সাথে এটাও জানিয়ে দিলেন যে খুব তাড়াতাড়ি বিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা এনে দিতে না পারলে বাকি জীবনটা তাকে কারাগারেই কাটাতে হবে।

বাবারও শিক্ষা হয়ে গেছে। তিনি টাকা দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনলেন, আর প্রতিজ্ঞা করলেন, স্পেনে আর না। এরপর তিনি মাদ্রিদের ব্যবসা গুটিয়ে ছোট ছেলেকে পাঠালেন রটারডামে। হল্যান্ডেই দুই জায়গায় ব্যবসা করার বুদ্ধিটা খারাপ না। শোনা যাচ্ছে স্পেনের ব্যবসায়ীরাও নাকি তাদের টাকা স্পেনের বাইরে পাচার করে দিচ্ছে। তারাও বুঝে গেছে কোথায় ব্যবসা করা লাভজনক আর নিরাপদ।

এভাবেই একসময় স্পেনের রাজা বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারালেন, আর ডাচ ব্যবসায়ীরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। ডাচদের সাম্রাজ্য তৈরি করে দিয়েছে এই ব্যবসায়ীরাই। স্পেনের রাজা যখন ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে অন্যায্যভাবে খাজনা আদায় করে প্রজাদের বিরাগভাজন হচ্ছেন, তখন ডাচ ব্যবসায়ীরা টাকা ধার নিয়ে আর ব্যবসার লভ্যাংশ বিক্রি করে সাম্রাজ্যবিস্তারে সাহায্য করছে। স্পেনের সরকারকে টাকা দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না, যেসব সতর্ক ব্যবসায়ী ডাচ সরকারকে টাকা দেওয়ার আগেও দুবার ভাবত, তারাও ডাচ ব্যবসায়ীদের টাকা দিয়েছে নির্দ্বিধায়।

যৌথ মূলধনী ব্যবসার শুরু তখন থেকেই। কোনো কোম্পানির সামনে বেশি লাভ করার সুযোগ দেখা গেলে মানুষ সেই কোম্পানির শেয়ার কিনতে শুরু করে, একটু বেশি দামে হলেও। আবার কোম্পানির লোকসানের সম্ভাবনা দেখা গেলে কম দামে শেয়ার বিক্রিও করে দেয়। এই শেয়ার কেনাবেচার সুবিধার্থে ইউরোপের বেশিরভাগ বড় শহরে স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়।

সবচেয়ে বিখ্যাত ডাচ যৌথ-মূলধনী কোম্পানি Vereenigde Oostindische Compagnie, সংক্ষেপে ভিওসি (VOC) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬০২ সালে, ঠিক যখন ডাচরা একটু একটু করে স্প্যানিশ শাসন থেকে বেরিয়ে আসছে। ভিওসি শেয়ার বিক্রির টাকায় জাহাজ বানিয়ে এশিয়ায় পাঠাত আর চীন, ভারত আর ইন্দোনেশিয়া থেকে মালামাল আনত। প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি বা জলদস্যুদের মোকাবেলা করার জন্যও তারা টাকা দিত। এমনকি ইন্দোনেশিয়া জয় করার অভিযানের খরচও দিয়েছে এই কোম্পানি।

ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপপুঞ্জ। এর হাজার হাজার দ্বীপ সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই শতশত রাজা, সুলতান আর দলের শাসন দেখে এসেছে। ১৬০৩ সালে যখন ভিওসির ব্যবসায়ীরা প্রথমবার ওখানে যায়, তখন তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধুই ব্যবসা। কিন্তু দিনে দিনে ব্যবসা ও ব্যবসার অংশীদারদের স্বার্থেই তাদের নানারকম সংঘাতে জড়াতে হয়েছে। স্থানীয় ক্ষমতাবানদের বাড়তি কর আদায়ের বিরুদ্ধে কিংবা অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে নানাভাবে লড়তে হয়েছে ভিওসিকে। এসব বিরোধের জন্যই একদিন ভিওসির বাণিজ্যিক জাহাজে দেখা গেল কামান। তারা ইউরোপ, জাপান, ভারত আর ইন্দোনেশিয়া থেকে সৈনিক জোগাড় করল, নানা জায়গায় দুর্গ বানাল, এমনকি রীতিমতো সামনাসামনি যুদ্ধও করতে শুরু করল। একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মকাণ্ড দেখে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু সে সময়ে বেসরকারি কোম্পানির যুদ্ধের আয়োজন করাটা বেশ স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। একটা বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান একটা আস্ত সাম্রাজ্য তৈরি করে ফেলছে- এটা সারা পৃথিবীতেই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।

ভিওসির সৈন্যরা একটার পর একটা দ্বীপ দখল করতে করতে ইন্দোনেশিয়ার একটা বড় অংশকেই নিজেদের উপনিবেশ বানিয়ে ফেলে। প্রায় দুইশ বছর ধরে তারা ইন্দোনেশিয়া শাসন করেছে। ১৮০০ সালে ডাচরা ইন্দোনেশিয়া দখল করে পরের দেড়শ বছর ধরে শাসন করে। এই একবিংশ শতাব্দীতে কর্পোরেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠছে- এমন কথা আমরা প্রায়ই শুনি। অথচ স্বার্থের জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যে কতদূর যেতে পারে তার নমুনা এর আগের শতাব্দীগুলোতে খুব ভালোভাবেই দেখা গেছে।

ভিওসি যখন ভারত মহাসাগরে তাদের ‘বাণিজ্য’ চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে আটলান্টিকে একই কাজ করছিল ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোম্পানি বা ডব্লিউআইসি। হাডসন নদীতে নিজেদের দখল ধরে রাখার জন্য তারা ঐ নদীর মুখেই একটা দ্বীপে ‘নিউ আমস্টারডাম’ নামের উপনিবেশ তৈরি করে। ইন্ডিয়ানরা মাঝেমধ্যেই সেখানে আক্রমণ করত। আর ব্রিটিশদের আক্রমণ ছিল নিয়মিত ঘটনা। ১৬৬৪ সালে ব্রিটিশরা জায়গাটা দখল করে নিয়ে তার নাম দেয় ‘নিউ ইয়র্ক’। আক্রমণ ঠেকাতে ডব্লিউআইসির লোকেরা যে দেয়াল তুলেছিল, আজ তার উপর দিয়ে তৈরি রাস্তাকে সবাই ‘ওয়াল স্ট্রিট’ নামে চেনে।

নিজেদের আধিপত্যের আত্মপ্রসাদে আর এইসব যুদ্ধ চালাতে গিয়েই একসময় ডাচরা নিউ ইয়র্কের দখল হারায়, হারায় ইউরোপের অর্থনৈতিক কেন্দ্রের জায়গাটাও। সেই শূন্যস্থান পূরণ করার প্রতিযোগিতায় নামে ফ্রান্স আর ব্রিটেন। শুরুতে ফ্রান্সই এগিয়ে ছিল। ফ্রান্স দেশটা আকারে ব্রিটেনের চেয়ে বড়, তার মানুষ আর সম্পদও ছিল বেশি। সেনাবাহিনীও ছিল দক্ষ। তারপরেও ইউরোপের অর্থনীতিতে ফ্রান্সের চেয়ে ব্রিটেনই এগিয়ে ছিল। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় যে অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দেয় সেটা মিসিসিপি বাবল (Mississippi Bubble) নামে পরিচিত। সেই সময়ে ফ্রান্সের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। আর তখনই ব্রিটেনের অর্থনীতি মানুষের আস্থা অর্জন করে। ঠিক তখনই একটা যৌথ মূলধনী কোম্পানির হাতে তৈরি হচ্ছে একটা সাম্রাজ্য।

১৭১৭ সালে ফ্রান্সের মিসিসিপি কোম্পানি মিসিসিপির অববাহিকায় উপনিবেশ তৈরির জন্য যাত্রা করে। নিউ অর্লিয়ন্স শহরটা সে সময়েই তৈরি হয়। এই বিরাট পরিকল্পনা সফল করতে প্রচুর টাকা দরকার। ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের দরবারে মিসিসিপি কোম্পানির ভালো জানাশোনা ছিল। তারা তখন প্যারিস স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করে। কোম্পানির পরিচালক জন ল ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। রাজা তাঁকে অর্থায়ন-নিয়ন্ত্রকের পদও দেন (যেটা আজকের দিনের অর্থমন্ত্রীর পদের সমতুল্য)। ১৭১৭ সালে মিসিসিপির আশেপাশে কুমির ভরা জলা জায়গা ছাড়া আর কিছু ছিল না। কিন্তু তা নিয়ে মিসিসিপি কোম্পানি মানুষকে অঢেল সম্পদ-সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখায়। সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে ফ্রান্সের ব্যবসায়ী, পুঁজিপতি আর অভিজাতরা প্রচুর বিনিয়োগ করে। মিসিসিপি কোম্পানির শেয়ারের দাম অনেক বেড়ে যায়। শুরুতে এক একটা শেয়ারের দাম ছিল ৫০০ লিভ্রা (পাউন্ড)। ১৭১৯ এর অগাস্টের ১ তারিখে এর দাম ছিল ২৭৫০ লিভ্রা, আর ৩০ তারিখে সেটাই হয়ে গেল ৪১০০ লিভ্রা। সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে এর দাম ৫০০০ আর ডিসেম্বরের ২ তারিখে ১০০০০ ছাড়িয়ে গেল। সারা প্যারিসে সাড়া পড়ে গেল। মানুষেরা তাদের সবকিছু বিক্রি করে না হয় ধার নিয়ে ছুটল মিসিসিপির শেয়ার কিনতে। রাতারাতি ধনী হওয়ার নেশায় পেল সবাইকে।

1660-new-amsterdam.jpg

৩৯। ম্যানহাটন দ্বীপের শেষপ্রান্তে নিউ আমস্টারডাম, ১৬৬০ সাল। এখানকার প্রতিরক্ষা দেওয়ালের উপরেই তৈরি হয়েছে আজকের ওয়াল স্ট্রিট।

কিছুদিনের মধ্যেই নেশা কেটে গিয়ে এল আতঙ্ক। অনেকেই টের পেল, শেয়ারের এই উচ্চমূল্য আসলে অস্থায়ী আর অবাস্তব। তারা বুঝতে পারল দাম বেশি থাকতে থাকতেই শেয়ার বেচে দেওয়া উচিত। সবাই শেয়ার বিক্রি শুরু করতেই বাজারে শেয়ারের যোগান বাড়ার কারণে দাম কমে গেল। দাম পড়ে যেতে দেখে বাকিরাও যার যার শেয়ার তাড়াতাড়ি বেচে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কাজেই শেয়ারের দামে ধস নামে। শেয়ারের দাম স্থিতিশীল করতে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক- বলা বাহুল্য, গভর্নর জন লয়ের নির্দেশে- মিসিসিপির শেয়ার কিনে নিতে থাকে। কিন্তু সব শেয়ার তো আর কিনে ফেলা সম্ভব নয়, ব্যাংকের টাকাও তো ফুরিয়ে যাবে। এই অবস্থায় দেশের অর্থায়ন-নিয়ন্ত্রক, অর্থাৎ সেই জন ল, বাকি শেয়ার কেনার জন্য নতুন টাকা ছাপানোর নির্দেশ দিলেন। এর ফলে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা হয়ে গেল একটা বুদবুদের মতো। সবাই মিলে আগেপিছে না ভেবে ফুঁ দিয়ে (টাকা ঢেলে) সেটাকে ফুলিয়ে তুলেছে, কিন্তু ফুলতে ফুলতে বুদবুদটা যখন ফেটেই গেল, তখন সবাই নিঃস্ব, কারও আর কিছু করার নেই। নতুন টাকা ছেপেও শেষরক্ষা হল না। মিসিসিপি শেয়ারের দাম ১০০০০ থেকে ১০০০ হয়ে গেল, তারপর আরও কমতে কমতে একেবারে শূন্যে এসে ঠেকল। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর রাষ্ট্রীয় কোষাগার ভরা কেবল মিসিসিপির শেয়ারে, একটা টাকাও নেই। বড় বড় ব্যবসায়ীদের গায়ে আঁচড়ও লাগল না, তারা পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে তাদের শেয়ার বেচে দিয়েছে আগেই। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সর্বনাশ হয়ে গেল। অনেকে আত্মহত্যাও করেছিল তখন।

এই মিসিসিপি বাবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধসগুলোর মধ্যে একটা। ফ্রান্স এই সঙ্কট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি আর কখনোই। মিসিসিপি কোম্পানি শেয়ারের দাম বাড়ানো আর মানুষের মধ্যে শেয়ার কেনার উন্মাদনা সৃষ্টি করতে যেভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছিল তাতে দেশের মানুষ ফরাসি ব্যাংক ব্যবস্থা আর রাজার অর্থনৈতিক জ্ঞানের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। ফলে পঞ্চদশ লুইয়ের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশদের কাছে ফরাসিদের পিছিয়ে পড়ার কারণ এটাই। ব্রিটিশরা খুব সহজে আর অল্প সুদে টাকা ধার নিতে পারত। ওদিকে ফ্রান্সে ঋণ নেওয়া আরও কঠিন হয়ে গেল, আর সুদের হারও বেড়ে গেল। সারা দেশের টাকার সঙ্কট ঠেকাতে ফ্রান্সের রাজাকে চড়া সুদে অনেক টাকা ধার নিতে হল। ১৭৮০ সালে নতুন রাজা ষোড়শ লুই সিংহাসনে বসেই দেখলেন দেশের বাজেটের অর্ধেক টাকা চলে যাচ্ছে শুধু ধার নেওয়া টাকার সুদ দিতে। রাজকোষ দেউলিয়া হতে বেশি বাকি নেই। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই ১৭৮৯ সালে রাজা অনিচ্ছাসত্ত্বেও দেড়শ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আইনসভার সম্মেলন ডাকলেন। ফরাসি বিপ্লবের শুরুটা সেখান থেকেই হয়।

এভাবেই পৃথিবীতে যখন ফরাসি সাম্রাজ্যের পতন হচ্ছে, ঠিক তখনই দুর্বার গতিতে বিস্তৃত হচ্ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। ডাচ সাম্রাজ্যের মতোই তাদের সাম্রাজ্যও তৈরি হয়েছে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন যৌথ-মূলধনী কোম্পানির হাতে। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে উত্তর আমেরিকায় তাদের প্রথম উপনিবেশ তৈরি করেছিল লন্ডন কোম্পানি, প্লিমাউথ কোম্পানি, ডরচেস্টার কোম্পানি আর ম্যাসাচুসেটস কোম্পানির মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

ব্রিটিশ রাজ্য কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশ দখল করেনি, করেছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী। তাদের সাফল্য ভিওসির চেয়েও বেশি। লন্ডনের লিডেনহল স্ট্রিটের প্রধান কার্যালয় থেকে তারা একশ বছর ধরে এই বিরাট সাম্রাজ্য শাসন করেছে। ভারতে তাদের সেনাবাহিনীতে সাড়ে তিন লাখ সৈন্য ছিল, এত সৈন্য খোদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেরও ছিল না। ১৮৫৮ সালে কোম্পানির সৈন্যসমেত এই বিপুল ভূখণ্ড ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন হয়। নেপোলিয়ন ব্রিটিশদের ‘দোকানদারের জাত’ বলে ঠাট্টা করতেন। অথচ এই দোকানদারের জাত নেপোলিয়নকে তো পরাজিত করেছেই, আর পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যের মালিকও ছিল কিন্তু এই ব্রিটিশরাই।

পুঁজির নামে

এই যে ইন্দোনেশিয়ার ডাচ সাম্রাজ্যের বা ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়া- এখানেই কিন্তু শেষ নয়, বরং এর পর থেকে সাম্রাজ্য ও পুঁজিবাদের সম্পর্কটা আরও দৃঢ় হয়েছে। উনিশ শতকে দেখা গেল, যৌথ-মূলধনী কোম্পানিগুলোর আর দেশ দখল করে শাসন করার দরকার নেই, বরং কোম্পানির ম্যানেজার আর শেয়ারমালিকরাই লন্ডন, আমস্টারডাম আর প্যারিসে বসে ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ছে। আর সাম্রাজ্যই তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য কাজ করছে। এজন্যই মার্ক্সের মতো লোকেরা বলে গেছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার আস্তে আস্তে একটা পুঁজিবাদী ট্রেড ইউনিয়ন হয়ে যাচ্ছে।

সরকার কীভাবে টাকার পিছনে ছোটে তার সবচেয়ে বিশ্রী উদাহরণ হল ১৮৪০ থেকে ১৮৪২ সালের মধ্যে হওয়া ব্রিটেন ও চীনের প্রথম আফিমের যুদ্ধ। উনিশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছাড়াও অনেক ব্রিটিশ লোক চীনে আফিমসহ বিভিন্ন রকম মাদক পাচার করে প্রচুর টাকা কামিয়েছিল। এতে চীনের লাখ লাখ লোক আফিমে আসক্ত হয়ে গোটা দেশটাকেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ১৮৩০ এর দশকের শেষে চীনের সরকার আইন করে মাদক পাচার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ব্রিটিশরা সে আইন না মেনে তাদের কাজ চালিয়ে যায়। তখন চীনা কর্তৃপক্ষ এসব মাদকের চালান বাজেয়াপ্ত করে নষ্ট করে ফেলতে শুরু করে। মাদক ব্যবসায়ীদের আবার ব্রিটেনের মন্ত্রী আর সংসদ সদস্যদের সাথে ভালো জানাশোনা ছিল। তাদের অনেকে আবার নিজেরাও এসব ব্যবসায়ীদের মাদক মজুদ করে রাখতেন, কাজেই তারা সহজেই এই ব্যাপারে সরকারি হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা করে ফেললেন।

১৮৪০ সালে ব্রিটেন ‘মুক্ত বাণিজ্যের’ নামে চীনের সাথে যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধটা ছিল পুরোপুরি একতরফা। অতি-আত্মবিশ্বাসী চীনা সেনাবাহিনী ব্রিটিশদের রণতরী, ভারী কামান, রকেট আর রাইফেলের সামনে দাঁড়াতেই পারল না। শেষে তারা ব্রিটিশ মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় বাধা দেবে না আর চীনা পুলিশের হাতে নষ্ট হওয়া মালামালের ক্ষতিপূরণ দেবে- এই শর্তে শান্তিচুক্তি করে। শুধু তাই না, ব্রিটিশরা এরপর হংকং-এও মাদক ব্যবসার সুযোগ দাবি করে এবং তা আদায়ও করে। এই হংকং মাদক চোরাচালানের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত হংকং ব্রিটিশদের হাতে ছিল। উনিশ শতকের শেষদিকে চীনের প্রায় চার কোটি মানুষ (মোট জনশংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগ) আফিমে আসক্ত ছিল।৩

মিশরও এই ব্রিটিশ পুঁজিবাদকে সমীহ করে চলেছে। উনিশ শতকে ফরাসি ও ব্রিটিশ বিয়োগকারীরা মিশরের শাসকদের অনেক বড় অঙ্কের টাকা ঋণ দিতেন- প্রথমত সুয়েজ খাল খননের খরচ যোগাতে, আর এর পরে সেখানে অল্প লাভজনক শিল্পের প্রসারের জন্য। এতে মিশরের ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেল। কাজেই ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা মিশরের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে শুরু করল। শেষে অতিষ্ঠ হয়ে ১৮৮১ সালে মিশরের জাতীয়তাবাদী মানুষ প্রতিবাদ শুরু করে। তারা সবরকম বৈদেশিক ঋণ বাতিলের ঘোষণা দেয়। রাণী ভিক্টোরিয়া অবশ্য এতে খুশি হতে পারেননি। বছর খানেক পরেই তিনি মিশরে স্থল ও নৌসেনা মোতায়েন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত মিশর ব্রিটিশদের দখলেই ছিল।

পুঁজিপতিদের স্বার্থে সংঘটিত যুদ্ধের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। আসলে এখানে যুদ্ধও আফিমের মতোই একটি পণ্য। ১৮২১ সালে গ্রিকরা অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ব্রিটেনের রোমান্টিক ও স্বাধীনচেতা মানুষদের কাছ থেকে এই বিপ্লব প্রচুর সমর্থন পায়। ব্রিটিশ কবি লর্ড বায়রন তো নিজেই গ্রিসে চলে গিয়েছিলেন লড়াইয়ে যোগ দিতে। পুঁজিপতিরাও এখানে একটা মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যায়। তারা বিদ্রোহী নেতাদের অনুরোধ করে লন্ডনের স্টক এক্সচেঞ্জে নিজেদের বন্ড চালু করতে। শর্ত ছিল গ্রিকরা স্বাধীন হলে এসব বন্ডের দাম সুদসহ শোধ করবে। বিনিয়োগকারীরা লাভের আশায় অথবা গ্রিকদের সমর্থন দিতে এসব বন্ড কিনত। এসব বন্ডের দাম আবার যুদ্ধে গ্রিকদের অবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে উঠত-নামত। শেষে তুর্কিরা যখন যুদ্ধে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেল, তখন বন্ডমালিকদের চোয়াল ঝুলে পড়তে লাগল। যেহেতু ব্যবসায়ীদের স্বার্থই ব্রিটিশদের জাতীয় স্বার্থ, কাজেই ১৮২৭ সালে ব্রিটিশদের একটি নৌবহর নাভারিনোর যুদ্ধে (Battle of Navarino) অটোমানদের একটা নৌবহর ডুবিয়ে দিল। অনেক শতাব্দী ধরে পরাধীন থাকার পর অবশেষে গ্রিস স্বাধীন হল। কিন্তু স্বাধীনতার সাথে সাথে তার মাথায় এমনই এক বিরাট ঋণের বোঝা চাপল যে সেটা শোধ করার আর কোনো উপায় রইল না। এরপর দশকের পর দশক ধরে গ্রিসের অর্থনীতি ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের হাতে জিম্মি হয়ে রইল।

পুঁজিবাদ আর রাজনীতির এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে পুঁজিবাজারে। কোথাও নতুন তেলের খনি পাওয়া গেছে, অথবা কেউ নতুন কোনো যন্ত্র আবিষ্কার করেছে- এ ধরণের অর্থনৈতিক প্রভাবক যেমন আছে, তেমনি কোথাও সরকার পরিবর্তন হচ্ছে কিংবা কোনো দেশ নতুন বৈদেশিক নীতি তৈরি করছে- এ ধরনের রাজনৈতিক বিষয়গুলোও পুঁজিবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। নাভারিনোর যুদ্ধের পর অনেক ব্রিটিশ পুঁজিপতিই বিদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। কারণ তারা এখন জানে, কেউ যদি টাকা ধার নিয়ে ঠিকমতো শোধ না করে, তবে তাকে শায়েস্তা করার জন্য রাণীর সৈন্যবাহিনী তো আছেই!

এই জন্যই আজকের দিনে একটা দেশের সম্পদের পরিমাণের চেয়ে তার ক্রেডিট রেটিং অর্থনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেডিট রেটিং হল টাকা ধার নিলে সেটা শোধ করার সম্ভাবনার পরিমাপ। কোনো দেশের ক্রেডিট রেটিং নির্ধারণ করার জন্য বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্তের পাশাপাশি সে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এমনকি সাংস্কৃতিক অবস্থাও আমলে নেওয়া হয়। একটা দেশে যদি স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় থাকে, সবসময় যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকে আর বিচার ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সে দেশ তেলের উপরে ভাসলেও তার ক্রেডিট রেটিং কম হবে। এর ফলে সে দেশ ঐ তেল ব্যবহার করে পুঁজি তৈরি করতে পারবে না, সেটা দরিদ্র দেশ হয়েই থাকবে। অন্যদিকে যে দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ নেই কিন্তু শান্তি আছে, সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা আর উন্মুক্ত সরকার ব্যবস্থা (যেখানে সরকারের ক্ষমতা আইন, শাসন ও বিচার ব্যবস্থার মধ্যে বিভক্ত থাকে) আছে, সে দেশের ক্রেডিট রেটিং বেশি হবে। ক্রেডিট রেটিং বেশি হওয়ার কারণে সেখানে বেশি বিনিয়োগ হবে, ফলে সহজে আরও বেশি পুঁজি তৈরি হবে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে সেখানে শিক্ষা ও শিল্পের উন্নতিও বেশি হবে।

মুক্তবাজারের ভূত

পুঁজিবাদ আর রাজনীতি এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এই দুটোর সম্পর্ক নিয়ে অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ আর আমজনতা- কারও মধ্যেই বিতর্কের শেষ নেই। ঘোর পুঁজিবাদীরা বলেন পুঁজিবাদ রাজনীতিকে প্রভাবিত করতেই পারে, তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু রাজনীতি যেন পুঁজিবাজারে প্রভাব না ফেলে। কারণ সরকার যখন বাজারে হস্তক্ষেপ করে, তখন রাজনৈতিক প্রভাবে মানুষ বিনিয়োগে ভুল করে আর তাতে অর্থনীতির অগ্রগতি ব্যাহত হয়। ধরুন সরকার ভোট বাড়ানোর জন্য শিল্পপতিদের উপর বেশি কর চাপিয়ে দিয়ে বেকারদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিল। তাতে পুঁজিপতিরা নাখোশ হবে। কারণ তাদের মতে, শিল্পপতিদের যদি কর একটু কম দিতে হয় তাহলে তারা আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে, ফলে আরও বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

এদিক থেকে দেখলে সর্বোত্তম অর্থনৈতিক কাঠামোতে রাজনীতিকে অর্থনীতি থেকে দূরে রাখা উচিত, কর কমিয়ে দেওয়া উচিত, সরকারের নিয়ন্ত্রণ যথাসম্ভব কমানো উচিত আর বাজারকে নিজ গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত না হয়ে সর্বোচ্চ লাভের খাতে তাদের টাকা বিনিয়োগ করবে। ফলে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে। তাতে মালিক ও শ্রমিক সবারই সুবিধা। অর্থাৎ অর্থনীতিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ যত কম হয় তত ভালো। এই মুক্তবাজার নীতিই আজকের দিনে পুঁজিবাদের সবচেয়ে চেনা রূপ। মুক্তবাজার সমর্থকরা দেশের বাইরে সামরিক অভিযান আর দেশের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড- এ দুটোকেই একই রকম অপছন্দ করে। সরকারের প্রতি তাদের পরামর্শ অনেকটা বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের মতোই- “কিচ্ছু করার দরকার নেই, সব যেভাবে চলছে চলতে দাও”।

তবে একটু তলিয়ে দেখলে মুক্তবাজারে বিশ্বাস করা অনেকটা সান্তা ক্লজে বিশ্বাস করার মতোই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। আসলে কোনো বাজারের পক্ষেই রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। আজকের অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হল ভবিষ্যতের উপর মানুষের আস্থা। এই সম্পদও কিন্তু চুরি কিংবা জালিয়াতির ঊর্ধ্বে নয়। বাজার কখনও জালিয়াতি, চুরি বা সন্ত্রাসের হাত থেকে সম্পদ বাঁচানোর দায়িত্ব নেয় না। সেটা কিন্তু রাজনৈতিক কাঠামোর কাজের মধ্যেই পড়ে। সম্পদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করাটা সরকারেরই দায়িত্ব। সরকার এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, এর ফলে পুঁজি আর বিনিয়োগ কমে যায় আর অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। ১৭১৯ সালের মিসিসিপি বাবল থেকে পাওয়া মূল শিক্ষা কিন্তু এটাই। এই শিক্ষা যে নিতে পারেনি তার জন্য আছে ২০০৭ সালের যুক্তরাষ্ট্রের হাউজিং বাবল (US housing bubble)।

পুঁজিবাদের নরক

নিয়ন্ত্রণহীন মুক্তবাজারকে ভয় পাওয়ার আরও কারণ আছে। অ্যাডাম স্মিথ বলেছিলেন লাভের উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে আরও শ্রমিক নিয়োগ করা যায়, আর লোভ জিনিসটা সবার জন্যই ভালো- এতে উৎপাদন আর কর্মসংস্থান দুই-ই বাড়ে।

এখন একজন শিল্পপতি যদি শ্রমিকদের বেতন কম দিয়ে আর অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে উৎপাদন বাড়াতে চায়? এক্ষেত্রে মুক্তবাজার অর্থনীতিই শ্রমিকদের রক্ষা করবে। শ্রমিকরা যদি অরিরিক্ত কাজ করেও কম বেতন পায়, তাহলে ভালো শ্রমিকরা আস্তে আস্তে সেখান থেকে সরে যাবে, প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পপতিদের কারখানায় কাজ খুঁজে নেবে। ফলে স্বেচ্ছাচারী শিল্পপতি দক্ষ শ্রমিক হারাবে। কাজেই তাকে হয় নিজের আচরণ ঠিক করতে হবে নয়তো কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। এভাবে তার নিজের লোভই তাকে শ্রমিকদের সাথে ভালো আচরণ করতে বাধ্য করবে।

তত্ত্ব হিসাবে এসব শুনতে ভালোই লাগে, কিন্তু বাস্তব অন্যরকম। যে বাজার পুরোপুরি মুক্ত, অর্থাৎ যেখানে কোনো রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে একজন অসৎ শিল্পপতি একচেটিয়া ব্যবসা কিংবা শ্রমিকদের শোষণ করতেই পারে। কোনো একটা প্রতিষ্ঠান যদি দেশের কোনো শিল্পের সব কারখানা দখল করে নেয়, অথবা যদি সব কারখানা মালিকরা চক্রান্ত করে একসাথে শ্রমিকদের বেতন কমিয়ে দেয়, তাহলে শ্রমিকদেরও আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকবে না।

শুধু তাই নয়, একজন লোভী মালিক তার শ্রমিকদের বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতেও বাধ্য করতে পারে। মধ্যযুগের শেষদিকে ক্রীতদাস প্রথা কী তা খ্রিস্টান অধ্যুষিত ইউরোপের লোকে জানতই না। আর আধুনিক যুগের শুরুতে ইউরোপীয় পুঁজিবাদের সাথে সাথেই উঠে এসেছে আটলান্টিক সাগরের দাস ব্যবসা। এর জন্য কিন্তু কোনো স্বৈরাচারী শাসক বা বর্ণবিদ্বেষ দায়ী নয়, দায়ী অনিয়ন্ত্রিত বাজার।

আমেরিকা জয় করার পর ইউরোপীয়রা সোনা ও রূপার খনির সন্ধান পায়, আর চিনি, তামাক ও তুলার খামার তৈরি করে। এগুলো ছিল তাদের উৎপাদন ও রপ্তানির প্রধান ক্ষেত্র। চিনির কারখানাগুলো ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগে ইউরোপে চিনি ছিল এক দুর্লভ বস্তু। মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রচুর দামে চিনি আমদানি করা হতো। বিভিন্ন মহার্ঘ্য খাবারে কিংবা সাপের তেলের ওষুধে ‘গোপন উপকরণ’ হিসেবেই সেটা ব্যবহার করা হতো। আমেরিকায় চিনিকল তৈরির পর থেকে ইউরোপে চিনির সরবরাহ বাড়তে থাকে। ফলে চিনির দাম দ্রুত কমতে শুরু করে আর ইউরোপের মানুষের মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণও বাড়তে থাকে। রাঁধুনিরাও নানা রকম মিষ্টি খাবার ও পানীয় তৈরি করতে শুরু করে। সপ্তদশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের একজন মানুষের বার্ষিক চিনির চাহিদা ছিল শূন্যের কাছাকাছি। অথচ ঊনবিংশ শতকের শুরুতে সেটা হয়ে গেল আট কেজির কাছাকাছি।

আখের চাষ ও তা থেকে চিনি তৈরি করাটা খুবই শ্রমসাধ্য কাজ। আমেরিকার ক্রান্তীয় এলাকার গরম আবহাওয়ায় ম্যালেরিয়া হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে কেউই চাইত না। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের হাতে তৈরি জিনিস জনসাধারণের হাতে কম দামে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিন্তু বাজারে চাহিদা প্রচুর। সবকিছু দেখে, লাভের আশায় আর অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য লোভী মালিকেরা চিনি উৎপাদনের কাজে ক্রীতদাস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল।

ষোড়শ থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আফ্রিকা থেকে প্রায় এক কোটি ক্রীতদাস আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের ৭০ শতাংশই কাজ করত চিনিকলে। সেখানে ক্রীতদাসদের জীবন ছিল অত্যন্ত দুর্বিষহ। তারা বেশি দিন বাঁচতও না। আফ্রিকার ভিতর থেকে আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত যাওয়ার পথে নানা যুদ্ধবিগ্রহে মারাও পড়ত অনেকে। ইউরোপের মানুষের চায়ে চিনির যোগান দিতে আর চিনিকল মালিকদের পকেটে টাকা আনতে এভাবেই শেষ হয়ে গেছে অসংখ্য ক্রীতদাসের জীবন।

এই ক্রীতদাস ব্যবসা কিন্তু কোনো দেশ বা সরকার চালায়নি। এর কারণ সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক। চাহিদা ও যোগানের সব সূত্র মেনে মুক্তবাজারের নীতিতে এই বাণিজ্য চলেছে। দাস-ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো আমস্টারডাম, লন্ডন আর প্যারিসের স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার বিক্রি করত। ইউরোপের মধ্যবিত্তরা এসব শেয়ার কিনত। শেয়ার বিক্রি করে পাওয়া টাকায় দাস ব্যবসায়ীরা জাহাজ কিনত, নাবিক ও সৈনিক জোগাড় করে যেত আফ্রিকায় আর সেখান থেকে দাস কিনে আমেরিকায় পাঠাত। আমেরিকার নানান ক্ষেতখামারে সেই দাসদের বিক্রি করে তারা কিনে নিয়ে আসত চিনি, কোকো, কফি, তামাক, তুলা ও রাম। সেসব নিয়ে ইউরোপে ফিরে ভালো দামে চিনি আর তুলা বিক্রি করে আবার চলে যেত আফ্রিকায়, আরেক দফা ব্যবসার জন্য। এই ব্যবস্থায় শেয়ারমালিকরাও খুশি। পুরো অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে বছরে প্রায় ৬ শতাংশ লাভে চলেছে এই দাস ব্যবসা। আজকের দিনেও যেকোনো বাণিজ্য-বিশেষজ্ঞ একে অত্যন্ত লাভজনক বলে স্বীকার করে নেবেন নির্দ্বিধায়।

এটাই হল মুক্তবাজার অর্থনীতির সমস্যা। ব্যবসায় সৎ পথে লাভ হচ্ছে কি না বা লাভের টাকা সুষমভাবে সবার মধ্যে বণ্টিত হচ্ছে কি না- তার কোনো নিশ্চয়তা কেউ দেয় না। বরং উল্টোটাই হয়- আরও বেশি উৎপাদন ও লাভের নেশা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, কোনো বাধা-বিপত্তি সে আর মানতে চায় না। অগ্রগতির পথ থেকে যখন নৈতিক বাধাটুকু সরে যায়, তখন বিপর্যয় ঘটতে আর দেরি হয় না। কোনো কোনো ধর্ম, যেমন খ্রিস্টধর্ম বা নাৎসিবাদ কেবল ঘৃণার কারণে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। আর পুঁজিবাদ লাখ লাখ মানুষ মেরেছে লোভ আর নির্লিপ্ততা দিয়ে। আটলান্টিকের দাস ব্যবসার পিছনে কোনো বর্ণবিদ্বেষ নেই। যেসব মানুষ এই ব্যবসার শেয়ার কিনেছে, যারা বিক্রি করেছে, আর যারা এই ব্যবসা চালিয়েছে- আফ্রিকার মানুষদের নিয়ে তাদের কেউ কখনও ভাবেইনি। ভাবেনি চিনিকলের মালিকরাও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কারখানা থেকে দূরে থাকত, সেখান থেকে লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখেই তারা খুশি।

ক্রীতদাস ব্যবসা ছাড়াও আরও উদাহরণ আছে। আগের অধ্যায়ে যে বাংলার দুর্ভিক্ষের কথা বলা হয়েছে, তার কারণটাও এমনই। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এক কোটি বাঙালির জীবনের চেয়ে ব্যবসায়িক লাভটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওদিকে ইন্দোনেশিয়ায় ভিওসির অভিযানের জন্য টাকা দিয়েছে যারা, তারাও সাংসারিক মানুষই ছিল- তাদের পরিবার ছিল, সন্তান ছিল, তারা দান-খয়রাত করত, গান শুনত, শিল্পের কদর বুঝত। অথচ জাভা, সুমাত্রা ও মালাক্কার নিপীড়িত মানুষদের জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতি তাদের ছিল না। বর্তমান অর্থনীতির এই অগ্রগতির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে পৃথিবী জুড়ে অগণিত অপরাধ ও শোষণের ইতিহাস।

উনিশ শতকের পুঁজিবাদও তেমন কোনো মানবিকতার পরিচয় দেয়নি। ইউরোপজুড়ে শিল্পবিপ্লবের সময়ে ব্যাংকার আর শিল্পপতিদের পকেট ফুলেফেঁপে উঠেছে, কিন্তু লাখ লাখ শ্রমিকের জীবনে এনে দিয়েছে অন্তহীন ভোগান্তি। ইউরোপের উপনিবেশগুলোর অবস্থা ছিল আরও খারাপ। ১৮৭৬ সালে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড একটা বেসরকারি মানবকল্যাণ সংস্থা তৈরি করেন। সেই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল মধ্য আফ্রিকা আবিষ্কার ও কঙ্গো নদীপথে দাস ব্যবসা প্রতিরোধ। অন্যান্য উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল সেখানে রাস্তাঘাট, বিদ্যালয় আর হাসপাতাল বানিয়ে ওখানকার মানুষের জীবনমান উন্নত করা। ১৮৮৫ সালে ইউরোপের কিছু দেশ ঐ সংগঠনকে কঙ্গো নদীর অববাহিকায় ২৩ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা দান করে। আকারে সেই এলাকাটা বেলজিয়ামের প্রায় ৭৫ গুণ। তখন থেকে সেই এলাকাটাকেই আমরা কঙ্গো নামক দেশ হিসেবে জানি। তবে এত বড় একটা পরিবর্তনের আগে কেউ সেখানকার ২-৩ কোটি অধিবাসীর মতামত জানতে চায়নি একবারও।

এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই মানবকল্যাণ সংস্থাটা একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যার উদ্দেশ্য যথারীতি প্রবৃদ্ধি আর মুনাফা অর্জন। স্কুল আর হাসপাতাল মাথায় উঠল, কঙ্গো নদীর দুই তীর ভরে গেল খনি আর খামারে। সেসবের মালিকেরা অবশ্যই বেলজিয়ামের লোক। তারা স্থানীয় মানুষদের শোষণের কোনো কমতি রাখেনি। এসবের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল ওখানকার রাবার শিল্প। তখন রাবারের প্রয়োজনীয়তা হু হু করে বাড়ছে, আর কঙ্গোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল রাবার রপ্তানি। রাবারচাষীদের কাছে অনেক বেশি রাবার দাবি করা হতো। সে দাবি পূরণ করতে না পারলে এই ‘অলসতার’ জন্য তাদের দেওয়া হতো নির্মম শাস্তি। তাদের হাত কেটে ফেলা হতো। অনেক সময় পুরো একটা গ্রামের সব মানুষকে হত্যা করা হতো। ধারণা করা হয়, ১৮৮৫ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে কম করে হলেও ৬০ লক্ষ মানুষের প্রাণ গেছে শুধু এই রাবারের জন্য, যা কিনা কঙ্গোর মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ)। কোনো কোনো সমীক্ষা অনুযায়ী এই সংখ্যাটা এক কোটিও হতে পারে।৪

১৯০৮ সালের পর, বিশেষ করে ১৯৪৫ এর পরে পুঁজিবাদের লোভ একটু সংযত হল, এর পেছনে অবশ্য কম্যুনিজমের অবদান কম নয়। তাই বলে সাম্য কিন্তু আসেনি। ১৫০০ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে পৃথিবীর সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। কিন্তু এখনও সেটা এত অসমভাবে বণ্টিত যে আফ্রিকার কৃষক আর ইন্দোনেশিয়ার শ্রমিকেরা আজও দিনশেষে তাদের ৫০০ বছর আগের পূর্বসূরীদের চেয়েও কম মজুরি নিয়ে ঘরে ফেরে। কৃষিবিপ্লব যেমন মানবজাতির জন্য একটা বিরাট ধোঁকা ছিল, এই অর্থনৈতিক উন্নয়নও ঠিক তাই। পৃথিবীতে মানুষ বাড়ছে, সাথে প্রসারিত হচ্ছে অর্থনীতিও, কিন্তু তার মাঝেও অসংখ্য মানুষের জীবন চাপা পড়ে আছে অভাব ও ক্ষুধার কালো ছায়ায়।

এই অভিযোগের বিপরীতে পুঁজিবাদ দুটো যুক্তি দেখাতে পারে। প্রথমটা হল, একটা পুঁজিবাদী পৃথিবী শাসন করতে পারবে কেবল পুঁজিবাদী মানুষই। এর বিপরীত ধারা কম্যুনিজমের ব্যর্থতার পরিমাণ এত বেশি যে সেদিকে যাওয়ার চেষ্টা মনে হয় কেউই করবে না। ৮৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মানুষেরা যদি কৃষিবিপ্লবের বিপক্ষে অবস্থান নিত, তা হলেও যেমন আর ফেরার পথ ছিল না, ঠিক তেমনি হাজারটা দোষ নিয়েও আজ পুঁজিবাদ টিকে থাকবে, কারণ এখানেও ফেরার পথ বন্ধ।

আর দ্বিতীয় যুক্তিটা হল, পুঁজিবাদের সুফল পেতে হলে আমাদের আরও ধৈর্য ধরতে হবে। পুঁজিবাদ যে স্বর্গের স্বপ্ন দেখায়, সেখানে পৌঁছাতে আমাদের আর একটু বাকি। হ্যাঁ, ভুল অনেক হয়েছে। কিন্তু ভুল থেকে তো শিক্ষাও হয়েছে। এভাবেই আমাদের সম্পদ আরেকটু বাড়বে, সবাই আরও বেশি সম্পদের মালিক হবে। বৈষম্যটুকু হয়তো পুরোপুরি দূর হবে না, কিন্তু তাতেও মানুষ তার চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট পাবে- এমনকি কঙ্গোর মানুষও।

আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি এখনও। কিছু কিছু বিষয়, যেমন গড় আয়ু, শিশু মৃত্যুহার, খাবারের সরবরাহ- এসব দিয়ে বিচার করলে ২০১৪ সালের গড়পড়তা একজন মানুষের জীবনের মান ১৯১৪ সালের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। সারা পৃথিবীতে জনসংখ্যার বিস্ফোরণের পরেও।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এভাবে কি অনন্তকাল চলতেই থাকবে? সম্পদ বৃদ্ধি করতে হলে কাঁচামাল ও শক্তি লাগে- কিন্তু দুটোই তো সীমিত। আজ হোক বা একশ বছর পরেই হোক, একদিন কি এ দুটোই শেষ হয়ে যাবে না? তখন কী করবে মানুষ?


1 Maddison, World Economy, vol. 1, 261, 264; ‘Gross National Income Per Capita 2009, Atlas Method and PPP’, the World Bank, accessed 10 December 2010, http://siteresources.worldbank.org/DATASTATISTICS/Resources/GNIPC.pdf.

2 The mathematics of my bakery example are not as accurate as they could be. Since banks are allowed to loan $10 for every dollar they keep in their possession, of every million dollars deposited in the bank, the bank can loan out to entrepreneurs only about $909,000 while keeping $91,000 in its vaults. But to make life easier for the readers I preferred to work with round numbers. Besides, banks do not always follow the rules.

3 Carl Trocki, Opium, Empire and the Global Political Economy (New York: Routledge, 1999), 91.

4 Georges Nzongola-Ntalaja, The Congo from Leopold to Kabila: A People’s History (London: Zed Books, 2002), 22.

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s